মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৫০
পরশুরাম কর্তৃক কর্ণকে অভিশাপ দেওয়ার কাহিনি
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
পরশুরাম কর্তৃক কর্ণকে অভিশাপ দেওয়ার কাহিনি
শল্যের কাছে হাস ও কাকের কাহিনি শুনে কর্ণ বললেন, কৃষ্ণ ও অর্জুনের শক্তি আমি ভালোভাবে জানি, তথাপি আমি নির্ভয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবো। কিন্তু ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ পরশুরাম আমাকে যে শাপ দিয়েছিলেন তার জন্যই আমি উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। পূর্বে আমি দিব্যাস্ত্র শিক্ষার জন্য ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে পরশুরামের নিকট বাস করতাম। একদিন পরশুরাম আমার উরুতে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলেন, সেই সময়ে অর্জুনের শুভাকাংখী দেবরাজ ইন্দ্র এক বিকট কীটের রূপ ধারণ কোরে আমার ঊরুতে দংশন করলেন। সেখান থেকে অত্যন্ত রক্তপাত হতে লাগল, কিন্তু গুরুর নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে আমি নিশ্চল হয়ে রইলাম। ঘুম থেকে উঠে তিনি আমার সহিষ্ণুতা দেখে বললেন, তুমি ব্রাহ্মণ নও, সত্য বলো তুমি কে? তখন আমি নিজের যথার্থ পরিচয় দিলাম। পরশুরাম ক্রুদ্ধ হয়ে আমাকে এই শাপ দিলেন — তুমি কপট উপায়ে আমার কাছে যে অস্ত্র লাভ করেছ, প্রয়োজনের সময় তা তোমার স্মরণ হবে না, মৃত্যুকাল ছাড়া অন্য সময়ে মনে পড়বে। কারণ, বেদমন্ত্রযুক্ত অস্ত্র অব্রাহ্মণের নিকট স্থায়ী হয় না।
তারপর কর্ণ বললেন, আজ যে তুমুল সংগ্রাম আসন্ন হয়েছে তাতে সেই অস্ত্রই আমার পক্ষে যথেষ্ট হতো। কিন্তু আজ আমি অন্য অস্ত্র স্মরণ করছি যার দ্বারা অর্জুন প্রভৃতি শত্রুকে নিপাতিত করবো। আজ আমি অর্জুনের প্রতি যে ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করবো তার শক্তি ধারণাতীত। যদি আমার রথচক্র গর্তে না পড়ে তবে অর্জুন আজ মুক্তি পাবে না। মদ্ররাজ, পূর্বে অস্ত্র শিক্ষার সময় অসাবধানতার ফলে আমি এক ব্রাহ্মণের হোমের জন্য রক্ষিত বাছুরকে বাণের আঘাতে বধ করেছিলাম। তার জন্য তিনি আমাকে শাপ দিয়েছিলেন - যুদ্ধকালে তোমার মহাভয় উপস্থিত হবে এবং রথচক্র গর্তে পড়বে। আমি সেই ব্রাহ্মণকে বহু গাভী, বলদ, হাতি, দাসদাসী, সুসজ্জিত ঘর এবং আমার সমস্ত ধন দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি প্রসন্ন হননি। আপনি আমার নিন্দা করা সত্বেও আপনাকে এইসব কথা বললাম। আপনি জানবেন যে কর্ণ ভয় পাবার জন্য জন্মগ্রহণ করেনি, বিক্রমপ্রকাশ ও যশোলাভের জন্যই জন্মেছে। হাজার শল্য পাশে না থাকলেও আমি শত্ৰুজয় করতে পারি। শল্য বললেন, তুমি বিপক্ষদের উদ্দেশ্যে যা বললে তা প্রলাপ মাত্র। আমি হাজার কর্ণ ব্যতীত যুদ্ধে শত্রুজয় করতে পারি।
শল্যের নিষ্ঠুর কথা শুনে কর্ণ আবার মদ্রদেশের নিন্দা করতে লাগলেন। তিনি বললেন, এক ব্রাহ্মণ আমার পিতার নিকট বাহীক ও মদ্রদেশের এই কুৎসা করেছিলেন - যে দেশ হিমালয়, গঙ্গা, সরস্বতী যমুনা ও কুরুক্ষেত্রের বাইরে এবং যা সিন্ধু, শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা ও বিতস্তার মধ্যে অবস্থিত, সেই ধর্মহীন অশুচি বাহীক দেশ বর্জন করবে। জর্তিক নামক বাহীক দেশের অধিবাসীর আচরণ অতি নিন্দিত, তারা গুড়ের তৈরী মদ্ পান করে, রসুনের সাথে গোমাংস খায়, তাদের নারীরা দুশ্চরিত্রা ও অশ্লীলভাষিণী। আরট্ট নামক বাহীকগণ মেষ, উট ও গাধার দুধ পান করে এবং জারজ পুত্র উৎপাদন করে। কোনও এক সতী নারীর অভিশাপের ফলে সেখানকার নারীরা বহুভোগ্যা, সেই দেশে ভাগ্নে উত্তরাধিকারী হয়, পুত্র নয়। পঞ্চনদ প্রদেশের আরট্টগণ কৃতঘ্ন, পরস্বাপহারী, মদ্যপ, গুরুপত্নীগামী, নিষ্ঠুরভাষী ও গোঘাতক, তাদের ধর্ম নেই, অধর্মই আছে।
শল্য বললেন, কর্ণ, তুমি যে দেশের রাজা সেই অঙ্গদেশের লোকে আতুরকে পরিত্যাগ করে, নিজের স্ত্রী-পুত্রকে বিক্রয় করে। কোনও দেশের সকল লোকেই পাপাচরণ করে না, অনেকে এমন সচ্চরিত্র যে দেবতারাও তেমন নন।
তারপর দুর্যোধন এসে কর্ণকে এবং শল্যকে বিবাদ থেকে নিবৃত্ত করলেন। কর্ণ একটু হেসে শল্যকে বললেন, এখন রথ চালান।
______________
(ক্রমশ)