“এই যুগে ভালোবাসা আসে নোটিফিকেশনে, কিন্তু সায়ার জীবনে প্রথম চিঠিটাই হয়ে উঠল শেষ।”
***সায়া কখনো চিঠি পায়নি।
এই যুগে চিঠি আসে না—মেসেজ আসে, নোটিফিকেশন আসে, হঠাৎ দেখা যায় “typing…”
কিন্তু সেই সকালে, দরজার নিচ দিয়ে সাদা খামটা গড়িয়ে আসার শব্দে সে থমকে গিয়েছিল।
খামের ওপর হাতের লেখা—
“সায়া”
একটাই শব্দ।
কিন্তু লেখার ভঙ্গিটা এমন ছিল, যেন কেউ নামটা লিখতে লিখতে থেমে গেছে, আবার লিখেছে, আবার মুছে ফেলতে চেয়েছে।
নীলের লেখা।
সায়া জানত।
কারণ নীলের হাতের লেখা সে চিনত—স্কুলের পুরোনো নোটবইয়ের পাতায়, বেঞ্চের নিচে, পরীক্ষার খাতার শেষ পাতায়।
খাম খুলতে তার হাত কাঁপছিল।
কেন জানি মনে হচ্ছিল—এই চিঠি খুললে কিছু একটা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক টুকরো কাগজ—ভাঁজ করা, বহুবার খুলে আবার ভাঁজ করা হয়েছে বোঝা যায়। কাগজের কোণাগুলো একটু নরম, যেন অনেকক্ষণ হাতে ধরা ছিল।
কাগজে নীল কালির লেখা।
প্রথম লাইনে চোখ পড়তেই সায়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
“সায়া,
এই চিঠিটা তোমার কাছে পৌঁছাবে—এই বিশ্বাসটাই আমার সবচেয়ে বড় সাহস।”
সায়া বসে পড়ল।
পা দুটো আর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না।
নীলের লেখা চলতে থাকল—
“আমি জানি, হঠাৎ চিঠি পাওয়া অদ্ভুত লাগছে।
এই যুগে মানুষ বিদায় নেয় ‘last seen’ দিয়ে,
কিন্তু আমি চেয়েছিলাম—আমার বিদায়টা যেন হাতে ধরা যায়।”
সায়ার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
নীল বরাবরই এমন—অল্প কথায় গভীর আঘাত।
“তুমি হয়তো কখনো খেয়াল করোনি,
কিন্তু তোমার জীবনের সব নীরব মুহূর্তে আমি ছিলাম।
তুমি যখন হাসতে, আমি দূরে সরে যেতাম—
কারণ তোমার হাসির মাঝে আমি থাকতে চাইনি বোঝা হয়ে।”
সায়ার আঙুল কেঁপে উঠল।
সে কি সত্যিই কখনো খেয়াল করেনি?
“আমি কখনো তোমাকে বলিনি ভালোবাসি।
কারণ আমি জানতাম—
কিছু ভালোবাসা বলা মানেই হারিয়ে ফেলা।”
চিঠির মাঝখানে এসে লেখা একটু বেঁকে গেছে।
কালি গাঢ়।
“আজ লিখছি, কারণ আর না লিখে থাকা যাচ্ছে না।
যখন তুমি এই চিঠি পড়বে,
আমি হয়তো এই শহরে থাকব না।
হয়তো এই জীবনেও না।”
সায়া উঠে দাঁড়াল।
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
“ভয় পেয়ো না, সায়া।
আমি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি না।
আমি শুধু এমন একটা জায়গায় যাচ্ছি,
যেখানে আর তোমাকে কষ্ট দিয়ে ভালোবাসতে হবে না।”
চিঠির শেষ দিকে এসে শব্দগুলো ছোট হয়ে গেছে,
যেন সময় ফুরিয়ে আসছে।
**“এইটাই আমার প্রথম চিঠি।
আর শেষ।
কারণ আমার কাছে তুমি ছিলে একটাই গল্প—
যেটা শুরু থেকেই শেষের জন্য লেখা ছিল।
ভালো থেকো।
যদি কখনো চিঠি হাতে নিয়ে আমাকে মনে পড়ে—
জেনো, আমি তখনো তোমাকে ভালোবাসি।
—নীল”**
চিঠিটা সায়ার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল।
ঘরটা হঠাৎ খুব নিঃশব্দ হয়ে গেল,
ঠিক যেমন নীলের চলে যাওয়ার পর তার জীবনটা হতে চলেছে।
সায়া বুঝে গেল—
সে শুধু একটা চিঠি পড়েনি,
সে একজন মানুষকে হারিয়েছে।
আর কিছু হারানো
কখনো ফিরে আসে না—
শুধু চিঠির ভাঁজে ভাঁজে থেকে।
নীলের চিঠি সেখানেই শেষ হয়নি ___
নীলের শেষ চিঠি
সায়া,
এই চিঠিটা লিখতে বসে অনেকবার কলম থামিয়েছি।
কারণ কিছু কথা লিখলে সত্যি হয়ে যায়,
আর আমি জানতাম—এই চিঠি শেষ হলেই আমার থাকা শেষ হয়ে যাবে।
তুমি একদিন বলেছিলে, এই যুগে কেউ আর চিঠি লেখে না।
আমি তখন হাসছিলাম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভাবছিলাম—
যদি কখনো লিখি, সেটা হবে এমন কিছু, যেটা মুছে ফেলা যাবে না।
এই চিঠি তাই।
আমি জানি না, তুমি কখনো বুঝেছ কিনা—
তোমার জীবনের সবচেয়ে নীরব সময়গুলোতে আমি ছিলাম।
তুমি যখন অন্যদের সামনে হাসতে,
আমি তখন দূরে দাঁড়িয়ে নিজেকে বোঝাতাম—
ভালোবাসা মানে কাছে থাকা নয়,
ভালোবাসা মানে বোঝা না হওয়া।
আমি কখনো তোমাকে বলিনি আমি কেমন অনুভব করি।
কারণ আমি ভয় পেতাম—
যদি বলি, আর তুমি না পারো সেই ভার নিতে?
তাই চুপ করে থাকা শিখে নিয়েছিলাম।
চুপ করে থাকা খুব কঠিন, সায়া,
কিন্তু তোমাকে কষ্ট দেওয়ার চেয়ে সহজ।
আজ লিখছি, কারণ আর না লিখে থাকা যাচ্ছে না।
আমি জানি, তুমি যখন এই চিঠি পড়বে,
আমি হয়তো এই শহরে থাকব না।
হয়তো এই জীবনের মাঝেও না।
ভয় পেয়ো না—আমি পালাচ্ছি না।
আমি শুধু এমন একটা জায়গায় যাচ্ছি,
যেখানে তোমাকে দূর থেকে ভালোবাসলেও অপরাধ হবে না।
এইটাই আমার প্রথম চিঠি,
আর শেষ।
কারণ আমার কাছে তুমি ছিলে একটাই গল্প—
যেটা শুরু থেকেই শেষের জন্য লেখা ছিল।
যদি কখনো মনে হয়,
কেউ নিঃশর্তভাবে তোমাকে ভালোবেসেছিল,
কিছু না চেয়ে, কিছু না বলেই—
তাহলে জেনো, সে আমি ছিলাম।
ভালো থেকো, সায়া।
খুব ভালো থেকো।
— নীল