ভুল পথে পেলাম তোমাকে – Part 10
“অন্ধকারের তৃতীয় নিয়ম — যার ভয় সবচেয়ে গভীর, তাকে রক্ষা করতে গেলে আত্মা কেটে যায়”
ঘরটা নিস্তব্ধ।
ইরা মায়ার কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে—
দু’জনেই হাঁপাচ্ছে, কিন্তু কেউ আলাদা হতে চাইছে না।
মায়ার আঙুল ইরার পিঠে থরথর করছে।
যেন এই মুহূর্তে সে কাউকে হারানোর ভয় পাচ্ছে।
ইরা ফিসফিস করল—
“মায়া… তুমি ভয় পাচ্ছ?”
মায়া চোখ বন্ধ করে বলল—
“তোকে হারানোর ভয়… ভয় নয় ইরা— সেটা আমার অভিশাপ।”
ইরা তার গালে হাত রাখতেই
মায়া ইরাকে আরও কাছে টেনে নিল।
মায়া ধীরে বলল—
“আজ থেকে তুই শুধু আলো নোস…
তুই আমার কেন্দ্র।”
ইরা অবাক—
“কেন্দ্র?”
মায়া মাথা নেড়ে বলল—
“হ্যাঁ… ছায়াদের জগতে যার জন্য অন্ধকার বদলায়… তাকে কেন্দ্র বলে।
আর তোকে নিয়ে আজ অন্ধকার বদলে গেছে।”
ইরা কিছু বলার আগেই
ঘরের বাতি হঠাৎ বুজে গেল।
মায়ার শরীর টানটান হয়ে উঠল।
শশশশশশ…
সেই ঠান্ডা শ্বাস আবার।
ইরা মায়ার হাতে আঁকড়ে ধরল—
“আবার?”
মায়া ফিসফিস করল—
“না… এটা পূর্ণ ছায়া নয়।
এটা অন্য কিছু।”
হঠাৎ
দরজা নিজে নিজে খুলে গেল।
মায়া ইরাকে নিজের পিছনে ঠেলে বলল—
“একেবারে নড়বি না।”
অন্ধকারের মধ্যে
একজোড়া সোনালি চোখ জ্বলে উঠল।
ইরা থমকে গেল—
“এগুলো কি… সাদা আলো নয়।”
মায়ার মুখ বিবর্ণ।
“না… এটা অন্ধকারের আগে জন্মানো জাতি।”
ইরা বুঝতে পারল না—
“মানে?”
মায়া শ্বাস ধীরে ফেলল—
“তারা আলোক-পূর্ব আত্মা…
যাদের মানুষ আলো ভাবে, কিন্তু আসলে…
তারা ছায়ার চেয়েও বিপজ্জনক।”
ইরা কেঁপে উঠল।
পূর্ণ ছায়ার থেকেও বেশি বিপজ্জনক?
সোনালি চোখ দুটি এগিয়ে এল।
মায়ার সামনে দাঁড়াল।
একটা মেয়ে।
মুখ অদ্ভুত শান্ত।
কিন্তু সেই শান্তির মধ্যে ভয় লুকিয়ে আছে।
মেয়েটি বলল—
“মায়া… এটাই তোমার কেন্দ্র?”
মায়া রাগে গর্জে উঠল—
“তার নাম ইরা।
আর হ্যাঁ, ও-ই আমার কেন্দ্র। কেন?”
মেয়েটি ধীরে হাসল—
“তাহলে ঠিকই শুনেছি।
ছায়ার সন্তান… এক মানুষের জন্য নিজের শক্তি ভেঙে দিচ্ছে।”
ইরা আঁতকে উঠল—
“কে তুমি?”
মেয়েটি মাথা নিচু করে বলল—
“আমরা ‘ঈশার জাতি’।
অন্ধকারের ভ্রূণ… কিন্তু আলো হওয়ার আগে থেমে যাওয়া শক্তি।”
ইরা কিছুই বুঝল না।
মায়া বলল—
“ওরা ছায়া নয়। আলোও নয়।
ওরা… মধ্যশক্তি।
যারা আলোকেও শত্রু ভাবে, ছায়াকেও।”
মেয়েটি শান্ত কণ্ঠে বলল—
“আমরা খবর পেয়েছি—
পূর্ণ ছায়া তোমার কেন্দ্রকে দাবি করেছে।
তুমি বাধা দিচ্ছো।
এটা ছায়ার নিয়মের বিরুদ্ধে।”
ইরা কষ্টে বলল—
“নিয়ম মানলে কি ভালোবাসা হয়?”
মেয়েটি ইরার দিকে তাকাল।
এক মুহূর্তের জন্য মনে হল সে ইরাকে লক্ষ্য করছে… পরখ করছে।
— “ভালোবাসা?
ছায়ার জগতে সেটা অস্তিত্বই নেই।”
মায়া রাগে ফেটে পড়ল—
“আমাকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ নেই।
আর আমার কেন্দ্রকে নিয়ে তো কেউই নয়।”
মেয়েটি ধীরে এগিয়ে এসে ইরার ঠিক সামনে দাঁড়াল।
ইরা তার নিঃশ্বাসে বরফের গন্ধ পেল।
তার চোখে একটা অদ্ভুত ভয় দেখল।
মেয়েটি ফিসফিস করল—
“তুমি জানো মায়ার পাশে থাকা মানে কী?”
ইরা বলল—
“আমি জানি।”
মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল—
“না, তুমি জানো না।
মায়া যতটা শক্তিশালী… তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও তুমিই।”
মায়া তাকে ঠেলে পিছিয়ে দিল—
“আমাকে ধমক দিও না। ইরার দিকে তাকাবেও না।”
মেয়েটি হাসল—
“আমি তোমাকে সতর্ক করতে এসেছি।
পূর্ণ ছায়ার চেয়ে বড় এক শক্তি তোমাদের পথে আছে।”
ইরা কাঁপল—
“পূর্ণ ছায়ার থেকেও বড়?”
মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল—
“হ্যাঁ। ছায়ার নেপথ্য-জন্মদাতা।
উনি খুব দ্রুতই জানতে পারবেন
তুমি, মায়া…
এক মানুষের জন্য নিজের অন্ধকার বিকৃত করেছো।”
মায়ার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
ইরা বুঝতে পারল—
এটা এমন কিছু, যা মায়াকেও ভয় দেখায়।
মেয়েটি বলল—
“কেন্দ্রকে রক্ষা করতে হলে
মায়াকে নিজের অর্ধেক আত্মা কেটে ফেলতে হবে।”
ইরা হাঁ করে তাকাল—
“মানে?!”
মেয়েটি বলল—
“যত বেশি সে তোমাকে ভালোবাসবে,
তত বেশি তার শক্তি কমবে…
আর ছায়াদের রাজা ওকে শিকার বলে গণ্য করবে।”
মায়া চিৎকার করে উঠল—
“চুপ!! ইরার সামনে এসব বলবি না!”
মেয়েটি ঘুরে দাঁড়াল।
“আমার কথা মনে রেখো, ইরা।
তুমি যার কেন্দ্র…
তাকে ভালোবাসা মানে
একটি যুদ্ধকে নিজের ঘরে ডেকে আনা।”
সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঘর নিঃশব্দ।
ইরা ধীরে মায়ার দিকে তাকাল—
“মায়া… সত্যি?”
মায়া কিছু বলল না।
শুধু ইরার হাতটা ধরে নিজের বুকে চেপে ধরল।
ইরা ফিসফিস করে বলল—
“আমাকে নিয়ে ভয় পেলে তুমি আরও বেশি আঘাত পাবে… তাই না?”
মায়া চোখ বন্ধ করে মাথা নেড়ে বলল—
“…হ্যাঁ।”
ইরা বলল—
“তুমি তাহলে আমাকে দূরে ঠেলে দেবে?”
মায়া ইরার থুতনি ধরে মাথা তুলল—
“তুই দূরে গেলে তো আমি মরে যাবি।”
ইরা চোখ ভিজে বলল—
“তাহলে?”
মায়া ধীরে বলল—
“তাহলে যুদ্ধ শুরু হলো, ইরা।”
ইরা অবাক—
“কিসের যুদ্ধ?”
মায়া চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
“তোকে বাঁচানোর জন্য
আমি পুরো অন্ধকার-জগতের বিরুদ্ধে লড়ব।”
ইরা তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল—
“আর আমি?
আমি লড়ব তোমার পাশে।”
মায়া হাসল—
“তুই আমার আলো আর আমার অন্ধকার।
এবার আমাদের সামনে যা আসবে—
আমরা দু’জন মিলে শেষ করব।”
ঘর নিঃশব্দ।
দু’জনের নিঃশ্বাস এক হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু জানলার বাইরে
কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।
এক ফোঁটা ছায়া নয়।
এক ফোঁটা আলো নয়।
বরং—
একটি মধ্যশক্তির ঝড়।
সে ফিসফিস করে বলল—
“মায়া…
তুমি নিয়ম ভেঙেছ।
এবার অন্ধকার নিজে তোমাকে খুঁজতে নামবে।”