Story of Mahabharat Part 52 in Bengali Spiritual Stories by Ashoke Ghosh books and stories PDF | মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 52

Featured Books
Categories
Share

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 52

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-৫২

মহর্ষি লোমশ বর্ণিত ভরদ্বাজ, যবক্রীত, রৈভ্য, অর্বাবসু ও পরাবসুর কাহিনি

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

মহর্ষি লোমশ বর্ণিত ভরদ্বাজ, যবক্রীত, রৈভ্য, অর্বাবসু ও পরাবসুর কাহিনি

রাজা জনকের সভায় অষ্টাবক্র দ্বারা বরুণপুত্র বন্দীকে শাস্ত্র সম্পর্কে তর্কে পরাজিত করার কাহিনি শুনিয়ে লোমশ বললেন, যুধিষ্ঠির, এই সেই সমঙ্গা বা মধুবিলা নদী। বৃত্রাসুরকে বধ করার পর ইন্দ্র এই নদীতে স্নান করে সর্ব পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। এই দেখ ঋষিগণের প্রিয় কনখল পর্বত, মহানদী গঙ্গা। ওই দেখ রৈভ্যাশ্রম, যেখানে ভরদ্বাজপুত্র যবক্রীত বিনষ্ট হয়েছিলেন। সেই কাহিনি শোন -

ভরদ্বাজ তার বন্ধু রৈভ্যের নিকটেই বাস করতেন। রৈভ্য এবং তাঁর দুই পুত্র অর্বাবসু ও পরাবসু বিদ্বান ছিলেন আর ভরদ্বাজ শুধুমাত্র তপস্বী ছিলেন। ব্রাহ্মণগণ ভরদ্বাজকে সম্মান করেন না কিন্তু রৈভ্য ও তার দুই পুত্রকে সম্মান করেন দেখে ভরদ্বাজপুত্র যবক্রীত কঠোর তপস্যায় নিরত হলেন। দেবরাজ ইন্দ্র উদ্বিগ্ন হয়ে তার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তপস্যা করছো? যবক্রীত বললেন, দেবরাজ, গুরুর কাছ থেকে বহু সময় লাগে বেদবিদ্যা লাভ করতে। অধ্যয়ন না করেই যাতে বেদজ্ঞ হওয়া যায়, সেই কামনায় আমি তপস্যা করছি। ইন্দ্র বলেলন, তুমি কুপথে যাচ্ছ, ফিরে গিয়ে গুরুর নিকট বেদবিদ্যা শেখো। যবক্রীত তথাপি তপস্যা করতে লাগলেন। দেবরাজ ইন্দ্র আবার এসে তাকে নিরস্ত হোতে বললেন কিন্তু যবক্রীত শুনলেন না। তখন ইন্দ্র এক বৃদ্ধ দুর্বল যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত ব্রাহ্মণের রূপে গঙ্গাতীরে এসে বার বার মুঠো ভরে নদীর জলে বালি ফেলতে লাগলেন। যবক্রীত তাকে প্রশ্ন করলেন ব্রাহ্মণ, একি করছেন? ইন্দ্র বললেন, বৎস, আমি গঙ্গায় সেতু বাঁধছি, লোকে যাতে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারে। যবক্রীত বললেন, তপস্বী, এই অসাধ্য কার্যের চেষ্টা করবেন না। ইন্দ্র বললেন, তুমি যেমন বেদজ্ঞ হবার আশায় তপস্যা করছো আমিও সেইরূপ বৃথা চেষ্টা করছি। যবক্রীত বললেন, দেবরাজ, যদি আমার তপস্যা নিরর্থক মনে করেন তবে বর দিন যেন আমি বিদ্বান হই। ইন্দ্র বর দিলেন — তোমরা পিতা ও পুত্র দুজনেই বেদজ্ঞান লাভ করবে।

যবক্রীত পিতার কাছে এসে বরলাভের বিষয় জানালেন। ভরদ্বাজ বললেন, বৎস, অভীষ্ট বর পেয়ে তোমার অহঙ্কার হবে, মন সংকীর্ণ হবে, তার ফলে তুমি বিনষ্ট হবে। মহর্ষি রৈভ্য অত্যন্ত রাগী, তিনি যেন তোমার কোনো অনিষ্ট না করেন। যবক্রীত বললেন, আপনি ভয় পাবেন না, রৈভ্য আপনার তুল্যই আমার মান্য। পিতাকে এইরূপে সান্ত্বনা দিয়ে যবক্রীত মহানন্দে অন্যান্য ঋষিদের অনিষ্ট করতে লাগলেন।

একদিন বৈশাখ মাসে যবক্রীত রৈভ্যের আশ্রমে গিয়ে কিন্নরীর ন্যায় রূপবতী পরাবসুর পত্নীকে দেখতে পেলেন। যবক্রীত নির্লজ্জ হয়ে তাকে বললেন, আমাকে আলিঙ্গন করো। পরাবসুর পত্নী ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলেন। রৈভ্য আশ্রমে এসে দেখলেন তার কনিষ্ঠ পুত্রবধূ কাঁদছেন। যবক্ৰীতের আচরণ শুনে রৈভ্য অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তার মাথা থেকে দুটি জটা ছিঁড়ে আগুনে নিক্ষেপ করলেন, তা থেকে পরাবসুর পত্নীর মতো রূপবতী এক নারী এবং এক ভয়ংকর রাক্ষস উৎপন্ন হোলো। রৈভ্য তাদের আজ্ঞা দিলেন, যবক্রীতকে বধ করো। তখন সেই নারী যবক্ৰীতের কাছে গিয়ে তাঁকে মোহিত কোরে তার কমণ্ডলু হরণ করলো। যবক্ৰীতের মুখে তখন উচ্ছিষ্ট ছিল। রাক্ষস শূল উদ্যত করে তার দিকে ধাবিত হোলো। যবক্রীত তার পিতার কাছে আশ্রয় নিতে গেলেন, কিন্তু সেখানকার দ্বাররক্ষী এক অন্ধ শূদ্র তাকে সবলে ধরে রাখলে, সেই রাক্ষস শূলের আঘাতে যবক্রীতকে বধ করলো।

পুত্রের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ভরদ্বাজ বিলাপ করতে লাগলেন - পুত্র, তুমি ব্রাহ্মণদের জন্য তপস্যা করেছিলে যাতে তারা অধ্যয়ন না করেই বেদজ্ঞ হোতে পারেন। ব্রাহ্মণের হিতার্থী ও নিরপরাধ হয়েও কেন তুমি বিনষ্ট হলে? আমার নিষেধ সত্ত্বেও কেন রৈভ্যের আশ্রমে গিয়েছিলে? আমি বৃদ্ধ, তুমি আমার একমাত্র পুত্র, তথাপি দুর্মতি রৈভ্য আমাকে পুত্রহীন করলেন। রৈভ্যও শীঘ্র তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র কর্তৃক নিহত হবেন। এইরূপ অভিশাপ দিয়ে ভরদ্বাজ পুত্রের সৎকার করে নিজেও আগুনে প্রাণ বিসর্জন দিলেন।

এই সময়ে রাজা বৃহদ্যুম্ন এক যজ্ঞ করছিলেন। সাহায্যের জন্য রৈভ্যের দুই পুত্র সেখানে গিয়েছিলেন, আশ্রমে কেবল রৈভ্য ও তার পুত্রবধূ ছিলেন। একদিন পরাবসু যখন আশ্রমে ফিরে আসছিলেন, তিনি শেষরাত্রে বনের মধ্যে মৃগচর্ম পরিহিত পিতাকে দেখে হরিণ মনে করে তাকে বধ করলেন। তারপর ভুল বুঝতে পেরে পিতার অন্তিম সংস্কার কোরে পরাবসু যজ্ঞস্থানে ফিরে গিয়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা অর্বাবসুকে বললেন, আমি হরিণ মনে কোরে পিতাকে বধ করেছি। আপনি আশ্রমে ফিরে গিয়ে আমার হয়ে পিতৃহত্যার প্রায়শ্চিত্ত করুন, আমি একাকীই এই যজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারবো। অর্বাবসু সম্মত হয়ে আশ্রমে গেলেন এবং প্রায়শ্চিত্তের পর যজ্ঞস্থানে ফিরে এলেন। তখন পরাবসু খুশি হয়ে অর্বাবাসুকে দেখিয়ে রাজা বৃহদদ্যুম্নকে বললেন, এই পিতৃহত্যাকারী যেন আপনার যজ্ঞ না দেখে ফেলে, তা হোলে আপনার অনিষ্ট হবে। রাজা অর্বাবসুকে তাড়িয়ে দেবার জন্য ভৃত্যদের আজ্ঞা দিলেন। অর্বাবসু বার বার বললেন, আমার এই ভ্রাতাই পিতৃহত্যা করেছে, আমি তাকে সেই পাপ থেকে মুক্ত করেছি। তার কথায় কেউ বিশ্বাস করলো না দেখে অর্বাবসু বনে গিয়ে সূর্যের আরাধনায় রত হলেন। সূর্য ও অন্যান্য দেবগণ প্রীত হয়ে অর্বাবসুকে সংবর্ধনা জানালেন এবং পরাবসুকে প্রত্যাখ্যান করলেন। অর্বাবসুর প্রার্থনায় দেবগণ বর দিলেন, তার ফলে রৈভ্য, ভরদ্বাজ ও যবক্রীত পুনর্জীবিত হলেন, পরাবসুর পাপ দূর হোলো, রৈভ্য বিস্মৃত হলেন যে পরাবসু তাঁকে হত্যা করেছিলেন এবং সূর্যমন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হল।

জীবিত হয়ে যবক্রীত দেবগণকে বললেন, আমি বেদজ্ঞ তপস্বী ছিলাম তথাপি রৈভ্য আমাকে কি করে বধ করতে পারলেন? দেবতারা বললেন, তুমি গুরুর সাহায্য না নিয়ে কেবল তপস্যার দ্বারা বেদজ্ঞান লাভ করেছিলে আর রৈভ অতি কষ্টে গুরুদের তুষ্ট করে দীর্ঘকালে বেদ অধ্যয়ন কোরে বেদজ্ঞান লাভ করেছিলেন, সেজন্য তাঁর জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ।

______________

(ক্রমশ)