মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-৩৭
পুনর্বার পাশা খেলায় যুধিষ্ঠিরের পরাজয় ও পাণ্ডবদের বনবাস
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
পুনর্বার পাশা খেলায় যুধিষ্ঠিরের পরাজয় ও পাণ্ডবদের বনবাস
শকুনির সঙ্গে পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির সব কিছু হেরে যাওয়ার পর, ধৃতরাষ্ট্র সব কিছু যুধিষ্ঠিরকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, যুধিষ্ঠির, তোমার মঙ্গল হোক। সমস্ত ধন সমেত তোমরা নিশ্চিন্তে ফিরে গিয়ে নিজ রাজ্য শাসন কর।
পাণ্ডবগণ চলে গেলে দুঃশাসন বললেন, আমরা পাশা খেলায় পাণ্ডবদের সব কিছু হস্তগত করেছিলাম আর বৃদ্ধ পিতা তা নষ্ট করলেন। তার পর কর্ণ আর শকুনির সঙ্গে মন্ত্রণা করে দুর্যোধন তার পিতার কাছে গিয়ে বললেন, মহারাজ, বৃহস্পতি বলেছেন যে, শত্রুকে যুদ্ধে বা যুদ্ধ না করে অন্য যে কোনো উপায়ে বিনষ্ট করবে। পিতা, ক্রুদ্ধ পাণ্ডবরা আমাদের বিনাশ করবে, কারণ আমরা তাদের নিগৃহ করেছি। সেইজন্য আমরা আবার তাদের সঙ্গে খেলতে চাই। এবারে পাশা খেলায় এই বাজী হবে যে, পরাজিত পক্ষ মৃগচর্ম ধারণ কোরে বারো বছর বনে বাস করার তার পর এক বৎসর অজ্ঞাতবাস করবে। আমরা খেলায় জয়ী হয়ে বারো বছরে রাজ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত হবো, শক্তিশালী মিত্র ও সৈন্য সংগ্রহ করবো। তারপর তেরো বছর পরে পাণ্ডবরা ফিরে এলে আমরা তাদের পরাজিত করবো। ধৃতরাষ্ট্র রাজী হয়ে বললেন, তাহলে পাণ্ডবদেরকে শীঘ্র ফিরিয়ে আনো।
বুদ্ধিমতী গান্ধারী তার পতিকে বললেন, দুর্যোধন জন্মগ্রহণ করলে বিদুর সেই কুলাঙ্গারকে পরলোকে পাঠাতে বলেছিলেন। মহারাজ, তুমি নিজের দোষে নির্বোধ অশিষ্ট পুত্রদের কথা শুনো না! পাণ্ডবরা শান্ত হয়েছে, আবার কেন তাদের ক্রুদ্ধ করছো? তুমি স্নেহবশে দুর্যোধনকে ত্যাগ করতে পারনি, এখন তার ফলে বংশনাশ হবে। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, আমাদের বংশ নষ্টই হবে, আমি তা নিবারণ করতে পারছি না। আমার পুত্রেরা যা ইচ্ছা হয় করুক।
দুর্যোধনের দূত যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে জানালো যে ধৃতরাষ্ট্র আবার তাকে পাশা খেলায় আহ্বান করেছেন। যুধিষ্ঠির বললেন, বিধাতার ইচ্ছা অনুসারে জীবের শুভাশুভ ঘটে। ধৃতরাষ্ট্র যখন ডেকেছেন তখন বিপদ হবে জেনেও আমাকে যেতে হবে। রাম জানতেন যে স্বর্ণময় জন্তু অসম্ভব, তথাপি তিনি স্বর্ণমৃগ দেখে লোভ করেছিলেন। বিপদ আসন্ন হলে লোকের বুদ্ধির বিপর্যয় হয়।
যুধিষ্ঠির পাশা খেলার সভায় উপস্থিত হলে, শকুনি বললেন, বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র তোমাদের ধন ফিরিয়ে দিয়ে মহৎ কার্য করেছেন। এখন যে বাজী রেখে আমরা খেলব তা শোন। আমরা যদি হারি তবে মৃগচর্ম ধারণ কোরে বারো বছর বনে বাস করবো, তার পর এক বৎসর স্বজনবর্গের কাছে অজ্ঞাত হয়ে থাকবো। যদি অজ্ঞাতবাসের সময় কেউ আমাদের সন্ধান পায় তবে আবার বারো বছর বনবাস করব। যদি তোমরা হেরে যাও তবে তোমরাও এই নিয়মে বনবাস ও অজ্ঞাতবাস করবে, এবং তেরো বছর পরে নিজেদের রাজ্য ফিরে পাবে।
শকুনির কথা শুনে সভার সকলে উদ্বিগ্ন হোয়ে হাত তুলে বললেন, পাণ্ডবদের আত্মীয়দেরকে ধিক, যে তারা পাণ্ডবদের সাবধান করে দিচ্ছেন না আর পাণ্ডবরাও তাদের বিপদ বুঝছেন না। যুধিষ্ঠির বললেন, আমি ধর্মনিষ্ঠ, পাশা খেলায় আমাকে আমন্ত্রণ করলে আমি পিছিয়ে যাই না। শকুনি, আমি আপনার সঙ্গে খেলব। যুধিষ্ঠির সম্মতি জানাতেই শকুনি তার পাশা ফেলে বললেন, আমি জিতে গিয়েছি।
পরাজিত পাণ্ডবগণ মৃগচর্ম ধারণ করে বনবাসের জন্য প্রস্তুত হলেন। দুঃশাসন বললেন, এখন দুর্যোধন রাজচক্রবর্তী হলেন আর পাণ্ডবগণ সুদীর্ঘকালের জন্য নরকে পতিত হল। ক্লীব পাণ্ডবদেরকে কন্যাদান করে দ্রুপদ ভাল করেননি। দ্রৌপদী, এই পতিত স্বামীদের সেবা কোরে তোমার আর লাভ কি? ভীম বললেন, নিষ্ঠুর, তুমি এখন আমাদের কটু কথা বলছ, তাই যুদ্ধক্ষেত্রে তোমার বুক চীরে প্রতিশোধ নেবো।
পাণ্ডবগণ সভা থেকে বেরিয়ে গেলেন। দুর্বুদ্ধি দুর্যোধন আনন্দে উল্লসিত হোয়ে ভীমের অনুকরণ করতে লাগলেন। ভীম পিছন ফিরে বললেন, মূঢ় দুর্যোধন, শুধু দুঃশাসনের বুকের রক্ত পান করেই আমি থামবো না, তোমাকে তো তোমার সব ভাইকে মেরে ফেলে প্রতিশোধ নেবো। আমি গদাঘাতে তোমাকে মারব, তোমার মাথায় পদাঘাত করবো। অর্জুন কর্ণকে আর সহদেব ধূর্ত শকুনিকে মারবেন, আর এই দুরাত্মা দুঃশাসনের রক্ত আমি সিংহের মতো পান করবো।
অর্জুন বললেন, মুখের কথায় সম্পূর্ণ সংকল্প ব্যক্ত করা যায় না, তেরো বছর পরে যা হবে তা সকলেই দেখতে পাবেন। ভীমসেন, আপনার কথায় আমি প্রতিজ্ঞা করছি, এই কটুভাষী অহঙ্কারী কর্ণকে আমি যুদ্ধে বধ করবো। সহদেব বললেন, কুলাঙ্গার শকুনি, তোমার সম্বন্ধে ভীম যা বলেছেন তা আমি করবো। নকুল বললেন, দুর্যোধনকে তুষ্ট করবার জন্য যারা এই সভায় দ্রৌপদীকে কটুকথা শুনিয়েছে সেই দুবৃত্তদের আমি যমালয়ে পাঠাব।
পিতামহ ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র, দ্রোণ, কৃপ, অশ্বত্থামা, সোমদত্ত, বিদুর, যুযুৎসু, সঞ্জয় প্রভৃতিকে সম্বোধন করে যুধিষ্ঠির বললেন, আমি বনগমনের অনুমতি চাচ্ছি, আশা করি ফিরে এসে আবার আপনাদের দর্শনলাভ করবো। যুধিষ্ঠিরের কথা শুনে লজ্জায় কেউ কিছু বলতে পারলেন না, কেবল মনে মনে যুধিষ্ঠিরের কল্যাণ কামনা করলেন। বিদুর বললেন, আর্যা কুন্তী বৃদ্ধা এবং সুখে থাকতে অভ্যস্তা, তিনি সসম্মানে আমার গৃহে বাস করবেন। পাণ্ডবগণ, তোমাদের মঙ্গল হোক। যুধিষ্ঠিরাদি বিদুরকে বললেন, আপনি আমাদের পিতার সমান, যা আদেশ করবেন তাই পালন করবো।
বিদুর বললেন, যুধিষ্ঠির, অধর্ম দ্বারা পরাজিত হলে পরাজয়ের দুঃখ হয় না। তুমি ধর্মজ্ঞ, অর্জুন যুদ্ধ বিশারদ, ভীম শক্ৰ বিনাশকারী, নকুল অর্থ সংগ্রহে পারদর্শী, সহদেব নিয়ম পালনকারী, পুরোহিত ধৌম্য শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিদ, দ্রৌপদী ধর্মচারিণী। তোমরা পরস্পরের প্রিয় এবং ন্যায়ের পথে চলো, তোমাদের মধ্যে কেউ বিভেদ সৃষ্টি করতে পারবে না। তোমাদের মঙ্গল হোক, নির্বিঘ্নে ফিরে এসো, আবার তোমাদের সাথে দেখা হবে।
কুন্তী ও অন্যান্য নারীদের কাছে গিয়ে দ্রৌপদী বিদায় চাইলেন। কুন্তী শোকে আকুল হোয়ে বললেন, তুমি সর্ব-গুণান্বিতা, আমার কোনও উপদেশ দেওয়া অনাবশ্যক। কৌরবগণ ভাগ্যবান তাই তারা তোমার ক্রোধে দগ্ধ হয়নি। তুমি নির্বিঘ্নে যাত্রা করো, আমি সর্বদাই তোমাদের শুভচিন্তা করবো।
দ্রৌপদী মুক্ত কেশে একবস্ত্রে ক্রন্দনরত হোয়ে পাণ্ডবদের সঙ্গে যাত্রা করলেন। পুত্রগণকে আলিঙ্গন করে কুন্তী বললেন, তোমরা ধার্মিক, সচ্চরিত্র ও উদার প্রকৃতি, তোমাদের ভাগ্যে এই বিপর্যয় কেন হল? তোমাদের পিতা ধন্য, এই বিপদ তাকে দেখতে হোলো না, স্বর্গগতা মাদ্রীও ভাগ্যবতী। আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারব না, সঙ্গে যাবো। হা কৃষ্ণ, কোথায় আছো তুমি, আমাদের দুঃখ থেকে ত্রাণ করছ না কেন?
পাণ্ডবগণ কুন্তীকে সান্ত্বনা দিয়ে যাত্রা করলেন। দুর্যোধনাদির পত্নীরা দ্রৌপদীর অপমানের বিবরণ শুনে কৌরবগণের নিন্দা করে উচ্চকণ্ঠে কাঁদতে থাকলেন। পুত্রদের অন্যায়ের কথা ভেবে ধৃতরাষ্ট্র উদ্বেগ ও অশান্তি ভোগ করছিলেন। তিনি বিদুরকে ডাকিয়ে বললেন, পাণ্ডবগণ কিভাবে যাচ্ছেন তা আমি জানতে চাই, তুমি বর্ণনা করো।
বিদুর বললেন, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির মুখ ঢেকে চলেছেন। মহারাজ, আপনার পুত্রেরা কপট উপায়ে রাজ্য হরণ করলেও যুধিষ্ঠিরের ধর্মবুদ্ধি বিচলিত হয়নি। শত্রুদের উপর বাহুবল প্রয়োগ করবেন তা জানাবার জন্য ভীম তার দুই বাহু প্রসারিত করে চলেছেন। অর্জুন, সহদেব এবং নকুল ভয়ঙ্কর রাগ দমন কোরে দ্রুতগতিতে চলেছেন। দ্রৌপদী তার কেশ দিয়ে মুখ ঢেকে ক্রন্দনরত অবস্থায় পাণ্ডবদের সঙ্গে চলেছেন। পুরোহিত ধৌম্য হাতে কুশ নিয়ে সাম মন্ত্র পাঠ করে সকলের আগে চলেছেন। পুরবাসিগণ বিলাপ করছে আর বলছে হায়, আমাদের রক্ষকগণ চলে যাচ্ছেন! মহারাজ, পাণ্ডবগণের যাত্রাকালে বিনা মেঘে বিদ্যুৎ, ভূমিকল্প, অকালে সূর্যগ্রহণ প্রভৃতি দুর্লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
এই সময় দেবর্ষি নারদ সভায এসে বললেন, দুর্যোধনের অপরাধে এবং ভীম ও অর্জুনের শক্তিতে এখন থেকে তেরো বছর পরে কৌরবগণের বিনাশ হবে। এই বলে তিনি অন্তর্হিত হলেন। ভবিষ্যৎ বিপদ থেকে দ্রোণাচার্য রক্ষা করবেন মনে কোরে দুর্যোধন, কর্ণ ও শকুনি তাকেই পাণ্ডবদের রাজ্য নিবেদন করলেন। দ্রোণ বললেন, তোমরা আমার শরণাগত তাই তোমাদের ত্যাগ করতে পারব না। পাণ্ডবরা ফিরে এসে তোমাদের উপর প্রতিশোধ নেবে। বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনের সঙ্গে আমাকে যুদ্ধ করতে হবে এর চেয়ে অধিক দুঃখ আর কি হোতে পারে। যে ধৃষ্টদ্যুম্ন আমার মৃত্যুর কারণ বলে নির্ধারিত, সে পাণ্ডবপক্ষেই থাকবে। দুর্যোধন, তোমার সুখ হেমন্তকালে তালগাছের ছায়ার মতো ক্ষণস্থায়ী। এখন থেকে তেরো বছর পরে তোমাদের মহাবিনাশ হবে।
______________
(ক্রমশ)