The Curse of Matangi - 5 in Bengali Spiritual Stories by MOU DUTTA books and stories PDF | মাতঙ্গীর অভিশাপ - 5

Featured Books
Categories
Share

মাতঙ্গীর অভিশাপ - 5

 পর্ব: “অন্ধকারের প্রত্যাবর্তন”

গিরিরামপুরে সেই রাতের ঘটনার পর কয়েকদিন কেটে গেছে। বাইরে সবকিছু শান্ত মনে হলেও রাজপ্রাসাদের ভেতরে যেন অদৃশ্য এক চাপা ভয় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পাহাড়ের গুহায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটা শুধু রাজপুত্র আর আরাধ্যা জানত। কিন্তু তারা দুজনেই বুঝছিল—ঝড় থেমে যায়নি, শুধু সাময়িকভাবে স্তব্ধ হয়েছে।

ভোরের আলোয় গঙ্গার জল আজ অস্বাভাবিক স্থির। পাখিরা ডাকছে, কিন্তু সেই স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্য নেই। আরাধ্যা মন্দিরের সিঁড়িতে বসে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মনে হচ্ছিল যেন নদীর বুকের ভেতরে কিছু একটা লুকিয়ে আছে।

ঠিক তখন রাজপুত্র এসে দাঁড়াল তার পাশে।

“তুমি এখনও আমার ওপর রাগ করেছ?”

তার গলায় ছিল অনুশোচনা।

আরাধ্যা ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

“রাগ না… ভয় পাচ্ছি।”

“আমার জন্য?”

“না… তোমাকে হারানোর জন্য।”

রাজপুত্র কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে বলল—

“আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আর কখনও ভুল পথে পা বাড়াব না।”

আরাধ্যা তার দিকে তাকাল। তার চোখে বিশ্বাস ছিল, কিন্তু কোথাও যেন একটা অজানা আশঙ্কাও ছিল।


সেইদিন দুপুরের দিকে রাজপ্রাসাদের আকাশ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল। সূর্য মেঘে ঢাকা পড়ল, অথচ বৃষ্টি নেই। হঠাৎ প্রাসাদের পুরোনো বটগাছের ডাল ভেঙে পড়ে গেল।

রাজ্যের বৃদ্ধ পুরোহিত ভয় পেয়ে বললেন—

“এটা অশুভ সংকেত। কোনো শক্তিশালী তান্ত্রিক শক্তি রাজ্যের দিকে এগিয়ে আসছে।”

রাজা সভা ডাকলেন। সৈন্যদের পাহারা দ্বিগুণ করা হল। কিন্তু আরাধ্যার মনে হচ্ছিল বিপদ বাইরের নয়—আরও গভীর কিছু।

সেই রাতে আরাধ্যা স্বপ্ন দেখল।

সে দেখল গঙ্গার জল রক্তের মতো লাল হয়ে গেছে। আর সেই জলের মাঝখান থেকে উঠে আসছে সেই কালো পোশাকের সাধক। কিন্তু এবার তার মুখ পুরো দেখা যাচ্ছে। তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে।

সে বলছে—

“আমি ফিরে এসেছি… এবার শুধু রাজপুত্র নয়… পুরো রাজ্য আমার।”

আরাধ্যা ঘুম ভেঙে উঠে বসে পড়ল। তার শরীর ঘামে ভিজে গেছে।

অন্যদিকে রাজ্যের সীমানার বাইরে, গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরে সেই সাধক বসে ছিল। চারদিকে ছড়িয়ে ছিল অদ্ভুত তান্ত্রিক চিহ্ন। আগুনের চারদিকে বসে সে কালো ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—

“মাতঙ্গী আমাকে থামিয়েছে… কিন্তু এবার আমি একা নই।”

তার সামনে ধোঁয়া থেকে একটা বিকৃত ছায়ামূর্তি তৈরি হলো।

সেই ছায়া বলল—

“তুমি রাজপুত্রকে চাইছ কেন?”

সাধক হেসে বলল—

“কারণ তার রক্তে আছে রাজশক্তি… আর তার হৃদয়ে আছে দুর্বলতা। এই দুইয়ের মিলেই আমি আমার শক্তি পূর্ণ করব।”

ছায়ামূর্তি ধীরে বলল—

“কিন্তু আরাধ্যা?”

সাধকের চোখে ঘৃণা জ্বলে উঠল—

“সে মাতঙ্গীর আশীর্বাদ পাওয়া। তাকে ভাঙতে হবে… তার বিশ্বাস ভাঙলেই রাজপুত্র নিজে থেকেই আমার কাছে আসবে।”


পরদিন রাজপুত্র হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিল সে সীমান্তে যাবে। কারণ কিছু গ্রাম থেকে খবর এসেছে—রাতে অদ্ভুত ছায়া দেখা যাচ্ছে, গবাদি পশু মারা যাচ্ছে।

আরাধ্যা তাকে থামাতে চাইলো।

“আমার মনে হচ্ছে এটা ফাঁদ।”

রাজপুত্র বলল—

“আমি যদি রাজা হতে চাই, তবে আমাকে মানুষের পাশে দাঁড়াতেই হবে।”

আরাধ্যা চুপ করে গেল। তার মনে হচ্ছিল সে যদি আটকায়, তাহলে রাজপুত্র ভাববে সে তাকে দুর্বল করছে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার মন কেঁপে উঠছিল।

রাজপুত্র চলে গেল সীমান্তের দিকে।


সীমান্তের সেই গ্রাম পৌঁছে রাজপুত্র দেখল সবকিছু অস্বাভাবিক শান্ত। গ্রামের মানুষজন যেন ভয়ে কথা বলতে চাইছে না।

এক বৃদ্ধা এসে কাঁপা গলায় বলল—

“মহারাজ… রাত নামলে কেউ বাইরে বেরোবেন না।”

রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল—

“কেন?”

বৃদ্ধা শুধু আঙুল তুলে জঙ্গলের দিকে দেখাল।

সেই রাতেই রাজপুত্র সৈন্যদের নিয়ে পাহারা দিচ্ছিল। হঠাৎ চারদিকে কুয়াশা নেমে এল। কুয়াশার ভেতর থেকে ভেসে এল সেই পরিচিত কণ্ঠ—

“তুমি আবার এসেছ… এবার তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।”

রাজপুত্র তলোয়ার বের করল। কিন্তু কুয়াশার ভেতর থেকে অসংখ্য ছায়া বেরিয়ে এল। সৈন্যরা একে একে অজ্ঞান হয়ে পড়তে লাগল।

ঠিক তখন রাজপুত্রের সামনে দাঁড়াল সেই সাধক।

“আমি তোমাকে শক্তি দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে অপমান করেছ।”

রাজপুত্র দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

“আমি কখনও অশুভ শক্তির সঙ্গে যাব না।”

সাধক হাসল—

“তুমি ভাবছ এটা তোমার সিদ্ধান্ত?”

সে হাত তুলে মন্ত্র পড়তে শুরু করল। হঠাৎ রাজপুত্রের চোখের সামনে আরাধ্যার ছবি ভেসে উঠল—

সে কাঁদছে… তাকে শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা হয়েছে।

রাজপুত্র ভেঙে পড়ল—

“আরাধ্যা!”

অন্যদিকে প্রাসাদে আরাধ্যা হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে বুঝতে পারল রাজপুত্র বিপদে।

সে মন্দিরে গিয়ে বসে পড়ল। চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করতে লাগল—

“মা, আমাকে পথ দেখাও।”

হঠাৎ মন্দিরের ঘণ্টা নিজে থেকেই বেজে উঠল। চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ল। আরাধ্যা চোখ খুলে দেখল মাতঙ্গীর শান্ত রূপ।

“তোমার ভালোবাসা আর বিশ্বাসই তার রক্ষা কবচ। কিন্তু আজ তোমাকে নিজের ভয় জয় করতে হবে।”

আরাধ্যা কাঁপা গলায় বলল—

“আমি কী করব মা?”

“তুমি তার হৃদয়ে পৌঁছে যাও… সে অন্ধকারের মায়ায় বন্দি।”

 

আরাধ্যা ধ্যানের মাধ্যমে নিজের শক্তি জাগাল। সে চোখ বন্ধ করে রাজপুত্রের নাম জপ করতে লাগল।

সেই মুহূর্তে সীমান্তের জঙ্গলে রাজপুত্রের সামনে হঠাৎ আলো ছড়িয়ে পড়ল। সে শুনতে পেল আরাধ্যার কণ্ঠ—

“তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখো। তুমি অন্ধকারের জন্য জন্মাওনি।”

রাজপুত্রের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে তলোয়ার শক্ত করে ধরল।

“আমি কখনও তোমাকে ছেড়ে যাব না।”


সাধক প্রচণ্ড রেগে গেল। সে কালো আগুন ছুঁড়ে মারল রাজপুত্রের দিকে। কিন্তু হঠাৎ সেই আগুন থেমে গেল।

রাজপুত্রের চারদিকে এক আলোর বৃত্ত তৈরি হলো। সেই আলোয় আরাধ্যার প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছিল।

সাধক চিৎকার করে উঠল—

“ভালোবাসা! এই দুর্বল জিনিস আমার শক্তিকে থামাতে পারবে না!”

ঠিক তখন আকাশে বজ্রপাত হলো। মাতঙ্গীর রুদ্ররূপ আবার দেখা দিল।

“ভালোবাসা দুর্বলতা নয়… সেটাই সর্বশক্তি।”

এক ঝলক আলো নেমে এসে সাধককে আঘাত করল। সে মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু এবার সে অদৃশ্য হলো না। বরং হাসতে লাগল।


সাধক ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে রক্ত, কিন্তু চোখে ভয় নেই।

“তোমরা ভাবছ আমি শেষ হয়ে গেছি? আমি তো শুধু দূত… আমার পেছনে আছে আরও বড় শক্তি।”

রাজপুত্র চমকে উঠল—

“কে সে?”

সাধক আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল—

“যে শক্তি শতাব্দী ধরে মাতঙ্গীর বিরোধিতা করে এসেছে… সেই অন্ধকারের অধিপতি।”

এই কথা বলেই সে নিজের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে সে ছাই হয়ে গেল।


রাজপুত্র প্রাসাদে ফিরে এল। আরাধ্যা তাকে দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল। দুজনেই বুঝছিল—তারা একে অপর ছাড়া অসম্পূর্ণ।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে মন্দিরের প্রধান প্রদীপ হঠাৎ নিভে গেল।

আরাধ্যা আতঙ্কে মন্দিরে দৌড়ে গেল। দেখল মাতঙ্গীর মূর্তির চোখ থেকে লাল আলো বের হচ্ছে।

তার কানে ভেসে এল এক ভয়ংকর বার্তা—

“প্রস্তুত হও… এবার আসছে সেই শক্তি… যার সঙ্গে আমার যুদ্ধ যুগ যুগ ধরে চলছে।”

আরাধ্যা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

আর দূরে, আকাশের কালো মেঘের ভেতরে এক বিশাল ছায়া ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছিল…