Story of Mahabharat Part 172 in Bengali Spiritual Stories by Ashoke Ghosh books and stories PDF | মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 172

Featured Books
Categories
Share

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 172

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৭২

ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর কাছে কৃষ্ণের আগমন

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর কাছে কৃষ্ণের আগমন

সকলে প্রস্থান করলে পাণ্ডবগণ দুর্যোধনের শিবিরে গেলেন। স্ত্রীলোক, নপুংসক ও বৃদ্ধ অমাত্যগণ সেখানে ছিলেন। দুর্যোধনের পরিচারকেরা কৃতাঞ্জলি হয়ে তাদের সম্মুখে এলো। পাণ্ডবগণ রথ থেকে নামলে কৃষ্ণের উপদেশে অর্জুন তার গাণ্ডীব ও দুই অক্ষয় তূণীর নামিয়ে নিলেন, তার পর কৃষ্ণ নামলেন। তখনই রথের ধ্বজে উপবিষ্ট বানর চলে গেল, রথ ও অস্ত্রসকলও ভস্ম হয়ে গেল। বিস্মিত অর্জুনকে কৃষ্ণ বললেন, বহুবিধ অস্ত্রের প্রভাবে তোমার রথে পূর্বেই অগ্নিসংযোগ হয়েছিল, আমি উপরে থাকায় এত কাল ভস্ম হয়ে যায়নি। এখন তুমি সফল হয়েছ, আমিও নেমে এসেছি, সেইজন্য রথ ভস্ম হয়ে গেল।

পাণ্ডবপক্ষের যোদ্ধারা দুর্যোধনের শিবিরে অসংখ্য ধনরত্ন ও দাসদাসী পেয়ে কোলাহল করতে লাগলেন। কৃষ্ণের উপদেশে পঞ্চপাণ্ডব ও সাত্যকি শিবিরের বাইরে নদীতীরে রাত্রিযাপনের আয়োজন করলেন। যুধিষ্ঠির কৃষ্ণকে বললেন, ধৃতরাষ্ট্রমহিষী তপস্বিনী গান্ধারী পুত্রপৌত্রগণের নিধন শুনে নিশ্চয় আমাদের অভিশাপে দিয়ে ভস্ম করবেন। তোমার অনুগ্রহেই আমাদের রাজ্য নিষ্কণ্টক হয়েছে, তুমি আমাদের জন্য বার বার অস্ত্রাঘাত ও কঠোর বাক্যযন্ত্রণা সয়েছ, এখন পুত্রশোকার্তা গান্ধারীর ক্রোধ শান্ত কোরে আমাদের রক্ষা করো।

দারুকের রথে চড়ে কৃষ্ণ তখনই হস্তিনাপুরে গেলেন। সেখানে বেদব্যাসকে দেখে তার চরণবন্দনা কোরে কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে অভিবাদন করলেন। ধৃতরাষ্ট্রের হাত ধরে কৃষ্ণ করূণ স্বরে বললেন, মহারাজ, কুলক্ষয় ও যুদ্ধ নিবারণের জন্য পাণ্ডবরা অনেক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য হননি। তারা বহু কষ্ট ভোগ করেছেন। যুদ্ধের আগে আমি আপনার কাছে এসে পাণ্ডবদের জন্য পাঁচটি গ্রাম চেয়েছিলাম, কিন্তু লোভের বশে তাতেও আপনি সম্মত হননি। ভীষ্ম দ্রোণ কৃপ বিদুর প্রভৃতি সন্ধির জন্য বারবার আপনাকে অনুরোধ করেছিলেন, তাতেও ফল হয়নি। আপনি পাণ্ডবদের দোষী মনে করবেন না, এই কুলক্ষয় আপনার দোষেই ঘটেছে। এখন আপনার কুলরক্ষা পিণ্ডদান এবং পুত্রের করণীয় যা কিছু আছে তার ভার পাণ্ডবদের উপরেই পড়েছে। অতএব আপনি এবং গান্ধারী ক্রোধ ও শোক ত্যাগ কোরে তাদের প্রতিপালন করুন। আপনার প্রতি যুধিষ্ঠিরের যে প্রীতি ও ভক্তি আছে তা আপনি জানেন। আপনি পুত্রশোকে কাতর হয়ে আছেন সেজন্য তিনি লজ্জায় আপনার কাছে আসতে পারছেন না।

তারপর কৃষ্ণ গান্ধারীকে বললেন, আপনার তুল্য নারী পৃথিবীতে দেখা যায় না। দুই পক্ষের হিতের জন্য আপনি যে উপদেশ দিয়েছিলেন তা আপনার পুত্রেরা পালন করেননি। আপনি দুর্যোধনকে ভৎর্সনা কোরে বলেছিলেন, মূর্খ, যেখানে ধর্ম সেখানেই জয়। কল্যাণী, আপনার সেই বাক্য সফল হয়েছে, অতএব শোক করবেন না, পাণ্ডবদের বিনাশকামনাও করবেন না। আপনি তপস্যার প্রভাবে ক্রোধের আগুনে চরাচর সহ সমস্ত পৃথিবী দগ্ধ করতে পারেন।

গান্ধারী কৃষ্ণকে বললেন, তুমি যা বললে তা সত্য। দুঃখে আমার মন অস্থির হয়েছিল, তোমার কথায় শান্ত হোলো। এখন তুমি আর পাণ্ডবরাই এই পুত্রহীন বৃদ্ধ অন্ধ রাজার অবলম্বন। এই বলে গান্ধারী বস্ত্রে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন। ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীকে সান্ত্বনা দিতে দিতে কৃষ্ণের মনে পড়ল যে অশ্বত্থামা এক দুষ্ট সংকল্প করেছেন। তিনি তখনই উঠলেন এবং বেদব্যাসকে প্রণাম কোরে ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, মহারাজ, আর শোক করবেন না। আমার এখন স্মরণ হোলো যে অশ্বত্থামা পাণ্ডবদের বিনাশের সংকল্প করেছেন, সেইজন্য আমি এখন যাচ্ছি। ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারী বললেন, কৃষ্ণ, তুমি শীঘ্র গিয়ে পাণ্ডবদের রক্ষার ব্যবস্থা করো। আবার যেন তোমার সঙ্গে আমাদের দেখা হয়।

______________

(ক্রমশ)