ভুল পথে পেলাম তোমাকে – Part 9
“ছায়াদের ইতিহাস – মায়ার জন্মরহস্য”
রাত নেমেছে।
ইরা মায়ার পাশে শুয়ে আছে, কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই।
মায়ার শরীর এখনো উত্তপ্ত-ঠান্ডা—
যেন আগুন আর বরফ একইসাথে বয়ে যাচ্ছে তার শিরায়।
পূর্ণ ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে,
কিন্তু এর পরের অস্থিরতা মাত্র শুরু।
ইরা নিঃশব্দে মায়ার গালে হাত রাখল।
মায়া চোখ খুলল।
ধীরে হাসল—
সেই অল্প-দেখা দুঃখমাখা হাসি।
— “ঘুমাসনি?”
— “তুমি ঘুমাচ্ছো না আমি কীভাবে ঘুমাই, মায়া?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর ধীরে বলল—
— “ইরা…
তুই সত্য জানতে চাস?”
ইরা তাকিয়ে রইল তার চোখে।
— “হ্যাঁ।
তোমার সব সত্য।”
মায়ার চোখের কালো গভীরতা যেন আরও অন্ধকার হয়ে উঠল।
— “তাহলে শুন…”
সে ফিসফিস করল।
“আজ আমি তোকে আমার জন্মরহস্য বলব।
যা কেউ জানে না…
এমনকি ছায়ারাও না।”
ইরার শ্বাস ঠান্ডা হয়ে এল।
মায়া এতদিন যা লুকিয়ে রেখেছিল,
সেটা আজ বাইরে আসছে।
◼︎ ১. অন্ধকারের আগের জন্ম
মায়া জানাল—
— “আমি এই দুনিয়ায় জন্মাইনি, ইরা।
অন্তত পুরোটা নয়।”
ইরা চমকে উঠল।
— “তোমার মানে?”
মায়া ধীরে, ভারী কণ্ঠে বলল—
— “আমি অর্ধ-ছায়া।
মানে অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক ছায়া।
এই দুই পৃথিবী যে কখনো এক হতে পারে—
তা কেউ বিশ্বাস করত না…
যতক্ষণ না আমার মা ভুল করে প্রেমে পড়ে।”
ইরা স্থির হয়ে শুনছে।
— “আমার মা ছিল মানুষ।
আর আমার বাবা… পূর্ণ ছায়া।”
ইরা হালকা কেঁপে উঠল।
মায়া ভয় পেল সে হয়তো পিছিয়ে যাবে।
কিন্তু ইরা তার হাত আরও জোরে ধরল।
— “চালিয়ে যাও।”
মায়ার চোখ নরম হলো।
— “ছায়ারা মানুষের আকৃতি নেয়,
তাদের ছায়ায় ঢুকে কথা বলে—
এতে মানুষ দুর্বল হয়,
কিন্তু কখনো কখনো…
মানুষ তাদের প্রেমেও পড়ে।”
ইরা ফিসফিস—
— “তোমার মা…?”
— “হ্যাঁ।
সে প্রেম করেছিল এক পূর্ণ ছায়ার সঙ্গে।
ভেবেছিল সে মানুষ…
যতক্ষণ না গর্ভধারণ করে।”
মায়ার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল—
— “আমার জন্মটাই ছিল নিষিদ্ধ।
কারণ অর্ধ-ছায়া শিশুরা
অন্ধকার আর আলো—
দুটোই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”
ইরা বিস্ময়ে—
— “তোমার শক্তি এত ভয়ানক কারণ এটাই?”
মায়া মাথা নেড়ে বলল—
— “হ্যাঁ।
ছায়ারা ভয় পায় আমাকে।
মানুষরাও ভয় পায়।
কারণ আমি দুই দুনিয়ার মিলনবিন্দু।”
◼︎ ২. মায়াকে হত্যা করার চেষ্টা
মায়া জানাল—
— “আমার জন্মের আগেই ছায়ারা সিদ্ধান্ত নেয়,
আমি বেঁচে থাকতে পারি না।
কারণ আমি বড় হলে
তাদের শাসন শেষ হতে পারে।”
ইরা আতঙ্কে—
— “তারা তোমাকে মারতে চেয়েছিল?”
মায়ার ঠোঁটের কোণে নির্লিপ্ত হাসি।
— “চেয়েছিল না, চেষ্টা করেছিল।”
ইরা গিলে ফেলল লালা।
— “…তারপর?”
মায়ার চোখ ঠান্ডা হয়ে গেল—
— “আমার বাবা…
আমাকে বাঁচাতে গিয়ে মারা যায়।”
ইরা চমকে উঠল—
— “একটা ছায়া…
তোমার জন্য নিজের জীবন দিল?”
মায়া মাথা নেড়ে বলল—
— “হ্যাঁ।
ছায়া হলেও…
সে আমাকে ভালোবাসত।”
ইরার বুকটা কি যেন টান দিয়ে উঠল।
একটা প্রশ্ন তার মনে ঘুরছে—
মায়া কি কাউকে…
কখনো…
ভালোবেসেছিল?
কিন্তু সে চুপ।
মায়া চালিয়ে গেল—
— “আমার মা আমাকে মানুষ দুনিয়ায় লুকিয়ে ফেলেছিল।
একটা ছোট গ্রামে।
কেউ জানত না আমি কি।”
ইরা বলল—
— “তুমি কি সবসময় এভাবে… ছায়া দেখতে পেতে?”
মায়া ধীরে বলল—
— “হ্যাঁ।
জন্ম থেকেই।”
◼︎ ৩. কেন ইরা?
ইরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
— “কিন্তু…
তুমি আমাকে কেন বাঁচাতে চাও?
আমি তোমার কে?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বলল—
— “কারণ তুই আলোর জন্ম।
যাকে আমি কখনো ছুঁতে পারব না…
তবুও ছুঁতে চাই।”
ইরা স্তব্ধ।
মায়া ফিসফিস করল—
— “তোকে দেখার দিনই বুঝেছিলাম—
তুই আমার অন্ধকারকে নরম করে দিতে পারিস।
ছায়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিস।
আর…
আমাকে থামাতে পারিস।”
ইরার গলা শুকিয়ে গেল।
— “থামাতে?”
মায়া চোখ নামাল—
— “হ্যাঁ।
কারণ আমি রেগে গেলে
মানুষ আর ছায়ার সীমা ভুলে যাই।
আমি… বিধ্বংসী হয়ে যাই।”
ইরা নিঃশব্দে তার গালে হাত রাখল।
— “আমাকে ঠেলে দূরে দেবে ভাবছ?”
মায়া ফিসফিস—
— “আমি তোকে ভাঙতে চাই না।”
ইরা গম্ভীর স্বরে—
— “মায়া…
তুমি আমাকে কখনো ভাঙতে পারবে না।
কারণ তুমি ভাঙার আগেই
আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরব।”
মায়া থমকে গেল।
তার চোখ ভিজে উঠল।
◼︎ ৪. ছায়ারা কেন ইরাকে চায়?
ইরা ধীরে প্রশ্ন করল—
— “পূর্ণ ছায়া আমাকে কেন চায়?”
মায়ার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
— “কারণ তুই আলো।
তুই এমন আলো—
যা ছায়াকে শেষ করে দিতে পারে।”
ইরা অবাক—
— “কিন্তু আমি তো কিছুই জানি না…”
মায়া বলল—
— “কিন্তু তোর শরীরে সেই আলো আছে।
শুধু জাগেনি।”
ইরা চুপচাপ।
মায়া যোগ করল—
— “আর একবার তোর আলো পুরো জাগলে…
তুই আমাকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারবি।”
ইরা চমকে উঠল—
— “তুমি চাইছ আমি তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করি?”
মায়া ধীরে বলল—
— “তাই তো তোকে কাছে রাখি।
কারণ তুই যদি না থাকিস…
আমি অন্ধকারের হাতে চলে যাব।”
ইরার মন কাঁপল।
— “মানে… আমি তোমার জন্য প্রয়োজন?”
মায়া ফিসফিস—
— “না।
তুই প্রয়োজন না, ইরা…
তুই আমার বাঁচার কারণ।”
ইরার শ্বাস থেমে গেল।
◼︎ ৫. কপালের চুম্বন
ইরা মায়ার মুখটা নিজের দিকে টেনে নিল।
মায়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
ইরা বলল—
— “ছায়ারা তোকে ভয় পায়,
মানুষ তোকে বোঝে না…
কিন্তু আমি তোকে দেখি।
পুরোপুরি।”
ধীরে, খুব ধীরে
ইরা তার কপালে চুমু দিল।
মায়ার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
সে কেঁপে উঠল।
ইরার চুমুতে
মায়ার পুরো শরীর কোমল হয়ে গেল।
মায়া ফিসফিস করে বলল—
— “ইরা…
তুই যদি কখনো আমার থেকে দূরে যাস…
আমি অন্ধকার হয়ে যাব।”
ইরা তার হাত ধরে বলল—
— “আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
মায়া প্রথমবার
মানুষের মতো হাসল।
একটু ব্যথা,
একটু ভালোবাসা,
একটু ভয়…
সব মিলিয়ে।
◼︎ ৬. ছায়ার রাজা—মায়ার শত্রু
মায়া হঠাৎ থামল।
তার চোখ ভয়ঙ্কর অন্ধকার হয়ে গেল।
ইরা বুঝল—
পরের কথাটা বিপজ্জনক।
মায়া ধীরে বলল—
— “পূর্ণ ছায়া যাকে তুই দেখেছিস…
সে তো ছোট শিকারি।”
ইরা আমলে নিল—
— “তাহলে বড় কে?”
মায়ার চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
— “ছায়াদের রাজা।
অন্ধকারের সর্বোচ্চ শাসক।
সে-ই নির্দেশ দিয়েছে তোকে ধরার।
কারণ তোর আলো…
ওর রাজত্ব শেষ করতে পারে।”
ইরার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেল।
— “সে কি তোমাকে চেনে?”
মায়া চোখ ঘুরিয়ে বলল—
— “ও আমাকে খুঁজছে।
কারণ আমি একমাত্র অর্ধ-ছায়া
যে রাজাকে হত্যা করতে পারে।”
ইরা স্তব্ধ।
মায়া বলল—
— “এবার তোর আলো আর আমার অন্ধকার—
দু’টোই ওর লক্ষ্য।”
ইরা তার হাত ধরে বলল—
— “আমরা একসাথে লড়ব।”
মায়া তার দিকে তাকিয়ে বলল—
— “একসাথে…
কিন্তু মনে রাখ…
যত তুই আমার কাছে আসছিস…
অন্ধকার তোকে আরও চাইছে।”
ইরা হাসল—
— “ভালো।
কারণ আমার আলো তোমাকে ছাড়া জ্বলে না।”
মায়ার চোখ থমকে গেল।
তারপর ধীরে
সে ইরাকে বুকের দিকে টেনে নিল।
— “তুই…
আমার আলো।”
আর ইরা ফিসফিস করে বলল—
— “আর তুমি… আমার ছায়া।”
এই দুই শব্দে
দু’জনের ভাগ্য সিল হয়ে গেল।
মায়া আর ইরা— আলো আর অন্ধকার— এবার সত্যিই
ছায়ার রাজাকে চ্যালেঞ্জ করে ফেলল।