রাতটা ঢাকার জন্য খুব বেশি নীরব ছিল—এই নীরবতাই বিপদের লক্ষণ।
পুরান ঢাকার সরু গলির শেষ মাথায় একটা পুরোনো চারতলা দালান। উপরের ছাদে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ—নাম আবির চৌধুরী। শহরের মানুষ তাকে এক নামে চেনে না। কেউ বলে গ্যাংস্টার, কেউ বলে দানব, কেউ আবার ফিসফিস করে বলে—
“ওই লোকটার চোখে ভয় নেই।”
আবিরের হাতে একটা সিগারেট, কিন্তু সে টানছে না। আগুনটা জ্বলছে, ঠিক যেমন তার চোখের ভেতরে জ্বলে আছে পুরোনো রাগ, পুরোনো ক্ষত। নিচে একটা কালো প্রাডো গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়ির ভেতরে তিনজন লোক—সবাই তার অপেক্ষায়।
আজ রাতেই একটা রক্ত ঝরার কথা।
হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এলো একটা শব্দ—জুঁই ফুলের গন্ধ।আবির ভ্রু কুঁচকে তাকাল। এই গলিতে জুঁই ফুলের গাছ থাকার কথা না। তবুও গন্ধটা পরিষ্কার।সে ঘুরে দাঁড়াল।
ছাদের সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।
মেয়েটার নাম নীলা—তখনও আবির জানে না। সে শুধু দেখে, মেয়েটা খুব সাধারণ। সাদা সালোয়ার-কামিজ, কোনো মেকআপ নেই, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাতে একটা পুরোনো বই—মলাটে লেখা: “মানুষ হওয়ার সহজ পথ”।
এই মেয়েটা এখানে থাকার কথা না।এবং সবচেয়েভয়ংকর বিষয়—মেয়েটার চোখে ভয় নেই।
“আপনি এখানে ধূমপান করতে পারবেন না,” নীলা শান্তগলায় বলল,“হাসপাতালের ছাদ এটা।”আবির প্রথমে হেসে ফেলল। তার হাসি বহু মানুষের শেষ দেখা হাসি।“তুমি জানো তুমি কাকে বলছ?”তার কণ্ঠস্বর ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে বজ্রপাত।
নীলা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“জানি না। জানার দরকারও নেই। আপনি মানুষ—এটাই যথেষ্ট।”
এই একটা বাক্য।এই শহরে শেষ কবে কেউ আবির চৌধুরীকে ‘মানুষ’ বলে ডেকেছে, সে নিজেও মনে করতে পারে না।নিচে হঠাৎ গুলির শব্দ।একটা কাজ শুরু হয়ে গেছে।আবিরের লোকেরা অস্থির। ফোন বেজে উঠছে। সময় শেষ।কিন্তু আবিরের চোখ আটকে আছে নীলার চোখে।
“নাম কী তোমার?”
সে অজান্তেই জিজ্ঞেস করে ফেলে।
“নীলা,”
মেয়েটা বলে,
“আর আপনি যদি কাউকে মারতে যাচ্ছেন—তাহলে দয়া করে এখান থেকে যান। এই হাসপাতালে বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে।”
আবির চুপ করে থাকে।এই প্রথম কেউ তাকে মারতে না বলেছে, ভয় পায়নি, শুধু অনুরোধ করেছে।
সে সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আগুন নিভে যায়।
নিচে আরেকটা গুলির শব্দ।
এবার আবির ফোন তোলে।
“কাজ বন্ধ,”সে শুধু এতটুকু বলে।ফোনের ওপাশে স্তব্ধতা।আবির ধীরে ধীরে নীলার পাশ দিয়ে হাঁটে। যাওয়ার আগে থামে, বলে—“এই শহরে ভালো মানুষ বেশিদিন বাঁচে না।”নীলা হালকা হেসে উত্তর দেয়,
“তবু কেউ না কেউ তো ভালো থাকতেই হবে।”
আবির চৌধুরী সেদিন জানত না—
এই শান্ত মেয়েটাই একদিন তার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হবে।
গুলির সঙ্গে না, শত্রুর সঙ্গে না—
নিজের সঙ্গে।ছাদে শুধু রয়ে যায় জুঁই ফুলের গন্ধ।
আবির চৌধুরী সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বুঝতে পারছিল—আজ রাতটা অন্যরকম হয়ে গেছে।
গুলির শব্দ, রক্ত, আদেশ—সবই তার চেনা।
কিন্তু ওই মেয়েটার চোখ…ওই চোখে কোনো হিসাব ছিল না, কোনো লোভ না,কোনো ভয় না।
নীচে পৌঁছাতেই তার ডানহাত, রাশেদ, ছুটে এলো।
“ভাই, আপনি কাজ বন্ধ করলেন কেন?”
গলা কাঁপছে। কারণ আবির কখনো কাজ বন্ধ করে না।
আবির কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
“এই হাসপাতালের এলাকায় আজ কেউ মরবে না।”
“কিন্তু টার্গেট—”
আবির তাকায়।
শুধু তাকায়।
রাশেদের বাকিটুকু গিলে যায়।
গাড়ি চলতে শুরু করে। ঢাকার আলো জানালার কাঁচে ভেঙে ভেঙে পড়ছে। শহরটা যেন সবসময় পালিয়ে বেড়াচ্ছে নিজের পাপ থেকে।
আবির চোখ বন্ধ করে হেলান দেয়।
হঠাৎই নীলার কণ্ঠটা আবার কানে বাজে—
“আপনি মানুষ—এটাই যথেষ্ট।”সে হেসে ফেলে।তিক্ত হাসি।“মানুষ?”
সে ফিসফিস করে বলে।
একই সময়, ছাদের ওপরে—
নীলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। রাতের বাতাসে সাদা ওড়নাটা নড়ে। সে জানে না সে কাকে কথা বলেছে। জানলে হয়তো বলত না।কিন্তু ভয়টা আসে দেরিতে।
তার বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়।হাত কাঁপে।
“আমি কি ঠিক করেছি?”
নিজেকে জিজ্ঞেস করে সে।
হাসপাতালের ভেতর থেকে একটা বাচ্চার কান্না ভেসে আসে। নীলা গভীর শ্বাস নেয়।
সে জানে—এই কান্নার জন্যই সে ভয়কে পাত্তা দেয় না।
নীলা ধীরে ধীরে বইটা বুকে চেপে ধরে।
বইয়ের ভেতরে একটা শুকনো জুঁই ফুল রাখা।
মায়ের দেওয়া।
নীলা জানে না—আজ রাতে সে শুধু একজন গ্যাংস্টারের সঙ্গে কথা বলেনি।
সে একটা ঝড়ের চোখের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
****পরের দিন।
ঢাকা ঘুম থেকে উঠছে।কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ড জেগে আছে।আবির চৌধুরী তার অফিসে বসে। কাচের দেয়াল, শহর দেখা যায়। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে ফাইল, অস্ত্র নয়—আজ সে ফাইল দেখছে।
“এই মেয়েটার খোঁজ লাগাও,”
সে রাশেদকে একটা কাগজ এগিয়ে দেয়।
কাগজে শুধু লেখা—
নীলা হাসপাতাল চোখে ভয় নেই রাশেদ অবাক হয়।
“ভাই… এইটা কি নতুন টার্গেট?”আবির মাথা নাড়ে।“না। এটা… প্রশ্ন।”
রাশেদ বুঝতে পারে না। কেউই বুঝতে পারে না।
সন্ধ্যায় নীলা বাসে চড়ে বাড়ি ফিরছে। জানালার পাশে বসে। বাইরে শহরের কোলাহল। হঠাৎ বাসটা ধীরে হয়ে যায়।একটা কালো গাড়ি পাশে এসে থামে।
নীলার বুকটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে।গাড়ির জানালা নামানো হয়।ভেতরে সেই মানুষটা।
আবির চৌধুরী।
তার চোখে আজও সেই ঠান্ডা আগুন।কিন্তু গলায় আদেশ নেই।
“ভয় পাচ্ছ?”
সে জিজ্ঞেস করে।
নীলা এক সেকেন্ড চুপ থাকে। তারপর মাথা নাড়ে।
“না। শুধু অবাক লাগছে,”সে বলে,
“আপনি তো চলে গিয়েছিলেন।”
আবির হালকা হেসে বলে,
“কিছু মানুষ একবার দেখা দিলে… চলে যায় না।”
বাসের মানুষ তাকিয়ে আছে। শহর তাকিয়ে আছে।
নীলা জানে না—এই মুহূর্ত থেকেই তার জীবনের সহজ, সোজা রেখাটা ভেঙে গেছে।এখন সামনে শুধু বাঁক অন্ধকার বাঁক।
আর আবির চৌধুরী জানে—এই শান্ত মেয়েটাকে ছুঁলে,
তার নিজের হাতই প্রথম পুড়বে।বাসটা ধীরে ধীরে আবার চলতে শুরু করে। লোকজনের কৌতূহলী দৃষ্টি সরে যায়। শহর নিজের কাজে ফিরে যায়, যেন কিছুই হয়নি।
নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা চাপ।
আবির গাড়ির ভেতর বসে জানালাটা তুলে নেয়।
“ফলো কোরো না,” সে ড্রাইভারকে বলে।
গাড়ি অন্যদিকে ঘুরে যায়।
এই প্রথম সে নিজেই নিজের আদেশ ভাঙল।
***রাত।
নীলার ঘর ছোট, কিন্তু পরিপাটি। দেয়ালে কিছু বইয়ের তাক, জানালার পাশে একটা টেবিল। টেবিলের ওপর একটা ছোট ফুলদানিতে দুটো জুঁই ফুল।
সে পড়তে বসে, কিন্তু চোখ বইয়ে নেই।
বারবার মনে পড়ে সেই প্রশ্ন—
“ভয় পাচ্ছ?”
সে নিজেকেই উত্তর দেয়,
“না। কিন্তু কিছু একটা শুরু হয়েছে।”
নীলা জানে, জীবনে কিছু শুরু হলে তার একটা দাম থাকে।
অন্যদিকে, আবিরের রাত শুরু হয় অন্যভাবে।
একটা গুদামঘর। লোহার দরজা বন্ধ। ভেতরে একজন লোক বাঁধা অবস্থায় বসে আছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়মে রাতটা শেষ হওয়ার কথা ছিল চিৎকারে।
আবির ঢুকে দাঁড়ায়।
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বলে,
“ভাই… ভুল হয়ে গেছে।”
আবির চুপ করে থাকে। তার চোখে কোনো তাড়া নেই।
হঠাৎ সে বলে,
“তুমি জানো, আজ আমি কাউকে মারিনি?”
লোকটা অবাক হয়।
“এই শহরে এটা বিপজ্জনক,”
আবির ধীরে বলে,
“মানুষ ভাবতে শুরু করে আমি নরম হয়ে গেছি।”
সে রাশেদের দিকে তাকায়।
“ওকে ছেড়ে দাও।”
রাশেদের চোখ বড় হয়ে যায়।
“ভাই—”
“বললাম ছেড়ে দাও।”
দরজা খোলে। লোকটা কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যায়।
রাশেদ চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর বলে,
“একটা মেয়ে, তাই না?”
আবির কোনো উত্তর দেয় না।
পরের দিন।
নীলা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে কাজ করছে। বাচ্চাদের গল্প শোনাচ্ছে। তার কণ্ঠ নরম, স্থির।
হঠাৎ একজন নার্স এসে ফিসফিস করে বলে,
“নীলা, বাইরে একজন লোক আপনাকে খুঁজছে।”
নীলার বুকটা হঠাৎ ধক করে ওঠে।
“কে?”
“বলেনি। শুধু বলেছে—আপনি মানুষ বলেছিলেন।”
নীলা স্থির হয়ে যায়।
হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবে—
কিছু মানুষ দরজায় এলে, দরজা বন্ধ করলেও শব্দ থেকে যায়।
বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আবির চৌধুরী।
আজ তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। সাদা শার্ট, কালো জ্যাকেট। শহরের হাজার মানুষের মতোই দেখায়।
“আমি কথা বলতে এসেছি,”
সে বলে,
“ভয় দেখাতে না।”
নীলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,
“কথা বলতে হলে ভেতরে আসুন। এখানে মানুষ অসুস্থ।”এই প্রথম কেউ তাকে নিয়ম শিখাচ্ছে।আবির ভেতরে ঢোকে।
করিডোরের দেয়ালে শিশুদের আঁকা ছবি। রঙিন সূর্য, ভাঙা ঘর, বড় হাসি।আবির থেমে যায়।সে খুব ধীরে বলে,
“তুমি জানো, আমি এই জায়গাগুলো এড়িয়ে চলি।”
নীলা জিজ্ঞেস করে,
“কেন?”
আবির উত্তর দেয় না।
কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে, আগে মানুষ হতে হয়।
ওই মুহূর্তে নীলার ফোন বেজে ওঠে।একটা অচেনা নম্বর।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠ—“নীলা রহমান? আপনি যদি আজ রাত দশটার মধ্যে আমাদের সঙ্গে দেখা না করেন…ওই লোকটা বাঁচবে না।”লাইন কেটে যায়।নীলার হাত কেঁপে ওঠে।আবির তার মুখের রঙ বদলাতে দেখে।
“কি হয়েছে?”
নীলা ধীরে ফোনটা নামায়।
তার কণ্ঠ আগের মতো শান্ত, কিন্তু চোখে এবার ঝড়।
“আপনার শত্রুরা আমাকে চিনে ফেলেছে,”
সে বলে,
“এখন বলুন—আমি ভয় পাবো, না আপনার মতো দাঁড়াবো?”
আবির চৌধুরী প্রথমবার বুঝতে পারে—
যুদ্ধটা আর একতরফা না।
এবার খেলায় নীলা।হাসপাতালের করিডোরে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নামে। দূরে কোথাও একটা মনিটরের বিপ শব্দ, কারও চাপা কাশি—জীবন চলতে থাকে, অথচ নীলার ভেতরে সবকিছু থমকে গেছে।
“ওরা কারা?”আবিরের কণ্ঠ এবার আগের মতো ঠান্ডা না। ভেতরে চাপা রাগ।নীলা মাথা নাড়ে।
“জানি না। কিন্তু জানে—আমি আপনার সঙ্গে কথা বলেছি।”
আবির ধীরে চোখ বন্ধ করে।একটা ভুল।
তার জীবনে ভুলের দাম মানুষ দিয়েছে—আজ দিতেপারে এই মেয়েটা।
“আজ রাতেই তুমি কোথাও যাবে না,”
সে বলে।
এটা অনুরোধ না, আদেশও না—একটা সিদ্ধান্ত।
নীলা তাকিয়ে থাকে।
“আমি লুকাবো না,” সে শান্ত গলায় বলে,
“কারণ আমি কিছু করিনি।”
এই কথাটা আবিরের বুকের ভেতরে কোথাও আঘাত করে।
এই শহরে নির্দোষ থাকা সবচেয়ে বড় অপরাধ।
“তাহলে আমি থাকবো,”আবির বলে,
“ছায়ার মতো।”
রাত নেমে আসে।
হাসপাতালের পেছনের গেটের কাছে অন্ধকার জমে। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলছে, কিন্তু আলো সাহসী না। দুটো বাইক থামে। হেলমেট পরা লোকেরা চারপাশ দেখে।
ওরা জানে—আজ শিকার সহজ।
হঠাৎ ছাদের ওপর থেকে একটা শব্দ।
একটা ছায়া নড়ে।
প্রথম লোকটা কিছু বোঝার আগেই মাটিতে পড়ে যায়। নিঃশব্দে। দ্বিতীয়জন পেছনে ঘুরতেই দেখে—আবির চৌধুরীর চোখ।
“কার পাঠানো?”
শান্ত প্রশ্ন।
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বলে,
“আমরা শুধু বলেছিলাম… মেয়েটাকে ভয় দেখাতে।”
এক সেকেন্ড নীরবতা।
“আমি বলেছিলাম,”আবির ধীরে বলে,
“আজ কেউ মরবে না।”লোকটা বেঁচে যায়।
কিন্তু ভয় নিয়ে।
ভেতরে নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখে না—শুধু অনুভব করে। বাতাস ভারী। যেন অদৃশ্য কিছু পাহারা দিচ্ছে।তার ফোনে একটা মেসেজ আসে।
Unknown Number:
“আজ বাঁচলে, কাল নয়।”
নীলা স্ক্রিনটা নিভিয়ে দেয়।
ভয় তার চোখে আসে না।
আসে দৃঢ়তা।
**পরদিন সকাল।
আবির চলে যাওয়ার সময় নীলাকে বলে,
“এই শহর কাউকে ঋণী রাখে না।”নীলা জবাব দেয়,
“আমি ঋণ চাইনি। শুধু মানুষ দেখেছিলাম।”
আবির থেমে যায়।কিছুক্ষণ পরে বলে,
“মানুষ দেখলে… পিছিয়ে আসা কঠিন।”
সে চলে যায়।
নীলা জানে—এই যাওয়া শেষ না।
দূরে, শহরের অন্য প্রান্তে—একজন লোক খবরটা শোনে।টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকে বলে,
“আবির দুর্বল হচ্ছে।”
সে হাসে।
“দুর্বল জায়গায় আঘাত করো।”ডেস্কের ওপর নীলার ছবি।যুদ্ধ এবার প্রকাশ্যে আসবে না।
এবার হবে নীরবে।একটা শান্ত মেয়েকে কেন্দ্র করে।
আর নীলা, জানে না—সে শুধু আবিরের জীবন বদলাচ্ছে না।
সে এমন এক আগুন জ্বালিয়েছে,যেটা পুরো শহরকেই ছুঁতে পারে।সেই আগুনের প্রথম আঁচ লাগে খুব শান্তভাবে।
পরের তিন দিন কিছুই হয় না।
না ফোন, না হুমকি, না ছায়া।
শহর এমন ভান করে, যেন সব ঠিক আছে।এই ভানটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।নীলা কাজে যায়, ফেরে। বাচ্চাদের গল্প শোনায়। রাতে বই পড়ে।কিন্তু তার ঘুম হালকা হয়ে গেছে।শব্দগুলো আলাদা করে শোনা যায়।আর আবির—সে শহরের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে।একটার পর একটা ঘাঁটি বন্ধ হচ্ছে। অস্ত্র সরানো হচ্ছে। লোক সরানো হচ্ছে।রাশেদ বুঝতে পারে—এটা যুদ্ধের প্রস্তুতি না।এটা ক্ষতি কমানোর চেষ্টা।
“ভাই,”
রাশেদ এক রাতে বলে,
“আপনি যদি পিছু হটেন, ওরা সামনে আসবে।”
আবির জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।শহরের আলোয় চোখে ছায়া পড়ে।
“আমি পিছু হটছি না,”
সে বলে,
“আমি জায়গা বদলাচ্ছি।”
****চতুর্থ দিন।
হাসপাতালের সামনে ভিড়।একটা ছোট দুর্ঘটনা। অ্যাম্বুলেন্স এসেছে।নীলা দৌড়ে বের হয়।
ঠিক তখনই—একটা সাদা ভ্যান ধীরে থামে।
সবকিছু খুব দ্রুত হয়।
একটা হাত।একটা কাপড়।একটা গন্ধ—কেমিক্যাল।নীলার চিৎকার ওঠার আগেই অন্ধকার।চোখ খুললে নীলার মাথা ব্যথা করছে।
চারপাশে কংক্রিটের গন্ধ।
হাত বাঁধা। চোখে কাপড় নেই—ওরা ভয় লুকোতে চায়নি।একজন লোক সামনে এসে দাঁড়ায়।পরিচ্ছন্ন পোশাক, ঠান্ডা হাসি।“আপনি শান্ত মানুষ,।লোকটা বলে,“তাই আপনাকে আমরা বেছে নিয়েছি।”নীলা গলা পরিষ্কার করে।ভয় এখনো নেই।কেবল প্রশ্ন।
“কেন?”
লোকটা হেসে বলে,“কারণ আবির চৌধুরী আপনাকে বাঁচাতে চাইছে।”
একটু থামে।তারপর যোগ করে।“আর যেটা সে চায়—আমরা সেটাই ভাঙতে চাই।”একই সময়।আবির ফোন পায়।একটা ছবি।
নীলা—চোখ খোলা, মুখে রক্ত নেই, কিন্তু হাত বাঁধা।
তারপর একটা লাইন—
“২৪ ঘণ্টা। শহর ছেড়ে চলে যাও। নইলে মেয়েটা থাকবে না।”
রাশেদ শব্দ না করে দাঁড়িয়ে থাকে।ঘরের ভেতর কিছু ভাঙে না।চিৎকার নেই।আবির শুধু বসে পড়ে।
এই প্রথম তার হাতে বন্দুক থেকেও মনে হয়—সে খালি হাতে।রাত গভীর হলে আবির একা বের হয়।কোনো লোক নেয় না।কোনো অস্ত্র না—শুধু একটা ফোন আর একটা পুরোনো চাবি।রাশেদ পেছন থেকে বলে,
“ভাই… এটা ফাঁদ।”আবির মাথা না ঘুরিয়ে বলে,
“হ্যাঁ।”
তারপর যোগ করে,“কিন্তু এবার শিকার আমি না।”
অন্যদিকে, নীলা কংক্রিটের মেঝেতে বসে চোখ বন্ধ করে।
সে জানে—ভেঙে পড়লে ওরা জিতবে।
মায়ের কথা মনে পড়ে।জুঁই ফুলের গন্ধ।
একটা কথা—“শান্ত থাকা মানে দুর্বল হওয়া না।”নীলা চোখ খুলে তাকায়।
চারপাশ নিঃশব্দ।এই নিঃশব্দতাই বলে দেয়—কেউ দেখছে।দূরে একটা বাল্ব ঝুলছে, দুলছে খুব ধীরে। আলো–ছায়া মেঝেতে কাঁপছে।
সময় এখানে সোজা চলে না।এক পায়ের শব্দ।একজন লোক ঢোকে। আগের সেই পরিষ্কার পোশাকের মানুষটা না।
এই লোকটা আলাদা—চুপচাপ, চোখে কৌতূহল।
“তুমি জানো,”
সে খুব আস্তে বলে,
“তুমি ভয় পাও না—এটাই তোমার সমস্যা।”
নীলা মাথা তোলে।
“ভয় দেখাতে হলে সত্যটা দেখাতে হয়,”
সে শান্ত গলায় বলে।
লোকটা হালকা হাসে।
“সত্য?”
একটু থেমে বলে,
“তাহলে দেখো।”
সে দরজার দিকে ইশারা করে।
দরজা খুলে যায়।
ভেতরে কেউ নেই—
শুধু একটা চেয়ার, আর চেয়ারের ওপর রাখা একটা ফোন।
ফোনটা বেজে ওঠে।
নীলার বুক কেঁপে ওঠে।
“ধরো,”
লোকটা বলে,
“তোমার মানুষ ফোনে আছে।”
নীলা ধীরে ফোনটা হাতে নেয়।
স্ক্রিনে একটাই নাম—
Unknown
কানে ধরতেই—
কিছুক্ষণ শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
তারপর—
“নীলা।”
এই এক শব্দ।
এই শহরে কেউ তাকে এভাবে ডাকে না।
“আবির?”
তার গলা কাঁপে না,
কিন্তু চোখে আলো জ্বলে।
“আমি আছি,”
আবির বলে,
“শোনো… ওরা যা বলবে—”
লাইন কেটে যায়।
ফোনটা নিভে যায়।
লোকটা আবার কথা বলে,
“দেখলে? ও চায় তুমি বাঁচো। আর আমরা চাই—
ও সিদ্ধান্ত নিক।”
নীলা ধীরে ফোনটা চেয়ারে রেখে দেয়।
চোখ তুলে তাকায়।
“ও সিদ্ধান্ত নিলে… তোমরা হারবে।”
লোকটার হাসি মিলিয়ে যায়।
একই সময়।
শহরের একেবারে পুরোনো অংশে,
একটা বন্ধ সিনেমা হল।
পর্দা ছেঁড়া, চেয়ার ধুলোয় ঢাকা।
কিন্তু প্রজেক্টর চলছে।
স্ক্রিনে—
লাইভ ভিডিও।
নীলা।
আবির সামনে বসে আছে।একাই।কেউ পাশে নেই।
পেছন থেকে কণ্ঠ আসে,
“শহর ছেড়ে যাও।”
আবির চোখ না সরিয়ে বলে,
“আর যদি না যাই?”
প্রজেক্টরের আলো কেঁপে ওঠে।“তাহলে এই মেয়েটা…আর মানুষ থাকবে না।”আবির প্রথমবার চোখ বন্ধ করে।খুব ছোট একটা সময়ের জন্য।তারপর চোখ খুলে বলে—
“তোমরা একটা ভুল করেছ।”
কণ্ঠটা শান্ত।ভয়ংকরভাবে শান্ত।
“তোমরা ভেবেছ—ও আমার দুর্বলতা।”
একটু থামে।
“ও আমার সীমা।”
পেছনের অন্ধকারে কেউ নড়ে।“আর যারা সীমা ছোঁয়…”আবির ধীরে দাঁড়ায়,“…তারা গল্পে বাঁচে না।”স্ক্রিন হঠাৎ ব্ল্যাক।চারদিকে নিঃশব্দ।কেউ বুঝতে পারে না—এই নিঃশব্দটা শেষের আগে,না শুরুর আগে।
কংক্রিটের ঘরে, নীলা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে।সে জানে না এখন কী হচ্ছে।
কিন্তু জানে—কিছু একটা ভাঙতে যাচ্ছে।দূরে কোথাও একটা ভারী দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
তারপর—
চাবির শব্দ।
এই শব্দটা সিদ্ধান্তের।কিন্তু কেউ ঢোকে না।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
তারপর আলো জ্বলে ওঠে।
নীলা চোখ মেলে তাকায়—আর ঠিক তখনই সব ধারণা ভেঙে যায়।ঘরটা আর কংক্রিটের সেল না।এটা একটা অপারেশন থিয়েটার।
সাদা আলো, স্টিলের ট্রে, সার্জিকাল যন্ত্র। দেয়ালের কাঁচের ওপাশে ছায়া—মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, মুখ দেখা যায় না।
নীলার বুকের ভেতর প্রথমবার সত্যিকারের ঠান্ডা নামে।
একজন লোক সামনে এগিয়ে আসে।এই লোকটা…সে তাকে চেনেন হাসপাতালে প্রতিদিন।
ডাঃ সায়েম রহমান।
তার বাবার বয়সী মানুষটা, যে তাকে ছোটবেলা থেকে “মা’র মতো শান্ত” বলত।নীলার গলা শুকিয়ে যায়।
“আপনি… এখানে?”ডাঃ সায়েমের কণ্ঠ নরম। খুব পরিচিত।“আমি ভেবেছিলাম তুমি এর আগে বুঝবে।”নীলা মাথা নাড়ে।
“কী বুঝবো?”
ডাক্তার ধীরে বলে,
“এই যুদ্ধটা আবিরকে সরানোর জন্য না।”একটু থামে।
তারপর বলে—
“এই যুদ্ধটা তোমার জন্য।”নীলার চোখ বড় হয়ে যায়।
“আমার?”
ডাঃ সায়েম কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকায়।“তুমি জানো তোমার মা কীভাবে মারা গিয়েছিল?”এই প্রশ্নটা নীলার বুকের ভেতর চেপে বসে।“হার্ট অ্যাটাক,” সে ফিসফিস করে বলে।ডাক্তার মাথা নাড়ে।
“না।”
একটা ফাইল খুলে সামনে রাখে।
রিপোর্ট।তারিখ।সিগনেচার।
“তোমার মা ছিল শহরের সবচেয়ে বড় মানি-লন্ডারিং নেটওয়ার্কের হিসাবরক্ষক। আর আবির চৌধুরী…”ডাক্তার চোখ তুলে তাকায়,“…ছিল সেই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রোডাক্ট।”
নীলার মাথা ঝিমঝিম করে।“আপনি মিথ্যে বলছেন।”ডাক্তার শান্তভাবে বলে,
“না। আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।”
নীলার চোখে জল আসে না।
শুধু শূন্যতা।
“তাহলে আমাকে অপহরণ করলেন কেন?”
ডাক্তার ধীরে হাসে।
“কারণ আবির তোমাকে বাঁচাতে চাইছে।”
একটু থামে।“আর আমরা দেখতে চাই—সে কাকে বাঁচায়।”একই সময়।
বন্ধ সিনেমা হলে স্ক্রিন আবার জ্বলে ওঠে।
কিন্তু এবার নীলার ছবি না।একটা পুরোনো ভিডিও।
একটা ছোট্ট মেয়ে—নীলা।তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন তরুণ লোক।চোখে সেই একই ঠান্ডা আগুন।
আবির।
ভিডিওতে আবির বলছে—“ওকে কখনো এই দুনিয়ার নাম বলবে না।ও স্বাভাবিক থাকবে।”স্ক্রিনের পেছন থেকে কণ্ঠ আসে,“তুমি জানো, ও তোমার কী?”
আবিরের তরুণ কণ্ঠ উত্তর দেয়—
“ও আমার পাপ না।
ও আমার সুযোগ।”
বর্তমানের আবির দাঁড়িয়ে যায়।“তোমরা ওকে ব্যবহার করেছ,”সে বলে। অন্ধকার থেকে কণ্ঠ আসে—“না। ও নিজেই চাবি।”
অপারেশন থিয়েটারে—ডাঃ সায়েম নীলার দিকে তাকায়।“তোমার শরীরে একটা জিনিস আছে,”সে বলে,“যেটা তোমার মা রেখে গেছে।”
নীলা ফিসফিস করে,“আমি কী?”
ডাক্তার উত্তর দেয়---“তুমি শেষ সাক্ষী।”নীলার চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
সে বুঝে যায়—এই গল্পে সে শুধু ভালো মানুষ না।
সে একটা কারণও।
****শেষাংশ ****
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর সে চোখ খুলে ডাঃ সায়েমের দিকে তাকায়।
এই প্রথম তার কণ্ঠে আবেগ ভাঙে।
“আমাকে তাহলে মারবেন?”
ডাক্তার মাথা নাড়ে।
“না। তোমাকে বাঁচাবো।”
একটু থামে।
তারপর যোগ করে—
“তোমাকে ব্যবহার করে।”
নীলার ঠোঁটে হালকা হাসি।
“আপনারা সবাই একই কথা বলেন।”
ডাঃ সায়েম ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“কারা?”
নীলা ধীরে বলে,
“যারা ভাবে—মানুষ একটা জিনিস।”
একই সময়, শহরের অন্য প্রান্তে—
আবির চৌধুরী একা দাঁড়িয়ে আছে।
তার সামনে টেবিলে ছড়িয়ে আছে পুরোনো ফাইল, ভিডিও, ছবি।
সব সত্য।
সব মিথ্যে।
রাশেদ চুপচাপ বলে,
“ভাই… আপনি জানতেন?”
আবির চোখ না তুলে বলে,
“আমি সব জানতাম।”
রাশেদের বুক ধক করে ওঠে।
“তাহলে নীলাকে—”
“আমি ওকে মিথ্যে বলিনি,”
আবির বলে,
“আমি শুধু পুরোটা বলিনি।”
সে ধীরে বসে পড়ে।
“ওর মা মারা যাওয়ার রাতে,”
আবির বলতে থাকে,
“আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”
ফ্ল্যাশব্যাক।
রাত।
রক্ত।
একটা অ্যাপার্টমেন্ট।
একজন নারী মেঝেতে পড়ে আছে।
শ্বাস চলছে না।
একটা ছোট মেয়ে—
নীলা—কাঁদছে।
তরুণ আবির মেয়েটাকে কোলে তুলে নেয়।
“এই শহর তোকে খাবে,”
সে ফিসফিস করে,
“যদি জানে তুই কে।”
বর্তমানে ফিরে—
আবির চোখ বন্ধ করে।
“আমি ওকে সাধারণ জীবন দিয়েছিলাম।
কারণ আমি জানতাম—একদিন এই শহর ওকে চাইবে।”
রাশেদের কণ্ঠ কাঁপে।
“এখন?”
আবির উঠে দাঁড়ায়।
“এখন শহরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
অপারেশন থিয়েটারে—
ডাঃ সায়েম নীলার হাতে একটা কলম দেয়।
সামনে একটা কাগজ।
“এটা সই করলে,”
সে বলে,
“তুমি সব ছেড়ে চলে যেতে পারো।
নাম বদলাবে। দেশ ছাড়বে।
সব শেষ।”
নীলা কাগজের দিকে তাকায় না।
“আর যদি না করি?”
ডাক্তার চুপ করে থাকে।
এই চুপটাই উত্তর।
নীলা ধীরে কলমটা নামিয়ে রাখে।
“আমি পালাবো না।”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“তাহলে আজ রাতেই শহর জ্বলবে।”
নীলা শান্তভাবে বলে,
“জ্বলবে।
কিন্তু সত্য ছাড়া না।”
রাত নামে।
ঢাকা অস্থির।
একটার পর একটা জায়গায় আগুন।
পাওয়ার কাটা।
ফোন নেটওয়ার্ক ডাউন।
শহর বুঝে যায়—
কিছু একটা শেষ হতে যাচ্ছে।
হঠাৎ সব স্ক্রিনে একটাই ভিডিও লাইভ হয়।
একটা ঘর।
সাদা আলো।
নীলা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে।
শহর থমকে যায়।
নীলা কথা বলে—
“আমার নাম নীলা রহমান।
আমাকে আজ বলা হয়েছে—আমি চাবি।
সাক্ষী।
অস্ত্র।”
একটু থামে।
“কিন্তু আমি মানুষ।”
স্ক্রিন বদলায়।
ডাঃ সায়েম, আরও কয়েকজন বড় মুখ—রাজনীতি, হাসপাতাল, দাতব্য সংস্থা।
নীলা বলে,
“এই মানুষগুলো শহর চালায়।
আর আবির চৌধুরী ছিল তাদের ঢাল।”
পুরো শহর স্তব্ধ।
হঠাৎ আরেকটা স্ক্রিন অন হয়।
আবির।
সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে শুধু বলে—
“ও সত্য বলছে।”
এই এক লাইনে শহরের ইতিহাস কেঁপে ওঠে।
ভোর।
সব শেষ।
ডাঃ সায়েম গ্রেপ্তার।
নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে।
শহর ধীরে নিঃশ্বাস নেয়।
নীলা হাসপাতালের ছাদে দাঁড়িয়ে।
আবির ধীরে এসে দাঁড়ায়।
দুজনেই চুপ।
অনেকক্ষণ পর নীলা বলে,
“আপনি আমাকে কেন বাঁচিয়েছিলেন?”
আবির তাকায় না।
“কারণ আমি পারিনি নিজেকে বাঁচাতে।”
নীলা হালকা হাসে।
“তাহলে আপনি মিথ্যে বলেননি।”
আবির তাকায়।
“কী?”
“আপনি বলেছিলেন—
মানুষ দেখলে পিছিয়ে আসা কঠিন।”
দুজনেই চুপ।
শেষ টুইস্ট—
নীলা হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়।
ক্যামেরা (গল্পের দৃষ্টি) আবিরের পেছনে থাকে।
হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে।
Unknown Number।
আবির ধরে।
ওপাশে নীলার কণ্ঠ—
খুব শান্ত।
“আপনি জানতেন না, তাই তো?”
আবির ভ্রু কুঁচকে।
“কী?”
নীলা বলে—
“আমি শুধু সাক্ষী না।
আমি পুরো নেটওয়ার্কের শেষ অ্যাক্সেস।”
একটু থামে।
“আর আজ আমি সব ডেটা…
নিজে ডিলিট করিনি।”
লাইন কেটে যায়।
আবির ধীরে হাসে।
এই প্রথম।
সে বুঝে যায়—
এই শহর আর আগের মতো হবে না।
কারণ সবচেয়ে শান্ত মেয়েটাই
শেষে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়েছে।