মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৯৬
ভীষ্ম কর্তৃক অজগরব্রত ও কামনা ত্যাগের বিষয়ে উপদেশ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
ভীষ্ম কর্তৃক অজগরব্রত ও কামনা ত্যাগের বিষয়ে উপদেশ
ব্রাহ্মণ ও সেনজিৎ-এর কাহিনি বলার শেষে ভীষ্ম বললেন, শম্পাক নামে এক ব্রাহ্মণ তার পত্নীর আচরণে এবং খাদ্যবস্ত্রের অভাবে কষ্ট পেয়ে সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, মানুষ জন্মাবধি যে সুখদুঃখ ভোগ করে, সে সমস্ত যদি সে দৈবকৃত মনে করে তবে আনন্দিত বা ব্যথিত হয় না। যার কিছুই নেই তিনি সুখে নিদ্রা যান, তার শত্রু হয় না। ধনবানের তুলনায় দারিদ্রতারই গুণ অধিক। বিদেহরাজ জনক বলেছিলেন, আমার ধনের অন্ত নেই, তবুও আমার কিছুই নেই। মিথিলারাজ্য পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও আমার কিছুই নষ্ট হয় না।
দানবরাজ প্রহ্লাদ এক ব্রাহ্মণকে বলেছিলেন, আপনি নির্লোভ শুদ্ধস্বভাব দয়ালু জিতেন্দ্রিয় ঈর্ষাহীন মেধাবী ও প্রাজ্ঞ, তথাপি বালকের মতো আচরণ করেন। আপনি লাভ বা লোকসানে আনন্দিত বা দুঃখিত হন না, ধর্ম অর্থ ও কামেও আপনি উদাসীন। আপনার তত্ত্বজ্ঞান শাস্ত্র ও আচরণ সম্পর্কে আমাকে বলুন। ব্রাহ্মণ বললেন, প্রহ্লাদ, অজ্ঞাত কারণ থেকে জীবগণের উৎপত্তি ও বিনাশ হয়। মহাকায় ও সূক্ষ্ম, স্থাবর ও জঙ্গম সকল জীবেরই মৃত্যু হয়। আকাশচারী জ্যোতিষ্কগণেরও পতন হয়। সকলেরই মৃত্যু হবে এই জেনে আমি সুখে নিদ্রা যাই। যদি লোকে দেয় তবে খাদ্য খাই, না পেলে অভুক্ত থাকি। কখনও সামান্য অন্ন, কখনও পলান্ন খাই। কখনও পালঙ্কে বা কখনও মাটিতে শুই। কখনও ছিন্নবস্ত্র কখনও মহামূল্য বস্ত্র পরি। স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত না হয়ে রাগ-দ্বেষা ত্যাগ কোরে পবিত্রভাবে আমি অজগরব্রত আচরণ করছি। অজগর যেমন দৈবক্রমে পাওয়া খাদ্যে তুষ্ট থাকে, আমিও তেমন যখন যেমন পাই তাতেই তুষ্ট থাকি। আমার শয়ন বা ভোজনের নিশ্চয়তা নেই, আমি সুখের অনিত্যতা উপলব্ধি কোরে পবিত্রভাবে এই অজগরব্রত পালন করছি।
যুধিষ্ঠির, কশ্যপবংশীয় এক ঋষিপুত্র কোনও বৈশ্যের রথের নীচে পড়ে আহত হয়েছিলেন। ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি প্রাণত্যাগের সংকল্প করলেন। তখন ইন্দ্ৰ শিয়ালের রূপ ধারণ কোরে তার কাছে এসে বললেন, তুমি দুর্লভ মানবজন্ম, ব্রাহ্মণত্ব ও বেদবিদ্যা লাভ করেছ। তোমার দুখানি সক্ষম হাত আছে, তার দ্বারা সকল কাজ করতে পারো। সৌভাগ্যক্রমে তুমি শিয়াল কীট ইঁদুর সাপ বা ব্যাং হওনি, মানুষ এবং ব্রাহ্মণ হয়েছ, এতেই তোমার সন্তুষ্ট থাকা উচিত। আমার অবস্থা দেখো, আমার হাত নেই, কীট-পতঙ্গ কামড়ালে তাড়াতে পারি না। আবার আমার চেয়েও নিকৃষ্ট জীব আছে। অতএব তুমি নিজের অবস্থায় তুষ্ট হও। মদ ও চড়াই পাখির মাংস অপেক্ষা উত্তম খাদ্যবস্তু কিছুই নেই, কিন্তু তুমি এই দুইএর স্বাদ জানো না এজন্য তোমার কামনা নেই। অতএব খাওয়া, স্পর্শ করা, দেখা ইদ্যাদি দমন করাই উচিৎ। তুমি প্রাণ বিসর্জনের সংকল্প ত্যাগ কোরে ধর্মাচরণে উদ্যোগী হও। এইপ্রকার উপদেশ দিয়ে ইন্দ্র নিজ রূপ ধারণ করলেন, তখন ঋষিপুত্র দেবরাজকে পূজা কোরে নিজের গৃহে চলে গেলেন।
______________
(ক্রমশ)