মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৭৭
অশ্বত্থামা ও অর্জুন উভয়ের ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
অশ্বত্থামা ও অর্জুন উভয়ের ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ
ভীম চলে গেলে কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ভীম আপনার সবচেয় প্রিয় ভাই, ইনি বিপদের দিকে যাচ্ছেন, আপনি ওঁর সঙ্গে গেলেন না কেন? দ্রোণাচার্য তাঁর পুত্রকে যে ব্রহ্মশির অস্ত্র দান করেছেন তা পৃথিবীকে ধ্বংস করতে পারে। অর্জুনকেও দ্রোণ এই অস্ত্র শিখিয়েছেন। তিনি পুত্রের চঞ্চল স্বভাব জানতেন সেজন্য অস্ত্রদানকালে অশ্বত্থামাকে বলেছিলেন, তুমি কখনও সৎপথে থাকবে না জানি, তবুও তুমি যুদ্ধে অত্যন্ত বিপন্ন হলেও এই অস্ত্র প্রয়োগ কোরো না, বিশেষত মানুষের উপর কখনোই নয়। আপনারা বনবাসে চলে গেলে অশ্বত্থামা দ্বারকায় এসে আমাকে বলেছিলেন, আমার ব্রহ্মশির অস্ত্র নিয়ে তোমার সুদর্শন চক্র আমাকে দাও। আমি উত্তর দিলাম, তোমার অস্ত্র আমি চাই না, তুমি আমার এই চক্র ধনু শক্তি বা গদা যা ইচ্ছা হয় নিতে পারো। অশ্বত্থামা সুদর্শন চক্র নিতে গেলেন, কিন্তু দু হাতে ধরেও তুলতে পারলেন না। তখন আমি তাকে বললাম, মূর্খ ব্রাহ্মণ, তুমি যা চেয়েছ তা অর্জুন প্রদ্যুম্ন বলরাম প্রভৃতিও কখনও চাননি। তুমি কেন আমার চক্র চাও? অশ্বত্থামা বললেন, এই চক্র পেলে আমি সসম্মানে তোমার সঙ্গেই যুদ্ধ করতে পারতাম এবং সকলের অজেয় হতাম। কিন্তু দেখছি তুমি ভিন্ন আর কেউ এই চক্র ধারণ করতে পারে না। এই বলে অশ্বত্থামা চলে গেলেন। তিনি ক্রোধী দুরাত্মা চপল ও ক্রুর, তার ব্রহ্মশির অস্ত্রও আছে। অতএব তার হাত থেকে ভীমকে রক্ষা করতে হবে।
তারপর কৃষ্ণ তাঁর গরুড়ধ্বজ রথে যুধিষ্ঠির ও অর্জুনকে তুলে নিয়ে যাত্রা করলেন এবং কিছুক্ষণ পরেই ভীমকে দেখতে পেয়ে তার পিছনে গিয়ে গঙ্গাতীরে উপস্থিত হলেন। সেখানে তারা দেখলেন, অশ্বত্থামা কুশের কৌপীন পরে শরীরে ঘী ও ধূলো মেখে বেদব্যাস ও অন্যান্য ঋষিগণের মধ্যে বসে আছেন। ভীম ধুনর্বাণ নিয়ে অশ্বত্থামার প্রতি ধাবিত হলেন। কৃষ্ণ, অর্জুন ও যুধিষ্ঠিরকে দেখে অশ্বত্থামা ভয় পেয়ে ব্রহ্মশির অস্ত্র নিক্ষেপ কোরে বললেন, পাণ্ডবরা বিনষ্ট হোক। তখন সেই অস্ত্র থেকে কালান্তক যমের ন্যায় আগুন উৎপন্ন হোলো। কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, দ্রোণের দেওয়া দিব্যাস্ত্র ব্রহ্মশির এখনই নিক্ষেপ কোরে অশ্বত্থামার অস্ত্র নিবারণ করো।
অর্জুন বললেন, অশ্বত্থামার, আমাদের, এবং আর সকলের মঙ্গল হোক, অস্ত্র দ্বারা অস্ত্র নিবারিত হোক। এই বলে তিনি দেবতা ও গুরুজনের উদ্দেশ্যে নমস্কার কোরে ব্রহ্মশির অস্ত্র নিক্ষেপ করলে সেই অস্ত্রও প্রলয়কালের আগুনের মতো জ্বলে উঠল। তখন দেবর্ষি নারদ ও বেদব্যাস সেই দুই ভয়ঙ্কর অস্ত্র থেকে উৎপন্ন আগুনের রাশির মধ্যে দাঁড়িয়ে বললেন, পূর্বে কোনও মহারথ এই অস্ত্র মানুষের উপর প্রয়োগ করেননি। তোমরা এই মহাবিপজ্জনক কাজ কেন করলে?
অর্জুন কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, অশ্বত্থামার অস্ত্র প্রতিহত করার জন্যই আমি অস্ত্র প্রয়োগ করেছি। যাতে সকলের মঙ্গল হয় আপনারা তা করুন। এই বলে অর্জুন তার অস্ত্র প্রত্যাহার করলেন। তিনি পূর্বে ব্রহ্মচর্য ও বিবিধ ব্রত পালন করেছিলেন সেজন্যই ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রত্যাহার করতে পারলেন, কিন্তু অশ্বত্থামা তা পারলেন না। অশ্বত্থামা বিষণ্ণ হয়ে বেদব্যাসকে বললেন, আমি ভীমের ভয়ে এবং পাণ্ডবদের বধের নিমিত্ত এই অস্ত্র নিক্ষেপ করেছি, আমি ক্রোধের বশে পাপকাজ করেছি। কিন্তু এই অস্ত্র প্রত্যাহারের শক্তি আমার নেই। বেদব্যাস বললেন, বৎস, অর্জুন তোমাকে মারবার জন্য ব্রহ্মশির অস্ত্র প্রয়োগ করেননি, তোমার অস্ত্র নিবারণের জন্যই করেছিলেন। পাণ্ডবগণ ও তাদের রাজ্য সর্বদাই রক্ষা করা তোমার ধর্ম, আত্মরক্ষা করাও তোমার কর্তব্য। তোমার মাথার মণি পাণ্ডবদের দান করো, তা হলে তারা তোমার প্রাণ দান করবেন।
অশ্বত্থামা বললেন, পাণ্ডব আর কৌরবদের যত রত্ন আছে সে সমস্তের চেয়ে আমার মণির মূল্য অধিক, ধারণ করলে সকল ভয় নিবারিত হয়। আপনার আদেশ আমার অবশ্য পালনীয়, কিন্তু ব্রহ্মশির অস্ত্রের প্রত্যাহার আমার অসাধ্য, অতএব তা পাণ্ডবনারীদের গর্ভে প্রয়োগ করবো। বেদব্যাস বললেন, তবে তাই করো।
কৃষ্ণ বললেন, এক শুদ্ধাচারী ব্রাহ্মণ অর্জুনের পুত্রবধূ উত্তরাকে বলেছিলেন, কুরুবংশ ক্ষয় হলে পরীক্ষিৎ নামে তোমার একটি পুত্র হবে। সেই সাধু ব্রাহ্মণের বাক্য সফল হবে। অশ্বত্থামা ক্রুদ্ধ হয়ে কৃষ্ণকে বললেন, তুমি পক্ষপাত কোরে যা বলছ তা সত্য হবে না, আমার বাক্যের অন্যথা হবে না। কৃষ্ণ বললেন, তোমার মহাস্ত্র অব্যর্থ হবে, উত্তরার গর্ভস্থ শিশুও মরবে, কিন্তু সে আবার জীবিত হয়ে দীর্ঘায়ু পাবে। অশ্বত্থামা, তুমি কাপুরুষ, বহু পাপ করেছ, বালকবধে উদ্যত হয়েছ। অতএব পাপকর্মের ফলভোগ করো। তুমি তিন হাজার বছর জনহীন দেশে অসহায় ব্যাধিগ্রস্ত ও দুর্গন্ধময় শরীর নিয়ে বিচরণ করবে। নরাধম, তোমার অস্ত্রে উত্তরার পুত্রের মৃত্যু হলে আমি তাকে জীবিত করবো, সে কৃপাচার্যের নিকট অস্ত্রশিক্ষা করে ষাট বৎসর রাজত্ব করবে।
অশ্বত্থামা বেদব্যাসকে বললেন, পুরুষোত্তম কৃষ্ণের বাক্য সত্য হোক, আমি আপনার কাছেই থাকব। তারপর অশ্বত্থামা পাণ্ডবগণকে মণি দিয়ে বনে গমন করলেন। কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরাদি ফিরে এলে ভীম দ্রৌপদীকে বললেন, এই তোমার মণি নাও, তোমার পুত্রদের হত্যাকারী পরাজিত হয়েছে, এখন শোক ত্যাগ করো। কৃষ্ণ যখন সন্ধি কামনায় হস্তিনাপুরে যাচ্ছিলেন তখন তুমি বলেছিলে – কৃষ্ণ, আমার পতি নেই পুত্র নেই ভাই নেই, তুমিও নেই। সেই কথা এখন স্মরণ করো। আমি পাপী দুর্যোধনকে বধ করেছি, দুঃশাসনের রক্তপান করেছি, অশ্বত্থামাকেও জয় কোরে কেবল ব্রাহ্মণ আর গুরুপুত্র বলে ছেড়ে দিয়েছি। তার যশ মণি এবং অস্ত্র নষ্ট হয়েছে, কেবল শরীর অবশিষ্ট আছে।
তারপর দ্রৌপদীর অনুরোধে যুধিষ্ঠির সেই মণি মস্তকে ধারণ করলেন এবং পুত্রশোকে কাতর দ্রৌপদীও অনশন ত্যাগ করলেন।
______________
(ক্রমশ)