🎨 রংধনু ছোঁয়ার স্বপ্ন
সুরঞ্জনা তখন সবে তার বাইশ বছর বয়স পেরিয়েছে। সে থাকত উত্তর কলকাতার এক পুরোনো, স্যাঁতসেঁতে বাড়ির দোতলায়। তার ঘরটি ছিল জানালাবিহীন, দিনের আলোও যেখানে ঠিকমতো পৌঁছাত না। কিন্তু তার ভেতরের পৃথিবীটা ছিল একেবারেই অন্যরকম—সেটা ছিল হাজারো রঙের আঁকা এক ক্যানভাস।
সুরঞ্জনার একমাত্র নেশা ছিল ছবি আঁকা। তার ক্যানভাসে প্রকৃতির কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না। সেখানে আকাশ লাল হতে পারত, নদী বেগুনি আর মানুষজন শুধু ছায়ামূর্তিতে। তার এই অদ্ভুত, স্বপ্নালু আঁকাআঁকি তার মা-বাবা কোনোদিনই সমর্থন করেননি। তাদের চোখে, 'ছবি এঁকে পেট চালানো যায় না।' তারা চাইতেন, সুরঞ্জনা সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিক, যেমনটা পাড়ার আর পাঁচটা ছেলেমেয়ে করে।
একদিন, সুরঞ্জনা তার সবচেয়ে প্রিয় ছবিটি আঁকল। এটি ছিল একটি বৃষ্টির পরের দৃশ্য। কিন্তু সেখানে কোনো ভেজা রাস্তা বা কাদামাটি ছিল না। ক্যানভাসের মাঝখানে ছিল একটি ছোট্ট, ভাঙা ছাতা, যা থেকে সাতটি উজ্জ্বল রঙের ধারা ঝরে পড়ছে। রংগুলো মাটিতে মিশে না গিয়ে, উল্টো আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে এবং একটি স্বচ্ছ রংধনু তৈরি করছে। ছবিটির নাম দিয়েছিল সে—"ফেরার পথ"।
ঐদিনই সন্ধ্যায়, তার বাবা তাকে ডেকে কঠোরভাবে বললেন, "তোমার এই ছেলেমানুষি আর কতদিন চলবে, সুরঞ্জনা? আর ক'দিন পর তোমার পঁচিশ হবে। একটা বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে, বেশ ভালো ঘর। ছবি আঁকা ছেড়ে দাও। ওসবে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।"
সুরঞ্জনা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখ ভিজে এলো, কিন্তু এবার সে আর কাঁদলো না। সে অনুভব করল, তার ভিতরের রংগুলো কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে আসছে। তার আঁকা রংধনুটা যেন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হলো, যদি সে আজ নিজেকে বাঁচিয়ে না রাখে, তাহলে তার সৃষ্টিও হারিয়ে যাবে।
পরের দিন খুব ভোরে, সুরঞ্জনা একটি ছোট ব্যাগে তার আঁকার সরঞ্জাম আর "ফেরার পথ" ছবিটি ভরে চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। তার পকেটে ছিল সামান্য কিছু টাকা, যা দিয়ে এক সপ্তাহের বেশি চলবে না। সে শহরের অন্য প্রান্তে, যেখানে শিল্পীদের একটি ছোট কলোনি ছিল, সেখানে পৌঁছালো।
কলোনিটি ছিল একটি পুরোনো চালের গুদামঘরকে ভাগ করে বানানো। সেখানে একজন বয়স্ক, খেয়ালী ভাস্কর, যার নাম ছিল প্রতাপ সেন, থাকতেন। সুরঞ্জনা তাঁকে তার ছবি দেখাল। প্রতাপ সেন অনেকক্ষণ ধরে ছবিটি দেখলেন। তিনি সুরঞ্জনার দিকে না তাকিয়ে শুধু বললেন, "এসো, মা। তুমি থাকতে পারো এখানে। তবে কাজ করতে হবে।"
সুরঞ্জনা মাথা নাড়ল। তার কাজ ছিল মূলত প্রতাপ সেনের ভাস্কর্যগুলির ছোটখাটো ফিনিশিং দেওয়া আর স্টুডিও পরিষ্কার রাখা। বিনিময়ে সে কোণায় একটি ছোট থাকার জায়গা পেল।
কয়েক মাস কেটে গেল। সুরঞ্জনা কঠোর পরিশ্রম করত, কিন্তু তার নিজের ছবি আঁকার সময় মিলত না। তার রংধনু ছোঁয়ার স্বপ্নটা চাপা পড়ে গেল দৈনন্দিন জীবনের ধুলোয়।
একদিন রাতে, প্রতাপ সেন সুরঞ্জনার কাছে এসে বললেন, "মা, তোমার সেই রংধনুর ছবিটা আর আঁকো না কেন?"
সুরঞ্জনা মাথা নিচু করে বলল, "সময় হয় না, আর... সাহসও পাই না। ভাবি, আসলে কি কোনো লাভ হবে?"
প্রতাপ সেন হাসলেন। "লাভ-ক্ষতির অঙ্কটা শিল্পীর জন্য নয়, মা। শিল্পী জানে, তার কাজটা শেষ করতেই হবে। তুমি ওই ছবিটা কেন এঁকেছিলে? কারণ, তুমি জানতে, তোমার রংধনুটা শুধু মাটিতে ঝরে পড়ার জন্য নয়, তার গন্তব্য আকাশ।"
সেই রাতে সুরঞ্জনা আবার রং তুলি নিল। কিন্তু এবার, সে প্রতাপ সেনের স্টুডিওর বাইরে, খোলা ছাদে বসে আঁকল। চাঁদের আলো আর স্ট্রিট লাইটের হলদে আলোয় সে আঁকল এক নতুন ক্যানভাস। সেখানে একটি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, যার হাতে কোনো ছাতা নেই, কিন্তু সে তার নিজের হাত দিয়ে আলো আর রং ধরে, আকাশ থেকে আসা রংধনুর দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। ছবিটির নাম দিল সে—"আলোর সেতু"।
পরের সপ্তাহেই প্রতাপ সেন তার স্টুডিওতে একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করলেন। তিনি তার নিজের কাজের সাথে সুরঞ্জনার "আলোর সেতু" ছবিটিও রাখলেন। একজন আর্ট গ্যালারির মালিক ছবিটি দেখে এতটাই মুগ্ধ হলেন যে তিনি সুরঞ্জনার আঁকা ছবিগুলি তার গ্যালারিতে স্থান দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন।
সুরঞ্জনার জীবনে প্রথমবার এক ঝলক রংধনু সত্যি হলো। গ্যালারির মালিক তাকে বললেন, "তোমার ছবিগুলোতে এমন একটা পাগলামি আছে, যা মানুষের স্বপ্নকে ছুঁয়ে যায়।"
মাসখানেক পরে, সুরঞ্জনা তার নিজের উপার্জিত টাকা দিয়ে একটি ছোট স্টুডিও ঘর ভাড়া করল। সে তার মা-বাবাকে চিঠি লিখল। চিঠিতে সে চাকরির কথা বলেনি, বা বিয়ের সম্বন্ধের কথাও লেখেনি। সে শুধু লিখেছিল:
> "বাবা, মা, আমি ভালো আছি। আমি এখন আমার রংধনু ছোঁয়ার পথে। আমার ফেরার পথ আমি নিজেই এঁকেছি, আর আজ সেই পথেই আমি হাঁটছি। হয়তো এতে অনেক টাকা নেই, কিন্তু আমার সবটুকু শান্তি আর রং আছে।"
>
সুরঞ্জনা বুঝতে পারল, জীবনের আসল রংধনু বাইরের আলোতে নয়, সেটা থাকে নিজের ভেতরের বিশ্বাস আর সাহসের মধ্যে।