Mayador - 8 in Bengali Love Stories by Rayhana Yasmin Ray books and stories PDF | মায়াডোর - পর্ব 8

Featured Books
Categories
Share

মায়াডোর - পর্ব 8

কাল সারারাত মেহুল দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি। যখনি ও চোখ বন্ধ করছে ওর মনে হচ্ছে আদ্রিয়ান ওর খুব কাছে ওর নিঃশ্বাসের তপ্ত হাওয়া মেহুলের ঠোঁটে এসে লাগছে। সেই নেশাক্ত স্পর্শে স্মৃতি মেহুলকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। সারা আর আরাধ্যা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকলেও মেহুল বারবার উঠে পড়ছে। অস্থিরতা কাটাতে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। রাতের নিস্তব্ধতায় আদ্রিয়ানের সেই কথাটা বারবার কানে বাজছে— "আমি তো নূপুরটা তোকে নিজে হাতে পরাবো বলে কিনে ছিলাম!" কথাটা মনে পড়তেই মেহুল লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছে। এমনকি রাতে যখন সবাই একসাথে খেতে বসেছিল মেহুল লজ্জায় আদ্রিয়ানের দিকে তাকাতেই পারছিলো না।
সকালেই ঠিক করা হয়েছে আজ বিকালে সবাই কৃষ্ণসায়র পার্কে ঘুরতে যাবে। অবশ্য এটি আদ্রিয়ানেরই মাস্টার প্ল্যান, মেহুল কে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু শুধু মেহুলকে নিয়ে গেলে যদি বাড়ির বড়োরা সন্দেহ করে, তাই ও কৌশলে একটা ছোট্ট টিম বানিয়ে নিলো— মেহুল, আরাধ্যা, আরান আর সারা।আরান এখন পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে ছুটছে, আর সারা সবে উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছে রেজাল্টের অপেক্ষায়।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর বাড়িটা একদম নিঝুম। বড়রা যে যার ঘরে ভাত–ঘুম দিতে ব্যস্ত।কিন্তু আদ্রিয়ানের চোখে ঘুম কোথায়? ওর মন ছটফট করছে মেহুলের সাথে কথা বলার জন্য। শেষমেষ কোনো উপায় না পেয়ে আদ্রিয়ান ওর ফোনটা হাতে নিলো। কন্টাক্ট লিস্টে গিয়ে ডায়াল করলো '𝗦𝘄𝗲𝗲𝘁𝗵𝗲𝗮𝗿𝘁💗' নামে সেভ করা নাম্বারটিতে।
ঐদিকে মেহুল তখন সারার সাথে মহাব্যস্ত।সারা ওর পুরো আলমারির কাপড় বের করে বিছানায় স্তূপ করে ফেলেছে। একটা করে জামা নিজের গায়ে ধরছে আর বলছে, — "দেখোনা ইরা দি, আমাকে এই ড্রেসটাই ভালো লাগবে নাকি ওটাই?" মেহুল কিছু একটা বলতে যাবে তখনই ওর ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে বড়ো বড়ো করে লেখা উঠেছে "আদি🤍" 
নামটা দেখা মাত্রই মেহুলের বুকে এক পশলা ঝড় বয়ে গেলো। ও কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনটা রিসিভ করে দ্রুত বারান্দায় চলে গেলো। ওপাশ থেকে তখন আদ্রিয়ান অধৈর্য হয়ে হ্যালো হ্যালো করেই যাচ্ছে। মেহুল কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিচু রেখে বললো— "হ্যালো!"

"কখন থেকে আমি হ্যালো হ্যালো করছি হ্যাঁ? তোর এই উত্তর দেওয়ার সময় হলো এতক্ষনে?" আদ্রিয়ানের কণ্ঠে কর্তৃত্ব। 
মেহুল আস্তে করে বললো—"সবাই ছিল তো তাই ব্যালকনিতে এসে কথা বললাম!"
আদ্রিয়ান এবার কিছুটা গম্ভীর আর ভারিক্কি চালে বললো— 
"ওহ, আচ্ছা শোন্— তুই একবার আমার রুমে আয়। এক্ষুনি!"
মেহুল শিউরে উঠে খানিকটা চিৎকার দিয়ে বললো— "না, আমি যাবো না!" 
আদ্রিয়ান কিছুটা বিরক্তি স্বরে বললো— 
"কেন ? কি সমস্যা ?"
মেহুল কাঁপাকাঁপা গলায় বললো— তু,তু তুমি যদি আবার..!
ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই আদ্রিয়ান ধমক দিয়ে উঠলো— "চুপ!বেশি কথা বললে আমি কিন্তু আবার....!!
মেহুল তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো— "আচ্ছা, যাচ্ছি যাচ্ছি!"
মেহুল ফোন কেটে দিতেই আদ্রিয়ান বিছানায় ফোনটা ছুড়ে দিয়ে বাঁকা হাসলো— "শাস্তি তো তুই আবার পাবি মাইরা, আমার মুখের ওপর ফোন কাটার শাস্তি।"

মেহুল যখন বেরোচ্ছিলো, সারা পেছন থেকে ডাকলো—
"কোথায় যাচ্ছ ইরা দি?"
মেহুল তখন আমতা আমতা করে বললো— "ইয়ে মানে, একটু নিচে যাচ্ছি!"
সারা হাসতে হাসতেই বললো— "হ্যাঁ তো এই ভাবে ভয় পাওয়ার কি আছে। যাও যাও!"

আদ্রিয়ানের দরজার কাছে গিয়ে মেহুল নক করতে যাবে তার আগেই ভেতর থেকে আওয়াজ এলো— "দরজা খোলা আছে।" মেহুল তো অবাক! ও তো খুব নিঃশব্দে এসেছিলো, তাহলে ও বুঝলো কি ভাবে? আমার জায়গায় তো অন্য কেউও আসতে পারতো।
"বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবি, না আমাকে যেতে হবে কোলে করে আনার জন্য?"
আদ্রিয়ানের কথায় মেহুল ঘাবড়ে গিয়ে দ্রুত দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো।
মেহুল ভেতরে ঢুকতেই আদ্রিয়ান উঠে গিয়ে দরজা দিতেই মেহুল কাঁপাকাঁপা গলায় বললো— "দ, দরজা দিচ্ছ কেন?"
"তোকে শাস্তি দেবো। তাই!"
"আমি কি করলাম!"
আদ্রিয়ান দরজা দিয়ে সামনে এগোতে এগোতে বলল— "তুই অনেক বড়ো অন্যায় করেছিস, তারই শাস্তি তোকে আমি এখন দেবো।"
আদ্রিয়ান যত এগোচ্ছে মেহুল ততো পিছিয়ে যাচ্ছে। পেছনে যেতে যেতে মেহুল আর যেতে পারলো না, ধপাস করে বিছানার ওপর বসে পড়লো। আদ্রিয়ানের চোখে এক আদিম নেশা। ও যখন মেহুলের ওপর কিছুটা ঝুঁকলো, মেহুল ভয়ে চোখ বুজে নিলো। আদ্রিয়ান মুচকি হেসে বিছানার ওপর থেকে একটা প্যাকেট নিলো এবং হাঁটু মুড়ে নিচে বসলো। মেহুল যখন বুঝলো আদ্রিয়ান ওর উপর থেকে সরে গেছে,তখন ও ধীরে ধীরে চোখ খুললো। দেখলো আদ্রিয়ান খুব সাবধানে মেহুলের পা নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিচ্ছে। আদ্রিয়ানের স্পর্শে মেহুলের সারা শরীরে এক অদ্ভুদ শিরশিরানি অনুভূত হলো, ওর শরীরের লোমকূপ জেগে উঠলো। ও পা সরিয়ে নিতে চাইলো, কিন্তু আদ্রিয়ান ওর পা হালকা চেপে ধরে ওর দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বললো— "উমহ... সাইলেন্স!"
মেহুল যেন এ এক অন্য আদ্রিয়ানকে দেখছে। তারপর আদ্রিয়ান প্যাকেট থেকে একটা রুপালি নূপুর বের করে খুব যত্ন করে মেহুলের পায়ে পরিয়ে দিলো। অন্য পায়েও খুব সুন্দর করে পরিয়ে দিলো। নূপুর পরানো শেষে আদ্রিয়ান হঠাৎই মেহুলের পা দুটো নিজের হাঁটুর উপর নিয়ে ওর পায়ে খুব আলতো করে ওর ঠোঁট ছোঁয়ালো।মেহুলের সারা শরীরে যেন মুহূর্তেই বিদ্যুৎ খেলে গেলো। ওর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো। আদ্রিয়ান মাথা তুলে ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে পুরুষালি কণ্ঠে বলে উঠলো—
"এতটুকুতেই তোর এই অবস্থা ? আরো গভীরে গেলে তোকে খুঁজে পাবো তো মাইরা..?"

মেহুলের যেন দমবন্ধ হয়ে আসছে ও একটা জোরে নিঃশ্বাস নিলো। ও যেন কথা বলার শক্তি হারিয়েছে। ও যখন পা নামিয়ে চলে যেতে চাইলো, আদ্রিয়ান ওর হাত ধরে আটকালো— "দাঁড়া!"
আদ্রিয়ান আলমারি থেকে একটা সুন্দর প্যাকেট বের করে মেহুলের হাতে দিয়ে বললো— "আজ বিকেলে এটা পরবি।"
মেহুল প্যাকেটটা নিয়ে রোবটের মতো বেরিয়ে যাচ্ছিলো।আদ্রিয়ান পেছন থেকে আবারও ডাকলো—"পরবি তো মাইরা.?"
মেহুল পেছন না ঘুরেই শান্ত গলায় উত্তর দিলো— "হুম!"

–––
বিকেলে যখন সবাই বের হওয়ার জন্য নিচে নামছে, মেহুল দেখলো আদ্রিয়ানের পরনে যে শার্ট, সেটার রঙ সারার ড্রেসের সাথে একদম মিলে গেছে। এটা দেখে তো মেহুলের মাথায় মুহূর্তেই রক্ত চড়ে গেলো। ওর মুখে হঠাৎই শয়তানি হাসি খেলে গেলো,ও চুপচাপ আদ্রিয়ানের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। আদ্রিয়ান তখন আরানের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। মেহুল সুযোগ বুঝে ওড়না থেকে একটা সেফটিপিন খুলে আদ্রিয়ানের শার্ট–এর পেছন দিকে ঢুকিয়ে জোরে টান দিলো। ক্যাচ করে একটা শব্দ হলো— শার্টটা খানিকটা ছিঁড়ে গেলো। আদ্রিয়ান যখন পেছন ঘুরলো। মেহুল তখন শয়তানি হাসি দিয়ে ওখান থেকে সরে গেলো। সারা যখন বাড়ির বাইরে এলো, ও আদ্রিয়ানের সাথে নিজের জামার কালার ম্যাচিং দেখে তো খুশিতে গদগদ। আদ্রিয়ান যখন সারা কে দেখলো তখন বুঝতে পারলো মেহুল এমনটা কেন করলো। আদ্রিয়ান যখন মেহুলের দিকে ঘুরে তাকালো, মেহুল ভ্রু নাচিয়ে দুষ্টু হাসি দিলো। আদ্রিয়ানের বুকে যেন হালকা ধাক্কা লাগলো , ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। তারপর ও মেহুলের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হেসে শার্ট চেঞ্জ করার জন্য পা বাড়ালে, সারা পেছন থেকে ডেকে উঠে— "কোথায় যাচ্ছ ভাইয়া ?" 
"আরে আমার শার্টটা না কিভাবে ছিঁড়ে গেছে, ওটাই চেঞ্জ করতে যাচ্ছি।" আদ্রিয়ানের উত্তরে সারার মুখটা চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো হয়ে গেলো।

মিনিট পাঁচেক পর আদ্রিয়ান যখন নিচে নামলো এবার মেহুলের হার্টবিট মিস করার পালা। আদ্রিয়ান সেই শার্ট বদলে এবার পড়েছে মেহুলের হিজাবের রঙের সাথে ম্যাচিং করে রোজউড কালারের শার্ট। ও নিচে এসেই মেহুলকে লক্ষ্য করে একটা চোখ মারলো, কিন্তু মেহুলের বুকে যেন কেউ অদৃশ্য তীর ছুড়লো।
গাড়ির কাছেই যেতে সারা ঠিক করলো ও আদ্রিয়ানের পাশে সামনের সিটেই বসবে। ও আগে ভাগে গিয়েই সামনের সিট দখল করলো। মেহুল এটা দেখে ওর মনটা ঠুস্ করে ভেঙে গেলো। ও কোনো কথা না বলে আরাধ্যাকে নিয়ে পেছনে গিয়ে বসলো। কিন্তু আসল খেলা তো আদ্রিয়ান আগেই খেলে রেখেছে। কারণ ও জানতো সারা সামনে বসা নিয়ে কোনো না কোনো ঝামেলা করবেই। তাই ও আরানকে আগেই বলে রেখেছিলো, যে তুই আজকে ড্রাইভ করবি।আরান ড্রাইভিং সিটে বসতেই সারা চেঁচিয়ে উঠলো, "তুমি এখানে কেন ভাইয়া ?"
আরান সারার এমন প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে বললো— "তাহলে কোথায় থাকবো ?" 
সারা পেছন ঘুরে দেখলো আদ্রিয়ান খুব আয়েশ করে রাজকীয় ভঙ্গিতে পেছনে ঠিক মেহুলের পাশেই বসেছে। সারা নাক–মুখ ফুলিয়ে যখন সামনে ঘুরে গেলো মেহুল তা দেখে মুখ টিপে হাসছে। মেহুল কে হাসতে দেখে আদ্রিয়ান মেহুলের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বললো— 
"কি ম্যাডাম এই ভাবে হাসছেন কেন ?"
মেহুল আদ্রিয়ানকে ওর এতটা কাছে দেখে শিউরে উঠলো। মেহুল কি বলবে কিছু বুঝতে পারছে না। মেহুল কিছুই বললো না দেখে আদ্রিয়ানও আর কিছু জিজ্ঞাসা করলো না।

–––

কিছুক্ষনের মধ্যেই ওরা কৃষ্ণসায়র পার্কে পৌঁছে গেলো।।গাড়ি থেকে নামতেই এক বিশাল জলরাশির স্নিগ্ধতা মেহুলকে ছুঁয়ে গেল। সামনেই আদিগন্ত বিস্তৃত ঐতিহাসিক "কৃষ্ণ সায়র দিঘি"। বিকেলের পড়ন্ত রোদ দিঘির টলটলে জলের ওপর হিরের কুচির মতো চিকচিক করছে। দিঘির চারপাশ ঘিরে লাল ইটের চওড়া বাঁধানো রাস্তা, যা চলে গেছে ঘন সবুজ গাছপালার আড়ালে। বিশাল বিশাল সব প্রাচীন অশ্বত্থ আর কৃষ্ণচূড়া গাছ যেন ডালপালা মেলে আকাশটাকে আগলে রেখেছে।

পার্কের ভেতরে পা বাড়াতেই নাকে এল ভিজে ঘাস আর বুনো ফুলের এক মিশ্র গন্ধ। মেহুল মুগ্ধ হয়ে দেখছিল, দিঘির পাড়ে সারিবদ্ধ দেবদারু গাছগুলো বাতাসের দোলায় যেন ওদের স্বাগত জানাচ্ছে। দিঘির জলে ছোট ছোট ঢেউ খেলা করছে, আর পাড়ের নির্জন বেঞ্চগুলোয় বিকেলের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। চারদিকের শান্ত নিস্তব্ধতা আর মাঝেমধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক মেহুলের অশান্ত মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দিল।

মেহুল আপনমনে দিঘির পাড় ধরে হাঁটছিল। ওর ওড়নার একপাশ হাঁটতে হাঁটতে মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছিল। আদ্রিয়ান খুব ধীর পায়ে মেহুলের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালো। সবার নজর এড়িয়ে আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় ওড়নাটা মাটি থেকে তুলে মেহুলের কাঁধে ঠিক করে দিল ও। আদ্রিয়ানের সেই ক্ষণিকের উষ্ণ ছোঁয়ায় মেহুলের শরীরের ভেতর দিয়ে এক সূক্ষ্ম শিহরন বয়ে গেল। ও না তাকালেও ওর হৃদস্পন্দন যেন দিঘির ঢেউয়ের মতো উত্তাল হয়ে উঠল। 
ওড়না ঠিক করে আদ্রিয়ান স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে শুরু করলেও, পেছন থেকে সারার বিষাক্ত চোখ এই দৃশ্যেটা ঠিকই দেখে ফেললো। আর এটা দেখে সারা হিংসেই রি রি 
করে উঠলো 
---

কৃষ্ণসায়র পার্কের দীঘির পারে আসতেই আরাধ্যা বায়না ধরলো ও প্যাডেল বোটে উঠবে। কিন্তু মেহুলের তো জলের নাম শুনলেই বুক কাঁপে, ও পরিষ্কার জানিয়ে দিলো—
"না রে আরাধ্যা, আমার খুব ভয় করে আমি উঠবো না।"
কিন্তু আরাধ্যা তো নাছোড়বান্দা ও উঠবে মানে উঠবেই। মেহুলকে রাজি করাতে না পেরে ও এবার সারাকে ধরলো—
"সারা দিদি, তুমি চলো না প্লিজ"! 
সারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজি হলো। যাওয়ার আগে ও আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে আহ্লাদী সুরে বলল, "আদি ভাইয়া, তুমি উঠবে না আমাদের সাথে?"
পাশ থেকে আরান একটা ধমক দিয়ে বলে উঠল, "আমি উঠছি তো চল, মেহুল কি এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকবে মাথা মোটা!"
আরান ওদের নিয়ে বোটের দিকে যাওয়ার সময় পেছন ফিরে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপল। ও যেন নীরব ইশারায় আদ্রিয়ানকে 'বেস্ট অফ লাক' বুঝিয়ে দিয়ে গেল। আদ্রিয়ান শুধু হালকা মাথা নেড়ে সায় দিল। মেহুল কিছুই বুঝতে পারল না, ও একবার আরানের দিকে আর একবার আদ্রিয়ানের দিকে অবাক হয়ে তাকাতে লাগল।

ওরা চলে যাওয়ার পর দিঘির পাড়ের সেই নির্জন রাস্তায় শুধু আদ্রিয়ান আর মেহুল। দুজনে পাশাপাশি হাঁটছে। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে হাঁটার পর আদ্রিয়ান হঠাৎই মেহুলের হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নিল। আদ্রিয়ানের সেই বলিষ্ঠ স্পর্শে মেহুল মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল, সারা শরীর ওর প্রবলভাবে কেঁপে উঠল।

আদ্রিয়ান হাঁটতে হাঁটতেই এক গভীর হাস্কি স্বরে মেহুলের কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনল— "কী ম্যাডাম, আপনার তো শাস্তির পাহাড় দিন দিন উঁচু হয়ে যাচ্ছে। একসাথে এতো শাস্তি দিলে সামলাতে পারবেন তো?"
মেহুল তোতলাতে তোতলাতে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "কী... কীসের শাস্তি?"
আদ্রিয়ানের ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল, হাঁটতে হাঁটতেই ও জবাব দিল— "আপনার যখন এতোই শখ আমাকে শার্ট ছাড়া দেখার, তবে তাই হবে।"
মেহুল আরও ঘাবড়ে গিয়ে বলল, "মা... মানে?"
আদ্রিয়ান ওর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলল— "আচ্ছা, এখন না হয় এই কঠিন শাস্তিগুলো তোলা থাক... আমি এগুলো একান্তে একসঙ্গে বুঝে নেব।"

আদ্রিয়ানের প্রতিটি শব্দ মেহুলের কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে। ওর কথা বলার শক্তি হারিয়ে গেছে। ভয়ে আর উত্তেজনায় মেহুলের হঠাৎই হেঁচকি উঠতে শুরু করল। মেহুলকে এমন ছটফট করতে দেখে আদ্রিয়ান এবার ওকে থামিয়ে পাশের একটা কাঠের বেঞ্চে বসিয়ে দিল। মেহুলকে সেখানে রেখে ও দ্রুত গিয়ে একটা জলের বোতল কিনে আনল।

মেহুলকে জল খাইয়ে আদ্রিয়ান ওর খুব কাছে সরে এল। ওর নেশালো দৃষ্টি মেহুলের পাংশুটে হয়ে যাওয়া মুখে স্থির। ও ফিসফিস করে বলল, "রিলাক্স মাইরা! আমি তো বললাম শাস্তিগুলো তোলা আছে। তাহলে তুই কেন এখনই এতো ঘাবড়ে যাচ্ছিস?"

মেহুল যেন কথা বলতেই ভুলে গেছে। ওর বুকটা তখন আতঙ্কে আর আবেশে কামারের হাপরের মতো দ্রুত ওঠানামা করছে। আদ্রিয়ান মেহুলের সেই অস্থিরতা খুব কাছ থেকে উপভোগ করছিল। ও অত্যন্ত যত্ন করে মেহুলের এলোমেলো হয়ে যাওয়া হিজাবটা ঠিক করে দিতে দিতে হাস্কি স্বরে বলল—

"চিন্তা করিস না... 𝗦𝘄𝗲𝗲𝘁𝗵𝗲𝗮𝗿𝘁'
তোর এই প্রতিটা অবাধ্যতার শাস্তি খুব শীঘ্রই পাবি.....

---