হাসপাতালের আইসিইউ রুমে নিস্তব্ধতা এতটাই ঘন ছিল, যেন সময় নিজেই থেমে গেছে। মনিটরের স্ক্রিনে সবুজ লাইনটা ধীরে ধীরে উঠানামা করছে—এটাই প্রমাণ, ছেলেটা এখনো বেঁচে আছে। তার নাম আয়ুষ। শহরের অন্যতম বড় কোম্পানির মালিক, যাকে সবাই অদম্য আর শক্তিশালী বলে জানতো। অথচ আজ সে একদম নিশ্চুপ… চোখ বন্ধ, কোনো সাড়া নেই—কোমায় পড়ে আছে।
কয়েকদিন আগে তার উপর হামলা হয়েছিল। খুব পরিকল্পিতভাবে।
কিন্তু অফিসে কেউ সত্যিটা জানে না—সবাইকে বলা হয়েছে, বস বিদেশে গেছে।
শুধু একজন জানে আসল সত্য।
কাবির।
আয়ুষের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পার্টনার… আর সেই মানুষ, যে নিজেই এই হামলার পেছনে ছিল।
সে চায়—আয়ুষ আর কখনো না জাগুক।
কারণ আয়ুষ জেগে উঠলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে।
কিন্তু একটা জিনিস কাবির জানে না—
আয়ুষ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সে আটকে আছে এক অদ্ভুত স্বপ্নের জগতে…
যেখানে সে প্রতিরাতে দেখা করে এক মেয়ের সাথে।
মেয়েটার নাম—আইরা।
আইরা একজন সাধারণ মেয়ে, একই কোম্পানির একজন এমপ্লয়।
তার জীবন খুব সাধারণ, কিন্তু তার স্বপ্নগুলো একদমই সাধারণ না।
প্রতিটা রাতে সে একই ছেলেটাকে দেখে—
একই চোখ, একই কণ্ঠ, একই অজানা টান।
সে জানে না ছেলেটা কে।
আর আয়ুষও জানে না—সে বাস্তবে কে।
কিন্তু যতবার তারা স্বপ্নে দেখা করে,
আয়ুষের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির এক একটা অংশ ফিরে আসে।
একটা অফিস রুম…
একটা সাইন করা ডিল…
একটা বিশ্বাসঘাতকতা…
সব ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে।
আর ঠিক তখনই—বিপদ শুরু হয়।
কারণ, আয়ুষ যত বেশি সত্যের কাছে পৌঁছায়,
স্বপ্নের জগতটা তত বেশি ভেঙে পড়তে থাকে।
আর বাস্তবে—
তার হার্টবিট ধীরে ধীরে কমে আসছে।
একটা ভয়ংকর সত্য তখন ধীরে ধীরে সামনে আসে—
যদি কোনো এক রাতে আয়ুষ আইরাকে স্বপ্নে দেখতে না পায়,
তাহলে সে আর কখনো জাগবে না।
আর যদি আইরা সত্যিটা জেনে ফেলে—
তাহলে সে নিজেই বিপদে পড়ে যাবে।
কারণ কাবির এখনো থামেনি।
সে জানে—
এই গল্পে কেউ একজন আয়ুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
আর সে ঠিক করেছে—
যে-ই হোক, তাকে সে বাঁচতে দেবে না।
পরের রাতটা আগের রাতগুলোর মতো ছিল না।
আইরা বিছানায় শুয়ে ছিল, কিন্তু তার চোখে ঘুম আসছিল না। মাথার ভেতর বারবার ঘুরছিল সেই অদ্ভুত স্বপ্নগুলো—আর সেই ছেলেটা… আয়ুষ। আজকে কেন জানি না, তার মনে হচ্ছিল কিছু একটা বদলে যাবে। বুকের ভেতরটা অকারণেই কাঁপছিল।
অবশেষে ক্লান্ত হয়ে সে চোখ বন্ধ করলো।
আর ঠিক তখনই—চারপাশটা বদলে গেল।
সে নিজেকে আবার সেই অচেনা জায়গায় খুঁজে পেল। কিন্তু আজ কুয়াশাটা অনেক বেশি ঘন, বাতাসটা ভারী, আর চারপাশে যেন একটা অদৃশ্য ভয় ছড়িয়ে আছে।
“আইরা…”
কণ্ঠটা ভেসে এলো দূর থেকে।
সে তড়িঘড়ি করে সামনে তাকালো। আয়ুষ দাঁড়িয়ে আছে—কিন্তু আজ তাকে আগের মতো লাগছে না। তার চোখে ক্লান্তি, শরীরে দুর্বলতা, আর মুখে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা।
আইরা দৌড়ে তার কাছে গেল। “তুমি ঠিক আছো? আজকে তোমাকে খুব অদ্ভুত লাগছে…”
আয়ুষ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন কিছু বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। তারপর ধীরে বললো, “আমি… কিছু মনে করতে পারছি।”
আইরার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। “কি মনে পড়ছে?”
আয়ুষ কপালে হাত রাখলো, চোখ বন্ধ করলো। “একটা অফিস… বড় একটা টেবিল… আর একজন মানুষ…”
“কে?”
“সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল… আমি তাকে বিশ্বাস করতাম…” তার গলা কেঁপে উঠলো, “কিন্তু সে… সে আমাকে ধাক্কা দিলো… তারপর—অন্ধকার…”
হঠাৎ করেই চারপাশে একটা তীব্র শব্দ হলো। মাটি যেন কেঁপে উঠলো। কুয়াশার ভেতর থেকে অদ্ভুত ছায়াগুলো নড়তে শুরু করলো।
আইরা ভয় পেয়ে আয়ুষের হাত শক্ত করে ধরলো। “এগুলো কি?”
আয়ুষ ফিসফিস করে বললো, “ওরা… আমাকে থামাতে চাইছে…”
ঠিক তখনই একটা ছায়া হঠাৎ তাদের দিকে এগিয়ে এলো। আয়ুষ ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো, তার শরীর কাঁপতে লাগলো।
“না! আয়ুষ!” আইরা চিৎকার করে উঠলো।
হঠাৎ সবকিছু ভেঙে পড়লো।
আইরা চোখ খুলে উঠে বসল। তার নিঃশ্বাস দ্রুত, পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। কিন্তু আজকের স্বপ্নটা অন্যরকম ছিল। খুব বাস্তব… খুব ভয়ংকর।
পরদিন অফিসে গিয়ে সে দেখতে পেল—সবকিছু যেন একটু অস্বাভাবিক।
সবাই চুপচাপ, কেউ ঠিকমতো কথা বলছে না।
হঠাৎ সে শুনলো দুইজন সিনিয়র স্টাফ কথা বলছে—
“শুনেছো? বসের অবস্থা নাকি খুব খারাপ…”
“ডাক্তাররা নাকি আশা ছাড়তে বলছে…”
আইরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
বস?
তার মাথার ভেতর ঝড় বয়ে গেল।
না… এটা কি সম্ভব?
সে হঠাৎ করে মনে করতে লাগলো—
আয়ুষ বলেছিল, “একটা অফিস…”
“একটা বিশ্বাসঘাতকতা…”
তার হাত কাঁপতে লাগলো।
ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়ালো কাবির।
তার চোখে এক অদ্ভুত হাসি। “আইরা, তুমি ঠিক আছো তো? তোমাকে খুব টেনশনড লাগছে।”
আইরা জোর করে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো। “জি… আমি ঠিক আছি।”
কাবির কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন কিছু বুঝতে চাইছে। তারপর ধীরে বললো, “বসের জন্য চিন্তা করছো?”
আইরা থমকে গেল। “আপনি জানেন…?”
কাবির মুচকি হেসে বললো, “সবাই জানে না। কিন্তু আমি জানি।”
তার গলার স্বরটা অদ্ভুত ঠান্ডা ছিল।
আইরার মনে হলো—এই মানুষটার মধ্যে কিছু একটা ঠিক নেই।
ঠিক তখনই কাবির একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললো—
“সবাইকে সবকিছু জানা ভালো না, আইরা।”
আইরার শরীর শিউরে উঠলো।
কাবির সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আবার স্বাভাবিক গলায় বললো, “তুমি তোমার কাজে মন দাও। অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল কখনো ভালো না।”
সে চলে গেল।
আইরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
তার মাথার ভেতর তখন একটা কথাই ঘুরছিল—
আয়ুষ…
বস…
কোমা…
বিশ্বাসঘাতকতা…
সবকিছু কি একসাথে জোড়া লাগছে?
আর যদি সত্যিই তাই হয়—
তাহলে সে এখন এমন একটা খেলায় জড়িয়ে পড়েছে, যেখান থেকে বের হওয়া খুব সহজ না।
আর সেই রাতেই—
আইরা আবার চোখ বন্ধ করলো।
কারণ সে জানে—
আজকের স্বপ্নেই হয়তো সবকিছুর উত্তর লুকিয়ে আছে…
রাতটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা ছিল।
আইরা বিছানায় শুয়ে আছে, কিন্তু আজ তার চোখে ঘুম নামছে না সহজে। কাবিরের সেই কথাগুলো বারবার মাথায় বাজছে—“সবাইকে সবকিছু জানা ভালো না…”। কথাটা শুধু হুমকি ছিল না… যেন একটা সতর্কবার্তা।
তবুও, সে চোখ বন্ধ করলো।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে—অন্ধকার।
কিন্তু আজ স্বপ্নের জগৎটা আগের মতো না।
কোনো কুয়াশা নেই…
কোনো শান্ত বাতাস নেই…
চারপাশটা ভেঙে পড়া দেয়াল, ছড়িয়ে থাকা কাঁচ, আর দূরে কোথাও আগুনের মতো লাল আলো।
“আইরা…”
কণ্ঠটা দুর্বল।
সে দৌড়ে গেল।
আয়ুষ মাটিতে বসে আছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখ দুটো আধখোলা।
“আয়ুষ!” আইরা তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। “তুমি এমন কেন? কি হচ্ছে তোমার?”
আয়ুষ কষ্ট করে তার দিকে তাকালো। “সময়… খুব কম…”
আইরার চোখ ভিজে উঠলো। “না! তুমি এমন কথা বলো না!”
আয়ুষ কাঁপা হাতে তার হাত ধরলো। “আমি… সব মনে করতে পারছি…”
আইরার বুক থমকে গেল। “কি মনে পড়েছে?”
আয়ুষের চোখে হঠাৎ একটা আগুন জ্বলে উঠলো। “কাবির…”
আইরা থমকে গেল। “কি?”
“সে… আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল… আমি তাকে বিশ্বাস করতাম…” তার গলা ভারী হয়ে গেল, “সে আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল…”
চারপাশে হঠাৎ একটা তীব্র শব্দ হলো। মাটিতে ফাটল ধরতে লাগলো।
আইরা ভয় পেয়ে চারদিকে তাকালো। “এগুলো কি হচ্ছে?”
আয়ুষ ফিসফিস করে বললো, “ও… বুঝে গেছে…”
“কে?”
“কাবির… সে বুঝে গেছে আমি মনে করতে পারছি…”
হঠাৎ করেই একটা ছায়া সামনে এসে দাঁড়ালো।
ধীরে ধীরে সেই ছায়াটা মানুষের রূপ নিতে লাগলো।
আইরার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
কাবির।
কিন্তু এটা বাস্তবের কাবির না—তার চোখ দুটো পুরো কালো, মুখে বিকৃত হাসি।
“অবশেষে…” সে ধীরে বললো, “তোমরা সত্যের কাছে পৌঁছে গেছো।”
আইরা পিছিয়ে গেল। “তুমি এখানে কিভাবে…?”
কাবির হেসে উঠলো। “এই জগৎটা শুধু আয়ুষের না… এখন এটা আমারও।”
আয়ুষ দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু পড়ে যেতে লাগলো। আইরা তাকে ধরে ফেললো।
কাবির ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। “তুমি ভাবছো, একটা স্বপ্ন তোমাকে বাঁচাবে?” তার চোখে ভয়ংকর ঝিলিক, “বাস্তবে তুমি মরতে বসে আছো, আয়ুষ।”
আইরা চিৎকার করে বললো, “না! তুমি কিছু করতে পারবে না!”
কাবির থেমে তার দিকে তাকালো। “আর তুমি… একটা সাধারণ মেয়ে… তুমি কি করবে?”
আইরার ভেতরে হঠাৎ একটা সাহস জেগে উঠলো। “আমি তাকে ছাড়বো না।”
কাবির মুচকি হেসে বললো, “তাহলে দেখাই যাক।”
হঠাৎ সে হাত তুলতেই চারপাশের সবকিছু ভেঙে পড়তে লাগলো। মাটি ফেটে যাচ্ছে, আকাশ কালো হয়ে যাচ্ছে।
আয়ুষ ব্যথায় কাঁপতে লাগলো। তার শরীর ধীরে ধীরে অদৃশ্য হতে শুরু করলো।
“না! না!” আইরা তার হাত শক্ত করে ধরলো। “তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না!”
আয়ুষ কষ্টে হাসলো। “আইরা… যদি আমি… না ফিরি…”
“চুপ! এমন কথা বলবে না!” আইরার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
আয়ুষ ধীরে বললো, “তুমি… আমাকে খুঁজে বের করো… বাস্তবে…”
আইরার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। “আমি করবো… আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো…”
ঠিক তখনই কাবির চিৎকার করে উঠলো, “শেষ!”
সবকিছু ভেঙে পড়লো।
আইরা হঠাৎ চোখ খুলে উঠে বসল।
তার নিঃশ্বাস দ্রুত, চোখ ভিজে গেছে।
কিন্তু আজ একটা জিনিস পরিষ্কার—
এটা শুধু স্বপ্ন না।
এটা বাস্তবের সাথে জড়িয়ে আছে।
আর আয়ুষ… সত্যিই বেঁচে আছে।
আইরা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
তার চোখে আর ভয় নেই।
শুধু একটা সিদ্ধান্ত—
সে আয়ুষকে খুঁজে বের করবে।
যাই হোক না কেন।
কারণ এখন এটা শুধু একটা স্বপ্নের গল্প না—
এটা একটা যুদ্ধ।
আর এই যুদ্ধে… সে হারবে না।