মার্কস বাই সিন –১৩
আহান আর ঋষিল বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর আহান একটা গভীর শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর ফ্রিজ খুলে আইসক্রিম বের করে আনে সে। ঋষিলের দিকে এক বাটি আইসক্রিম এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে “কি রে, ঘুম পাচ্ছে?”
ঋষিল মুখ তুলে আহানের হাত থেকে আইসক্রিমের বাটিটা নিয়ে একগাল হেসে বলে ওঠে “পাচ্ছিল। তবে এটা দেখে উধাও হয়ে গেছে।”
আহান হালকা হেসে ওর পাশে এসে বসে। “গ্রেট। তোর সঙ্গে কিছু কথা আছে।”
"কি কথা আহানদা? তোর কেসের ব্যাপারে কিছু কি?"
আহান ক্লান্ত হেসে মাথা নাড়িয়ে বলে "একদম ঠিক ধরেছিস, কেসের সম্পর্কিত কথাতো আছে। তবে তার আগে তোকে ক’টা কথা বলি। জানিস, অনেক ভেবেচিন্তে আমি মনস্থির করেছি, তুই ঠিকই বলেছিলিস। আমাদের ইউনিটে জয়েন করা ঠিক হবে না।"
ঋষিল বেশ অবাক হয় আহানের কথা শুনে। সে চুপ করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আহানের দিকে। যে ছেলে কয়েক ঘন্টা আগেই ওকে ইউনিটে চাইছিল, এখন হঠাৎ কি এমন হল যে জয়েন করতে বারণ করছে।
ভ্রু কুঁচকে যায় ওর। সে আহানের হাতের ওপর হাত রেখে বলে “কি বলছিস তুই, আহানদা? তুই তো নিজেই চেয়েছিলিস যে আমি তোদের ইউনিটে জয়েন করি। হ্যাঁ মানছি আমি রাজি হয়নি। কিন্তু হঠাৎ করে কি এমন হলো তোর? যার জন্য তুই আমাকে জয়েন্ট করতে বারণ করছিস। ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বল আহানদা। এইরকম কেন বলছিস তুই?"
আহানের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে "দেখ ঋষ, তোর বয়স এখনও অনেক কম। আর আমার পরিবার বলতে তুই, দাদা, বউদি আর ঘন্টু। তোরা আমার অস্তিত্বের অংশ। তোদের কোনো মূল্যে হারাতে পারব না। আমি যার বিরুদ্ধে এখন লড়াই চালাচ্ছি সে খুব পাওয়ারফুল। বড়ো বড়ো নেতা থেকে শুরু করে কিছু বড়ো অফিসার পর্যন্ত সেই লোকের অঙ্গুলি হেলনে নাচে। যেখানে প্রতি মুহূর্তে প্রাণের সংশয় থাকে। সেখানে তোকে সব জেনেশুনে কি করে আমি যেতে বলতে পারি, তুই বল!"
একটু থেমে সে আবার বলে "প্রথমে যখন তুই রাজি হসনি, তখন আমি তোর ওপর একটু অভিমান হয়েছিল, এটা ঠিক। তবে বাড়িতে আসার সময় এই নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তার পর বুঝলাম, তুই একদম ঠিক সিধান্ত নিয়েছিস আর আমি ভুল...।
ঋষিল এই কথা শুনে কিছু বলছিল, আহান থামিয়ে দেয়। "তুই কর্পোরেটের চাকরি খুঁজছিস, তাই কর।আর আমাকে তুই যেভাবে এখন সাহায্য করছিস—লুকিয়ে, ব্যাকডোর দিয়ে—সেটাই যথেষ্ট। তোর সামনে আসার কোনো দরকার নেই।"
একটু থেমে, আহান নিঃশ্বাস নেয়। তারপর ধরা গলায় মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে বলে ওঠে "ঋষ, তুই জানিস আমার বাবা কিভাবে মারা গিয়েছিল?"
আহানের প্রশ্ন শুনে ঋষিল একটু ভেবে উত্তর দেয় “আমি যতদূর জানি, মামার মৃত্যুটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না… ওটা ছিল একটা পরিকল্পিত আক্রমণ। উনি তখন একজন খুব হাইপ্রোফাইল মানুষের বিরুদ্ধে কাজ করছিলেন।”
একটু থেমে সে আবার বলে “কিন্তু হঠাৎ করে তুই এখন এসব জিজ্ঞাসা করছিস কেন এখন?”
আহান সোফা থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়ায়। বন্ধ জানালা দিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকায় সে। চাপা স্বরে উত্তর দেয় “তুই জানিস, বাবাকে যে মেরেছে…"
"নাতো।" মাথা নাড়ায় ঋষিল। "কে মেরেছে মামাকে আহানদা?" ভ্রু কুঁচকে ওঠে তার।
আহান গভীর শ্বাস নিয়ে উত্তর দেয় "বাবারই একজন কলিগ ছিল সে। বাবার সাথেই কাজ করছিল। আর বাবার খুব আপন একজন ছিল। যদিও এখনো তার নাম জানি না।" তাচ্ছিল্য ভরা হেসে বলে আহান। "সেই মানুটা… না সেই বিশ্বাসঘাতক অপরাধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল আমার বাবার সঙ্গে। বাবা বড্ড বিশ্বাস করতো লোকটাকে কিন্তু সেই আমার বাবাকে গুলি দিয়ে ঝাঁঝরা করে দেয়।"
ঋষিল ধাক্কা খায়, গলার স্বর নিচু। “মানে… নিজের টিমের লোক…?”
আহান এবার ঘুরে দাঁড়ায়। ওর চোখ জ্বলজ্বল করছে। “আর এই পুরো ঘটনার পেছনে… একজন মাস্টারমাইন্ড ছিল এবং আজও আছে। এমনি কার্লও তার অধীনেই আছে।”
ঋষিল থেমে যায়। চোখ বড় বড় করে বলে। “কি বলছিস তুই দাদা? কার্লও? আমি জানতাম ওর থেকে ভয়ঙ্কর কেউ হতে পারে না।”
আহান তির্যক হেসে ধীরে ধীরে বলে “পারে ঋষ, পারে। এই গেমের মেন খেলোয়াড় কার্লকে লোকে ভাবলেও, ও আসলে নয়। কার্লকে বানানো হয়েছে। ওকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয়েছে… ছায়ার ভেতর থেকে, সেই মানুষটার হাতে, যার নাম এখনও কেউ জানে না।”
একটু থেমে, আহান আবার বলে “যেদিন এসপি স্যার আমার সাসপেনশন তুলে নিয়ে আমায় এই কেসটার দায়িত্ব দিলেন… সেদিন উনিই আমাকে এই সত্যটা বলেন। আর সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিই— এই কার্ল, তার মাস্টার, আর যারা এই খেলায় আছে, একে একে সবাইকে শাস্তি দেব আমি। তবেই আমার বাবার আত্মা শান্তি পাবে।”
ঋষিল আস্তে ফিসফিস করে “আর… ওই কলিগ? কিছু হয়নি ওর?”
আহানের চোখ নেমে আসে। স্বরটা কড়া আর ঠান্ডা। “না। স্যার জানান বাবাকে খুন করার পর সেও আর বাঁচেনি। ওকে ‘ব্যবহার’ করা হয়েছিল। আর যখন তার দরকার ফুরিয়েছে…। ওকে শেষ করে দেওয়া হয়। যেন কিছু হয়নি। যেন একটা নাম, একটা শরীর… আর কিছু নয়।”
ঘরে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে আসে। শুধু নিঃশ্বাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ওদের দুইজনের। ঋষিল কিছু বলতে গিয়েও আহানের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থেমে যায়।
আহান একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে এগিয়ে এসে ঋষিলের মাথায় স্নেহামাখা হাত রেখে বলে "এবার বুঝতে পারছিস, কেন তোকে এই বারণ করছি। কেন বলছি তুই ডিরেক্টলি এই কেসে জড়াস না।"
ঋষিল ফিসফিস করে বলে “কিন্তু ভাই, তুই তো শুধু আমাদের জন্য ভাবছিস... তোর নিজের কী হবে?”
আহান মুচকি হেসে বলে “আমার কী হবে তা নিয়ে চিন্তা করিস না। যতক্ষণ না আমি কার্ল আর ওর পিছনে থাকা মাস্টারমাইন্ডকে ধরছি, ততক্ষণ আমি মরব না।”
ঋষিল ব্যস্ত হয়ে বলে ”আহানদা… প্লিজ, এমন কথা বলিস না।"
আহানের মুখে শান্ত একটা হাসি ফুটে ওঠে। “আচ্ছা বলবো না, হ্যাপি। এইবার নিজের রুমে যা এখন। অনেক বকবক হয়েছে। এমনিতেই বেশ রাত হয়েছে। এবার ঘুমো গিয়ে।”
ঋষিল চোখে ঘুম নিয়ে হাই তুলে বলে “হুম রে… খুব ঘুম পাচ্ছে। তবে তুই রেস্ট নিবি না? তোরও তো অনেকদিন ধরে খাটুনি চলছে। একটু না বিশ্রাম নিলে শরীর যে আর চলবে না আহানদা।”
আহান মাথা নাড়ে। গলার স্বরটা নিচু, কিন্তু দৃঢ় “আমার কিছু হবে না, ঋষিল। আমি এই ‘কার্ল’ নামটার পেছনে যে সত্তা লুকিয়ে আছে, তাকে বের করে আনতে চাই। দেখতে চাই—এই লোকটা আদৌ কতোটা ভয়ঙ্কর।”
ঋষিল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলে “ঠিক আছে। তুই যা বলিস... তবে খুব বেশি রাত করিস না। একটু বিশ্রাম নিস।”
মাথা নাড়ায় আহান। ঋষিল হালকা হাসে তারপর পেছন ঘুরে চলে যেতে যেতে সে বলে। “গুড নাইট, আহানদা।”
“হুম, গুড নাইট।”
ঋষিল নিজের রুমে চলে যায়। আহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ডাইনিং স্পেসের লাইট অফ করে নিজের বেডরুমের দিকে পা দাঁড়ায়। ও জানে, আজ রাতটাও ঘুমের নয়। কার্লের ছায়া যতক্ষণ শহরের ওপর পড়ে থাকবে—ততক্ষণ আহানের লড়াই শেষ হবে না।
চলবে....................................