Light after darkness in Bengali Anything by Sohagi Baski books and stories PDF | অন্ধকারের পর আলো

Featured Books
Categories
Share

অন্ধকারের পর আলো

হেরে যাওয়া যদি সত্যিই উৎসবের মতো হতো, তবে পৃথিবীটা হয়তো একেবারেই অন্যরকম হতো। মানুষ তখন পরাজয়কে লুকিয়ে রাখত না, বরং আলো জ্বালিয়ে, হাসিমুখে তাকে বরণ করে নিত। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সহজ নয়। হার মানে শুধু একটা ফলাফল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অগণিত আশা, স্বপ্ন আর নীরব কষ্ট।
একটা ছোট্ট ঘরে বসে ছিল রিয়াদ। জানালার পাশে টেবিলে রাখা ছিল কিছু বই, আর তার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অনেকগুলো অসমাপ্ত নোট। আজ সে আবারও ব্যর্থ হয়েছে। অনেকদিন ধরে যে স্বপ্নটা সে বুকে লালন করছিল, আজ সেটাই যেন তার হাতছাড়া হয়ে গেছে। বাইরে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল, আর ঘরের ভেতরে নেমে আসছিল অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা।
রিয়াদ জানালার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—যদি সত্যিই হেরে যাওয়া উৎসবের মতো হতো! যদি মানুষ ব্যর্থতাকে নিয়েও আনন্দ করতে পারত! তাহলে হয়তো এই কষ্টটা এত গভীর লাগত না। তখন হয়তো সবাই বলত, “আজ আমি হেরেছি, কিন্তু এই হারটাই আমাকে আগামীকালের জয়ের পথ দেখাবে।”
কিন্তু মানুষ তো এমন নয়। মানুষ জিততে ভালোবাসে। জয়ের গল্প শুনতে ভালোবাসে। আর সেই কারণেই পরাজয়ের গল্পগুলো বেশিরভাগ সময়ই নিঃশব্দে হারিয়ে যায়।
তবুও জীবনের এক অদ্ভুত নিয়ম আছে। অনেক সময় যে মানুষটা বারবার হেরে যায়, সেও একদিন এমনভাবে জিতে যায় যে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কারণ হার মানে শেষ নয়; অনেক সময় সেটাই নতুন শুরুর দরজা।
রিয়াদ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাগজগুলো গুছিয়ে নিল। তার চোখে তখন আর আগের মতো হতাশা ছিল না। বরং এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা ছিল।
সে বুঝতে পারল, হারটা যতই কষ্টের হোক, এটাও জীবনেরই একটা অংশ। যদি হেরে যাওয়া সত্যিই উৎসবের মতো হতো, তবে হয়তো জয়ের আনন্দটা এত বড় লাগত না। কারণ অন্ধকার না থাকলে আলোকে কখনোই এত উজ্জ্বল মনে হয় না।
জীবনের পথটা ঠিক এমনই। এখানে কখনো আনন্দ আসে, কখনো আসে দুঃখ। কখনো স্বপ্ন পূরণ হয়, আবার কখনো স্বপ্ন ভেঙেও যায়। কিন্তু মানুষ বেঁচে থাকে এই বিশ্বাস নিয়ে যে, প্রতিটা হার একদিন তাকে নতুন করে জিততে শেখাবে।
রিয়াদ আবার বই খুলে বসলো। বাইরে তখন রাত নেমে এসেছে। আকাশে কয়েকটা তারা জ্বলজ্বল করছে। সেগুলো যেন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল—অন্ধকার যত গভীরই হোক, কোথাও না কোথাও একটু আলো থাকেই।
আর হয়তো সেই ছোট্ট আলোই একদিন বড় হয়ে পুরো আকাশটা ভরে দেয়।




হেরে যাওয়া যদি সত্যিই উৎসবের মতো হতো, তবে পৃথিবীটা হয়তো একেবারেই অন্যরকম হতো।
হার মানে শুধু একটা ফলাফল নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে অনেক স্বপ্ন, আশা আর নীরব কষ্ট।
মানুষ জয়ের গল্প শুনতে ভালোবাসে, তাই পরাজয়ের গল্পগুলো প্রায়ই নিঃশব্দেই হারিয়ে যায়।
হার মানে শেষ নয়, অনেক সময় সেটাই নতুন শুরুর দরজা খুলে দেয়।
অন্ধকার না থাকলে আলোকে কখনোই এত উজ্জ্বল মনে হতো না।
প্রতিটা হার মানুষকে একদিন নতুন করে জিততে শেখায়।
অন্ধকার যত গভীরই হোক, কোথাও না কোথাও একটু আলো ঠিকই জ্বলে।






সেই ছোট্ট আলোই অনেক সময় মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি হয়ে ওঠে। যখন চারপাশের সবকিছু ভেঙে পড়তে থাকে, তখন মানুষ ঠিক সেই ক্ষীণ আলোটাকেই আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। কারণ আশা নামের জিনিসটা খুব অদ্ভুত—এটা খুব ছোট হলেও মানুষের মনকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
জীবনের পথে চলতে চলতে আমরা অনেকবারই হেরে যাই। কখনো স্বপ্ন ভেঙে যায়, কখনো প্রিয় মানুষ দূরে চলে যায়, আবার কখনো নিজের ওপরই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। তখন মনে হয় যেন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সত্যি বলতে, সেই শেষ ভাবাটাই আসলে এক নতুন শুরুর আগমনী বার্তা।
কারণ মানুষ তখনই সবচেয়ে বেশি শক্ত হয়ে ওঠে, যখন সে ভেঙে পড়ার পর আবার উঠে দাঁড়াতে শেখে। হার তাকে শিখিয়ে দেয় ধৈর্য, শিখিয়ে দেয় নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনতে। আর সেই শিক্ষা অনেক সময় জয়ের থেকেও বড় হয়ে যায়।
একদিন যে মানুষটা বারবার হেরে গিয়েছিল, একদিন তাকেই দেখা যায় অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়াতে। কারণ সে জানে অন্ধকারের স্বাদ কেমন, সে জানে ভেঙে পড়ার অনুভূতি কেমন। তাই যখন সে আবার আলো দেখতে পায়, তখন সেই আলোকে সে আগের চেয়ে অনেক বেশি মূল্য দেয়।
জীবন আসলে নদীর মতো। কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল। কখনো পথ সহজ মনে হয়, আবার কখনো পথটাই হারিয়ে যায়। কিন্তু নদী যেমন থেমে থাকে না, তেমনি মানুষকেও থেমে থাকলে চলে না।
হয়তো আজকের দিনটা কঠিন, হয়তো আজকের স্বপ্নটা ভেঙে গেছে। তবুও আগামীকাল আবার সূর্য উঠবে, আবার নতুন একটা সকাল শুরু হবে। আর সেই সকালটাই হয়তো নতুন কোনো গল্পের শুরু।
মানুষ বেঁচে থাকে ঠিক এই বিশ্বাস নিয়েই—আজ না পারলেও একদিন সে পারবেই। আজ না জিতলেও একদিন তার গল্পটা জয়ের গল্প হয়ে উঠবে।
আর তখন হয়তো সে ফিরে তাকিয়ে হাসবে, ভাববে—সেদিনের সেই হারগুলো না থাকলে আজকের এই আলোটা কখনোই এত সুন্দর লাগত না। কারণ জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো অনেক সময় জন্ম নেয় গভীর অন্ধকারের ভেতর থেকেই।


আর সেই কারণেই মানুষ কখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না। যত কষ্টই আসুক, যতবারই স্বপ্ন ভাঙুক, মানুষের ভেতরে কোথাও না কোথাও একটা জেদ থেকে যায়—আবার শুরু করার জেদ।
কিছু কিছু রাত খুব দীর্ঘ হয়। মনে হয় যেন এই অন্ধকার আর শেষ হবে না। চারপাশে নীরবতা, মনে অজস্র প্রশ্ন, আর হৃদয়ের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা। তখন মানুষ নিজের সাথেই কথা বলে, নিজের ভাঙা স্বপ্নগুলোকে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে।
অনেকেই তখন থেমে যায়। কিন্তু কেউ কেউ আছে, যারা থামে না। তারা ধীরে ধীরে আবার হাঁটতে শুরু করে। প্রথমে হয়তো পা কাঁপে, পথটা কঠিন লাগে, তবুও তারা এগিয়ে যায়। কারণ তারা জানে—থেমে থাকলে গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে।
জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, এটা কখনো একই রকম থাকে না। আজ যে মানুষটা কাঁদছে, কাল সেই মানুষটাই হয়তো হাসবে। আজ যে পথটা অন্ধকার মনে হচ্ছে, কাল সেই পথেই হয়তো আলো জ্বলে উঠবে।
সময় খুব অদ্ভুত এক শিক্ষক। সে কাউকে কিছু না বলেই অনেক বড় বড় শিক্ষা দিয়ে যায়। হারানোর মধ্য দিয়ে সে মানুষকে বুঝিয়ে দেয় কোনটা সত্যি, কোনটা মিথ্যা। কষ্টের মধ্য দিয়ে সে মানুষকে শক্ত হতে শেখায়।
তাই হয়তো জীবনের প্রতিটা হার এক একটা গল্প। সেই গল্পের কিছু পৃষ্ঠা ভেজা থাকে অশ্রুতে, কিছু পৃষ্ঠা ভরা থাকে দীর্ঘ অপেক্ষায়। কিন্তু শেষের দিকে কোথাও না কোথাও একটু আলো জ্বলেই ওঠে।
যে মানুষটা ধৈর্য ধরে সেই গল্পটা শেষ পর্যন্ত পড়তে পারে, সে-ই একদিন বুঝতে পারে—সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। অনেক সময় সবচেয়ে ভাঙা মুহূর্ত থেকেই সবচেয়ে সুন্দর শুরুটা জন্ম নেয়।
আর তখন মানুষ উপলব্ধি করে, হারগুলো তাকে থামানোর জন্য আসেনি। বরং তাকে আরও শক্ত করে গড়ে তোলার জন্যই এসেছিল।
জীবন তখন নতুন করে অর্থ খুঁজে পায়। ছোট ছোট আনন্দগুলো আবার মূল্যবান মনে হয়। আকাশের তারা, ভোরের আলো, কিংবা কারও একটি হাসি—সবকিছুই যেন নতুন করে সুন্দর লাগে।
কারণ যে মানুষটা অন্ধকার দেখেছে, সে-ই আসলে আলোকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে শেখে। আর সেই ভালোবাসাই তাকে আবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেয়।
শেষ পর্যন্ত জীবন ঠিক একটা গল্পের মতোই—যেখানে প্রতিটা হার, প্রতিটা কষ্ট, প্রতিটা অপেক্ষা মিলে একদিন এমন একটা অধ্যায় তৈরি করে, যেটা পড়ে মানুষ বুঝতে পারে—সবকিছুই বৃথা ছিল না। সবকিছুই দরকার ছিল, আজকের এই আলো পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য।
>সমাপ্তি <