মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-৫৬
অর্জুনের প্রত্যাবর্তন এবং নিবাতকবচ বধ ও হিরণ্যপুরের কাহিনি বর্ণন
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
অর্জুনের প্রত্যাবর্তন এবং নিবাতকবচ বধ ও হিরণ্যপুরের কাহিনি বর্ণন
কুবেরকে দর্শন কোরে রাজর্ষি আর্চিযেণের আশ্রমে একমাস থাকবার পরে একদিন পাণ্ডবগণ দেখলেন, অর্জুন মুকুট ও মূল্যবান আভরণে ভূষিত হয়ে বিমানে কোরে উপস্থিত হয়েছেন। বিমান থেকে নেমে অর্জুন পুরোহিত ধৌম্য, যুধিষ্ঠির ও ভীমকে প্রণাম করলেন। পাণ্ডবগণ কর্তৃক আপ্যায়িত হোয়ে মাতলি বিমান নিয়ে ইন্দ্রলোকে ফিরে গেলেন।
দ্রৌপদীকে ইন্দ্রের দেওয়া বিবিধ মহামূল্য অলংকার উপহার দিয়ে অর্জুন তার ভাই ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে এসে বসলেন এবং দেবলোকে বাস করা ও অস্ত্রশিক্ষার বৃত্তান্ত সংক্ষেপে বললেন। পরদিন সকালে বিমানে চড়ে করে ইন্দ্র পাণ্ডবদের নিকট উপস্থিত হয়ে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, তুমি পৃথিবী শাসন করবে, এখন তোমরা কাম্যকবনে ফিরে যাও। অর্জুন সর্ববিধ অস্ত্র লাভ করেছেন, আমার প্রিয় কার্যও করেছেন। এখন ত্রিভুবনের কেউ এঁকে জয় করতে পারবে না। ইন্দ্র চলে গেলে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে অর্জুন তার যাত্রা ও দেবলোকে অবস্থানের ঘটনাবলী সবিস্তারে জানিয়ে নিবাতকবচ বধের বৃত্তান্ত বললেন - আমার অস্ত্রশিক্ষা সমাপ্ত হোলে দেবরাজ বললেন, তোমার এখন গুরুদক্ষিণা দেবার সময় এসেছে। আমার শত্রু নিবাতকবচ নামক তিন কোটি দানব সমুদ্রের মধ্যে দুর্গে বাস করে, তারা চেহারায় ও বিক্রমে সমান। তুমি তাদের বধ করো, তা হলেই তোমার গুরুদক্ষিণা দেওয়া হবে।
মুকুট ও কবচে ভূষিত হয়ে গাণ্ডীব ধনু নিয়ে আমি ইন্দ্রের রথে যাত্রা করলাম। অবিলম্বে মাতলি আমাকে সমুদ্রের মধ্যে দানবনগরে নিয়ে এলেন। আমাকে দেখে নিবাতকবচ নামক দানবেরা মহাশূল, গদা, মুষল, খড়্গ প্রভৃতি অস্ত্র নিয়ে আমাকে আক্রমণ করলো। তুমুল যুদ্ধে অনেক দানব আমার অস্ত্রাঘাতে মারা গেল। তারপর তারা মায়াবলে পাথর, আগুন ও প্রবল বায়ু বর্ষণ করতে লাগলো, চতুর্দিক ঘোর অন্ধকারে ছেয়ে গেল। তখন আমি নিজের অস্ত্রে দানবগণের মায়া নষ্ট করলাম। তারা তখন অদৃশ্য হয়ে আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করতে লাগলো, আমরা যেখানে ছিলাম সেই স্থান গুহার মতো হয়ে গেল। তখন মাতলির উপদেশে আমি দেবরাজের দেওয়া ভীষণ বজ্র অস্ত্র নিক্ষেপ করলাম। তার ফলে পর্বতের মত বিশালকায় নিবাতকবচগণের মৃতদেহে যুদ্ধস্থান ভরে গেল আর দানবদের রমণীগণ উচ্চস্বরে কঁদতে কাঁদতে তাদের ঘরের মধ্যে আশ্রয় নিলো। আমি মাতলিকে জিজ্ঞাসা করলাম, দানবদের এই নগর দেবলোকের চেয়েও সুন্দর, দেবতারা এখানে বাস করেন না কেন? মাতলি বললেন, এই নগর পূর্বে দেবরাজেরই ছিল, নিবাতকবচগণ ব্রহ্মার বরের প্রভাবে এই স্থান অধিকার করে দেবতাদের তাড়িয়ে দেয়। ইন্দ্রের অভিযোগে ব্রহ্মা বলেছিলেন, বাসব, তুমি অন্য ব্যক্তির দ্বারা এদের সংহার করবে। এই কারণেই ইন্দ্র তোমাকে অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছেন।
নিবাতকবচ দানবগণকে বিনাশ কোরে যখন আমি দেবলোকে ফিরছিলাম তখন আর একটি উজ্জ্বল আশ্চর্য নগর আমি দেখতে পেলাম। মাতলি বললেন, পুলোমা নামে এক দৈত্যনারী এবং কালকা নামে এক মহাসুরী কয়েক হাজার বছর তপস্যা কোরে ব্রহ্মার নিকট বর পায় যে, তাদের পৌলোম ও কালকেয় নামক পুত্রগণ দেবতা, রাক্ষস ও নাগের অবধ্য হবে এবং তারা ব্রহ্মার নির্মিত আকাশে অবস্থিত হিরণ্যপুর নামক এই প্রভাময় রমণীয় নগরে বাস করবে। পার্থ, তুমি এই ইন্দ্ৰশত্রু অসুরগণকে বিনষ্ট করো।
মাতলি আমাকে হিরণ্যপুরে নিয়ে গেলেন। দানবগণ আক্রমণ করলে আমি তাদের শরাঘাতে বধ করতে লাগলাম। তাদের নগর কখনও মাটিতে নামল, কখনও আকাশে উঠল, কখনও জলের মধ্যে ডুবে গেল। তার পর দানবগণ ষাট হাজার রথে চড়ে আমার দিব্যাস্ত্রসমূহ প্রতিহত করে যুদ্ধ করতে লাগল। আমি ভয় পেয়ে মহাদেবকে প্রণাম করে রৌদ্র নামে সর্বশত্রু-নাশক দিব্য পাশুপত অস্ত্র প্রয়োগে উদ্যত হলাম। তখন এক আশ্চর্য পুরুষ আবির্ভূত হোলো, তার তিনটি মাথা, নয়টি চোখ, ছয়খানি হাত। তার আগুনের মতো উজ্জ্বল কেশরাশি বিশাল নাগ বেষ্টন করে আছে। মহাদেবকে নমস্কার করে আমি সেই ঘোর রৌদ্র অস্ত্র গাণ্ডীবে যোজনা করে নিক্ষেপ করলাম। তৎক্ষণাৎ হাজার হাজার সিংহ, বাঘ, ভল্লুক, সাপ, হাতি প্রভৃতি এবং দেবতা, গন্ধর্ব, পিশাচ, যক্ষ ও নানারূপ অস্ত্রধারী রাক্ষস ও অন্যান্য প্রাণী আবির্ভুত হয়ে দানবগণকে বধ করতে লাগল আর আমিও শরবর্ষণ করে মুহূর্তমধ্যে সমস্ত দানব সংহার করলাম।
আমি দেবলোকে ফিরে গেলে মাতলির মুখে সমস্ত শুনে দেবরাজ আমার বহু প্রশংসা কোরে বললেন, পুত্র, তুমি যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, শকুনি ও তাদের সহায়ক রাজারা সকলে মিলে তোমার ষোল ভাগের এক ভাগেরও সমান হবেন না। তার পর তিনি আমাকে এই দেহরক্ষাকারী অভেদ্য কবচ, সোনার মালা, দেবদত্ত নামক শঙ্খ, দিব্য মুকুট এবং এই সকল দিব্য বস্ত্র ও আভরণ দান করলেন। আমি পাঁচ বৎসর দেবলোকে বাস করে ইন্দ্রের অনুমতিক্রমে এখন এই গন্ধমাদন পর্বতে আপনাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছি।
অর্জুনের নিকট সকল বৃত্তান্ত শুনে যুধিষ্ঠির অতিশয় আনন্দিত হলেন। পরদিন তাঁর অনুরোধে অর্জুন দিব্যাস্ত্র সমূহের প্রয়োগ দেখাবার উপক্রম করলে নদী ও সমুদ্র উত্তাল হোলো, পর্বত বিদীর্ণ হয়ে গেলো এবং বায়ুপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেল, সূর্যোদয় হোলো না, ব্রাহ্মণগণ বেদ স্মরণ করতে পারলেন না। তখন নারদ এসে অজুনকে বললেন, দিব্যাস্ত্র বৃথা প্রয়োগ করো না, তাতে মহাদোষ হয় আর যুধিষ্ঠিরকে বললেন, অর্জুন যখন শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন তখন তুমি এইসব অস্ত্রের প্রয়োগ দেখবে।
______________
(ক্রমশ)