The Curse of Matangi - 6 in Bengali Spiritual Stories by MOU DUTTA books and stories PDF | মাতঙ্গীর অভিশাপ - 6

Featured Books
Categories
Share

মাতঙ্গীর অভিশাপ - 6

“অন্ধকারের অধিপতির জাগরণ”
গিরিরামপুরে রাত নামতেই যেন প্রকৃতির রূপ বদলে গেল। আকাশে কালো মেঘ জমেছে, কিন্তু বৃষ্টি নেই। বাতাস থমথমে। গঙ্গার জল অস্বাভাবিকভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে, যেন নদী নিজেই কোনো অশুভ আগমনের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
রাজপ্রাসাদের ভেতরে সবাই আতঙ্কে। কারণ বহু বছর পর মন্দিরের প্রধান প্রদীপ নিজে থেকে নিভে গেছে—যা গিরিরামপুরে সর্বনাশের সংকেত বলে মনে করা হয়।
আরাধ্যা মন্দিরের সামনে বসে ছিল। তার চোখে ভয় থাকলেও মুখে অদ্ভুত দৃঢ়তা।
রাজপুত্র এসে তার পাশে দাঁড়াল।
“কি ভাবছ?”
আরাধ্যা ধীরে বলল,
“মনে হচ্ছে বড় কিছু ঘটতে চলেছে। মা আমাকে সতর্ক করেছেন… কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না সেই অন্ধকার শক্তি কে।”
রাজপুত্র তার হাত ধরল।
“যাই হোক, এবার আমি তোমার পাশে থাকব।”
আরাধ্যা একটু হাসল… কিন্তু তার বুকের ভিতর অজানা অশান্তি ছড়িয়ে ছিল।
 প্রাচীন ইতিহাসের উন্মোচন
পরদিন রাজা রাজ্যের পুরোনো পুঁথিঘর খুলে দিতে আদেশ দিলেন। কারণ তিনি বুঝেছিলেন—এই বিপদ নতুন নয়, বহু পুরোনো কোনো শক্তির প্রত্যাবর্তন।
রাজ্যের সবচেয়ে বৃদ্ধ আচার্য পুরোনো তালপাতার পুঁথি নিয়ে এলেন।
তিনি ধীরে বলতে শুরু করলেন—
“শত শত বছর আগে গিরিরামপুর শুধু রাজ্য ছিল না… এটি ছিল দেবী মাতঙ্গীর সাধনক্ষেত্র। কিন্তু তখন এক তান্ত্রিক রাজা ছিল—নাম ছিল অঘোরেশ্বর কালবীর।”
রাজপুত্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
“সে কি সেই অন্ধকার শক্তির সঙ্গে জড়িত?”
আচার্য মাথা নেড়ে বললেন—
“হ্যাঁ। সে মাতঙ্গীর শক্তি দখল করতে চেয়েছিল। কিন্তু দেবী তাকে পরাজিত করেন। মৃত্যুর আগে সে প্রতিজ্ঞা করে—একদিন সে ফিরে আসবে… অন্য রূপে… আরও ভয়ংকর হয়ে।”
এই কথা শুনে আরাধ্যার শরীর কেঁপে উঠল।
অদ্ভুত পরিবর্তন
সেইদিন থেকেই রাজ্যের মানুষ অদ্ভুত ঘটনা দেখতে শুরু করল।
রাতে ছায়া নিজের থেকে নড়ছে।
জঙ্গলের পশুরা গ্রামে ঢুকে পড়ছে।
অনেক মানুষ স্বপ্নে একই মুখ দেখছে—এক ভয়ংকর ছায়া, যার চোখ আগুনের মতো জ্বলছে।
আরাধ্যা বুঝতে পারছিল… অঘোরেশ্বরের শক্তি ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
রাজপুত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব
এই সময় রাজপুত্র নিজেও অদ্ভুত পরিবর্তন অনুভব করছিল। মাঝে মাঝে তার মাথা ঘুরছিল। সে স্বপ্নে দেখছিল—
সে নিজেই অন্ধকার সিংহাসনে বসে আছে।
তার হাতে কালো তলোয়ার।
তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে হাজার মানুষ।
এক রাতে সে হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে চিৎকার করে উঠল।
আরাধ্যা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“কি হয়েছে?”
রাজপুত্র কাঁপা গলায় বলল—
“আমি ভয় পাচ্ছি… মনে হচ্ছে কেউ আমার ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইছে।”
আরাধ্যার চোখে জল চলে এল।
সে বুঝতে পারল—অঘোরেশ্বর শুধু বাইরে নয়… রাজপুত্রের আত্মাকেও টার্গেট করছে।
 মাতঙ্গীর গোপন বার্তা
সেই রাতে আরাধ্যা গভীর ধ্যানে বসে মাতঙ্গীর আরাধনা করল।
হঠাৎ মন্দিরে নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল। মাতঙ্গীর শান্ত কিন্তু গম্ভীর রূপ দেখা দিল।
“সময় এসে গেছে, আরাধ্যা।”
“মা… আমি কি পারব এই অন্ধকারকে থামাতে?”
মাতঙ্গী বললেন—
“অঘোরেশ্বর শুধু তান্ত্রিক নয়। সে এমন শক্তি অর্জন করেছে যা মানুষের ভয় আর লোভ থেকে জন্ম নেয়। তাকে হারাতে হলে শুধু যুদ্ধ নয়… আত্মার শক্তি লাগবে।”
আরাধ্যা ধীরে জিজ্ঞেস করল—
“রাজপুত্র কি বিপদে আছে?”
মাতঙ্গীর চোখে গম্ভীর ছায়া নেমে এল।
“তার রক্তে রাজশক্তি আছে… আর সেই শক্তিই অঘোরেশ্বরকে টানছে। তুমি যদি তাকে রক্ষা করতে চাও, তবে তোমাকে নিজের শক্তি জাগাতে হবে।”
 গোপন সাধনার শুরু
পরদিন আরাধ্যা গঙ্গার ধারে একা চলে গেল। সেখানে পাহাড়ের নিচে একটা প্রাচীন গুহা ছিল—যেখানে বহু বছর আগে মাতঙ্গীর সাধনা হতো।
সে সেখানে বসে জপ শুরু করল।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল।
তার চারদিকে বাতাস ঘুরতে লাগল।
গঙ্গার ঢেউ যেন তার মন্ত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উঠছিল।
হঠাৎ তার সামনে এক আলো তৈরি হলো।
সেই আলো থেকে বেরিয়ে এল এক রহস্যময় নারী—সাদা পোশাকে, চোখে অদ্ভুত দীপ্তি।
“আমি মাতঙ্গীর শক্তির রক্ষক। তোমাকে শক্তি পেতে হলে তিনটি পরীক্ষা পার করতে হবে।”
আরাধ্যা নির্ভয়ে বলল—
“আমি প্রস্তুত।”
 প্রথম পরীক্ষা – ভয় জয়
গুহার চারদিকে হঠাৎ অন্ধকার ছড়িয়ে গেল।
আরাধ্যা দেখল—তার চারদিকে আগুন জ্বলছে, আর আগুনের মধ্যে রাজপুত্র দাঁড়িয়ে আছে… তাকে ডাকছে।
“আমাকে বাঁচাও!”
আরাধ্যার বুক ভেঙে যাচ্ছিল। সে দৌড়ে যেতে চাইলো… কিন্তু তার মনে পড়ল—এটা পরীক্ষা।
সে চোখ বন্ধ করে মাতঙ্গীর নাম জপ করল।
মুহূর্তের মধ্যে আগুন আর দৃশ্য অদৃশ্য হয়ে গেল।
নারী বলল—
“তুমি ভয় জয় করেছ।”
 দ্বিতীয় পরীক্ষা – ত্যাগ
হঠাৎ তার সামনে রাজপুত্র এসে দাঁড়াল। সে বলল—
“আমাকে বাঁচাতে চাইলে তোমাকে মাতঙ্গীর সাধনা ছেড়ে দিতে হবে। না হলে আমি ধ্বংস হয়ে যাব।”
আরাধ্যার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
সে জানত—এটা সত্যি হলে সে সব হারাবে।
কিন্তু সে ধীরে বলল—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি… কিন্তু সত্য আর ধর্মের পথ ছাড়ব না।”
রাজপুত্রের ছায়া মিলিয়ে গেল।
নারী হাসল—
“তুমি ত্যাগের পরীক্ষা পেরিয়েছ।”
 তৃতীয় পরীক্ষা – বিশ্বাস
হঠাৎ পুরো গুহা ভেঙে পড়তে শুরু করল। পাথর ঝরছে, চারদিকে ধ্বংস।
নারী বলল—
“এই গুহা ধ্বংস হলে তুমি মারা যাবে। তুমি পালাতে পারো… অথবা বিশ্বাস রেখে বসে থাকতে পারো।”
আরাধ্যা চোখ বন্ধ করে বসে পড়ল।
সে শুধু বলল—
“মা, তোমার ওপর আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে।”
মুহূর্তের মধ্যে সব শান্ত হয়ে গেল।
শক্তির জাগরণ
নারী তার কপালে হাত রাখল।
এক ঝলক আলো তার শরীরে প্রবেশ করল।
“এখন তুমি শুধু পূজারিণী নও… তুমি মাতঙ্গীর শক্তিধারী।”
আরাধ্যার শরীর আলোয় ভরে উঠল। তার চোখে এক নতুন দীপ্তি দেখা দিল।
 অন্ধকারের উত্থান
ঠিক সেই সময় রাজপ্রাসাদে ভয়ংকর ঘটনা ঘটল।
রাজপুত্র হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ল। তার শরীর কালো ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছিল। রাজ্যের চিকিৎসকরা কিছুই করতে পারছিল না।
হঠাৎ ঘরের ভেতর ঠান্ডা বাতাস বইল।
এক ভয়ংকর কণ্ঠ ভেসে এল—
“আমি এসে গেছি…”
ঘরের কোণ থেকে ধীরে ধীরে এক বিশাল ছায়া তৈরি হলো।
সেই ছায়ার চোখ লাল আগুনের মতো জ্বলছিল।
সে বলল—
“আমি অঘোরেশ্বর কালবীর… আর এবার এই রাজপুত্র হবে আমার মাধ্যম।”

আরাধ্যার প্রত্যাবর্তন 

ঠিক তখন প্রাসাদের দরজা নিজে থেকে খুলে গেল।
আরাধ্যা ভেতরে ঢুকল।
তার শরীর থেকে নীল আলো বের হচ্ছিল।
অঘোরেশ্বর হেসে বলল—
“তুমি ভেবেছ তুমি আমাকে থামাতে পারবে?”
আরাধ্যা শান্ত কণ্ঠে বলল—
“আমি একা নই। আমার সঙ্গে আছে সত্য… আর মাতঙ্গীর শক্তি।”
অঘোরেশ্বর গর্জে উঠল।
ঘর কাঁপতে লাগল।
ভয়ংকর ক্লিফহ্যাঙ্গার
হঠাৎ অঘোরেশ্বর রাজপুত্রের শরীরে ঢুকে পড়ল।
রাজপুত্রের চোখ লাল হয়ে গেল।
সে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“এবার তুমি আমাকে থামাবে কিভাবে, আরাধ্যা?”
আরাধ্যার চোখে জল চলে এল… কিন্তু তার মুখে দৃঢ়তা।
সে বুঝতে পারল—
এবার তাকে যুদ্ধ করতে হবে… নিজের স্বামীর সঙ্গেই।
ঘরের চারদিকে বজ্রপাতের আলো ঝলসে উঠল।
মাতঙ্গীর মূর্তির চোখ জ্বলতে লাগল।
আর দূরে গঙ্গার জল অস্বাভাবিকভাবে উথালপাতাল শুরু করল…