Mayador - 1 in Bengali Love Stories by Rayhana Yasmin Ray books and stories PDF | মায়াডোর - পর্ব 1

Featured Books
Categories
Share

মায়াডোর - পর্ব 1

কলমে : রায়হানা ইয়াসমিন রায় 

 কলেজের করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে মেহুল।

হাতে ফিজিক্সের মোটা বই,পরনে সাধারণ সুতির সালোয়ার কামিজ। মেহুল ধবধবে ফর্সা নয় কিন্তু ওর মুখে আলাদা একটা মায়া আছে, মেহুল যখন হাসে তখন ওর গজদন্তি ও গালের টোল পড়ার দৃশ্যটা অপূর্ব সুন্দর।

 কিন্তু আজ মেহুলের মুখে হাসি নেই, বরং চোখে একরাশ আতঙ্ক। কারণ আজ ফিজিক্সের ক্লাসে দেরি হয়ে গেছে, আর লেকচার থিয়েটারে স্বয়ং "আদ্রিয়ান চৌধুরী"।

মে আই কাম ইন, স্যার ? মেহুলের গলা ভয়ে শুকিয়ে এলো।

আদ্রিয়ান ঘড়ি না দেখেই গম্ভীর গলায় বলল —

"টুয়েন্টি মিনিটস লেট, মিস শিকদার। তুমি কি কলেজের নিয়মগুলো তোমার বাড়িতে ফেলে এসেছো ? নাকি শিকদার বাড়ির অভিযাত্য তোমেক শিখিয়েছে যে প্রফেসারের ক্লাসে যখন খুশি ঢোকা যাই..? 

" স্যা,স্যার আসলে......

মেহুলের কথা শেষ হওয়ার আগেই,আদ্রিয়ান গম্ভীর স্বরে বলল—

"চোপ, ক্লাসে ঢোকো। এখানে আমি তোমার কোনো এক্সকিউস শোনার জন্য আসি না"।

মেহুল ক্লাসের এক কোনে জানলার ধরে বসলো, পাশেই তার বান্ধবী "আরশি" বসেছে।

জানালার বাইরে সেই বিশাল কাঠগোলাপ গাছের দিকে তাকিয়ে মেহুল ভাবছে — "এবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। ফুফুর বাড়িতে আর কদিন ? অন্যের বাড়িতে আশ্রিতা হয়ে থাকটা তার বড্ডো আত্মসম্মানে লাগে। সেই চাই তার একটা চাকরি হক, একটা ছোট নিজের বাড়ি হক, যেখানে অন্তত্ব কারোর দয়ার ছায়ায় থাকতে হবে না।

"এই মেহুল কি ভাবছিস তু্ই" ? আরশির ডাকে মেহুল ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে ক্লাসে মন দেয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু না মেহুল কিছুতেই কিছু করে ক্লাসে মন দিতে পারছে না।

এক তো ফিজিক্স যেটা মেহুলের মাথায় ঢোকে না, তারপর আবার এমন রগচটা স্যার, যাকে মেহুলের একদমই পছন্দ না।

"কিরে কি হয়েছে তোর ? কথার উত্তর দিচ্ছিস না কেন ?

মেহুল আরশির কথার উত্তর না দিয়ে আস্তে আস্তে বলল 

"কালকের নোটসটা দে না রে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না"।


হুট্ কইরেই আদ্রিয়ান বোর্ডে লেখা ছেড়ে মেহুলের দিকে ঘুরে তাকালো —

"মেহুল শিকদার মাইরা! গেট আউট!" আদ্রিয়ান এর বজ্র গর্জনে পুরো রুম কেঁপে উঠলো।

মেহুল হকচকিয়ে তাকিয়ে রইলো।

"একই তো ক্লাসে দেরিতে ঢুকেছো তারওপর আমার ক্লাসে বসে কথা বলার সাহস পাও কোথায়" ?


মেহুল আমতা আমতা করে বলল— আসলে স্যা, স্যার আমি কালকের নোট.......

 

Shut up , আগেও বলেছি, আমি এখানে তোমার কোনো এক্সকিউস শুনতে আসনি না। কালকের নোট কাল নাওনি কেন ? কলেজের পড়া কি তোমার কাছে তামাশা মনে হয়। যদি তাই মনে হয় তাহলে কলেজে আসার দরকার নেই।

ব্যাগ তোলো আর ক্লাস থেকে বের হও।

পুরো ক্লাসের সামনে এমন বিদ্রুপে মেহুলের চোখে পানি চলে আসলো, সে মাথা নিচু করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলো।

কলেজের করিডরে দাঁড়িয়ে মেহুল ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। সে বুঝে উঠতে পারে না, কোন জন্মের শত্রুতা মেহুলের সাথে আদ্রিয়ান এর। 

আদ্রিয়ান এর ক্লাসের বাকিটা সময় করিডরে দাঁড়িয়ে কাটাতে হলো মেহুলকে।

ঘন্টা বাজার পর আদ্রিয়ান যখন ক্লাস থেকে বের হলো, মেহুলের দিকে একবারও ফিরে তাকালো না।

ওর সেই দীর্ঘদেহী অবই টা করিডর দিয়ে গট গট করে হেটে চলে গেলো। মেহুল নিজেকে সামলে নিয়ে ক্লাসে ঢুকলো। 

আরশি ওর হাতে নোটসটা দিয়ে সমব্যথি গলায় বলল — মেহুল আদ্রিয়ান স্যার কি তোর ওপর কোনো রাগ পুষে রেখেছেন রে ? কেনো জানি মনে হচ্ছে তোকে উনি একটু বেশিই টার্গেট করেন।

মেহুল শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কথা বলার শক্তিও যেন ওর নেই।

এরপর হলো ইংলিশ ক্লাস।টানা দুটো ক্লাস হওয়ার পর লাঞ্চ ব্রেক হলো।

লাঞ্চ ব্রেকে আরশির সাথে বসে মেহুল কিছুই খেতে পারলো না।

মাথাটা যন্ত্রনায় ছিঁড়ে যাচ্ছে ওর। আরশিকে কোনো মতে বুঝিয়ে, কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে কলেজ থেকে বেরিয়ে এলো।

কলেজের গেটে সায়নের সাথে মেহুলের দেখা, ওর সাথে 

দু–একটা কথা বইল মেহুল ওখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলো...

"আরে মেহুল দারা....

সায়নের ডাকে দাঁড়িয়ে গেলো মেহুল।

"তু্ই বাড়িই যাচ্চিস তো এখন...??

মেহুল মনটা চাইছিলো দুটো কথা শোনাতে, যে এই ভরদুপুরে বাড়ি যাবো না তো কোথায় যাবো...?? কিন্তু আফসোস মাথা যন্ত্রণার কারণে মাইনা কোথায় মনেই রয়ে গেলো। মেহুল শুধু ছোট করে বলল.... হুম।

সায়ন এটা শুনে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল....

"আরে আমিও তো ওদিকেই যাচ্ছিলাম, চল একসাথেই যাই।

মেহুল আর কিছু বললাম না, হাঁটা ধরলো। সামনে থেকে ওরা একটা রিকশা নিয়ে উঠলো।

শহরের কোলাহল পেরিয়ে বাড়ি ফিরলো মেহুল, কলিং বেলে ছাপ দেওয়ার কিছু ক্ষণ পরেই গেট খুলে "আরাধ্যা"

আদ্রিয়ান এর একমাত্র ছোট বোন।

আরাধ্যার বয়স এখন সবে 7 বছর।সে তো মেহুলকে দেখেই খুশিতে আত্যহারা।

"তোমার এতো তাড়াতাড়ি কলেজ শেষ হয়ে গেলো ইরা দিদি..??

মেহুল ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল.. "না রে প্রচন্ড মাথা যন্ত্রনা হচ্ছে তাই চলে এলাম।।

মেহুল এর আওয়াজ পেয়ে রুমে থেকে বেরিয়ে এলেন "নিশিতা বেগম" মেহুকের ফুফু।

"কি রে মা কি হয়েছে..??

"তেমন কিছু না, মাথা যন্তরা হচ্ছে ফুফু।

"তু্ই ফ্রেস হয়ে আই আমি ভাত বাড়ছি।

"না না ফুফু আমি কিছু খাবো না, একটু গুমাবো এখন"।

"আরে খেয়ে ঘুমা না।

"না ফুফু কিছু খাবো না"।

এটা বলেই মেহুল ওপরে চলে গেলো ওর বরাদ্দকৃত রুমে।

মেহুল সেই যে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়েছে এখনো পর্যন্ত দরজা খোলেনি।

রাতের খাবার টেবিলেও এখনো নামেনি মেহুল,শেষমেষ নিশিতা বেগমের ডাকে আরাধ্যা বাধ্য হয়ে মেহুল আর আদ্রিয়ানকে ডাকতে গেলো ওপরে।

আদ্রিয়ান নেমে এসে দেখলো মেহুল আগে থেকেই বসে আছে, আদ্রিয়ান মেহুলের সোজাসুজি চেয়ারটাই গিয়ে বসলো।

"কে রে ইরা তোর মাথা যন্ত্রনা কমেছে?

ফুফুর কোথায় চমকে উঠলো মেহুল। "হুম কমেছে"।

ফুফুর সাথে কথা বলে সামনে তাকাতেই মেহুলের বুক হালকা কেঁপে উঠলো। অন্যমনস্ক থাকার ফলে সে এতক্ষন খেয়ালি করে নি যে,যাকে সে যমের মতো ভয় করে সেই তার সামনে বসে আছে।

খুব তাড়াহুড়ো করে মেহুল তার খাবার শেষ করে উঠে গেলো।

নিজের ঘরে ঢুকে একটা স্বস্তির নিঃশাস ফেললো মেহুল, এতক্ষন যেন যে কোনো যেন সে কোনো বিরাট যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল।অনেক্ষন ধরে মেহুল ফিজিক্স এর এই চ্যাপ্টার টা নিয়ে বসে কিছুতেই বুঝতে পারছে না। আর না অনেক ভাবার পরে মেহুল ঠিক করলো আদ্রিয়ান এর কাছে যেতেই হবে নয়তো সে এবার সিওর ঐযেক্স সাবজেক্ট এ ফেল করবে।

শেষমেষ বিরক্তি আর একরাশ ভয় নিয়ে বগলে বইটা চেপে আদ্রিয়ান এর রুমের দরজায় টোকা দিলো।

ভেতর থেকে অদ্রীয়নের গম্ভীর গলা ভেসে এলো —"কে?

মেহুল মৃদুস্বরে উত্তর দিলো —"আমি মেহুল"।

"এতো রাতে আমার সাথে কি দরকার?" অদ্রীয়নের কণ্ঠস্বরে একধরণের শীতলতা।

মেহুল দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে 

বলল — "ভাইয়া, এই চ্যাপ্টার টা একটু বুঝিয়ে দেবে। পরশু পরীক্ষা, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

আদ্রিয়ান এবার দরজাটা খুলে ওকে ভেতরে আস্তে বললো। মেহুল পড়ার টেবিলে বইটা রাখতেই, আদ্রিয়ান কঠিন সব প্রশ্ন করতে শুরু করলো।এমনিতেই মেহুল কিচ্ছু বুঝতে পারছে না, তারপর আদ্রীয়নের এই সব বাঁকা প্রশ্নে মেহুল sub গুলিয়ে ফেললো।

"ভাইয়া কিছু বুঝতো পারছি না"। মেহুল অত্যন্ত মৃদুস্বরে বলল। 

এই কথাটা শোনা মাত্র আদ্রিয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। মেহুলের উপর একদম ঝুঁকে পরে ওকে চেয়ারের সাথে চেপে ধরলো আদ্রিয়ান। ওর তপ্ত নিঃশাস মেহুলের মুখে লাগছে।অদ্রীয়নের রাগী স্বর মেহুলের কানের কাছে তীরের মতো বিধলো —


"ক্লাস ফাঁকি দিয়ে bf এর সাথে দেখা করার সময় মনে ছিল না, আমার পড়াই ডাউট আছে। এখন আমার কাছে এসেছিস কেনো হুম?"

মেহুল বিস্ময় চাইলো। আদ্রিনের চোখের মনি দুটো তখন আগুনের মতো জ্বলছে।ও মেহুলের চিবুকটা শক্ত করে উঁচিয়ে ধরে চরম শাসনে ফিসফিসিয়ে বলল—

"শুনে রাখ মাইরা,তু্ই আমার কাছে থাকিস। আমার কথার অবাদ্ধ হলে একদম জানে মেরে ফেলবো তোকে। মনে থাকবে ?"


চলবে.....