মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৭৩
অশ্বত্থামার সংকল্প এবং সেনাপতি পদে অভিষেক
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
অশ্বত্থামার সংকল্প এবং সেনাপতি পদে অভিষেক
কৃপাচার্য অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা দূতমুখে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গের সংবাদ শুনে রথে চড়ে দ্রুত তার কাছে এলেন। অশ্বত্থামা শোকার্ত হয়ে বললেন, সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর হয়ে এই নির্জন বনে এইভাবে একাকী পড়ে আছ কেন? দুর্যোধন সাশ্রু নয়নে বললেন, কালধর্মে সমস্তই বিনষ্ট হয়। আমি কখনও যুদ্ধে বিমুখ হইনি, পাপী পাণ্ডবগণ কপট উপায়ে আমাকে নিপাতিত করেছে। ভাগ্যক্রমে আপনারা তিন জন জীবিত আছেন, আপনারা আমার জন্য দুঃখ করবেন না। আমি নিশ্চয়ই স্বর্গলোকে যাব। আপনারা জয়লাভের জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন, কিন্তু দৈবকে অতিক্রম করা অসাধ্য।
অশ্বত্থামা বললেন, মহারাজ, পাণ্ডবরা নিষ্ঠুর উপায়ে আমার পিতাকে বধ করেছে, কিন্তু তাঁর জন্য আমার তত শোক হয়নি যত তোমার জন্য হচ্ছে। আমি শপথ করছি, কৃষ্ণের সামনেই আজ সমস্ত পাঞ্চালদের যমালয়ে পাঠাব, তুমি আমাকে অনুমতি দাও।
দুর্যোধন প্রীত হয়ে কৃপকে বললেন, আচার্য, শীঘ্র জলপূর্ণ কলস আনুন। কৃপাচার্য কলস আনলে দুর্যোধন বললেন, দ্বিজশ্রেষ্ঠ, দ্রোণপুত্রকে সেনাপতির পদে অভিষিক্ত করুন। অভিষেক সম্পন্ন হলে অশ্বত্থামা দুর্যোধনকে আলিঙ্গন করে কৃপ ও কৃতবর্মার সঙ্গে প্রস্থান করলেন। দুর্যোধন রক্তাক্ত দেহে সেখানে শুয়ে থেকে ঘোর রজনী যাপন করতে লাগলেন।
কৃপাচার্য অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা কিছুদূর গিয়ে এক ঘোর বনে উপস্থিত হলেন। অল্প কাল বিশ্রাম কোরে এবং ঘোড়াদের জল খাইয়ে তারা আবার যাত্রা করলেন এবং একটি বিশাল বটগাছের নিকটে এসে রথ থেকে নেমে সন্ধ্যাবন্দনা করলেন। ক্রমে রাত্রি গভীর হলে কৃপ ও কৃতবর্মা মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। অশ্বত্থামার ঘুম হোলো না, তিনি ক্রোধে অধীর হয়ে সাপের মতো নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। তিনি দেখলেন, সেই বটগাছে বহু কাক নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে, এমন সময় এক ঘোরদর্শন বিশাল পেঁচা এসে অনেকগুলি কাক বিনষ্ট করলো, তাদের মৃতদেহে বটগাছের তলা ঢেকে গেল।
অশ্বত্থামা ভাবলেন, এই পেঁচা ঠিক সময়ে এসে আমাকে শত্রুসংহারের উপযুক্ত উপদেশ দিয়েছে। আমি বলবান বিজয়ী পাণ্ডবদের সম্মুখযুদ্ধে বধ করতে পারব না। যে কাজ অন্যায় বলে গণ্য হয়, ক্ষত্রিয়ের পক্ষে তাও করণীয়। কথিত আছে যে, পরিশ্রান্ত, ভগ্ন, ভোজনে রত, পলায়মান, আশ্রিত, নিদ্রিত, নায়কহীন, বিচ্ছিন্ন বা দ্বিধাযুক্ত শত্রুকে প্রহার করা বিধেয়। অশ্বত্থামা স্থির করলেন, তিনি সেই রাত্রিতেই পাণ্ডব ও পাঞ্চালগণকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করবেন।
দুই সঙ্গীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে অশ্বত্থামা তার সংকল্প জানালেন। কৃপ ও কৃতবর্মা লজ্জিত হয়ে উত্তর দিতে পারলেন না। ক্ষণকাল পরে কৃপ বললেন, কেবল দৈব বা কেবল পুরুষকারে কাজে সফল হওয়া যায় না, দুই-এর যোগেই সিদ্ধিলাভ হয়। কর্মদক্ষ লোক যদি চেষ্টা করেও কৃতকার্য না হয় তবে তার নিন্দা হয় না। কিন্তু অলস লোকে যদি কাজ না করেও ফললাভ করে তবে সে নিন্দা ও বিদ্বেষের পাত্র হয়। লোভী অদূরদর্শী দুর্যোধন হিতৈষী মিত্রদের উপদেশ শোনেননি, তিনি অসাধু লোকদের মন্ত্রণায় পাণ্ডবগণের সঙ্গে শত্রুতা করেছেন। আমরা সেই দুঃশীল পাপীর অনুসরণ কোরে এই দারুণ দুর্দশায় পড়েছি। আমার বুদ্ধি বিকল হয়েছে, কিসে ভাল হবে তা বুঝতে পারছি না। চলো, আমরা ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী ও মহামতি বিদুরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি, তারা যা বলবেন তাই আমাদের কর্তব্য হবে।
অশ্বত্থামা বললেন, নিপুণ বৈদ্য যেমন রোগ নির্ণয় কোরে ঔষধ প্রস্তুত করেন, সাধারণ লোকেও সেই ভাবে কার্যসিদ্ধির উপায় নির্ধারণ করে, আবার অন্য লোকে তার নিন্দাও করে। যৌবনে, মধ্যবয়সে ও বার্ধক্যে মানুষের বিভিন্ন বুদ্ধি হয়, মহাবিপদে বা মহাসমৃদ্ধিতেও মানুষের বুদ্ধি বিকৃত হয়। আমি শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণকূলে জন্মগ্রহণ কোরে মন্দভাগ্যবশত ক্ষত্রিয়ের ধর্ম গ্রহণ করেছি। সেই ধর্ম অনুসারে আমি মহাত্মা পিতৃদেবের এবং রাজা দুর্যোধনের পথে যাবো। বিজয়লাভে আনন্দিত শ্রান্ত পাঞ্চালগণ আজ যখন বর্ম খুলে ফেলে নিশ্চিন্ত হয়ে নিদ্রামগ্ন থাকবে তখন আমি তাদের বিনষ্ট করবো। পাঞ্চালগণের দেহে রণভূমি আচ্ছন্ন কোরে আমি পিতার নিকট ঋণমুক্ত হবো। আজ রাতেই আমি নিদ্রিত পাঞ্চাল ও পাণ্ডবপুত্রগণকে খড়গাঘাতে বধ করবো, পাঞ্চালসৈন্য সংহার কোরে সুখী হবো।
কৃপ বললেন, তুমি প্রতিশোধের যে সংকল্প করেছ তা থেকে স্বয়ং ইন্দ্রও তোমাকে নিবৃত্ত করতে পারবেন না। বৎস, তুমি বহুক্ষণ জেগে আছ, আজ রাত্রিতে বিশ্রাম করো। কাল সকালে আমরা বর্মধারণ কোরে রথে চড়ে তোমার সঙ্গে যাবো। তুমি যুদ্ধে বিক্রম প্রকাশ কোরে অনুচর সহ পাঞ্চালগণকে বিনষ্ট কোরো।
অশ্বত্থামা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, আতুর, ক্রুদ্ধ, অর্থচিন্তায় আকুল ও কার্য উদ্ধার যে করতে চায় সে কেমন কোরে ঘুমাবে? আমি ধৃষ্টদ্যুম্নকে বধ না কোরে জীবনধারণ করতে পারছি না। ভগ্ন উরু রাজা দুর্যোধনের যে বিলাপ আমি শুনেছি তাতে কার হৃদয়ে যন্ত্রণা না হয়? মামা, সকালে কৃষ্ণ ও অর্জুন শত্রুদের রক্ষা করবেন, তখন তারা ইন্দ্রেরও অজেয় হবে। আমার ক্রোধ দমন করতে পারছি না, আমি যা ভাল মনে করেছি তাই করবো। এই রাত্রিতেই ঘুমন্ত শত্রুদের বধ করবো, তার পর আমি ঘুমাবো।
কৃপাচার্য বললেন, শুভাকাঙ্খীরা যখন পাপকাজ করতে নিষেধ করেন তখন ভাগ্যবান নিবৃত্ত হয়, ভাগ্যহীন হয় না। বৎস, তুমি নিজের কল্যাণের জন্যই নিজেকে সংযত করো, আমার কথা শোন, তা হলে পরে অনুতাপ করতে হবে না। ঘুমন্ত নিরস্ত্র ঘোড়া ও রথহীন লোককে হত্যা করলে কেউ প্রশংসা করে না। পাঞ্চালরা আজ রাত্রিতে মৃতের ন্যায় অচেতন হয়ে ঘুমাবে, সেই অবকাশে যে কুটিল লোক তাদের বধ করবে সে অগাধ নরকে নিমগ্ন হবে। তুমি অস্ত্রবিদগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে বিখ্যাত, সামান্য পাপকর্মও তুমি করো নি। অতএব তুমি কাল সকালে শত্রুগণকে যুদ্ধে জয় করো। সাদা বস্তুতে যেমন রক্তের দাগ, তেমনপ তোমার পক্ষে অন্যায় কাজ অসম্ভব মনে করি।
অশ্বত্থামা বললেন, মামা, আপনার কথা সত্য, কিন্তু পাণ্ডবরা আগেই অধর্ম করেছে করেছে। আমি আজ রাতেই পিতৃহন্তা পাঞ্চালগণকে ঘুমন্ত অবস্থায় বধ করবো, তার ফলে যদি আমাকে কীটপতঙ্গ হয়ে জন্মাতে হয় তাও শ্রেয়। আমার পিতা যখন অস্ত্র ত্যাগ করেছিলেন তখন ধৃষ্টদ্যুম্ন তাকে বধ করেছিল। আমিও তেমন পাপকর্ম করবো, বর্মহীন, ধৃষ্টদ্যুম্নকে পশুর মতো বধ করবো, যাতে সেই পাপী অস্ত্রাঘাতে নিহত বীরের স্বর্গ না পায়। অশ্বত্থামা এই বলে বিপক্ষশিবিরের দিকে যাত্রা করলেন, কৃপ ও কৃতবর্মাও নিজ নিজ রথে চড়ে তার সঙ্গে চললেন।
______________
(ক্রমশ)