কবিতা: অসহ্য দহন
কবি: সৌরদীপ অধিকারী
বাইরের আকাশ তখন কালবৈশাখী ঝড়ের শেষ মুহূর্তের শ্বাসরোধকারী স্তব্ধতা, নয় কোনো গর্জন, শুধু অন্ধকারের গিলে নেওয়া এক অসহনীয় চাপ।
তোমার চোখে আজ কোনো আস্থা নয়, দেখি শুধু ধীরে ধীরে জমতে থাকা লাভা ফুঁড়ে বের করে আনার জিদ।
এ রাত শুধুই জীবনের মূল, নগ্ন স্রোতে মিশে যাওয়ার,
তুমি আর আমি, পাহাড়-ধসের অপ্রতিরোধ্য গতিতে ভাসিয়ে নিয়ে যাও আমার মনের শেষ প্রতিরোধটুকু, এই হোক চূড়ান্ত বিলীন।
আমার শরীর শুকনো খটখটে মাটি, এক অপ্রতিরোধ্য অনাবাদী জমি, প্রথম জলের জন্য উন্মত্ত,
তোমার শক্ত, গরম, ঘর্মাক্ত আলিঙ্গন যখন আমাকে ভেতরে ভেতরে গুঁড়িয়ে দেয়, ঠিক যেন পাহাড়ে আছড়ে পড়া উল্কাপিণ্ড।
ভেতরে বাজে এক আদিম বন্যতা, যা শুধুই অন্যকে সম্পূর্ণ অধিকারের ভয়ঙ্কর নেশা।
তোমার উষ্ণ হাতের প্রতিটি দখল যেন বৃষ্টি নয়, এ যেন আগ্নেয়গিরির লাভা—যা আমার স্পর্শকাতর প্রতিটি রন্ধ্রপথ চেনে,
মনে হয় যেন পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে উঠে আসা চরমতম উত্তাপ ছাড়া আর কোনো অস্তিত্ব নেই।
আমাদের শরীর যেন দুই বিপরীত শক্তি কেন্দ্রের শেষ, বিধ্বংসী আকর্ষণ, এক অপরিহার্য বিস্ফোরণের প্রস্তুতি।
এখানে নদীর শান্ত বয়ে যাওয়া নেই, আছে শুধু ক্ষ্যাপা সমুদ্রের উত্তাল, হিংস্র তাণ্ডব—যা সব কিছু ভাসিয়ে নেয়।
তোমার শ্বাসরুদ্ধকর চাপ যখন আমার বুকে চাপ দেওয়া পাথরের মতো নয়, যেন বুক ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা,
তখন আনন্দ আর যন্ত্রণার এক হিংস্র মিশ্রণ হয়, যেখানে আমার সবটুকু প্রতিরোধ ভেঙে যায়।
ঠোঁটে ঠোঁট নয়, এ যেন অন্ধকারের গভীরে থাকা দুটি শিকড়ের উন্মত্ত বাঁধন, যা নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত থামবে না।
যেখানে সব দ্বিধা শেষ—শুধু বাসনার অসহনীয়, জ্বালাময়ী বাস্তব, যা মুহূর্তের চরম সত্য।
তোমার শরীরের প্রতিটি উত্তেজিত পেশী, যেন তীব্র রোদে তেতে ওঠা বুনো জন্তু নয়, শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া চিতাবাঘ,
আমার মস্তিষ্কে এঁকে দেয় এক সর্বগ্রাসী, নিষিদ্ধ উপাসনার চূড়ান্ত, ভয়ংকর দৃশ্য।
অন্ধকারে মেশা দুটি পরস্পরের ওপর চরমভাবে অধিকার করা দেহ—যেন আকাশ থেকে মাটিতে ছিটকে পড়া দুটি উল্কাখণ্ড নয়, যেন নিয়তি নিজেই এখানে খেলা করছে।
এ যেন তীব্র দাবদাহের পরে প্রকৃতির নিজের সঙ্গে নেওয়া গভীর শ্বাস—যা নিঃশেষ হওয়ার পরেই নতুন জীবনের ইঙ্গিত দেয়।
তোমার জোর করা বন্য আদর যখন আমার ইচ্ছেরা স্বেচ্ছায় মেনে নেয়,
আমি হিসেবহীনভাবে মিশে যাই, যেখানে শুধু তোমার তীব্র, চরম উপস্থিতির অধীনতাতেই মুক্তি মেলে।
তখন আর কোনো স্বর নয়, শুধু পাগল গলার স্বরের তীব্র কম্পন, যা বন্য ঝর্ণার স্রোতের নয়, বজ্রপাতের শব্দের মতো।
তোমার আক্রমণাত্মক চাহনি অন্ধকারের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ঙ্কর মন্ত্র, যা আমাকে বেঁচে থাকার শর্ত দেয়।
আমার সব ভয়, পাপ, আর লুকানো ইচ্ছে—
তোমার সর্বস্ব দিয়ে দেওয়ার উষ্ণতা আর রুক্ষতায় সব মিশে যাওয়া বালির মতো শান্ত হয়ে গেল।
এই যে অসহ্য পাগল করা অসম্ভব দহন, এই যে দখলের বেপরোয়া, আদিম আকর্ষণ,
এ শুধু বাসনা নয়, এ এক দুর্ভেদ্য, জীবনের মূল স্পন্দন।
তোমার সবটুকু উন্মত্ততা দিয়ে আমাকে নিজের করে নাও, যেন মরুভূমি গিলে নিচ্ছে শেষ বিন্দু জলকে।
আমি চাই, এই খাঁটি, আদিম, অপ্রতিরোধ্য ক্ষণটা যেন অনন্তকালের জন্য থেমে যায়।
তোমার দেহের ভেজা, উষ্ণ গন্ধ কোন সাধারণ চুম্বক নয়, সদ্য লাঙল দেওয়া মাটির তীব্র, খাঁটি ঘ্রাণ— যা সৃষ্টির অঙ্গীকার।
আমরা তখন এক, নিয়ম না মানা ঝড় আর উর্বর মাটি, যারা ধ্বংসের মাধ্যমে কেবল সৃষ্টি করে—কেবল সেই সৃষ্টির নেশায় মুক্তি খোঁজে।