মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৮৫
ভীষ্মের কাছে কৃষ্ণ-যুধিষ্ঠিরাদির গমন এবং রাজধর্মের বিষয়ে ভীষ্মের উপদেশ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
ভীষ্মের কাছে কৃষ্ণ-যুধিষ্ঠিরাদির গমন এবং রাজধর্মের বিষয়ে ভীষ্মের উপদেশ
একদিন যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের আলয়ে গিয়ে দেখলেন, তিনি হলুদ বস্ত্র পরে দিব্য আভরণে ভূষিত হয়ে বুকে কৌস্তুভ মণি ধারণ কোরে একটি বৃহৎ পালঙ্কে বসে রয়েছেন। ধর্মরাজ কৃতাঞ্জলি হয়ে কৃষ্ণকে ডাকলেন, কিন্তু কৃষ্ণ উত্তর না দিয়ে ধ্যানস্থ হয়ে রইলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, কি আশ্চর্য, অমিতবিক্ৰম কৃষ্ণ, তুমি ধ্যান করছ! ত্রিলোকের মঙ্গল তো? তুমি স্থির শিখাযুক্ত দীপ এবং পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে আছ। যদি গোপনীয় হয় এবং আমি যদি শোনবার যোগ্য হই তবে তোমার এই ধ্যানের কারণ আমাকে বলো।
ঈষৎ হেসে কৃষ্ণ উত্তর দিলেন, শরশয্যাশায়ী ভীষ্ম আমাকে ধ্যান করছেন, সেজন্য আমার মন তার দিকে গিয়েছিল। এই পুরুষশ্রেষ্ট স্বর্গে গেলে পৃথিবী চন্দ্রহীন রাত্রির সমান হবে। আপনি তার কাছে গিয়ে আপনার যা জানবার আছে জিজ্ঞাসা করুন। যুধিষ্ঠির বললেন, তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা ভীষ্মের কাছে যাবো। কৃষ্ণ সাত্যকিকে আদেশ দিলেন, আমার রথ প্রস্তুত করতে বলো।
এই সময়ে দক্ষিণায়ণ শেষ হয়ে উত্তরায়ণ আরম্ভ হয়েছিল। ভীষ্ম একাগ্রচিত্তে তার আত্মাকে পরমাত্মায় সমাবিষ্ট কোরে কৃষ্ণের ধ্যান করতে লাগলেন। বেদব্যাস নারদ অসিত বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্র বৃহস্পতি শুক্র কপিল বাল্মীকি ভার্গব কশ্যপ প্রভৃতি ভীষ্মকে ঘিরে রইলেন।
কৃষ্ণ, সাত্যকি, যুধিষ্ঠির ও তার ভাইয়েরা, কৃপাচার্য, যুযুৎসু এবং সঞ্জয় রথে চড়ে কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন। তারা দেখলেন, ওঘবতী নদীর তীরে পবিত্র স্থানে ভীষ্ম শরশয্যায় শুয়ে আছেন, মুনিগণ তার উপাসনা করছেন। বেদব্যাস আদি মহর্ষিগণকে অভিবাদন কোরে কৃষ্ণ কিঞ্চিৎ কাতর হয়ে ভীষ্মকে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে প্রশ্ন করলেন। তার পর কৃষ্ণ বললেন, পুরুষশ্রেষ্ঠ, আপনি যখন সুস্থদেহে সমৃদ্ধ রাজ্যে বাস করতেন তখন অসংখ্য সুন্দরী নারীতে পরিবৃত হলেও আপনাকে ঊর্ধ্বরেতা দেখেছি। আপনি ভিন্ন অন্য কেউ মৃত্যুকে রোধ কোরে শরশয্যায় শুয়ে থাকতে পারে এমন আমরা শুনিনি। সর্বপ্রকার ধর্মের তত্ত্ব আপনার জানা আছে। জ্যেষ্ঠপাণ্ডব যুধিষ্ঠির জ্ঞাতিবধের জন্য অনুতপ্ত হয়েছেন, এঁর শোক আপনি দূর করুন।
হে মহাবীর, আপনার জীবনের আর ছাপ্পান্ন দিন অবশিষ্ট আছে, তার পরেই আপনি দেহত্যাগ করবেন। আপনি পরলোকে গেলে আপনার সমস্ত অমূল্য জ্ঞান আমাদের কাছে অজানা থেকে যাবে এই কারণে যুধিষ্ঠিরাদি আপনার কাছে ধর্মের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে এসেছেন।
ভীষ্ম কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, তোমার কথা শুনে আমি আনন্দ আপ্লুত হয়েছি। হে কৃষ্ণ, তোমার কাছে আমি কি বলবো? তুমি সর্বজ্ঞ। দুর্বলতার ফলে আমার বাকশক্তি ক্ষীণ হয়েছে, বোধশক্তিও লোপ পেয়েছে, কেবল তোমার প্রভাবেই জীবিত রয়েছি। কৃষ্ণ, তুমি শাশ্বত জগৎকর্তা, গুরু উপস্থিত থাকতে শিষ্যতুল্য আমি কি কোরে উপদেশ দেবো?
কৃষ্ণ বললেন, মহামতি ভীষ্ম, আমার বরে আপনার গ্লানি মোহ কষ্ট ক্ষুদা পিপাসা কিছুই থাকবে না, সমস্ত জ্ঞান আপনার নিকট প্রকাশিত হবে, ধর্ম ও অর্থের তত্ত্ব সম্বন্ধে আপনার বুদ্ধি তীক্ষ হবে, আপনি জ্ঞানচক্ষু দ্বারা সকল জীবই দেখতে পাবেন। কৃষ্ণ এই কথা বললে আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হোলো, বিবিধ বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠল, অপ্সরারা গান করতে লাগল, সুগন্ধ বায়ু প্রবাহিত হোলো। এই সময়ে পশ্চিম দিকে সূর্য অস্তাচলে যেতে লাগলেন। সন্ধ্যা সমাগত দেখে মহর্ষিগণ উঠলেন, কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরাদিও ভীষ্মের নিকট বিদায় নিয়ে প্রস্থান করলেন।
পরদিন কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠিরাদি ও সাত্যকি আবার ভীষ্মের নিকট উপস্থিত হলেন। নারদ, অন্যান্য মহর্ষিগণ এবং ধৃতরাষ্ট্রও সেখানে এলেন। কৃষ্ণ কুশল প্রশ্ন করলে ভীষ্ম বললেন, তোমার কৃপায় আমার সন্তাপ মোহ ক্লান্তি গ্লানি সবই দূর হয়েছে, ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান সমস্তই আমি প্রত্যক্ষ করছি, সর্বপ্রকার ধর্ম আমার মনে পড়ছে এবং বলবার শক্তিও আমি পেয়েছি। এখন ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির আমাকে ধর্ম সম্বন্ধে প্রশ্ন করুন।
কৃষ্ণ বললেন, পূজনীয় গুরুজন ও আত্মীয়বান্ধব বিনাশ কোরে ধর্মরাজ লজ্জিত হয়েছেন, অভিশাপের ভয়ে ইনি আপনার সম্মুখে আসতে পারছেন না। ভীষ্ম বললেন, পিতা পিতামহ ভাই গুরু আত্মীয় এবং বান্ধবগণ যদি অন্যায় যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন তবে তাদের বধ করলে ধর্মই হয়। তখন যুধিষ্ঠির সামনে গিয়ে ভীষ্মের পা দুই হাত দিয়ে ধরলেন। ভীষ্ম আশীর্বাদ কোরে বললেন, তুমি নির্ভয়ে আমাকে প্রশ্ন করো। যুধিষ্ঠির বললেন, পিতামহ, ধর্মজ্ঞরা বলেন যে রাজার পক্ষে রাজধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম, এই ধর্ম জীবলোকের অবলম্বন। রশি যেমন ঘোড়াকে, অঙ্কুশ যেমন হাতিকে, সেইরূপ রাজধর্ম সকল লোককে নিয়ন্ত্রিত করে। অতএব আপনি এই ধর্ম সম্বন্ধে বলুন।
ভীষ্ম বললেন, মহান ধর্ম, কৃষ্ণ ও ব্রাহ্মণগণকে নমস্কার কোরে আমি শ্বাশ্বত ধর্মের বিষয়ে বলছি। কুরুশ্রেষ্ঠ, দেবতা ও দ্বিজগণকে সন্তুষ্ট করার জন্য রাজা শাস্ত্রবিধি অনুসারে সকল কাজ করবেন। বৎস যুধিষ্ঠির, তুমি সর্বদা উদ্যোগী হয়ে কাজ করবে, পুরুষকার ভিন্ন কেবল দৈবে রাজকার্য সিদ্ধ হয় না। তুমি সকল কাজই সরলভাবে করবে, কিন্তু নিজের দোষ গোপন, পরের দোষ খোঁজা এবং মন্ত্রণাগোপন বিষয়ে সরল হবে না। ব্রাহ্মণকে শারীরিক দণ্ড দেবে না, গুরুতর অপরাধ করলে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করবে। শাস্ত্রে ছয় প্রকার দুর্গের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে নরদুর্গই সর্বাপেক্ষা দুর্ভেদ্য। অতএব প্রজাগণের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে যাতে তারা অনুরক্ত থাকে। রাজা সর্বদা মৃদু হবেন না, সর্বদা কঠোরও হবেন না, বসন্তকালীন সূর্যের মতো নাতিশীতোষ্ণ হবেন। গর্ভিণী যেমন নিজের প্রিয় বিষয় ত্যাগ কোরে গর্ভেরই হিতসাধন করে, রাজাও তেমন নিজের হিতচিন্তা না কোরে প্রজারই হিতসাধন করবেন। ভৃত্যের সঙ্গে অধিক পরিহাস করবে না, তাতে তারা প্রভুকে অবজ্ঞা করে, তিরস্কার করে, উৎকোচ নিয়ে এবং বঞ্চনার দ্বারা রাজকাজ নষ্ট করে। তারা বেতনে সন্তুষ্ট থাকে না, রাজার অর্থ হরণ করে, লোককে বলে বেড়ায় আমরাই রাজাকে চালাচ্ছি।
যুধিষ্ঠির, রাজ্যের সাতটি অঙ্গ আছে — অমাত্য, সুহৃৎ, কোষ, রাষ্ট্র, দুর্গ ও সৈন্য। যে তার বিরুদ্ধাচরণ করবে, গুরু বা মিত্র হলেও তাকে বধ করতে হবে। রাজা কাকেও অত্যন্ত অবিশ্বাস বা অত্যন্ত বিশ্বাস করবেন না। তিনি সাধু লোকের ধন হরণ করবেন না, অসাধুরই ধন নেবেন এবং সাধু লোককে দান করবেন। যার রাজ্যে প্রজাগণ পিতার গৃহে পুত্রের মতো নির্ভয়ে বিচরণ করে সেই রাজাই শ্রেষ্ঠ। শুক্রাচার্য তার রামচরিত আখ্যানে এই শ্লোকটি বলেছেন - প্রথমেই কোনও রাজার আশ্রয় নেবে, তার পর বিবাহ করে স্ত্রী আনবে, তার পর ধন আহরণ করবে। রাজা না থাকলে স্ত্রী বা ধন কি করে থাকবে?
ভীষ্মের উপদেশ শুনে ব্যাসদেব কৃষ্ণ কৃপ সাত্যকি প্রভৃতি আনন্দিত হয়ে সাধু সাধু বললেন। যুধিষ্ঠির সজলনয়নে ভীষ্মের পা স্পর্শ কোরে বললেন, পিতামহ, সূর্য অস্ত যাচ্ছেন, কাল আবার আপনার কাছে আসব।
______________
(ক্রমশ)