Storey of Mahabharat Part 130 in Bengali Spiritual Stories by Ashoke Ghosh books and stories PDF | মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 130

Featured Books
Categories
Share

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 130

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৩০

অর্জুনের প্রতিজ্ঞায় জয়দ্রথের ভয় এবং সুভদ্রার বিলাপের কাহিনি

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

অর্জুনের প্রতিজ্ঞায় জয়দ্রথের ভয় এবং সুভদ্রার বিলাপের কাহিনি

পাণ্ডবগণের গর্জন শুনে এবং চরের মুখে অর্জুনের প্রতিজ্ঞার সংবাদ জেনে জয়দ্রথ উদ্বিগ্ন হয়ে দুর্যোধনাদিকে বললেন, অর্জুন আমাকে যমালয়ে পাঠাতে চায়। তোমাদের মঙ্গল হোক, তোমরা আমাকে রক্ষা কর, অভয় দাও, নচেৎ আমি প্রাণরক্ষার জন্য নিজ ভবনে চলে যাবো। পাণ্ডবদের গর্জন শুনে আমার অত্যন্ত ভয় হয়েছে,  শরীর অবশ হয়েছে। তোমরা অনুমতি দাও, আমি আত্মগোপন করি, যাতে পাণ্ডবরা আমাকে দেখতে না পায়। দুর্যোধন বললেন, ভয় পেয়ো না, তুমি ক্ষত্রিয় বীরগণের মধ্যে থাকলে কে তোমাকে আক্রমণ করবে? আমরা সবাই মিলে তোমাকে রক্ষা করবো। তুমি স্বয়ং রথিশ্রেষ্ঠ মহাবীর, তবে পাণ্ডবদের ভয় করছ কেন?

রাত্রিকালে জয়দ্রথ দুর্যোধনের সঙ্গে দ্রোণের কাছে গিয়ে তাঁকে প্রণাম কোরে বললেন, আচার্য, অস্ত্রশিক্ষায় অর্জুন আর আমার প্রভেদ কি তা জানতে ইচ্ছা করি। দ্রোণ বললেন, বৎস, আমি তোমাদের সমভাবেই শিক্ষা দিয়েছি, কিন্তু যোগাভ্যাস ও কষ্টভোগ কোরে অর্জুন অধিকতর শক্তিমান হয়েছেন। তবুও তুমি ভয় পেয়েছ তাই আমি তোমাকে নিশ্চয় রক্ষা করবো। আমি এমন ব্যূহ রচনা করবো যা অর্জুন ভেদ করতে পারবেন না। তুমি স্বধর্ম অনুসারে যুদ্ধ করো। মনে রেখো, আমরা কেউ চিরকাল বাঁচব না, একদিন সকলেই নিজ নিজ কর্ম অনুযায়ী পরলোকে যাবো। দ্রোণের কথা শুনে জয়দ্রথ আশ্বস্ত হলেন এবং ভয় ত্যাগ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন।

কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, তুমি আমার সঙ্গে মন্ত্রণা না করেই প্রতিজ্ঞা করেছ যে কাল জয়দ্রথকে বধ করবে। এই দুঃসাহসের জন্য যেন আমরা উপহাসের পাত্র না হই। আমি কৌরবশিবিরে যে চর পাঠিয়েছিলাম তাদের কাছে শুনেছি, কর্ণ, ভূরিশ্রবা, অশ্বত্থামা, বৃষসেন, কৃপ ও শল্য এই ছয় জন জয়দ্রথের সঙ্গে থাকবেন। এঁদের জয় না করলে জয়দ্রথকে পাবে না। অর্জুন বললেন, আমি মনে করি, এঁদের মিলিত শক্তি আমার অর্ধেকের তুল্য। তুমি দেখো, কাল আমি দ্রোণাদির সামনেই জয়দ্রথের মুণ্ডচ্ছেদ করবো। কাল সকলেই দেখবে, পাপাচারী জয়দ্রথ আমার বাণে নিহাত হয়ে রণভূমিতে পতিত হয়েছে। দিব্যধনু গাণ্ডীব, আমি যোদ্ধা, আর তুমি সারথি থাকলে কি না জয় করা যায়? কৃষ্ণ, কাল প্রভাতেই যাতে আমার রথ সজ্জিত থাকে তা দেখো। এখন তুমি তোমার বোন সুভদ্রা এবং আমার পুত্রবধূ উত্তরাকে সান্ত্বনা দাও, উত্তরার সহচরীদের শোক দূর করো।

কৃষ্ণ দুঃখিতমনে অর্জুনের গৃহে গিয়ে সুভদ্রাকে বললেন, তুমি আর বধূ উত্তরা কুমার অভিমন্যুর জন্য শোক করো না, একদিন সকল প্রাণীরই এই গতি হয়। মহৎ কুলজাত ক্ষত্রিয় বীরের এরূপ মরণই উপযুক্ত। পিতার ন্যায় পরাক্রান্ত মহারথ অভিমন্যু বীরের কাঙ্খিত গতি লাভ করেছে। তপস্যা, ব্রহ্মচর্য, বেদাধ্যয়ন ও প্রজ্ঞা দ্বারা সাধুজন যেখানে যেতে চান তোমার পুত্র সেখানে গেছে। তুমি বীরপ্রসবিনী বীরপত্নী, শোক করো না, তোমার পুত্র পরম গতি পেয়েছে। বালকহন্তা পাপী জয়দ্রথ তার কর্মের উপযুক্ত ফল পাবে, সুরলোকে আশ্রয় নিলেও সে অর্জুনের হাতে নিষ্কৃতি পাবে না। তুমি কালই শুনবে জয়দ্রথের ছিন্ন মুণ্ড ভূমিতে পতিত হয়েছে। তুমি পুত্রবধূকে আশ্বস্ত করো, কাল তুমি বিশেষ প্রিয় সংবাদ শুনবে, তোমার পতি যে প্রতিজ্ঞা করেছেন তার অন্যথা হবে না।

পুত্রশোকার্তা সুভদ্রা বিলাপ করতে লাগলেন, হা পুত্র, তুমি এই মন্দভাগিনীর কোলে এসে পিতৃতুল্য পরাক্রান্ত হয়েও কেন নিহত হলে? তুমি সুখভোগে অভ্যস্ত ছিলে, উত্তম শয্যায় শুতে, আজ কেন বাণবিদ্ধ হয়ে ভূমিতে শয়ন করেছ? বরনারীগণ যে মহাবাহুর সেবা করতো, আজ শৃগালরা কেন তার কাছে রয়েছে? ভীম, অর্জুন, বৃষ্ণি, পাঞ্চাল, কেকয়, মৎস্য প্রভৃতি বীরগণকে ধিক, তারা তোমাকে রক্ষা করতে পারলেন না! হা বীর, তুমি স্বপ্নে পাওয়া ধনের ন্যায় দেখা দিয়ে চলে গেলে! তোমার এই শোকার্তা তরুণী ভার্যাকে কি করে বাঁচিয়ে রাখবো? হা পুত্র, তুমি ফলদানের সময় আমাকে ত্যাগ করে অকালে চলে গেলে! যজ্ঞকারী দানশীল ব্রহ্মচর্যপরায়ণ গুরুশুশ্রষাকারী ব্রাহ্মণদের যে গতি, সম্মুখযুদ্ধে শক্তহন্তা বীরগণের যে গতি, সদাচার ও চতুরাশ্রমীর পুণ্য রক্ষাকারী রাজা এবং সর্বভূতের প্রতি প্রীতিযুক্ত দয়ালু লোকের যে গতি, তুমি সেই গতি লাভ করো।

সুভদ্রা উত্তরার সঙ্গে এইরূপ বিলাপ করছিলেন এমন সময় দ্রৌপদী সেখানে এলেন এবং সকলে শোকাকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে উন্মত্তের ন্যায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। জল ছিটিয়ে তাদের সচেতন করে কৃষ্ণ বললেন, সুভদ্রা, শোক ত্যাগ করো, দ্রৌপদী তুমি উত্তরাকে সান্ত্বনা দাও। অভিমন্যু ক্ষত্রিয়োচিত উত্তম গতি পেয়েছে, আমাদের বংশের সকলেই যেন এই গতি পায়। সে যে মহৎ কর্ম করেছে, আমরা ও আমাদের সুহৃগণও যেন সেইরূপ কর্ম করতে পারি।

______________

(ক্রমশ)