Mayador - 5 in Bengali Love Stories by Rayhana Yasmin Ray books and stories PDF | মায়াডোর - পর্ব 5

Featured Books
Categories
Share

মায়াডোর - পর্ব 5


কলমে : রায়হানা ইয়াসমিন রায়..
পর্ব : ০৫
আজ মেহুল খুব তাড়াতাড়িই ঘুম থেকে উঠেছে। ভোরের আলো এখনো পরিষ্কার হয়ে ফোটেনি, চারপাশটা এক রহস্যময় ধোঁয়াশায় ঢাকা। আজ এই বাড়ির আবহাওয়াটাও যেন একটু থমথমে। কারণ, আজ বহু বছর পর মেহুলের আব্বু সোহিকুল শিকদার, তার সৎ মা তহিদা বেগম এবং তার একমাত্র সৎ বোন এই বাড়িতে আসছেন। আদ্রিয়ানের আব্বু আফতাব চৌধুরী নিজে উদ্যোগ নিয়ে তাদের নিমন্ত্রণ করেছেন। আসলে এই আয়োজনটা অনেক আগেই হতে পারত, কিন্তু আদ্রিয়ানের কড়া নিষেধ ছিল। সে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল— মেহুলের পড়াশোনা আর পরীক্ষার মাঝে যেন কোনো বাইরের ঝামেলা না আসে। আগে মেহুলের এক্সাম শেষ হোক, তারপর অন্য সব।

কাল মেহুলের অবশেষে এক্সাম শেষ হলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটলেও মেহুলের আজ মনটা ভীষণ খারাপ। সে ভোরের ফজরের নামাজ আদায় করে বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে। বাইরের হিমেল বাতাস তার চোখের কোণে জমে থাকা জলকে যেন আরও ঠান্ডা করে দিচ্ছে। আজ বারবার তার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ছে। মেহুল আনমনে ভাবছে— সেদিন যদি তার মা বেঁচে থাকতেন, তবে আজ তাকে সৎ মায়ের সেই অমানুষিক অত্যাচার আর গ্লানি সহ্য করতে হতো না। তার জীবনটা হয়তো অন্যরকম এক সুখে ভরা থাকত।

মেহুলের স্মৃতির পাতায় ধুলো পড়া কিছু দৃশ্য আজ ভিড় করে আসছে। একবারের কথা তো সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না। মেহুলকে সারাদিন না খেয়ে থাকতে হয়েছিল। কেন? কারণ সে সেদিন সকালে একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠেছিল। কিন্তু মেহুল তো আর ইচ্ছা করে দেরি করে ওঠেনি! সারাটা রাত প্রচণ্ড জ্বরে ছোট্ট মেহুলের শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল। অথচ সেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে তহিদা বেগম তাকে একটুও মমতা দেখাননি। উল্টো আগুনের মতো গরম শরীর নিয়ে মেহুলকে রান্নাঘরের এক কোণে একা শুতে হয়েছিল। মাত্র সাড়ে ছয় বছর বয়স ছিল তখন মেহুলের। সেই বয়সেই তাকে সংসারের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছে, কত রাত যে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
একদিন মেহুলের ফুফু আচমকাই তাদের বাড়িতে হাজির হন। মেহুলের আব্বু তখন বাড়িতে ছিলেন না। তিনি কর্মসূত্রে কাশ্মীরে থাকতেন, তাই বাড়ির চার দেয়ালের ভেতর মেহুলের ওপর ঠিক কী ধরনের পৈশাচিক নির্যাতন চলত, তার বিন্দুমাত্র খবর তিনি পেতেন না। মেহুলের ফুফু ও আঙ্কেল হঠাৎ সেদিন বাড়িতে গিয়ে মেহুলের সারা শরীরে মারের কালশিটে ছাপ দেখে শিউরে ওঠেন। প্রথমে নিশিতা চৌধুরী অনেক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কিন্তু মেহুল ছিল তহিদা বেগমের ভয়ে কুঁকড়ে থাকা এক জ্যান্ত লাশ। সে কিছুই বলতে চাইছিল না। কিন্তু ফুফু যখন তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিতে শুরু করলেন, তখন মেহুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠে সবটুকু বলে দিল— তার সাথে তার সৎ মা ঠিক কী কী অত্যাচার করে। নিশিতা চৌধুরী সেদিনই মনে মনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তৎক্ষণাৎ তার ভাই সোহিকুল শিকদারকে ফোন করে চিৎকার করে সব ঘটনা জানান। সোহিকুল শিকদারও মেয়েকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে অন্ধ ছিলেন। বোনের মুখে সব শুনে তিনি আর বাধা দেননি; বরং মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মেহুলকে ফুফুর সাথে পাঠিয়ে দিতে রাজি হন। সেই দিনই মেহুল তার শৈশবের সেই নরককুণ্ড ছেড়ে মুক্তি পায়।
মেহুলের নামটা নিয়ে কতই না স্বপ্ন ছিল তার বাবা-মায়ের। জুবাইরা শিকদার আর সোহিকুল শিকদারের সেই মিষ্টি মধুর ঝগড়া আজও মেহুলের কানে অনুরণিত হয়। মা চেয়েছিলেন মেয়ের নাম রাখবেন ‘মাইরা শিকদার’, আর বাবা চেয়েছিলেন ‘মেহুল শিকদার’। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন। শেষমেশ মেহুলের দাদি সখিনা শিকদার বিবাদ মেটাতে বললেন— "আচ্ছা বাবা থাম তোরা, আর লড়াই করতে হবে না। ওর নাম হবে মেহুল শিকদার মাইরা।" সেই নাম শুনে দুজনেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দ যেন বালুর বাঁধের মতো ভেঙে পড়ল। মেহুলের জন্মের ঠিক দুই মাস পরেই ধরা পড়ল জুবাইরা শিকদারের ব্লাড ক্যান্সার। ডাক্তার বলেছিলেন ৫-৬ মাস সময় আছে। কিন্তু নিয়তি এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে মাত্র এক মাসের মাথায় তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন। মায়ের মৃত্যুর সময় মেহুলের বয়স ছিল মাত্র তিন মাস। তিন মাস বয়সেই এক চরম একাকীত্বের পথে পা বাড়াল মেহুল।
মায়ের বিদায়ে দাদি সখিনা শিকদারই হয়ে উঠেছিলেন মেহুলের একমাত্র আশ্রয়। তিনি ছায়ার মতো আগলে মেহুলকে বড় করতে থাকেন। কিন্তু মেহুলের যখন ৫ বছর বয়স, তখন দাদিও হঠাৎ শয্যাশায়ী হন। অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখানো হলেও ওনার বাঁচার আশা ছিল ক্ষীণ। মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে সখিনা শিকদার তার ছেলে সোহিকুল শিকদারকে শেষ মিনতি করেন বিয়ে করার জন্য। সোহিকুল রাজি না হলেও দাদি জোরাজুরি করেছিলেন যাতে ৫ বছরের এই এতিম মেয়েটার মাথায় একজন মায়ের হাত থাকে। শেষমেশ দাদির হাত ধরে সোহিকুল শিকদার রাজি হলেন।
ঘরে এলেন তহিদা বেগম। তিনি একজন শিক্ষিত নারী ছিলেন, কিন্তু তার অতীত ছিল বড়ই করুণ। তহিদার আব্বু জুয়ায় হেরে গিয়ে এক মাতালের সাথে তার জোর করে বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই লোকটা রোজ রাতে মদ খেয়ে এসে তহিদাকে পশুর মতো মারত। একদিন তহিদা আর সহ্য করতে না পেরে নিজের অধিকার বুঝে নিতে সাহস দেখান। তিনি থানায় অভিযোগ করেন এবং টাকা জোগাড় করে কোর্ট থেকে ডিভোর্স জারি করেন। ডিভোর্সের পর তহিদা শিকদার হয়ে তিনি সোহিকুলের সংসারে আসেন।
শুরুতে সবকিছু ঠিকই ছিল। তহিদা মেহুলকে অনেক ভালোবাসতেন। কিন্তু সমীকরণ বদলে গেল তখন, যখন তহিদার নিজের একটি মেয়ে সন্তান হলো। নিজের মেয়ের প্রতি অতিরিক্ত টান মেহুলকে তার চোখের বালিতে পরিণত করল। বাড়ির যাবতীয় কঠিন কাজ মেহুলকে দিয়ে করানো শুরু হলো। মেহুল মারের ভয়ে এবং বাবার প্রতি কোনো অশান্তি না করার টানে তহিদার কোনো কথাই আব্বুকে বলত না। দিনের পর দিন এই নীরব হাহাকার সে নিজের ভেতরেই চেপে রেখেছিল।
বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা মেহুলের ভাবনার জগতে করাঘাত পড়ল আদ্রিয়ানের গম্ভীর ডাকে। মেহুল তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে ফেলল যাতে আদ্রিয়ান টের না পায়। আদ্রিয়ান ওর রুমে ঢুকে চড়া গলায় বলল—

"কানে কি তুলো গুঁজে রেখেছিস নাকি তুই? কতক্ষণ ধরে তোকে ডাকছি আমি... কানে কম শুনিস নাকি?"

আদ্রিয়ানের এত ধমকেও যখন মেহুল কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না এবং পেছন ঘুরল না, তখন আদ্রিয়ান নিজেই ওর হাত ধরে ঘুরিয়ে দাঁড় করাল। মেহুলের কান্নাসিক্ত টলমলে চোখ দেখে আদ্রিয়ানের রাগী চেহারাটা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল। সে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল—
"তোকে কেউ কিছু বলেছে?"
মেহুল শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। আদ্রিয়ান আবারও প্রশ্ন করল— "তাহলে কাঁদছিস কেন?"

মেহুল এবার খুব সহজ ও শান্ত কণ্ঠে তার বুকের গভীরের ক্ষতটা প্রকাশ করে দিল। বলল—
"আমার মা অনেক নিষ্ঠুর তাই না। তা না হলে আমার ৩ মাস বয়সে আমাকে এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় রেখে যেত না, আমাকেও তাহলে সাথে নিয়ে যেত সেদিন।"
আদ্রিয়ান কী বলবে তা খুঁজে পেল না। সে এই মুহূর্তে এই ব্যাপারে কোনো কথা বলে মেহুলের মন আর ভারাক্রান্ত করতে চাইল না। সে মেহুলকে তাড়া দিয়ে বলল— "নে হয়েছে, অনেক বড়দের মতো কথা বলেছিস। ফ্রেশ হয়ে এবার নিচে যা, তোকে মা সেই কখন থেকে ডাকছে!"
এই বলে আদ্রিয়ান চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে এল। মেহুলকে বলল—

"বিকালে রেডি থাকিস, এক জায়গায় যাওয়ার আছে।"

কথাটা বলেই আদ্রিয়ান দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

কিন্তু মেহুল এখনো বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার মন বারবার অতীত হাতড়াচ্ছে। সে যখন প্রথম এই বাড়িতে এসেছিল, তখন তার ফুফু নিশিতা চৌধুরী ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বাথরুমে পড়ে গিয়ে বাচ্চাটি নষ্ট হয়ে যায়। সেটি ছিল একটি পুত্রসন্তান। এই ঘটনায় আদ্রিয়ানের দাদি মেহুলকে দায়ী করে বসেছিলেন। তিনি নিষ্ঠুরভাবে চিৎকার করে মেহুলকে বলেছিলেন—

"এই মেয়ে অপয়া! জন্মের ৩ মাস পরে নিজের মাকে খেয়েছে, এখন আবার আমার বাড়ির বংশধরকে খেল। বাড়ি থেকে বের করে দে এই মেয়েকে!"

সেদিন বুকফাটা অভিমানে মেহুল বাড়ির ছাদে গিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কাঁদছিল। আদ্রিয়ান সারা বাড়ি খুঁজেও যখন মেহুলকে পাচ্ছিল না, তখন সে ছাদে যায়। আদ্রিয়ানের বয়স তখন মাত্র ১৩। সে দেখল ছোট্ট মেহুল এক কোণে গুটিসুটি মেরে কাঁদছে। আদ্রিয়ান তখন ওর দাদির সব কথা শুনতে পেয়েছিল। আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে মেহুলের পাশে গিয়ে বসল এবং বলল—

"আর কাঁদিস না, তোকে আমি আইসক্রিম কিনে দেবো।"

মেহুল তখন ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেছিল— "আমাকে কেউ ভালোবাসে না আদি ভাইয়া। ওই জন্যই তো মা আর দাদি দুজনেই আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি খুব একা।"

আদ্রিয়ান সেদিন আবেগের বশবর্তী হয়ে মেহুলকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল। সে মেহুলের কানে কানে এক গভীর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—

"আমি তোকে ভালোবাসবো মাইরা। কথা দিচ্ছি, এই পৃথিবীর সবার থেকে বেশি ভালোবাসবো তোকে। প্লিজ আর কাঁদিস না।"

সেই দিন থেকে আজ পর্যন্ত আদ্রিয়ান তার দেওয়া সেই শৈশবের কথাটি অক্ষরে অক্ষরে রেখে চলেছে। সেই দিন মেহুলের প্রতি তার হৃদয়ে যে মায়ার সঞ্চার হয়েছিল, আজ তা এক বিশাল মহীরুহ। মেহুলের চোখের কোণে আজও যে মায়া লেগে থাকে, সেই মায়াতেই হয়তো আদ্রিয়ান আজন্মের জন্য এই **'মায়াডোর'**-এ আটকে গেছে।

চলবে.....