Story of Mahabharat Part 178 in Bengali Spiritual Stories by Ashoke Ghosh books and stories PDF | মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 178

Featured Books
Categories
Share

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 178

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৭৮

কৃষ্ণ কর্তৃক মহাদেবের মাহাত্ম্য বর্ণনা এবং ধৃতরাষ্ট্রকে বিদুরের সান্ত্বনাদান

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

কৃষ্ণ কর্তৃক মহাদেবের মাহাত্ম্য বর্ণনা এবং ধৃতরাষ্ট্রকে বিদুরের সান্ত্বনাদান

যুধিষ্টির কৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন, নীচস্বভাব পাপী অশ্বত্থামা কি কোরে আমাদের মহাবল পুত্রগণ ও ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতিকে বধ করতে সমর্থ হলেন? কৃষ্ণ বললেন, মহাদেবের শরণাপন্ন হয়েই তিনি একা বহু জনকে বধ করতে পেরেছেন। তার পর কৃষ্ণ এই মহাদেবের মহিমা বর্ণনা করলেন-

প্রাচীনকালে ব্রহ্মা মহাদেবকে প্রাণি সৃষ্টির জন্য অনুরোধ করেছিলেন। মহাদেব সম্মত হলেন এবং জলে মগ্ন হয়ে তপস্যা করতে লাগলেন। দীর্ঘকাল প্রতীক্ষার পর ব্রহ্মা দক্ষ প্রভৃতি প্রজাপতিগণকে সৃষ্টি করলেন। প্রাণীরা ক্ষুধার্ত হয়ে প্রজাপতিদেরকেই খেতে গেল। তখন ব্রহ্মা প্রজাগণের খাদ্যের জন্য ওষধি ও অন্যান্য উদ্ভিদ এবং প্রবল প্রাণীর খাদ্য হিসাবে দুর্বল প্রাণী সৃষ্টি করলেন। তার পর মহাদেব জল থেকে উঠলেন এবং বহুপ্রকার জীব সৃষ্ট হয়েছে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রহ্মাকে বললেন, অপর পুরুষ প্রজা উৎপাদন করেছে, আমি লিঙ্গ নিয়ে কি করবো? এই বলে তিনি ভূমিতে লিঙ্গ ফেলে দিয়ে মুঞ্জবান পর্বতের পাদদেশে তপস্যা করতে গেলেন।

দেবযুগ অতীত হলে দেবতারা যজ্ঞ করবার ইচ্ছা করলেন। তারা যথার্থ ভাবে মহাদেবকে জানতেন না সেজন্য যজ্ঞের হবি ভাগ করবার সময় মহাদেবের জন্য ভাগ রাখলেন না। মহাদেব ক্রুদ্ধ হয়ে পাঁচ হাত দীর্ঘ ধনু নিয়ে দেবগণের যজ্ঞে উপস্থিত হলেন। তখন চন্দ্রসূর্য অদৃশ্য হোলো, আকাশ অন্ধকারে ছেয়ে গেল এবং দেবতারা ভয়ে উৎকন্ঠিত হলেন। মহাদেবের শরাঘাতে বিদ্ধ হয়ে অগ্নিদেব হরিণের রূপ ধারণ কোরে আকাশে গেলে মহাদেব তার অনুসরণ করতে লাগলেন। যজ্ঞ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দেবতারা মহাদেবের শরণাপন্ন হলেন এবং তাকে প্রসন্ন কোরে তার জন্য হবির ভাগ নির্দেশ কোরে দিলেন। মহাদেবের ক্রোধে সমস্ত জগৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তিনি প্রসন্ন হলে আবার সকলে সুস্থ হোলো।

কাহিনি শেষ কোরে কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, অশ্বত্থামা যা করেছেন তা নিজের শক্তিতে করেননি, মহাদেবের আশীর্বাদেই করতে পেরেছেন।

শত পুত্রের মৃত্যুতে ধৃতরাষ্ট্র অত্যন্ত শোকাকুল হয়েছিলেন। সঞ্জয় তাঁকে বললেন, শোক করছেন কেন, শোকের কোনও প্রতিকার নেই। এখন আপনি সকলের পারলৌকিক কাজ সম্পন্ন করান। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, আমার সমস্ত পুত্র অমাত্য ও শুভাকাঙ্খী নিহত হয়েছেন, এখন আমি ডানাহীন পাখির মতো হয়েছি, আমার চোখ নেই, রাজ্য নেই, বন্ধু নেই। আমার জীবনের আর প্রয়োজন কি?

ধৃতরাষ্ট্রকে আশ্বাস দেবার জন্য বিদুর বললেন, মহারাজ, শুয়ে আছেন কেন, উঠুন, সমস্ত প্রাণীর ভবিতব্য এই। মানুষ শোক কোরে মৃতজনকে ফিরে পায় না, শোক কোরে নিজেও মরতে পারে না। সকল সঞ্চয়ই ক্ষয় পায়, উন্নতির শেষে পতন হয়, মিলনের শেষে বিচ্ছেদ হয়, জীবনের শেষে মরণ হয়। মানুষ অদৃশ্য স্থান থেকে আসে, আবার অদৃশ্য স্থানেই চলে যায়। তারা আপনার নয়, আপনিও তাদের নন। তবে কিসের খেদ? নানা প্রকার শোকের কারণ এবং বিভিন্ন ভয়ের কারণ প্রতিদিন মূর্খ লোককে অভিভূত করে, কিন্তু পণ্ডিতকে করে না। কালের কেউ প্রিয় বা অপ্রিয় নেই, কাল কারও প্রতি উদাসীনও নয়। কাল সকলকেই আকর্ষণ করে নিয়ে যায়।

তারপর বিদুর বললেন, গর্ভাধানের কিছু পরে জীব জরায়ুতে প্রবেশ করে, পঞ্চম মাস অতীত হলে তার দেহ গঠিত হয়। তারপর সর্বাঙ্গসম্পন্ন হয়ে ভ্রূণরূপে সে মাংসশোণিতযুক্ত অপবিত্র স্থানে বাস করে। তার পর সেই ভ্রূণ ঊর্ধ্বপদ অধঃমস্তক হয়ে বহু কষ্ট ভোগ কোরে যোনিপথ দিয়ে ভূমিষ্ট হয়। সেই সময়ে গ্রহগণ তার কাছে আসে। ক্রমশ সে নিজের কাজে আবদ্ধ হয় এবং বিবিধ ব্যাধি ও বিপদ তাকে আশ্রয় করে, তখন হিতৈষীগণই তাকে রক্ষা করেন। অবশেষে যমদূতেরা তাকে আকর্ষণ করে, তখন তার মৃত্যু হয়। লোকে লোভের বশে, ক্রোধ ও ভয়ের কারণে নিজেকে বুঝতে পারে না। সৎকুলে জন্মালে নীচকুলজাতের এবং ধনী হলে দরিদ্রের নিন্দা করে, অন্যকে মূর্খ বলে, নিজেকে সংযত করতে চায় না। প্রাজ্ঞ ও মূর্খ, ধনবান ও নির্ধন, কুলীন ও অকুলীন, মানী ও অমানী সকলেই পরিশেষে শ্মশানে গিয়ে শয়ন করে জেনেও দুষ্টবুদ্ধি লোকে পরস্পরকে প্রতারিত করে।

______________

(ক্রমশ)