সাফা খুব সহজেই চোখে পড়ে যাওয়ার মতো মেয়ে—কথায়, হাসিতে, চলাফেরায়। যেন চারপাশের স্থিরতাকে নড়াচড়া করে দেয় সে। প্রতিদিন বিকেল হলেই তার পায়ের পথ এসে থামে শহরের ছোট্ট কিন্তু পরিচিত সেই ক্যাফেটায়। জানালার পাশের টেবিলটা প্রায় তার জন্যই রাখা—ক্যাফের কর্মচারীরাও জানে, সাফা এলে সেখানে বসবেই।
কখনো বই খুলে বসে, কখনো মোবাইলে গান শোনে, আবার কখনো শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে—কিন্তু চোখে থাকে একরকম প্রাণচাঞ্চল্য, যা সহজে মুছে যায় না।
অন্যদিকে আহান—পুরোপুরি বিপরীত।
তার জীবনটা ছাঁটা, গুছানো, নিয়মে বাঁধা। পড়াশোনা শেষ করে আজই সে দেশে ফিরেছে। বিদেশের কড়া নিয়ম, নিজের তৈরি শৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে তার অভ্যাসে কোনো আলগা জায়গা নেই। রাগ তার স্বভাবেরই অংশ, আর ডিসিপ্লিন—সে তো আহানের পরিচয়।
সন্ধ্যা নামার সময়, অচেনা শহরটা আবার চেনা লাগছিল তার কাছে। হঠাৎ করেই পা থামল সেই ক্যাফের সামনে। ক্লান্ত শরীর, মাথার ভেতর এলোমেলো ভাবনা—এক কাপ কফি দরকার ছিল।
ক্যাফের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই আহানের চোখ চলে গেল জানালার পাশে বসে থাকা মেয়েটার দিকে।
সাফা তখন হাসছিল। ঠিক কিসে হাসছিল—তা বোঝা যায়নি। কিন্তু সেই হাসিটা মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের শব্দকে নীরব করে দিল।
আহান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
অচেনা মেয়ে, অচেনা অনুভূতি—তবু বুকের ভেতর কোথাও যেন অস্বস্তিকর এক নড়াচড়া।
সাফার চোখও একসময় তার দিকে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুজনের চোখাচোখি। সাফা স্বাভাবিকভাবেই হালকা হাসল—তার অভ্যাসই এমন।
কিন্তু আহান…
সে চোখ সরিয়ে নিল।
কথা বলা হলো না।
কোনো পরিচয় হলো না।
শুধু একই জায়গায় বসে থাকা দুই অচেনা মানুষ—যাদের গল্প তখনো শুরুই হয়নি।
ক্যাফে থেকে বেরিয়ে আসার সময় আহান বুঝতে পারল, আজকের এই দেখা তার দিনের হিসাবের মধ্যে পড়ে না।
আর জানালার পাশে বসে থাকা সাফা জানত না—এই নীরব দেখা একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গভীর অধ্যায়ের দরজা খুলে দেবে।তখনো কেউ জানত না—এই নীরব দেখা কোনো কাকতাল নয়।
এটা ছিল ঠিক সেই মুহূর্ত, যেখান থেকে কিছু সম্পর্ক শুরু হয়… শব্দ ছাড়াই।
ক্যাফের কাঁচের দরজাটা বন্ধ হতেই আহান থমকে দাঁড়াল।
পা চলছিল ঠিকই, কিন্তু মন পিছনে পড়ে রইল।
এই অনুভূতিটা তার পরিচিত না—কারণ আহান কখনোই অকারণ থামে না।
তার জীবন হিসাব করা, অনুভূতি নয়।
সে জানত না কেন,
একটা হাসি কেন তার ভেতরের সব নিয়মে ফাটল ধরাল।
ভেতরে বসে থাকা সাফা তখনও জানালার দিকেই তাকিয়ে।
সে জানত না ছেলেটা কে,
জানত না তার চোখে কেন এত কঠোরতা,
কিন্তু বুঝেছিল—এই মানুষটা সহজ কেউ নয়।
তবু অদ্ভুতভাবে,
সাফার মনে হলো—এই রাগী, নীরব মানুষটার ভেতরে কোথাও খুব গভীর একটা ভাঙন আছে।
আর ভাঙন সে চিনতে পারে,
কারণ তার নিজের মনটাই খুব বেশি অনুভব করতে জানে।
কাপের কফি ঠান্ডা হয়ে এসেছে,
কিন্তু সাফা খেয়াল করল না।
তার মনটা যেন একটু আগেই কাউকে অনুসরণ করে বাইরে চলে গেছে।
এই দেখা কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
কোনো কথাও হয়নি।
কিন্তু কিছু দেখা এমনই হয়—
যা কথা না বলেও মনে দাগ কেটে যায়।
সেদিন রাতে আহান বুঝল,
দেশে ফেরার দিনটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে অপ্রস্তুত দিন।
আর সাফা জানত না,
আগামী দিনগুলোতে ক্যাফের এই জানালাটা আর আগের মতো থাকবে না।
কারণ কিছু মানুষ জীবনে আসে—
থাকতে নয়,
শেষ হয়ে যেতে।
আর সেই শেষটাই হয়ে ওঠে—সবকিছু।কারণ কিছু মানুষ জীবনে আসে—
থাকতে নয়,
শেষ হয়ে যেতে।
আর সেই শেষটাই হয়ে ওঠে—সবকিছু।
আহান সেদিন অনেক দূর হেঁটেছিল,
কিন্তু মাথার ভেতর থেকে সেই ক্যাফেটা এক পা-ও সরেনি।
তার জীবনে কখনো কেউ এমনভাবে ঢুকে পড়েনি—
নাম না জেনে, কথা না বলে, তবু সম্পূর্ণ অস্বস্তি হয়ে।
সে নিজের ওপর রাগ করল।
এই দুর্বলতা তার নয়।
সে শিখেছে নিয়ন্ত্রণে থাকতে,
অনুভূতিকে শাসন করতে—অনুভূতির কাছে হার মানতে নয়।
কিন্তু তবু,
রাগী এই মানুষটার ভেতরে কোথাও যেন প্রশ্ন জমে রইল—
একটা হাসি কীভাবে এত গভীরে আঘাত করতে পারে?
অন্যদিকে সাফা,
ঘরে ফিরেও নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারল না।
মায়ের কথায় সাড়া দিতে দেরি হলো,
চোখে পড়ল না আয়নার সামনে নিজের হাসিটা আর আগের মতো নেই।
সে জানে না কেন,
কিন্তু ছেলেটার চোখে তাকানোর মুহূর্তে
তার চঞ্চল মনটা হঠাৎ থেমে গিয়েছিল।
যেন কেউ চুপচাপ বলেছে—
“এই মানুষটা সহজ নয়, সাবধান।”
কিন্তু সাফা সাবধান মানুষ না।
সে অনুভূতিকে ভয় পায় না।
সে জানে—সব শক্ত জিনিসই ভাঙে,
আর ভাঙার শব্দটাই কখনো কখনো সবচেয়ে সত্য।
সেদিন কোনো কথা হয়নি,
কোনো প্রতিশ্রুতি হয়নি,
কিন্তু দুজনেই অজান্তেই একটা ব্যাপার বুঝে গিয়েছিল—
এই দেখা এখানেই শেষ নয়।
এটা কেবল শুরু—
যেখানে কেউ জিতবে না,
কিন্তু দুজনেই বদলে যাবে।
আর এই বদলটাই
একদিন তাদের এনে দাঁড় করাবে
একটাই প্রশ্নের সামনে—
শেষটা কি সত্যিই “তুমিতেই শেষ”?
এই প্রশ্নটা তখনো কেউ মুখে বলেনি,
কিন্তু দুজনের ভেতরেই প্রশ্নটা জন্ম নিয়েছিল—নিঃশব্দে, গভীরে।
আহান নিজের ঘরের আলো নিভিয়ে বসে ছিল।
ঘর অন্ধকার, অথচ তার ভেতরটা অস্বাভাবিক রকম জেগে।
সে বহুদিন পর বুঝল—নিয়ম মানলেই সব নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
কিছু অনুভূতি অনুমতি না নিয়েই ঢুকে পড়ে,
আর ঢুকে পড়লে আর বেরোতে চায় না।
তার রাগ আজ নিজের দিকেই ঘুরে গেল।
কারণ সে জানে—
যা তাকে ভাবায়,
তা একদিন তাকে ভাঙবেই।
অন্যদিকে সাফা জানালাটা খুলে দাঁড়িয়েছিল।
রাতের বাতাস চুল এলোমেলো করে দিচ্ছিল,
কিন্তু তার মাথার ভেতর শুধু একটা দৃশ্য—
এক জোড়া চোখ,
যেখানে কঠোরতার নিচে লুকানো ছিল
অদ্ভুত এক নীরবতা।
সাফা হালকা হাসল।
সে জানে না কেন,
কিন্তু তার মন বলছিল—
এই মানুষটা হাসতে জানে না,
আর যারা হাসতে জানে না
তারা ভেতরে ভেতরে সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত।
এই প্রথমবার,
সাফা কাউকে না চিনেই তার জন্য দোয়া করল।
দুজনেই তখন আলাদা দুই ঘরে,
আলাদা দুই জীবনে—
কিন্তু ভাগ্য খুব ধীরে, খুব নিশ্চুপে
একই সুতোয় গিঁট বাঁধছিল।
কারণ কিছু দেখা কেবল স্মৃতি হয় না—
কিছু দেখা ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে।
আর সেই ভবিষ্যৎ,
কখনোই অনুমতি নিয়ে আসে না।
অধ্যায় :_২
পরদিন বিকেলেও সাফা ক্যাফেতে এলো।
এটা তার রুটিন—কিন্তু আজ রুটিনের ভেতর অকারণ একটা অপেক্ষা ঢুকে পড়েছে।
সে নিজেই বুঝতে পারছিল না,
কাকে খুঁজছে তার চোখ।
জানালার পাশের টেবিলটা আজও খালি।
সাফা সেখানে বসে পড়ল।
কফির অর্ডার দিতে গিয়ে হঠাৎ থামল—
কাল সে ঠিক এই জায়গাতেই বসে ছিল,
আর ঠিক তখনই…
সে মাথা ঝাঁকাল।
নিজেকে থামাল।
একদিনের দেখা দিয়ে কেউ মনে জায়গা নেয় না—
এটা সে ভালো করেই জানে।
ঠিক তখনই ক্যাফের দরজাটা খুলল।
আহান।
আজ সে আরও গম্ভীর।
মুখে ক্লান্তি, চোখে পরিচিত কঠোরতা।
গত রাতটা তারও সহজ যায়নি।
সে নিজেকে বুঝিয়েছে—এই শহর, এই ক্যাফে, এই অনুভূতি—সবই সাময়িক।
কিন্তু তবু পা তাকে আবার এখানে এনে ফেলেছে।
চোখ উঠল।
দৃষ্টি থামল।
সাফা।
এইবার আর কাকতাল নয়।
এইবার পালানোর সুযোগও নেই।
সাফা তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড।
তারপর সেই স্বাভাবিক হাসি—
যেটা সে কাউকে দেওয়ার আগে ভাবেনা।
— “আপনি কালও এসেছিলেন, না?”
আহান অবাক হলো।
কেউ এত সহজে কথা শুরু করে?
সে স্বভাবসিদ্ধ সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
— “হ্যাঁ।”
একটা শব্দ।
কিন্তু ওই এক শব্দেই সাফা বুঝে নিল—
এই মানুষটা কথা কম বলে,
আর অনুভূতি লুকাতে জানে খুব ভালো।
— “আপনি এখানকার নন, তাই তো?”
সাফা বলল, কোনো জোর নেই, কোনো দাবি নেই।
আহান একটু বিরক্ত হলো নিজের ওপর।
সে চেয়েছিল নীরব থাকতে।
কিন্তু উত্তর বেরিয়ে এলো—
— “আজই ফিরেছি।”
সাফা মাথা নেড়ে বলল,
— “তাই বুঝি… আপনার চোখে শহরটা নতুন লাগছে।”
এই প্রথম,
আহান সাফার দিকে পুরোপুরি তাকাল।
কেউ এত সহজে তাকে পড়ে ফেলল কীভাবে?
সে আর কিছু বলল না।
কিন্তু সাফা বুঝে গেল—
এই নীরবতাই তার দেয়াল।
দুজনের মাঝে কফির ধোঁয়া উঠছিল,
আর তার ভেতর দিয়ে জন্ম নিচ্ছিল এমন এক টান—
যার নাম কেউ তখনো জানে না।
কারণ কিছু সম্পর্ক শুরু হয় কথায় না—
শুরু হয় থেমে যাওয়ার ভেতর দিয়ে।
আর সেই থেমে যাওয়াটাই
একদিন সবকিছু বদলে দেয়।পরের কয়েকদিন সাফার কাছে ক্যাফেটা আর শুধু সময় কাটানোর জায়গা রইল না।
সে নিজেও বুঝে উঠতে পারল না,
কখন থেকে সে দরজার দিকে একটু বেশি তাকাতে শুরু করেছে।
কখন থেকে কফির স্বাদটা তার কাছে গৌণ হয়ে গেছে।
আহান নিয়ম ভাঙে না।
কিন্তু তবু, প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় তার পা নিজে থেকেই ওই দিকেই চলে আসে।
সে নিজেকে বলে—এটা কাকতাল।
কিন্তু সে জানে,
কাকতাল তার জীবনে এত নিয়মিত হয় না।
দুজনের মাঝে কথাবার্তা কম।
অল্প।
প্রয়োজনের বাইরে কিছু নয়।
কিন্তু নীরবতাগুলো কথা বলে যায়—
যা শব্দ পারে না।
সাফা মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করেই চুপ করে থাকে।
সে দেখতে চায়,
এই রাগী, শক্ত মানুষটা
নীরবতায় কী করে।
আর আহান…
সে প্রথমবার বুঝতে শুরু করে—
সব নীরবতা শূন্য হয় না।
কিছু নীরবতা খুব বেশি অনুভূতিতে ভরা।
একদিন সাফা হঠাৎ বলল,
— “আপনি খুব রেগে থাকেন, তাই না?”
প্রশ্নটা সরাসরি।
সাফার মতোই।
আহান থমকে গেল।
সে এমন প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না।
কঠিন স্বরে বলল,
— “আপনার এমন মনে হলো কেন?”
সাফা কাঁধ ঝাঁকাল।
— “কারণ আপনি সবসময় নিজেকে শক্ত করে রাখেন।
যারা খুব শক্ত থাকে,
তারা সাধারণত ভেতরে ভেতরে খুব ক্লান্ত।”
এই কথাটা আহানকে আঘাত করল।
কারণ এটা সত্যি।
আর সত্যি সে সহ্য করতে পারে না।
সে উঠে দাঁড়াল।
— “আপনি আমাকে চেনেন না।”
সাফা তাকিয়ে রইল।
চোখে ভয় নেই,
দয়া নেই—
শুধু শান্ত একটা দৃঢ়তা।
— “না,”
সে বলল,
— “কিন্তু চিনতে চাই।”
এই প্রথম,
আহানের রাগের দেয়ালে ফাটল ধরল।
সে সেদিন চলে গেল।
রাগ করে।
নিজের ওপর রাগ করে।
আর সবচেয়ে বেশি রাগ করল এই কারণে—
কেউ একজন তার দেয়ালের ভেতরটা দেখতে শুরু করেছে।
আর সাফা জানত,
এই চলে যাওয়া শেষ নয়।
কারণ যারা হঠাৎ চলে যায়,
তারা আসলে
আটকে পড়েই যায়।আহান চলে যাওয়ার পর ক্যাফেটার ভেতরটা অস্বাভাবিক রকম শান্ত হয়ে গেল।
যেন তার রাগ, তার অস্থিরতা—সবকিছু দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু একটা ভারী ছাপ রেখে গেছে বাতাসে।
সাফা নড়ল না।
কফির কাপটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হচ্ছিল, কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত এক স্থিরতা।
সে জানে—এই মানুষটা পালিয়েছে, কিন্তু পালিয়ে বাঁচেনি।
কিছু মানুষ রাগ করে চলে যায়,
কারণ তারা ভয় পায়—থেমে গেলে ভেঙে পড়বে।
সাফা জানালার দিকে তাকাল।
বাইরে সন্ধ্যা নামছে।
ঠিক যেমন আহানের চোখে সন্ধ্যা নামে—হঠাৎ, নীরবে।
সেই রাতে আহান নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করল একটু বেশি জোরে।
ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলল এক পাশে।
টাই খুলে ফেলল, শার্টের বোতাম খুলল—শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
“আপনি আমাকে চেনেন না।”
কথাটা সে সাফাকে বলেছিল,
কিন্তু প্রতিধ্বনি ফিরে এসে তাকে প্রশ্ন করল—
তুমি নিজেকে চেনো?
আহান আয়নার সামনে দাঁড়াল।
চেনা মুখ, চেনা কঠোরতা।
কিন্তু চোখের গভীরে আজ কিছু একটা আলাদা—একটা অস্বস্তি, যেটার নাম সে দিতে জানে না।
কেউ একজন তার দিকে তাকিয়ে ভয় পায়নি।
এটাই তাকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছে।
সে নিজেকে বোঝাল—
এটা দুর্বলতা।
এটা কেটে যাবে।
কিন্তু মন জানে—
যা কেটে যায়, তা এমন গভীরে ঢোকে না।
পরদিন বিকেলে সাফা আবার ক্যাফেতে এলো।
এইবার আর কোনো অপেক্ষা লুকানোর চেষ্টা করল না।
জানালার পাশের টেবিল।
চেনা চেয়ার।
কিন্তু সামনে বসার মানুষটা নেই।
সে কফি অর্ডার করল না।
শুধু বসে রইল।
ক্যাফের দরজা বারবার খুলছে, বন্ধ হচ্ছে—
প্রতিবারই তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য উঠে যাচ্ছে।
নিজের ওপর সে হালকা হেসে ফেলল।
“দেখো, তুমি তো এমন ছিলে না।”
কিন্তু মানুষ বদলায়—
কখনো নিজের অজান্তেই।
তৃতীয় দিনেও আহান এলো না।
চতুর্থ দিনেও না।
সাফা বুঝে গেল—
সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে।
দেয়ালটা আবার উঁচু করছে।
কিন্তু সাফা অপেক্ষা করতে জানে।
কারণ সে জানে—
যারা খুব শক্ত দেয়াল তোলে,
তারা ভেতরে ভেতরে ভীষণ একা।
পঞ্চম দিন, বৃষ্টি নামল হঠাৎ।
শহর ভিজে গেল, মানুষ ছুটতে লাগল।
সাফা জানালার পাশে বসে ছিল।
বৃষ্টির ফোঁটা কাচে আছড়ে পড়ছে—ঠিক তার ভাবনার মতো।
হঠাৎ দরজাটা খুলল।
ভেজা চুল, গম্ভীর মুখ।
আহান।
এইবার তার চোখে রাগ নেই।
আছে ক্লান্তি।
চোখাচোখি হলো।
দুজনেই কিছু বলল না।
আহান ধীরে এগিয়ে এসে বসল—
এই প্রথম, ঠিক সাফার সামনে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আহান নিচু স্বরে বলল—
— “আমি রেগে গিয়েছিলাম।”
একটা স্বীকারোক্তি।
ছোট, কিন্তু ভারী।
সাফা কিছু বলল না।
শুধু মাথা নেড়ে বলল—
— “আমি জানি।”
এই দুই শব্দে কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু বোঝা আছে।
আহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আপনি ঠিক বলেছিলেন।
আমি ক্লান্ত।”
এই প্রথম,
সে নিজের দেয়াল নামাল।
আর সাফা বুঝে গেল—
এই গল্পটা আর ক্যাফের চার দেয়ালে আটকে থাকবে না।
কারণ কিছু সম্পর্ক
শুরু হয় রাগ দিয়ে,
কিন্তু বাঁচে
স্বীকারোক্তিতে।বৃষ্টির শব্দটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো।
ক্যাফের ভেতরে তখন আর খুব বেশি মানুষ নেই।
আহান চুপ করে বসে আছে,
আর সাফা—এই প্রথম—নিজের ভেতরের দরজাটা খুলতে চাইছে।
সে জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি তার ভালো লাগে।
কারণ বৃষ্টি প্রশ্ন করে না।
— “আপনি জানেন,”
সাফা হঠাৎ বলল,
— “মানুষ আমাকে দেখে ভাবে—আমি খুব সহজ।”
আহান কিছু বলল না।
শুধু তাকিয়ে রইল।
এই মেয়েটাকে আজ সে প্রথমবার সত্যি করে শুনছে।
— “সবাই ভাবে, আমি হালকা।
সবকিছুকে সহজভাবে নিই।
কিন্তু সহজ হওয়া আর ভেতরে হালকা থাকা—এক জিনিস না।”
সাফার গলায় কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু একধরনের ক্লান্ত সততা।
সে আঙুল দিয়ে কফির কাপের ধারে ঘুরাতে লাগল।
— “আমি ছোটবেলা থেকেই হাসতে শিখেছি।
কারণ ঘরে হাসির অভাব ছিল।”
এই কথাটায় আহানের বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ল।
— “আমার বাবা খুব চুপচাপ মানুষ ছিলেন,”
সাফা বলল,
— “সব সময় দায়িত্বে ডুবে থাকা।
কথা কম, অনুভূতি তার চেয়েও কম।
আর মা…
তিনি সব বুঝতেন, কিন্তু বলতেন না।”
সাফা হালকা হেসে ফেলল।
— “আমাদের ঘরে কেউ কাঁদত না।
কাঁদা নিষেধ ছিল না—
কাঁদার সময়ই ছিল না।”
আহান চোখ সরাল না।
সে বুঝতে পারছে—
এই হাসির পেছনে কতটা জমে থাকা শব্দ।
— “একদিন হঠাৎ মা চলে গেলেন,”
সাফা বলল, খুব সাধারণ স্বরে।
— “কোনো বিদায় না।
কোনো প্রস্তুতি না।”
এক মুহূর্ত থামল সে।
শ্বাস নিল।
— “তারপর আমি বুঝলাম—
যদি আমি ভেঙে পড়ি,
এই বাড়িটা আর টিকবে না।”
আহান হাতের মুঠো শক্ত করল।
এই অনুভূতিটা তার চেনা।
— “তাই আমি হাসি,”
সাফা বলল,
— “কারণ কেউ না কেউ তো স্থির থাকতে হবে।
আমি মানুষকে ভালো রাখি,
কারণ জানি—ভালো না থাকলে কেমন লাগে।”
সে এবার আহানের দিকে তাকাল।
চোখে কোনো করুণা নেই।
শুধু বোঝা।
— “আর আপনি…”
সে থামল।
— “আপনি নিজেকে শক্ত রেখেছেন অনেকদিন।
কারণ যদি আপনি ভেঙে পড়েন,
তাহলে আর কেউ আপনাকে সামলাতে পারবে না—এই ভয়টা আপনার।”
আহান চোখ নামাল।
এই প্রথম,
কেউ তার ভয়টাকে নাম দিয়ে ডাকল।
— “আমি সবাইকে অনুভব করতে দিই,”
সাফা নরম স্বরে বলল,
— “কিন্তু নিজের অনুভূতি কাউকে ধরতে দিই না।
কারণ আমি জানি—
একবার যদি আমি নিজে ভাঙি,
তাহলে আমাকে জোড়া লাগানোর কেউ থাকবে না।”
বৃষ্টি আবার জোরে নামতে শুরু করল।
দুজনেই চুপ করে রইল।
এই নীরবতা আর ভারী না—
এটা নিরাপদ।
আহান ধীরে বলল,
— “আপনি খুব একা।”
সাফা তাকাল।
এই কথাটা সে বহুদিন শোনেনি।
হালকা হাসল সে।
— “হ্যাঁ।
কিন্তু অভ্যস্ত।”
আহান মাথা নাড়ল।
— “একাকীত্বে অভ্যাস হয়ে গেলে
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়।”
এই প্রথম,
সাফা কিছু বলল না।
কারণ সত্যিটা—
এই মানুষটা তাকে দেখছে।
হালকা নয়,
ভাঙা নয়—
পুরোটা।
আর সাফা বুঝে গেল—
এই সম্পর্কটা আর সহজ থাকবে না।
কারণ তারা দুজনেই
একই জিনিস লুকিয়ে রেখেছে—
ভাঙার ভয়।
আর যে সম্পর্ক
ভাঙার ভয় থেকে শুরু হয়,
তার শেষটা
কখনোই সাধারণ হয় না।ক্যাফেটার ভেতরে আলোটা একটু ম্লান হয়ে এসেছে।
বাইরে বৃষ্টি থামেনি,
শুধু শব্দটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে—ঠিক তাদের দুজনের নীরবতার মতো।
সাফা প্রথম উঠে দাঁড়াল।
— “আমার যেতে হবে,”
বলল সে।
কথাটায় তাড়া নেই,
শুধু একটা সীমা টানা।
আহান মাথা নেড়ে বলল,
— “আমি হাঁটতে হাঁটতে যাব।”
দুজন একসাথে বেরিয়ে এল ক্যাফে থেকে।
রাস্তায় কাঁচা আলো, ভেজা পিচ।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
হঠাৎ সাফা থামল।
— “আপনি জানেন,”
সে বলল,
— “আমি মানুষকে খুব কাছে আসতে দিই।
কিন্তু থাকতে দিই না।”
আহান তাকাল।
— “কেন?”
— “কারণ যারা থাকে,”
সাফা খুব ধীরে বলল,
— “তারা একদিন চলে যায়।
আর যারা চলে যায়,
তারা কিছু না কিছু ভেঙে যায় ভেতরে।”
আহানের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।
— “সব চলে যায় না।”
সাফা হেসে ফেলল।
— “এটাই তো সমস্যা।
আপনি বিশ্বাস করেন—
আমি করি না।”
এই কথাটাই
গল্পের প্রথম মোড়।
সেদিনের পর
তারা নিয়মিত দেখা করতে লাগল।
কিন্তু নামহীন।
কোনো সংজ্ঞা নেই।
আহান চাইত স্পষ্টতা।
সাফা চাইত স্বাধীনতা।
এই দুই চাওয়া
একসাথে থাকে না।
একদিন আহান বলল,
— “আপনি আমার জীবনে কী হয়ে থাকতে চান?”
সাফা থেমে গেল।
এই প্রশ্নটাই সে এড়িয়ে চলছিল।
— “আমি থাকতে চাই না,”
সে বলল।
— “আমি শুধু আসি।”
এই কথাটা
আহানের নিয়ন্ত্রণের দেয়ালে
প্রথম বড় আঘাত।
সে স্বর নামিয়ে বলল,
— “আমি অস্থায়ী মানুষ না।”
সাফা তাকিয়ে রইল।
— “আর আমি স্থায়ী হতে পারি না।”
এইবার নীরবতা
আর আরামদায়ক রইল না।
কয়েকদিন তারা দেখা করল না।
ইচ্ছা করে না,
অভিমানেও না—
শুধু ভয় থেকে।
সাফা নিজেকে ব্যস্ত রাখল।
হাসল আগের মতো।
কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ালে
হাসিটা আর চোখে পৌঁছাত না।
আর আহান
নিজের নিয়মে ফিরে গেল।
জিম, কাজ, ঘুম।
কিন্তু প্রতিটা নিয়মের ফাঁকে
একটা নাম ঢুকে পড়ছিল—
সাফা।
এক রাতে সাফা মায়ের পুরোনো ডায়েরিটা খুলল।
সে কখনো খোলেনি এটা।
ভয় পেত।
একটা পাতায় লেখা ছিল—
“ভালোবাসা মানে থাকা না,
ভালোবাসা মানে সাহস।”
সাফার হাত কাঁপল।
সে বুঝল—
সে সবসময় চলে গেছে,
কারণ সে সাহসী হতে চায়নি।
আর ঠিক তখনই
ফোনটা বেজে উঠল।
আহান।
সে ধরল না।
ফোন থামল।
আবার বেজে উঠল।
এইবার সে ধরল।
ওপাশ থেকে আহানের কণ্ঠ—
ভাঙা, সোজাসাপ্টা—
— “আমি জানি আপনি ভয় পান।
কিন্তু আমি যাচ্ছি না।
আপনি তাড়ালেও না।”
সাফার চোখ ভিজে উঠল।
এই প্রথম—
ভয়টা শব্দ পেল।
— “আপনি জানেন না,”
সে ফিসফিস করে বলল,
— “আমি কেমন ভাঙতে পারি।”
আহান এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,
— “আমি ভাঙা জিনিস ঠিক করতে পারি না।
কিন্তু পাশে দাঁড়াতে পারি।”
এই কথাটাই
গল্পের দ্বিতীয় মোড়।
কারণ এইবার
সাফা পালাতে পারল না।
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর সাফা অনেকক্ষণ অন্ধকারে বসে রইল।
কান্না এলো না।
ভয় এলো।
কারণ এই প্রথম কেউ তার পালানোর রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়েছে—
রাগ দিয়ে না,
দাবি দিয়ে না,
শুধু থেকে যাওয়ার অদ্ভুত দৃঢ়তায়।
সে ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।
মায়ের হাতের লেখা।
মায়ের অসম্পূর্ণ সাহস।
“ভালোবাসা মানে সাহস।”
এই লাইনটা আজ তার জন্য লেখা।
পরদিন সাফা ক্যাফেতে গেল না।
ইচ্ছা করে না।
আজ সে দেখতে চায়—
আহান কি অভ্যাসের মানুষ,
নাকি সিদ্ধান্তের।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলো।
দরজায় কড়া নাড়ল কেউ।
সাফা জানত—
কে।
দরজা খুলতেই আহান দাঁড়িয়ে।
চোখে ক্লান্তি,
মুখে কোনো অভিযোগ নেই।
— “আপনি আসবেন জানতাম,”
সাফা বলল।
আহান মাথা নেড়ে বলল,
— “আর আপনি খুলবেন জানতাম।”
এই দুইটা জানা
একসাথে বিপজ্জনক।
ভেতরে ঢুকে আহান চারপাশে তাকাল।
ছোট ঘর।
গোছানো না, এলোমেলোও না।
একটা ঘর, যেখানে কেউ নিজের মতো থাকে।
— “আপনি ভয় পান,”
আহান বলল।
— “কিন্তু দৌড়ান না।
আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাঙেন।”
এই কথাটা
সাফার বুকের ঠিক মাঝখানে লাগল।
সে ধীরে বসে পড়ল।
— “আমি যদি থাকি,”
সে বলল,
— “আমি বদলে যাব।
আর আমি বদলাতে ভয় পাই।”
আহান চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— “আমি যদি থাকি,
আমিও বদলাব।
কিন্তু একা না।”
এই কথাটার কোনো নাটক নেই।
কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
শুধু সমতা।
সাফা উঠে দাঁড়াল।
জানালার কাছে গেল।
বাইরে শহরটা আলোয় ভিজে।
— “আমার মা একদিন হঠাৎ চলে গিয়েছিলেন,”
সে বলল, পেছন ফিরে না তাকিয়ে।
— “ক্যান্সার না, দুর্ঘটনা না।
ডিপ্রেশন।”
এই শব্দটা
সে কখনো জোরে বলেনি।
— “আমি ছোট ছিলাম,”
সাফা বলল,
— “আমি ভেবেছিলাম—
আমি যদি আরও হাসতাম,
আরও ভালো হতাম,
তিনি থাকতেন।”
আহানের শ্বাস আটকে গেল।
— “সেইদিন থেকে,”
সাফা বলল,
— “আমি কাউকে থাকতে দিই না।
কারণ যদি তারা চলে যায়—
আমি আবার নিজেকেই দোষ দেব।”
এইটাই
সাফার জীবনের অদেখা দিক।
আহান ধীরে এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল।
ছুঁল না।
জোর করল না।
— “আপনার মা চলে গেছেন,”
সে বলল,
— “কিন্তু আপনি দায়ী না।”
এই বাক্যটা
সাফা বহু বছর শোনেনি।
হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল সে।
এইবার কান্না এলো।
শব্দহীন, ভেঙে পড়া কান্না।
আহান পাশে বসে রইল।
কিছু ঠিক করতে না পেরে,
কিছু বদলাতে না চেয়ে—
শুধু থেকে।
সেই রাতে
কিছু শুরু হয়নি।
কিন্তু কিছু ভাঙা
শেষ হলো।
আর যেদিন কোনো মানুষ
ভাঙা বহন করতে শেখে,
সেদিনই গল্পটা
শেষের দিকে হাঁটা শুরু করে।
কিন্তু এই গল্পের শেষ
সহজ হবে না।
কারণ এখন প্রশ্নটা বদলে গেছে—
ভালোবাসা কি তাদের জোড়া লাগাবে,
নাকি একই জায়গায় আবার ভাঙবে?রাতটা কেটে গেল।
কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই।
কোনো স্পর্শ ছাড়াই।
কিন্তু কিছু রাত এমন হয়—
যেখানে মানুষ একা থাকে না,
শুধু নীরবে পাশাপাশি থাকে।
সকাল হলে আহান উঠে দাঁড়াল।
জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে।
সাফা তখনও সোফার এক কোণে বসে,
চোখ ফোলা,
কিন্তু ভেতরটা অদ্ভুতভাবে হালকা।
— “আমি যাচ্ছি,”
আহান বলল।
এই কথাটা শুনে
সাফার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
এই তো।
এটাই সে চেনে।
মানুষ যায়।
কিন্তু আহান পরের লাইনটা বলল—
— “পালাতে না।
কাজে।”
সাফা তাকাল।
এই মানুষটা আজও নিয়ন্ত্রণে,
কিন্তু আর নিষ্ঠুর না।
— “আমি আবার আসব,”
আহান বলল,
— “আপনি দরজা বন্ধ না করলে।”
সাফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল—
— “আমি দরজা বন্ধ করি না।
আমি শুধু খুলি না।”
আহান মাথা নেড়ে বলল—
— “আজ খুললেন।”
এই কথাটা
সাফার ভেতরে কোথাও
একটা আলো জ্বালাল।
দিনগুলো এগোতে লাগল।
তারা আর প্রতিদিন দেখা করে না।
ইচ্ছা করে।
কারণ দুজনেই জানে—
অতিরিক্ত কাছাকাছি থাকলে
ভয়টা বড় হয়ে যায়।
কিন্তু যখনই দেখা হয়,
কিছু একটা করে তারা আরও গভীরে ঢুকে পড়ে।
একদিন আহান বলল—
— “আপনি জানেন,
আমি কেন এত নিয়ন্ত্রণে থাকি?”
সাফা মাথা নাড়ল।
— “কারণ আমি একবার হারিয়েছি,”
আহান বলল।
— “সব।”
এই শব্দটা ভারী।
— “বিদেশে থাকার সময়,”
সে বলল,
— “আমি যাকে ভালোবাসতাম,
সে বলেছিল—
আমি খুব কঠিন।
ভালোবাসার জায়গা দিই না।”
সাফা তাকিয়ে রইল।
— “আমি বদলাতে পারিনি,”
আহান বলল।
— “আর সে চলে গেল।”
একটা দীর্ঘ শ্বাস।
— “সেইদিন বুঝলাম—
নিয়ন্ত্রণ না রাখলে
আমি কাউকে রাখতে পারি না।
আর নিয়ন্ত্রণ রাখলে
কেউ থাকতে চায় না।”
এই স্বীকারোক্তিটা
আহানের জন্য
নিজের হাত খালি করে দেওয়া।
সাফা খুব ধীরে বলল—
— “হয়তো আপনি কাউকে রাখার চেষ্টা করছিলেন,
আর আমি কাউকে যেতে দিচ্ছিলাম না।”
এই দুইটা ভুল
একসাথে ভয়ংকর।
একদিন হঠাৎ সাফার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
হাসপাতাল।
নীরব করিডর।
সেই পুরোনো ভয়।
সাফা কাউকে ফোন করতে চায়নি।
কিন্তু আঙুলটা নিজে থেকেই
একটা নাম ডায়াল করল।
আহান এলো।
প্রশ্ন না করে।
দাবি না করে।
হাসপাতালের বেঞ্চে বসে
সে শুধু বলল—
— “আমি আছি।”
এই “আছি”
সাফার জন্য নতুন।
রাত গভীর হলে
সাফা হঠাৎ বলল—
— “যদি বাবাও চলে যায়?”
এই প্রশ্নটা
ভালোবাসার না—
এটা শৈশবের।
আহান ধীরে বলল—
— “তাহলে আমরা শিখব
কীভাবে শূন্যতা নিয়ে বাঁচতে হয়।”
এই উত্তরটা
আশ্বাস না,
সত্য।
সাফা কাঁদল।
এইবার ভয় থেকে না—
স্বস্তি থেকে।
কিন্তু ভালোবাসা
সবসময় জোড়া লাগায় না।
কখনো কখনো
এটা আয়না ধরিয়ে দেয়।
আর আয়নায় যা দেখা যায়,
সবাই সহ্য করতে পারে না।
কারণ কিছু সম্পর্ক
ভাঙে না বাইরে থেকে—
ভাঙে
ভেতরের পুরোনো ক্ষত খুলে গেলে।
এখন তারা দাঁড়িয়ে আছে
সবচেয়ে কঠিন জায়গায়—
একসাথে থাকলে
ভাঙার ঝুঁকি,
আর একা হলে
ফাঁকা হয়ে যাওয়ার ভয়।
ভালোবাসা কি তাদের জোড়া লাগাবে?
নাকি
একই জায়গায় আবার ভাঙবে?
এই প্রশ্নের উত্তর
এখন আর ভবিষ্যতে না—
উত্তরটা আসবে
পরের একটা সিদ্ধান্তে।
আর সেই সিদ্ধান্ত
নেবে সাফা।
হাসপাতালের করিডরটা তখন প্রায় ফাঁকা।
সাদা আলো, সাদা দেয়াল—
সবকিছু অতিরিক্ত পরিষ্কার,
কিন্তু অনুভূতিগুলো এলোমেলো।
সাফা বেঞ্চে বসে ছিল।
হাত দুটো জড়ো করে রাখা,
যেন কিছু ধরে না রাখলে
সে নিজেই ভেঙে পড়বে।
আহান একটু দূরে দাঁড়িয়ে।
সে জানে—
কিছু সিদ্ধান্ত মানুষ একা নেয়।
সেখানে পাশে থাকা যায়,
হস্তক্ষেপ না।
ডাক্তারের কণ্ঠ ভেসে এলো।
“এখন স্থিতিশীল।
কিন্তু নিয়মিত দেখাশোনা লাগবে।”
এই “কিন্তু”-টাই
সাফার বুক ভারী করে দিল।
বাবা বেঁচে আছেন—
কিন্তু আগের মতো শক্ত নন।
আর শক্ত মানুষ ভাঙলে
সবচেয়ে বেশি শব্দ হয় না—
সবচেয়ে বেশি শূন্যতা হয়।
বাড়ি ফেরার পথে
গাড়ির ভেতর কেউ কথা বলল না।
হঠাৎ সাফা বলল—
— “আমি ভয় পাচ্ছি।”
এই কথাটা
সে আগে কখনো বলেনি।
আহান তাকাল না।
শুধু বলল—
— “আমি জানি।”
— “আমি যদি আপনাকে থাকতে দিই,”
সাফা বলল,
— “আপনি একদিন আমার দায় হয়ে যাবেন।”
আহানের কণ্ঠ শান্ত।
— “আর আপনি যদি আমাকে দূরে রাখেন,
আমি আপনার অভ্যাস হয়ে যাব।”
এই কথাটায়
সাফা হেসে ফেলল—
কিন্তু চোখ ভিজে গেল।
সেই রাতে সাফা ঘুমাতে পারল না।
বাবার নিঃশ্বাসের শব্দ,
মায়ের স্মৃতি,
আর আহানের “আমি আছি”—
সব একসাথে মাথার ভেতর।
ভোরের দিকে
সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
নিজেকে প্রশ্ন করল—
আমি কী চাই?
ভালোবাসা না নিরাপত্তা?
থাকা না পালানো?
হঠাৎ বুঝল—
সে সবসময় প্রশ্নটাই ভুল করেছে।
ভালোবাসা মানে নিরাপত্তা না।
ভালোবাসা মানে
ঝুঁকি নেওয়ার সাহস।
সকালবেলা
সে আহানকে ফোন করল।
— “আপনি আসতে পারবেন?”
কণ্ঠটা কাঁপছিল।
— “এখনই,”
আহান বলল।
ক্যাফেতে নয়।
হাসপাতালে নয়।
আজ সে চেয়েছে—
নিজের জায়গায়।
আহান এলো।
সাফা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে।
এইবার সে পিছিয়ে গেল না।
— “আমি জানি না আমি ভালো সঙ্গী হতে পারব কি না,”
সাফা বলল।
— “আমি মাঝেমধ্যে ভয় পেলে বন্ধ হয়ে যাই।”
আহান ধীরে বলল—
— “আমি জানি না আমি নরম হতে পারব কি না।
আমি নিয়ন্ত্রণ হারালে রেগে যাই।”
এই স্বীকারোক্তিগুলো
আর অজুহাত না—
এগুলো শর্ত।
সাফা গভীর শ্বাস নিল।
— “তবু,”
সে বলল,
— “আমি চাই আপনি থাকুন।”
এই বাক্যটা
তার জীবনের সবচেয়ে সাহসী।
আহান এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
— “আমি থাকব।
কিন্তু যদি আমরা ভাঙি,
দোষারোপ করব না।
একসাথে সামলাব।”
সাফার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
এইবার সে পালাল না।
ভালোবাসা
তাদের জোড়া লাগাল না হঠাৎ করে।
তাদের সব ক্ষত সারিয়ে দিল না।
কিন্তু ভালোবাসা
তাদের একই জায়গায় দাঁড় করাল—
যেখানে ভাঙলেও
একলা হতে হবে না।
আর সেটাই
তাদের গল্পের সবচেয়ে বড় মোড়।
কারণ কিছু মানুষ
জোড়া লাগে না নিখুঁতভাবে—
তারা জোড়া লাগে
সততার ফাঁকফোকর দিয়ে।
আর সেই ফাঁক দিয়েই
আলো ঢোকে।তারা একসাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিল,
কিন্তু কেউ বলেনি—
এটা সহজ হবে।
প্রথম কয়েকদিন
সবকিছু অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল।
অতিরিক্ত যত্ন,
অতিরিক্ত বোঝাপড়া—
যেন দুজনেই ভয় পাচ্ছে
একটু জোরে নিঃশ্বাস নিলেই
এই নতুন বাস্তবতা ভেঙে যাবে।
সাফা সকালবেলা চুপচাপ চা বানাত।
আহান খবরের কাগজ পড়ত।
কথা কম,
কিন্তু উপস্থিতি গভীর।
কিন্তু ভালোবাসার আসল পরীক্ষা আসে
যখন অভ্যাস তৈরি হয়।
এক সন্ধ্যায়
আহান দেরি করে ফিরল।
ফোন ধরেনি।
সাফা জানালার পাশে বসে ছিল।
অভ্যস্ত ভয়টা
ধীরে ধীরে জেগে উঠল।
মা-র সেই চলে যাওয়া,
অজানা অপেক্ষা—
সব একসাথে।
দরজা খুলল।
আহান ঢুকল, ক্লান্ত।
— “ফোন ধরোনি কেন?”
সাফার কণ্ঠ শান্ত,
কিন্তু ভেতরে ঝড়।
— “মিটিং লম্বা ছিল,”
আহান সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।
এই সংক্ষিপ্ততা
সাফার ভয়কে রাগে বদলে দিল।
— “একটা মেসেজ দিতে পারতে,”
সে বলল।
— “আমি মানুষটা কী ভাববে,
আপনি একবারও ভাবেননি।”
আহান কপাল কুঁচকাল।
— “আমি রিপোর্ট জমা দিতে ব্যস্ত ছিলাম।
আমি ব্যাখ্যা দিতে আসিনি।”
এই বাক্যটাই
আগুনে ঘি।
— “আপনি কখনোই ব্যাখ্যা দেন না,”
সাফা বলল।
— “আপনি ধরে নেন—
আপনার নীরবতাই যথেষ্ট।”
আহানের কণ্ঠ কঠিন হলো।
— “আমি আমার কাজের জন্য দুঃখিত হতে পারি না।”
এই কথাটা
সাফার বুকের ভেতর পুরোনো দরজা খুলে দিল।
— “ঠিক তাই,”
সে ফিসফিস করে বলল,
— “আপনি কখনো থাকেন না।
শুধু হাজির থাকেন।”
ঘরটা হঠাৎ খুব ছোট হয়ে গেল।
আহান চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
— “আপনি আমার ওপর আপনার ভয় চাপাচ্ছেন।”
এইবার সাফার চোখ জ্বলল।
— “আর আপনি আপনার নিয়ন্ত্রণ চাপাচ্ছেন!”
সে বলল।
— “আমি আপনার নিয়মের ভেতর ঢুকতে চাই না।”
এইটাই
তাদের প্রথম বড় ঝগড়া।
কথা বাড়ল না।
কিন্তু দেয়াল উঠল।
আহান বাইরে বেরিয়ে গেল।
রাগ করে না—
নিয়ন্ত্রণ ফেরত নিতে।
সাফা দরজা বন্ধ করে
মেঝেতে বসে পড়ল।
এইবার সে জানে—
ভালোবাসা শুরু হয়েছে ঠিকই,
কিন্তু নিরাপদ হয়নি।
রাত গভীর হলে
আহান ফিরে এলো।
চুপচাপ।
সে সোফায় বসে বলল—
— “আমি ভয় পেলে দূরে সরে যাই।”
এই কথাটা
অজুহাত না—
স্বীকারোক্তি।
সাফা ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— “আর আমি ভয় পেলে
ধরে রাখতে চাই।”
এই দুইটা ভয়
একসাথে থাকলে
সংঘর্ষ হবেই।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আহান বলল—
— “আমরা যদি এভাবে চলি,
আমরা একে অপরকে ভাঙব।”
সাফা মাথা নেড়ে বলল—
— “কিন্তু পালালে
আমরা আগেই ভাঙা থাকব।”
এই কথাটায়
আহান তাকাল।
এই প্রথম,
সে বুঝল—
এই মেয়েটা শুধু অনুভূতি না,
সে সিদ্ধান্তও।
ভালোবাসা
এখন আর গল্প না—
এখন এটা কাজ।
আর কাজের মতোই
এটার ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
পরের অংশে
এই সম্পর্ক দাঁড়াবে
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের সামনে—
থাকা মানে কি প্রতিদিন জেতা,
নাকি প্রতিদিন লড়াই করে
একসাথে থাকা?
এই প্রশ্নের উত্তর
একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে আসবে।
আর সেই ঘটনাটা
তাদের দুজনকেই
একবার আলাদা করে দেবে।
ঝগড়ার পরের দিনগুলোতে ঘরটা আগের মতোই ছিল, কিন্তু মানুষ দুটো আর আগের মতো ছিল না। একই ছাদের নিচে থেকেও তারা যেন আলাদা আলাদা কক্ষে বাস করছিল—শরীর কাছে, মন দূরে। সাফা চেষ্টা করছিল স্বাভাবিক থাকতে, কিন্তু প্রতিবার আহান দেরি করলে বা ফোনে ব্যস্ত থাকলে তার বুকের ভেতর অচেনা চাপ জমে উঠত। আর আহান, সে আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। কথা বললেই ভুল হবে—এই ভয়টা তাকে নীরবতার ভেতর আটকে রেখেছিল।
এক সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে আহান দেখল সাফা ব্যাগ গোছাচ্ছে। খুব বড় কিছু না, কয়েকদিনের জিনিসপত্র। দৃশ্যটা তার ভেতরের সব নিয়ন্ত্রণ একসাথে কাঁপিয়ে দিল।
সে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কোথাও যাচ্ছেন?”
সাফা তাকাল না। হাত থামাল না। বলল, “আমি বাবার কাছে যাচ্ছি। কয়েকদিন।”
এই “কয়েকদিন” শব্দটা আহানের কাছে হঠাৎ খুব বড় হয়ে উঠল। সে জানে, সাফার কাছে দূরে যাওয়া মানে শুধু জায়গা নেওয়া নয়—এটা নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা।
“পালাচ্ছেন?” আহান প্রশ্ন করল, গলায় অজান্তেই কঠোরতা ঢুকে পড়ল।
এইবার সাফা তাকাল। চোখে রাগ নেই, আছে ক্লান্তি। “আমি পালাচ্ছি না। আমি বুঝতে চাই—আমি থাকছি ভালোবাসা থেকে, না ভয় থেকে।”
এই কথাটার কোনো সহজ জবাব আহানের কাছে ছিল না। সে প্রথমবার বুঝল, এই সম্পর্ককে ধরে রাখতে চাইলে তাকে জিততে হবে না—নিজেকে হারাতে হবে।
“আমি আপনাকে থামাতে চাই না,” আহান ধীরে বলল। “কিন্তু আপনি যদি যান এই ভেবে যে আমি যাব বলেই আপনি যাচ্ছেন, তাহলে আমরা কখনোই ঠিক জায়গায় থাকব না।”
সাফা ব্যাগটা বন্ধ করল। জানালার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে সন্ধ্যা নামছিল, ঠিক যেমন প্রথম দিন ক্যাফেতে নেমেছিল। সেই নীরবতা, সেই অচেনা শুরু।
“আমি ভয় পাই,” সাফা অবশেষে বলল। “আপনি একদিন ক্লান্ত হয়ে যাবেন। আমার অনুভূতিতে, আমার চাওয়ায়।”
আহান তার দিকে এগিয়ে এল। এইবার আর দূরে দাঁড়াল না। “আর আমি ভয় পাই, আপনি একদিন চলে যাবেন—কারণ আমি ঠিকভাবে ভালোবাসতে জানি না।”
এই প্রথম তারা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজেদের ভয়টা একসাথে দেখল। কে ঠিক, কে ভুল—এই প্রশ্নটা তখন আর গুরুত্বপূর্ণ রইল না।
সাফা গভীর শ্বাস নিল। “আমি কয়েকদিন যাচ্ছি,” সে বলল। “ভাঙতে না। নিজেকে শুনতে।”
আহান মাথা নেড়ে বলল, “ফিরে আসবেন?”
সাফা একটু থামল, তারপর বলল, “যদি মনে হয়—এই ফিরে আসাটা আর পালানো না।”
সে চলে গেল।
ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেল, কিন্তু ভাঙা হলো না। এই আলাদা হওয়াটা প্রথমবার তাদের দূর করেনি—বরং আয়না ধরিয়ে দিয়েছিল। ভালোবাসা মানে একসাথে আটকে থাকা নয়, আবার একা হয়ে যাওয়া ও নয়। ভালোবাসা মানে, আলাদা দাঁড়িয়ে একই দিকে ফিরতে পারা।
আর এই দূরত্বটাই ঠিক করে দেবে—তারা আবার জোড়া লাগবে, নাকি এই ফাঁকটাই হয়ে উঠবে তাদের শেষ সত্য।
সাফা চলে যাওয়ার পর ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে গেল, কিন্তু সেই নীরবতা শান্তির ছিল না। আহান প্রথমবার বুঝল, কারও উপস্থিতি না থাকলেই যে ঘর ফাঁকা লাগে—এমন না; কিছু মানুষ চলে গেলে জায়গাটা শ্বাস নিতে ভুলে যায়। সে আগের মতোই সকালে উঠে কাজে গেল, রাতে ফিরল, সবকিছু নিয়ম মেনেই চলল, কিন্তু প্রতিটা নিয়মের ভেতর একটা করে প্রশ্ন আটকে থাকল—এই নিয়ন্ত্রণ কি তাকে সত্যিই নিরাপদ রাখে, নাকি ধীরে ধীরে একা করে তোলে?
সাফা বাবার বাড়িতে পৌঁছে প্রথম যে জিনিসটা টের পেল, সেটা স্বস্তি না—ক্লান্তি। পুরোনো ঘর, চেনা দেয়াল, বাবার নীরব উপস্থিতি—সবকিছু তাকে আবার সেই জায়গায় ফিরিয়ে নিল, যেখানে সে ছোটবেলা থেকেই শক্ত হয়ে থাকতে শিখেছিল। বাবা খুব বেশি প্রশ্ন করলেন না। শুধু এক সন্ধ্যায় চা খেতে খেতে বললেন, “তুই সবসময় অন্যদের বোঝাস, কিন্তু নিজেকে বোঝার সময় কবে নিবি?” এই প্রশ্নটার কোনো জবাব সাফার কাছে ছিল না। সে বুঝল, সে এসেছিল পালাতে নয়, কিন্তু থেমে দাঁড়াতে।
এই কদিনে আহান আর সাফার যোগাযোগ খুব কম ছিল। প্রয়োজনীয় খোঁজখবর, সংক্ষিপ্ত বার্তা—এর বেশি কিছু না। অথচ এই কম কথার মাঝেই তারা দুজনেই বুঝছিল, আলাদা থাকাটা কষ্ট দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু চোখ খুলেও দিচ্ছে। আহান ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল, সে যাকে ভালোবাসে তাকে ঠিক করার চেষ্টা করে না—সে শুধু নিজের ভয় ঢাকতে চায়। আর সাফা বুঝল, সে যাকে ভালোবাসে তাকে দূরে রেখে আসলে নিজেকেই শাস্তি দেয়।
এক রাতে আহান হঠাৎ ক্যাফেটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। অনেকদিন এখানে আসেনি। জানালার পাশে সেই টেবিলটা খালি। সে বসে পড়ল। প্রথম দিনের মতোই চারপাশে কোলাহল, কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত এক স্থিরতা। সে বুঝল, এই গল্পটা শুরু হয়েছিল চোখাচোখি দিয়ে, কিন্তু টিকে থাকবে কি না—তা ঠিক হবে কথাবার্তা দিয়ে নয়, সিদ্ধান্ত দিয়ে।
সেই রাতেই সে সাফাকে একটা মেসেজ পাঠাল। খুব লম্বা না। খুব আবেগীও না। শুধু লিখল—“আমি ঠিক হতে চাই না। আমি সত্য হতে চাই। আপনার সাথে, আপনার ছাড়া নয়।”
সাফা মেসেজটা পড়ল অনেকক্ষণ পরে। পড়েই উত্তর দিল না। সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাবার ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকাল। বুঝল, ভালোবাসা মানে কাউকে হারিয়ে ফেললে বেঁচে থাকা নয়, আবার কাউকে আঁকড়ে ধরে নিজেকে হারিয়েও যাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে দুজনেই নিজেদের মতো করে বাঁচতে পারা—একে অপরের ভেতর লুকিয়ে নয়, পাশে দাঁড়িয়ে।
পরদিন সকালে সাফা সিদ্ধান্ত নিল। সে বাবাকে বলল, “আমি ফিরে যাচ্ছি।” বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শুধু বললেন, “ফিরিস ঠিকই, কিন্তু নিজেকে ফেলে রেখে না।”
সাফা শহরে ফিরল। সন্ধ্যার দিকে সে ক্যাফেতে গেল। জানালার পাশের টেবিলটা আজও খালি ছিল। সে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল, আহান ঢুকল। কেউ ডাকেনি কাউকে, কেউ অবাকও হলো না—যেন দুজনেই জানত, এই দেখা আবার হবে।
আহান এগিয়ে এসে বসল। কোনো অভিযোগ, কোনো প্রশ্ন নয়। শুধু বলল, “আপনি এসেছেন।”
সাফা মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। এবার পালাতে নয়।”
এই ফিরে আসাটা কোনো সুখী সমাপ্তি না। এটা ছিল শুরু—আরও কঠিন, আরও সৎ এক শুরুর। কারণ এখন তারা জানে, ভালোবাসা তাদের জোড়া লাগাবে কিনা সেটা ভবিষ্যৎ ঠিক করবে না; সেটা ঠিক করবে তারা প্রতিদিন কীভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়ায়।
ক্যাফের জানালার পাশে বসে থাকা দুজন মানুষ অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। শহরের কোলাহল বাইরে চলছিল, কিন্তু তাদের ভেতরে তখন অদ্ভুত এক শান্ত সিদ্ধান্ত জমে উঠছিল। এই নীরবতা আর অস্বস্তির ছিল না; এটা ছিল বোঝাপড়ার, যেখানে কথা না বলেও অনেক কিছু ঠিক হয়ে যায়।
আহান প্রথম কথা বলল। তার গলায় আগের সেই কঠোরতা নেই, আবার নাটকীয় কোমলতাও নেই। সে শুধু সত্যি ছিল। সে বলল, সে জানে না ভবিষ্যৎ কেমন হবে, জানে না তারা সব ঝগড়া জিততে পারবে কি না, বা প্রতিদিন ঠিকভাবে ভালোবাসতে পারবে কি না। কিন্তু সে জানে, পালিয়ে গেলে সে নিজেকেই হারাবে, আর থেকে গেলে অন্তত চেষ্টা করার সুযোগ থাকবে।
সাফা চুপ করে শুনল। এই প্রথম সে অনুভব করল, কারও কথা তার কাঁধে বোঝা হয়ে বসছে না। সে বুঝল, সে এতদিন যাকে ভয় ভেবেছে, সেটা আসলে দায়িত্ব। ভালোবাসা তাকে বেঁধে ফেলছে না, বরং দাঁড়াতে শেখাচ্ছে।
সে বলল, সে পারফেক্ট মানুষ নয়। সে মাঝেমধ্যে ভয় পাবে, চুপ করে যাবে, দূরে সরে যেতে চাইবে। কিন্তু এবার সে পালানোর আগে বলবে। দরজা বন্ধ করার আগে জানাবে। কারণ সে বুঝে গেছে—ভালোবাসা মানে নিজেকে আড়াল করা নয়, নিজেকে দেখা যেতে দেওয়া।
তারা সেদিন কোনো প্রতিশ্রুতি দিল না। একসাথে থাকার বড় ঘোষণা করল না। শুধু সিদ্ধান্ত নিল—কথা জমে উঠলে বলবে, ভয় এলে লুকাবে না, আর একে অপরকে ঠিক করার দায়িত্ব নেবে না। পাশে থাকার দায়িত্ব নেবে।
দিনগুলো ধীরে এগোতে লাগল। ঝগড়া হলো, ভুল বোঝাবুঝি হলো, আবার সমাধানও হলো। আহান শিখল সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে নেই। কিছু জিনিস বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দিতে হয়। আর সাফা শিখল, থেকে যাওয়াটা দুর্বলতা নয়; অনেক সময় সেটাই সবচেয়ে বড় সাহস।
একদিন সন্ধ্যায় তারা আবার সেই প্রথম দিনের মতো ক্যাফের জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরে বৃষ্টি নামছিল। সাফা হেসে বলল, “ভাবলে অবাক লাগে, একটা হাসি দিয়ে শুরু হয়েছিল সবকিছু।”
আহান হালকা হাসল। “আর আজ বুঝি, ওই হাসিটা আমাকে ভাঙেনি—আমাকে খুলে দিয়েছিল।”
এই গল্পটা কোনো নিখুঁত ভালোবাসার গল্প হলো না। এখানে কেউ কাউকে সারিয়ে তোলেনি। তারা শুধু একে অপরের ভাঙা জায়গাগুলোকে সম্মান করতে শিখেছিল। কেউ কারও শেষ হয়ে ওঠেনি, আবার কেউ কারও বদলে সবকিছু হয়ে ওঠেনি।
কিন্তু তারা শিখেছিল—কিছু মানুষ জীবনে আসে থাকতে নয় বা চলে যেতে নয়, বরং শেখাতে। কীভাবে ভয় নিয়েও থাকা যায়, কীভাবে অসম্পূর্ণ হয়েও একসাথে থাকা যায়।
আর সেই শেখাটাই ছিল তাদের গল্পের শেষ কথা।
ভালোবাসা কি তাদের জোড়া লাগাল?
না, জোড়া লাগানোর মতো ভাঙা তারা আর ছিল না।
ভালোবাসা শুধু তাদের পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছিল—
নিজেদের মতো করেই, একসাথে।
এভাবেই গল্পটা শেষ হলো।
নিঃশব্দে।
সৎভাবে।
সমাপ্তি 🍁