Story of Mahabharat Part-57 in Bengali Spiritual Stories by Ashoke Ghosh books and stories PDF | মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 57

Featured Books
Categories
Share

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 57

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-৫৭

অজগররূপী নহুষের কবলে ভীম ও নহুষের শাপমুক্তি

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

অজগররূপী নহুষের কবলে ভীম ও নহুষের শাপমুক্তি

দেবলোক থেকে অর্জুন ফিরে আসবার পর গন্ধমাদন পর্বতে কুবেরের উদ্যানে পঞ্চপাণ্ডব চার বছর সুখে বাস করলেন। ইতিপূর্বে তারা ছয় বছর বনবাসে কাটিয়েছিলেন। একদিন ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব যুধিষ্ঠিরকে বললেন আপনার প্রতিজ্ঞা ও সত্য রক্ষার জন্যই আমরা দুর্যোধনকে মারতে যাইনি, সম্মান বিসর্জন দিয়ে সমস্ত সুখভোগে বঞ্চিত হয়ে আমরা বনে বিচরণ করছি। আমাদের বনবাসের একাদশ বছর চলছে, পরে এক বৎসর দূরদেশে অজ্ঞাতবাস করলে দুর্যোধন জানতে পারবে না। এখন এখানে নিশ্চেষ্ট হয়ে না থেকে ভবিষ্যতে শত্রুজয়ের জন্য আমাদের প্রস্তুত হওয়া উচিত।

যুধিষ্ঠির গন্ধমাদন পর্বত ছেড়ে যেতে সম্মত হলেন। ঘটোৎকচ তার অনুচরদের সঙ্গে নিয়ে এসে তাদের সকলকে বহন করে নিয়ে চললেন। মহর্ষি লোমশ দেবলোকে ফিরে গেলেন। পাণ্ডবগণ বৃষপর্বার আশ্রমে এক রাত্রি এবং বদরিকাশ্রমে এক মাস বাস করে কিরাতরাজ সুবাহুর দেশে উপস্থিত হলেন। সেখান থেকে ইন্দ্রসেন ও অন্যান্য ভৃত্য, পাচক, সারথি ও রথ প্রভৃতি সঙ্গে নিয়ে এবং ঘটোৎকচকে বিদায় দিয়ে তারা যমুনার উৎপত্তিস্থলের কাছে বিশাখযূপ নামক বনে এলেন এবং সেখানে তারা এক বৎসর শিকার করে কাটালেন।

একদিন ভীম হরিণ, শুয়োর, মহিষ ইত্যাদি বধ করে বনে বিচরণ করছিলেন এমন সময় এক পর্বতের গুহাবাসী সবুজ রং-এর বিশাল সাপ তাকে পেঁচিয়ে ধরলো। অজগরের স্পর্শে ভীম অবশ হয়ে গেলো, মহাবলশালী হয়েও তিনি নিজেকে মুক্ত করতে পারলেন না। ভীম বললেন, হে মহানাগ তুমি কে? আমি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের ভাই ভীম, আমি অযুত হস্তীর সমান বলবান, আমাকে কি করে তুমি অবশ করলে? ভীমের দুই হাত মুক্ত কোরে এবং তার দেহ পেঁচিয়ে ধরে অজগর বললো, তোমার পূর্বপুরুষ রাজর্ষি নহুষের নাম শুনে থাকবেন, আমি সেই নহুষ, অগস্ত্যের অভিশাপে আমি অজগর হয়ে গিয়েছি। আমি বহুকাল ক্ষুধার্ত হয়ে আছি, আজ ভাগ্যক্রমে তোমাকে আমার খাদ্য হিসাবে পেয়েছি। ভীম বললেন, নিজের প্রাণের জন্য আমি ভাবছি না, আমার মৃত্যু হলে আমার ভাইয়েরা শোকে কাতর হবেন। রাজ্যের লোভে আমি আমার ধর্মপরায়ণ অগ্রজকে কটুকথা বলে কষ্ট দিয়েছি। আমার মৃত্যুতে হয়তো অর্জুন বিষাদগ্রস্ত হবেন না, কিন্তু আমার মা কুন্তী ও নকুল-সহদেব অত্যন্ত শোক পাবেন।

এদিকে হঠাৎ নানা রকম দুর্লক্ষণ দেখে যুধিষ্ঠির ভয় পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ভীম কোথায়? দ্রৌপদী বললেন, তিনি বহুক্ষণ আগে শিকারে গেছেন। যুধিষ্ঠির ধৌম্যকে সঙ্গে নিয়ে ভীমের খোঁজে চললেন। ভীমের শিকারে যাওয়ার চিহ্ন অনুসরণ কোরে তিনি এক পর্বতগুহার কাছে এসে দেখলেন, এক বিশাল অজগর ভীমকে পেঁচিয়ে ধরে আছে, তার নড়বার শক্তি নেই। যুধিষ্ঠিরক দেখে সেই অজগর বললো, একে আমি আমার মুখের কাছে পেয়েছি, এই ব্যক্তি আমার ভক্ষ্য। তুমি চলে যাও। নয়তো কাল তোমাকেও খাবো। কিন্তু তুমি যদি আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারো তবে তোমার ভাইকে ছেড়ে দেবো। যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি ইচ্ছামত প্রশ্ন করুন, আমি তার উত্তর দেবো।

তখন সেই বিশাল অজগর যুধিষ্ঠিরকে বললো, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি অতি বুদ্ধিমান। আমার প্রশ্ন হোলো - ব্রাহ্মণ কে? কাম্য কি? যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, সত্য, দান, ক্ষমা, সচ্চরিত্র, অহিংসা, তপস্যা ও দয়া যাঁর আছে তিনিই ব্রাহ্মণ। যাঁকে লাভ করলে শোক থাকে না সেই সুখদুঃখহীন পরমব্রহ্মই কাম্য। যুধিষ্ঠিরের উত্তর শুনে অজগর বললো, শূদ্রদের মধ্যেও তো ওইসব গুণ থাকতে পারে, আর, এমন কাউকেও দেখা যায় না যিনি সুখদুঃখের অতীত। যুধিষ্ঠির বললেন, যে শূদ্রের মধ্য ওইসব লক্ষণ থাকে তিনি শূদ্র নন, ব্রাহ্মণ। আর যে ব্রাহ্মণে ওইসব লক্ষণ থাকে না তিনি ব্রাহ্মণ নন, তাকে শূদ্র বলাই উচিত। আর, আপনি যাই মনে করুন, সুখদুঃখাতীত ব্রহ্ম আছেন এই আমার মত। অজগর বললো, যদি গুণানুসারেই ব্রাহ্মণ হয় তবে যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ সেই গুণের অধিকারী না হয় সে পর্যন্ত সে ব্রাহ্মণ নয়। যুধিষ্ঠির বললেন, মহানাগ, আমি মনে করি সকল বর্ণেই সংকরত্ব আছে, সেজন্য মানুষের জাতিনির্ণয় দুঃসাধ্য।

যুধিষ্ঠিরের উত্তর শুনে অজগর খুশি হয়ে ভীমকে মুক্তি দিলো। তার পর তার সঙ্গে যুধিষ্ঠিরের নানাবিধ দার্শনিক আলাপ হওয়ার পরে যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান, সর্বজ্ঞ, স্বর্গবাসীও ছিলেন, তবে আপনার এ দশা হল কেন? তখন অজগররূপী নহুষ বললেন, আমি দেবলোকে অহংকারে মত্ত হয়ে বিমানে বিচরণ করতাম, ব্রহ্মর্ষি, দেবতা, গন্ধর্ব প্রভৃতি সকলেই আমাকে কর দিতেন। এক হাজার ব্রহ্মর্ষি আমার পালকি বহন করতেন। একদিন অগস্ত্য যখন আমার পালকির বাহন ছিলেন তখন আমি পা দিয়ে তার মস্তক স্পর্শ করি। তার অভিশাপে আমি সাপ হয়ে ভূমিতে পতিত হলাম। আমার প্রার্থনায় তিনি বললেন, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির তোমাকে শাপমুক্ত করবেন। এই কথা বলে নহুষ অজগরের রূপ ত্যাগ করে দিব্যদেহে স্বর্গলোকে গেলেন। যুধিষ্ঠির ভীম ও ধৌম্য তাদের আশ্রমে ফিরে গেলেন।

______________

(ক্রমশ)