“আত্মার আহ্বান”
রাজপ্রাসাদের ঘরটায় নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। বাইরে ঝড় চলছে, বজ্রপাত আকাশ ছিঁড়ে ফেলছে। গঙ্গার জল যেন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে।
ঘরের মাঝখানে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে আরাধ্যা।
তার শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে… তার মুখ শান্ত, কিন্তু প্রাণহীন।
রাজপুত্র হাঁটু গেড়ে তার পাশে বসে পড়ল।
তার চোখে আতঙ্ক, অপরাধবোধ আর অসহায়তা একসাথে মিশে গেছে।
সে কাঁপা গলায় বলল —
“তুমি কেন এটা করলে… কেন নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেললে?”
ঠিক তখন বাতাসে ঠান্ডা অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ল।
রাজপুত্র অনুভব করল — অঘোরেশ্বরের শক্তি এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
কালো ধোঁয়ার মতো সেই ছায়া ধীরে ধীরে আরাধ্যার শরীর ঘিরে ধরছিল।
এক ভয়ংকর কণ্ঠ ভেসে এল —
“আমি বলেছিলাম… এবার আমি ওকে নেব।”
রাজপুত্রের ভেঙে পড়া
রাজপুত্র চিৎকার করে উঠল —
“না! তুমি ওকে ছুঁতে পারবে অষ্টম পর্ব না!”
সে তলোয়ার তুলে সেই ছায়ার দিকে আঘাত করল…
কিন্তু তলোয়ার অন্ধকার ভেদ করতে পারল না।
অঘোরেশ্বর হাসতে লাগল —
“তুমি এখনও দুর্বল। তুমি নিজের অহংকারে আমাকে শক্তি দিয়েছ।”
রাজপুত্র মাটিতে বসে পড়ল।
তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
সে প্রথমবার নিজের ভুলগুলো মনে করতে লাগল—
তার অহংকার… তার ভুল সিদ্ধান্ত… তার অন্ধ লোভ।
সে ধীরে আরাধ্যার হাত ধরে বলল —
“আমি কখনও ভালো রাজা হতে পারিনি… ভালো মানুষও না। কিন্তু তোমাকে হারাতে পারব না।”
আত্মার ডাকে সাড়া
ঠিক তখন রাজপুত্র অনুভব করল — তার বুকের ভেতর তীব্র ব্যথা হচ্ছে।
তার মনে হল কেউ যেন তাকে ডাকছে।
সে চোখ বন্ধ করতেই নিজেকে অন্য এক জগতে দেখতে পেল।
চারদিকে অন্ধকার।
দূরে একটা ক্ষীণ আলো জ্বলছে।
সে ধীরে সেই আলোর দিকে এগোল।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আরাধ্যা… কিন্তু সে যেন দূরে… খুব দূরে।
রাজপুত্র কাঁপা গলায় বলল —
“আরাধ্যা! ফিরে এসো… আমাকে ছেড়ে যেও না।”
আরাধ্যা মৃদু হাসল।
তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ভালোবাসা ভরা।
“আমি ফিরতে চাই… কিন্তু অন্ধকার আমাকে আটকে রেখেছে।”
আত্মত্যাগের উপলব্ধি
হঠাৎ চারদিকে অঘোরেশ্বরের ছায়া তৈরি হলো।
সে গর্জে উঠল —
“তুমি ওকে ফেরাতে পারবে না। কারণ ও নিজের প্রাণ দিয়ে তোমাকে মুক্ত করেছে।”
রাজপুত্র দাঁত চেপে বলল —
“তাহলে এবার আমি নিজের প্রাণ দিয়ে ওকে ফিরিয়ে আনব।”
অঘোরেশ্বর হেসে উঠল —
“তুমি কি সত্যিই নিজের জীবন ত্যাগ করতে পারবে?”
রাজপুত্র শান্ত গলায় বলল —
“হ্যাঁ… যদি সেটাই ওকে বাঁচানোর পথ হয়।”
চূড়ান্ত মানসিক যুদ্ধ
অঘোরেশ্বর তার চারদিকে বিভ্রম তৈরি করল।
রাজপুত্র দেখল —
তার সামনে সিংহাসন… রাজমুকুট… অসীম ক্ষমতা।
অঘোরেশ্বর বলল —
“সবকিছু তোমার হতে পারে। শুধু আরাধ্যাকে ছেড়ে দাও।”
রাজপুত্র চোখ বন্ধ করল।
তার মনে পড়ল —
আরাধ্যার হাসি…
তার বিশ্বাস…
তার ত্যাগ।
সে ধীরে বলল —
“ক্ষমতা দিয়ে সব কেনা যায় না।”
সেই মুহূর্তে সিংহাসন ভেঙে ধুলো হয়ে গেল।
আত্মার মিলন
রাজপুত্র সামনে এগিয়ে আরাধ্যার হাত ধরল।
“তুমি আমাকে বদলে দিয়েছ। এবার আমি তোমার জন্য সব ছাড়তে প্রস্তুত।”
তার শরীর থেকে উজ্জ্বল আলো বের হতে শুরু করল।
সে নিজের শক্তি আরাধ্যার দিকে ছড়িয়ে দিল।
আরাধ্যার চারদিকে থাকা অন্ধকার ফেটে যেতে লাগল।
অঘোরেশ্বর চিৎকার করে উঠল —
“না! এটা হতে পারে না!”
অঘোরেশ্বরের চূড়ান্ত আক্রমণ
হঠাৎ সে বিশাল রূপ ধারণ করল।
চারদিকে বজ্রপাত শুরু হলো।
পুরো আত্মিক জগৎ ভেঙে পড়তে লাগল।
সে গর্জে উঠল —
“তোমরা দুজন একসাথে থাকলে আমাকে হারাতে পারো… তাই তোমাদের আলাদা করব।”
সে রাজপুত্রকে অন্ধকারের গভীরে টেনে নিতে শুরু করল।
আরাধ্যা চিৎকার করে উঠল —
“না! এবার আমি তোমাকে একা যেতে দেব না।”
দেবী শক্তির জাগরণ
ঠিক তখন আকাশ ভেদ করে এক উজ্জ্বল আলো নেমে এল।
চারদিকে শঙ্খধ্বনি আর মন্ত্রের শব্দ ভেসে উঠল।
আরাধ্যার শরীর আলোয় ভরে উঠল।
তার চোখে দেবী শক্তির দীপ্তি দেখা দিল।
সে শান্ত কিন্তু শক্ত কণ্ঠে বলল —
“অঘোরেশ্বর… তোমার সময় শেষ।”
অন্ধকার কেঁপে উঠল।
বাস্তব জগতে ফিরে আসা
রাজপ্রাসাদের ঘরে হঠাৎ আরাধ্যার শরীর কেঁপে উঠল।
তার আঙুল নড়ে উঠল।
রাজপুত্র বাস্তব জগতে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল।
সে অবাক হয়ে দেখল — আরাধ্যার চোখ ধীরে খুলছে।
কিন্তু তার চোখে এখন অন্য এক দীপ্তি… যেন দেবী শক্তির ছায়া।
ঠিক তখন মন্দিরের মাতঙ্গী মূর্তির কপাল থেকে রক্তের মতো লাল আলো বের হতে লাগল।
আকাশে কালো ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলো।
দূরে পাহাড় ফেটে যাওয়ার শব্দ শোনা গেল।
এক ভয়ংকর কণ্ঠ আকাশে গর্জে উঠল —
“তোমরা ভাবছ আমাকে হারিয়েছ?
এবার আমি আমার আসল রূপে ফিরব…”
গিরিরামপুরের আকাশ সম্পূর্ণ কালো হয়ে গেল।
গঙ্গার জল বিপরীত দিকে বইতে শুরু করল।
আরাধ্যা আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল —
“মা… এবার কি মহাযুদ্ধ শুরু হতে চলেছে?”