সোমবার সকালগুলো সবসময়ই একটু বেশি শব্দে ভরা থাকে। রাস্তার ওপর গাড়ির হর্ন, বাসের ভিড়, মানুষজনের তাড়াহুড়া—সবকিছু মিলিয়ে শহরটা যেন নিজের গতিতে দৌড়াতে শুরু করে। এই দৌড়ের মাঝেই মেহের দাঁড়িয়ে ছিল একটা বাসস্ট্যান্ডে, হাতে একটা ফাইল শক্ত করে ধরে। ফাইলটার ভিতরে তার নতুন চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার, আর সেই সঙ্গে হাজারটা দুশ্চিন্তা।
আজ তার জীবনের প্রথম অফিস ডে।
হালকা নার্ভাস লাগছিল, কিন্তু সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল। বারবার নিজের মনে বলছিল—“সব ঠিক হবে… কিছু হবে না…” কিন্তু তার হাতের আঙুলগুলো বারবার ফাইলের কোণটা চেপে ধরছিল, যেন ভয়টা পুরোপুরি ছাড়তে চাইছে না।
অবশেষে বাসটা এলো। ভিড় ঠেলে সে কোনোভাবে উঠে দাঁড়াল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাতেই শহরটা যেন একটু অন্যরকম লাগতে শুরু করল—সবকিছু নতুন, অচেনা, কিন্তু কোথাও একটা অদ্ভুত টানও আছে।
প্রায় এক ঘণ্টা পরে সে পৌঁছাল অফিসের সামনে—একটা বড় কাঁচের বিল্ডিং, যেখানে নিজের প্রতিবিম্বটা স্পষ্ট দেখা যায়। মেহের কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল। সাধারণ একটা মেয়ে, খুব বেশি কিছু আলাদা নয়… তবুও আজ তার মনে হচ্ছিল, এই জায়গাটা হয়তো তার জীবনের অনেক কিছু বদলে দেবে।
সে গভীর শ্বাস নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
অন্যদিকে, একই সময় বিল্ডিংয়ের ওপরের ফ্লোরে অর্ণব দাঁড়িয়ে ছিল জানালার সামনে। নিচের ছোট ছোট মানুষগুলোকে দেখলে তার সবসময় একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়—সবাই ছুটছে, সবাই ব্যস্ত, কিন্তু কেউ কারও নয়। তার নিজের জীবনও যেন অনেকটা সেরকমই হয়ে গেছে।
টেবিলের ওপর ফাইলের স্তূপ, মিটিংয়ের লিস্ট, আর ফোনে একের পর এক নোটিফিকেশন—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও তার ভেতরটা ফাঁকা লাগে। গত কয়েক মাস ধরে সে নিজেও বুঝতে পারছে, সে বদলে যাচ্ছে… আরও বেশি রাগী, আরও বেশি চুপচাপ।
ঠিক তখনই তার সেক্রেটারি দরজায় নক করে ঢুকল।
“Sir, today a new employee is joining. HR asked if you—”
“Handle it,” অর্ণব তাকিয়েও দেখল না। তার গলায় সেই একই ঠান্ডা ভাব।
নিচে, মেহের HR রুমে বসে ফরমালিটিগুলো শেষ করছিল। তার চারপাশে সবকিছুই নতুন—নতুন মুখ, নতুন নিয়ম, নতুন পরিবেশ। মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছিল, সে হয়তো এখানে ঠিক মানিয়ে নিতে পারবে না… কিন্তু আবার নিজের মনকে শক্ত করছিল।
কিছুক্ষণ পরে তাকে তার ডিপার্টমেন্টে নিয়ে যাওয়া হলো। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত, কেউ তেমন কথা বলছে না। পরিবেশটা একটু চাপা, একটু ভয় ধরানো।
“এটাই তোমার ডেস্ক,” একজন সিনিয়র দেখিয়ে দিল।
মেহের চুপচাপ বসে পড়ল। কম্পিউটারটা অন করতেই তার চোখে একটু নার্ভাসনেস ফিরে এলো। প্রথম দিনেই কোনো ভুল করলে কী হবে—এই চিন্তাটা বারবার মাথায় ঘুরছিল।
এদিকে, অর্ণব হঠাৎই তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। তার হাঁটার ভঙ্গিতেই বোঝা যায়—কেউ তার সামনে ভুল করলে রেহাই নেই। পুরো ফ্লোরটা মুহূর্তের মধ্যে নিঃশব্দ হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল… আর ঠিক তখনই মেহের মাথা তুলে তাকাল।
এক মুহূর্ত।
দুজনের চোখ একসাথে আটকে গেল।
অর্ণব থেমে গেল।
কেন যেন, এই মুখটা তার কাছে অচেনা মনে হলো না। সে ঠিক বুঝতে পারল না কেন, কিন্তু মেয়েটার চোখে একটা অদ্ভুত পরিচিতি ছিল—যেন সে আগে কোথাও দেখেছে… অনেক আগে, বা হয়তো কখনোই না।
মেহেরও একটু অস্বস্তি বোধ করল। এত বড় বস তার দিকে তাকিয়ে আছে—সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেলল।
অর্ণব নিজেকে সামলে নিয়ে আবার আগের মতো গম্ভীর হয়ে গেল।
“New?” সে সংক্ষেপে জিজ্ঞেস করল।
“জি… আজই জয়েন করেছি,” মেহের আস্তে বলল।
“Then focus on your work. I don’t like distractions.”
কথাটা বলে সে চলে গেল, কিন্তু তার মনে প্রশ্নটা থেকেই গেল—
এই মেয়েটাকে সে কেন এত পরিচিত মনে করছে?
আর মেহের… সে বুঝতেই পারল না কেন, কিন্তু বসের চোখের সেই দৃষ্টি তার মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি রেখে গেল—ভয় আর কৌতূহলের মাঝামাঝি কিছু।
অফিসের ব্যস্ততার মাঝেই, খুব অজান্তে, দুইটা সম্পূর্ণ আলাদা জীবনের পথ এক জায়গায় এসে মিলতে শুরু করল… আর সেই মিলনটাই ধীরে ধীরে বদলে দেবে তাদের দুজনকেই।
দুপুরের পর থেকেই কাজের চাপটা একটু বেড়ে গেল। মেহের নিজের ডেস্কে বসে একের পর এক ফাইল দেখে যাচ্ছিল, কিন্তু সবকিছু এত নতুন যে মাঝে মাঝে সে বুঝে উঠতে পারছিল না ঠিক কীভাবে এগোবে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ে গেল। সে কয়েকবার পাশের সহকর্মীর দিকে তাকাল, কিন্তু কারও কাজের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইল না।
শেষমেশ সে সাহস করে একটা রিপোর্ট বানিয়ে সাবমিট করল।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই খবর এলো—“Mr. Arnav is calling you.”
তার বুকটা ধক করে উঠল।
ধীরে ধীরে সে কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা হালকা খোলা ছিল। ভিতর থেকে ঠান্ডা গলায় ভেসে এলো—
“Come in.”
মেহের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই অর্ণব মাথা না তুলেই বলল,
“Sit.”
সে চুপচাপ বসে পড়ল। তার হাত দুটো নিজের অজান্তেই শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
অর্ণব ফাইলটা বন্ধ করে এবার তার দিকে তাকাল। চোখে কোনো নরম ভাব নেই, শুধু কঠোরতা।
“Is this your report?”
“জি… স্যার,” মেহের আস্তে বলল।
“Do you even check what you write?” তার গলা একটু কড়া হয়ে উঠল। “These numbers are wrong. Formatting is careless. This is not acceptable.”
প্রতিটা কথার সাথে মেহেরের মুখটা ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল। প্রথম দিনেই এত বড় ভুল… তার চোখে হালকা পানি চলে এলো, কিন্তু সে মাথা নিচু করে রাখল যাতে কেউ না দেখে।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল।
কেন যেন, আজ তার রাগটা পুরোপুরি বেরোতে পারছিল না। সাধারণত এমন ভুল হলে সে আরও বেশি চিৎকার করত। কিন্তু মেয়েটার সেই চুপ করে থাকা, নিজের ভুল মেনে নেওয়া… আর চোখের কোণে জমে থাকা পানি—এসব কিছু তার ভেতরে অদ্ভুত একটা দ্বন্দ্ব তৈরি করছিল।
সে চোখ সরিয়ে নিয়ে একটু ঠান্ডা গলায় বলল,
“Fix it. And submit again within one hour.”
মেহের মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“জি… আমি ঠিক করে দিচ্ছি।”
সে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
কেবিনের দরজা বন্ধ হতেই অর্ণব চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। কয়েক সেকেন্ড সে চুপ করে রইল, তারপর নিজের কপালে হাত রাখল।
“Why am I… reacting like this?” সে নিজের মনেই বলল।
এদিকে, মেহের নিজের ডেস্কে ফিরে এসে বসতেই আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে তাড়াতাড়ি চারপাশে তাকিয়ে নিল—কেউ দেখছে কিনা—তারপর চুপচাপ নিজের কাজ শুরু করল।
সে ভুলগুলো ঠিক করতে লাগল, প্রতিটা লাইন খুব সাবধানে লিখছিল। যেন আর কোনো ভুল না হয়।
সময় যেন খুব দ্রুত কেটে যাচ্ছিল।
এক ঘণ্টা পরে সে আবার রিপোর্টটা নিয়ে কেবিনের সামনে দাঁড়াল। এবার তার চোখে ভয় আছে, কিন্তু সাথে একটা দৃঢ়তাও আছে।
“Come in.”
সে ভেতরে ঢুকে ফাইলটা এগিয়ে দিল।
অর্ণব ফাইলটা নিয়ে পড়তে লাগল। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
মেহেরের মনে হচ্ছিল, তার হৃদস্পন্দন যেন পুরো রুমে শোনা যাচ্ছে।
অবশেষে অর্ণব ফাইলটা বন্ধ করল।
“Better.”
একটা ছোট শব্দ, কিন্তু মেহেরের জন্য সেটা অনেক বড় কিছু ছিল। তার মুখে অজান্তেই হালকা হাসি চলে এলো।
সে বলল,
“Thank you, sir… আমি চেষ্টা করব আর ভালো করতে।”
অর্ণব তার দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
এই হাসিটা… এত সিম্পল, এত নির্ভেজাল… অফিসের এই ঠান্ডা পরিবেশে যেন একদম বেমানান।
সে হঠাৎই দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
“You can go.”
মেহের মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
কেবিনে একা বসে অর্ণব আবার জানালার দিকে তাকাল। নিচে একই শহর, একই ভিড়… কিন্তু আজ সবকিছু যেন একটু অন্যরকম লাগছে।
তার মনে অজান্তেই একটা চিন্তা ঘুরছিল—
এই মেয়েটা… সত্যিই কি শুধু একজন নতুন এমপ্লয়ি?
নাকি তার জীবনে আরও বড় কিছু হতে চলেছে…?
আর বাইরে, নিজের ডেস্কে বসে মেহেরও বুঝতে পারছিল—
এই অফিসটা শুধু একটা কাজের জায়গা নয়… এখানে কিছু একটা ঘটতে চলেছে, যা সে এখনও বুঝতে পারছে না।
শহরের ব্যস্ততার মাঝেই, তাদের দুজনের গল্পটা ধীরে ধীরে গভীর হতে শুরু করল।
দিনগুলো একে একে কেটে যেতে লাগল। অফিসের কাজ, মিটিং, ডেডলাইন—সবকিছুর ভিড়ে মেহের ধীরে ধীরে নিজের জায়গাটা তৈরি করতে শুরু করল। প্রথম দিনের সেই ভয়টা এখনও পুরোপুরি যায়নি, কিন্তু তার চোখে এখন একটু আত্মবিশ্বাস দেখা যায়। সে প্রতিটা কাজ খুব মন দিয়ে করে, যেন কোনো ভুল না হয়।
অর্ণবও লক্ষ্য করছিল সবকিছু।
সে প্রকাশ্যে কিছু বলত না, কিন্তু তার চোখ এড়িয়ে কিছু যেত না। মেহেরের কাজের প্রতি মনোযোগ, তার চুপচাপ স্বভাব, আর মাঝে মাঝে অকারণে হাসি—এসব কিছু অর্ণবের অজান্তেই তার দৃষ্টি কাড়তে শুরু করেছিল।
তবুও, বাইরে থেকে সবকিছু একই রকম রয়ে গেল।
“Deadline means deadline.”
“Focus on your work.”
“I don’t repeat instructions.”
অফিসে তার কড়া ব্যবহার একটুও কমেনি।
একদিন বিকেলে, হঠাৎ করে একটা জরুরি প্রজেক্ট এসে পড়ে। পুরো টিম চাপের মধ্যে পড়ে যায়। সবাই দৌড়াচ্ছে, ফোন বাজছে, ফাইল আসছে-যাচ্ছে—পুরো পরিবেশটা অস্থির হয়ে ওঠে।
মেহেরও সেই প্রজেক্টের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশে কাজ করছিল। সে মন দিয়ে কাজ করছিল, কিন্তু সময় খুব কম। চাপটা ধীরে ধীরে তার ওপরও পড়তে শুরু করল।
হঠাৎ তার কম্পিউটার স্ক্রিনে একটা এরর দেখাল।
সে থেমে গেল।
আবার চেষ্টা করল—কাজ হলো না।
তার বুক ধীরে ধীরে ধড়ফড় করতে লাগল। এত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি সে কাজটা শেষ করতে না পারে…?
সে চারপাশে তাকাল। সবাই এত ব্যস্ত যে কাউকে ডাকার সাহস পেল না।
কিছুক্ষণ দ্বিধা করার পর, সে উঠে দাঁড়াল।
ধীরে ধীরে অর্ণবের কেবিনের দিকে এগোল।
দরজার সামনে এসে সে একবার থামল। হাতটানক করার জন্য উঠিয়েও আবার নামিয়ে নিল। বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছিল—প্রথম দিন থেকেই সে জানে, অর্ণবের সামনে ভুল মানে শুধু ভুল নয়, তার থেকেও বেশি কিছু। তবুও আর কোনো উপায় নেই ভেবে সে অবশেষে ধীরে ধীরে নক করল। ভেতর থেকে ঠান্ডা গলায় ভেসে এলো, “Come in।”
মেহের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল অর্ণব ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকে কিছু কাজ করছে। তার চোখে ক্লান্তি থাকলেও মুখে সেই একই কঠিন ভাব। সে মাথা না তুলেই বলল, “Yes?”
মেহের কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “Sir… আমার সিস্টেমে একটা এরর দেখাচ্ছে… আমি ঠিক করতে পারছি না…”
কথাটা শেষ করতে না করতেই অর্ণব বিরক্তির ভঙ্গিতে নিঃশ্বাস ফেলল, যেন এমন ছোট সমস্যার জন্য তার কাছে আসাটা তার পছন্দ হয়নি। কিন্তু সে কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। তার হাঁটার ভঙ্গি আগের মতোই দৃঢ়, কিন্তু আজ তার চোখে একটু অন্যরকম কিছু ছিল—যেন বিরক্তির সাথে সাথে একটা অদ্ভুত মনোযোগও মিশে আছে।
সে মেহেরের সাথে তার ডেস্ক পর্যন্ত এলো। চারপাশের লোকজন কাজ করলেও, তাদের দৃষ্টি অজান্তেই ওদের দিকে চলে যাচ্ছিল। CEO নিজে কারও ডেস্কে এসে দাঁড়ানো—এটা খুব সাধারণ দৃশ্য নয়।
অর্ণব স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর কিবোর্ডে হাত রেখে দ্রুত কাজ শুরু করল। তার আঙুলগুলো এত দ্রুত চলছিল যে মেহের অবাক হয়ে দেখছিল। সে কিছু বলতে চেয়েও বলল না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই স্ক্রিন ঠিক হয়ে গেল। এররটা হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেল, যেন কখনো ছিলই না।
“Simple issue,” অর্ণব শান্ত গলায় বলল, “Next time panic করবে না।”
মেহের মাথা নেড়ে আস্তে বলল, “জি… ধন্যবাদ…”
অর্ণব আর কিছু না বলে ফিরে যেতে লাগল। কিন্তু দু’পা যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে গেল। কেন থামল, সে নিজেও বুঝতে পারল না। এক মুহূর্তের জন্য সে পিছনে তাকাল—মেহের তখন আবার নিজের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার চোখে এখনও সেই চাপা দুশ্চিন্তা রয়ে গেছে।
অর্ণব দৃষ্টি সরিয়ে নিল, যেন কিছুই হয়নি, আর ধীরে ধীরে নিজের কেবিনে ফিরে গেল।
এরপর সময় যেন আরও দ্রুত চলতে লাগল। ডেডলাইনের চাপ, টিমের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে অফিসের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। মেহের এবার আর কোনো ভুল না করার জন্য নিজের পুরো মনোযোগ কাজে ঢেলে দিল। তার আঙুলগুলো কিবোর্ডে চলছিল, চোখ স্ক্রিনে আটকে ছিল, আর সময়ের সাথে সাথে সে ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ ফিরে পাচ্ছিল।
অবশেষে, অনেক চাপ আর চেষ্টা শেষে প্রজেক্টটা সময়মতো সাবমিট হলো। পুরো টিম যেন একসাথে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কেউ হাসল, কেউ চেয়ার ছেড়ে উঠে স্ট্রেচ করল—একটা চাপা স্বস্তি সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল।
মেহেরও চুপচাপ বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল, যেন সে একটা বড় পরীক্ষা শেষ করেছে। তার ঠোঁটে খুব হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল—নিজের অজান্তেই।
ঠিক তখনই পাশ থেকে রোহিত বলল, “Good work, Meher. তুমি ভালো হ্যান্ডেল করেছো।”
মেহের একটু চমকে তাকাল, তারপর লজ্জা পেয়ে হেসে বলল, “আমি তো চেষ্টা করছিলাম…”
রোহিত আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তেই দূর থেকে অর্ণবের দৃষ্টি তাদের ওপর এসে পড়ল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি ছিল না, কিন্তু তার চোখ দুটো অস্বাভাবিকভাবে স্থির হয়ে গেল।
সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
কিন্তু সেই ছোট্ট মুহূর্তটা তার ভেতরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তৈরি করে গেল।
সে নিজের কেবিনে ফিরে গিয়ে চেয়ারে বসে রইল। কাজ ছিল, ফাইল ছিল, কিন্তু তার মন বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল। সে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করছিল—এটা শুধু কাজের জায়গা, এখানে ব্যক্তিগত কিছু ভাবার কোনো মানে নেই।
তবুও, কেন যেন সে বারবার সেই দৃশ্যটাই মনে করতে লাগল—মেহেরের হাসি, তার সহজ স্বভাব, আর অন্য কারও সাথে তার স্বাভাবিকভাবে কথা বলা।
অন্যদিকে, মেহের কিছুই বুঝতে পারছিল না। তার কাছে সবকিছুই স্বাভাবিক। তার কাছে এটা শুধু একটা কাজের জায়গা, আর অর্ণব—তার বস, যার সামনে সবসময় একটু সাবধানে থাকতে হয়।
কিন্তু অজান্তেই, তাদের দুজনের ভেতরে দুইরকম অনুভূতি জন্ম নিতে শুরু করেছে—একটা অজানা টান, যেটা কেউ স্বীকার করছে না, কিন্তু এড়িয়ে যেতেও পারছে না।
সন্ধ্যা নেমে এলো ধীরে ধীরে। অফিসের আলো একে একে নিভতে শুরু করল। সবাই বাড়ির পথে রওনা দিল, কিন্তু অর্ণব আর মেহের—দুজনেই বুঝতে পারল না, কখন তাদের সাধারণ দিনের ভেতরে একটা অসাধারণ গল্প নীরবে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে…
সন্ধ্যা নেমে এলো ধীরে ধীরে। অফিসের আলো একে একে নিভতে শুরু করল। সবাই বাড়ির পথে রওনা দিল, কিন্তু অর্ণব আর মেহের—দুজনেই বুঝতে পারল না, কখন তাদের সাধারণ দিনের ভেতরে একটা অসাধারণ গল্প নীরবে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে।
অফিস প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। বড় ফ্লোরে এখন শুধু কয়েকটা লাইট জ্বলছে, আর সেই নীরবতার মাঝে কিবোর্ডের শব্দও আলাদা করে শোনা যায়। মেহের এখনও নিজের ডেস্কে বসে ছিল। দিনের কাজ শেষ হলেও সে কিছু ফাইল আবার চেক করছিল—ভুলের ভয়টা এখনও তাকে পুরো ছাড়েনি।
অন্যদিকে, অর্ণব নিজের কেবিনে বসে ছিল, কিন্তু কাজের দিকে তার মন ছিল না। সে কয়েকবার ফাইল খুলে আবার বন্ধ করেছে। শেষমেশ বিরক্ত হয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে শহরের আলো ঝলমল করছে, কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত একটা অস্থিরতা কাজ করছে।
কেন যেন আজ বাড়ি যেতে ইচ্ছা করছে না।
কিছুক্ষণ পরে সে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। ফ্লোর প্রায় খালি, কিন্তু তার চোখ হঠাৎই গিয়ে থামল—মেহের এখনও বসে কাজ করছে।
সে কিছুটা অবাক হলো।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে বলল, “Still here?”
মেহের চমকে উঠে তাকাল। সে বুঝতেই পারেনি কেউ এসেছে।
“জি… আমি একটু কাজটা আবার চেক করছিলাম,” সে আস্তে বলল।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “It’s late. Go home.”
কথাটা আদেশের মতো শোনালেও, তার গলায় আগের মতো কড়া ভাবটা ছিল না।
মেহের একটু থেমে বলল, “আপনি তো এখনও আছেন…”
কথাটা বলেই সে থেমে গেল, বুঝতে পারল হয়তো এটা বলা ঠিক হয়নি।
অর্ণব হালকা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, তারপর অদ্ভুতভাবে শান্ত গলায় বলল, “That’s not your concern.”
মেহের মাথা নিচু করে ফেলল, “Sorry…”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর অর্ণব ধীরে বলল, “First day না হলেও, এখনও নতুন। এত দেরি করে থাকার দরকার নেই।”
মেহের এবার কিছু বলল না। সে চুপচাপ নিজের জিনিসপত্র গুছাতে লাগল।
দুজন একসাথে লিফটের দিকে হাঁটতে লাগল। পুরো বিল্ডিংটা প্রায় ফাঁকা, শুধু তাদের পায়ের শব্দটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
লিফটের ভিতরে এক অদ্ভুত নীরবতা।
মেহের সামনে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আর অর্ণব পাশ থেকে তাকে লক্ষ্য করছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই নীরবতাটা অস্বস্তিকর না… বরং একটু অন্যরকম।
হঠাৎই লিফটটা ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে গেল।
মেহের হালকা চমকে উঠল।
লাইট জ্বলছে, কিন্তু লিফট নড়ছে না।
“W-what happened…?” সে আস্তে বলল।
অর্ণব সাথে সাথে কন্ট্রোল প্যানেল চেক করল, কয়েকটা বাটন চাপল, কিন্তু কোনো রেসপন্স নেই।
“Power fluctuation,” সে সংক্ষেপে বলল।
মেহেরের শ্বাস একটু দ্রুত হয়ে গেল। ছোট জায়গায় আটকে থাকার একটা অদ্ভুত ভয় তার মধ্যে কাজ করছিল।
সে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
অর্ণব সেটা লক্ষ্য করল।
“Relax. It will start,” সে বলল, কিন্তু এবার তার গলায় আগের মতো কঠোরতা ছিল না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল।
লিফটের ভিতরের নীরবতা, হালকা গুমোট বাতাস, আর দুজনের মাঝের অদ্ভুত দূরত্ব—সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটা ভারী হয়ে উঠছিল।
মেহের আস্তে বলল, “আমি… লিফটে একটু ভয় পাই…”
অর্ণব তার দিকে তাকাল।
এই প্রথমবার, সে তাকে এতটা অসহায়ভাবে দেখল।
কিছু না ভেবেই সে একটু এগিয়ে এসে বলল, “Look at me.”
মেহের ধীরে তার দিকে তাকাল।
“Nothing will happen. I’m here.”
সাধারণ একটা কথা, কিন্তু তার গলায় এমন এক নিশ্চয়তা ছিল, যা মেহেরের ভয়টা একটু হলেও কমিয়ে দিল।
সে ধীরে ধীরে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
কয়েক সেকেন্ড… তারপর এক মিনিট… সময় যেন ধীরে চলছিল।
হঠাৎ করেই লিফট আবার নড়তে শুরু করল।
মেহের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুলে গেল।
দুজনেই বাইরে বেরিয়ে এলো, কিন্তু কেউ কিছু বলল না।
বাইরে রাত পুরোপুরি নেমে গেছে।
মেহের ধীরে বলল, “Thank you… sir…”
অর্ণব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, “Go home safely.”
মেহের মাথা নেড়ে হাঁটতে শুরু করল।
অর্ণব দাঁড়িয়ে রইল, যতক্ষণ না সে চোখের আড়াল হয়ে গেল।
তারপর সে ধীরে নিঃশ্বাস ফেলল।
আজকের রাতটা তার জন্য আলাদা.....কারণ সে বুঝতে পারছে—এই সম্পর্কটা আর শুধু বস আর এমপ্লয়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই… কিছু একটা বদলাতে শুরু করেছে।
পরের দিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হলেও, ভেতরে ভেতরে দুজনেরই কিছু যেন পাল্টে গেছে। অফিসে ঢোকার সময় মেহের আগের মতোই নিজের ডেস্কে গিয়ে বসে, কিন্তু আজ তার মনটা অদ্ভুতভাবে অস্থির। লিফটের সেই মুহূর্তটা বারবার মনে পড়ছে—অর্ণবের চোখ, তার কণ্ঠের সেই শান্ত ভরসা… সবকিছু যেন এখনও খুব কাছাকাছি।
সে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের মনোযোগ কাজে ফেরানোর চেষ্টা করল।
অন্যদিকে, অর্ণবও নিজের কেবিনে বসে ছিল, কিন্তু আজ তার রুটিনটা যেন একটু এলোমেলো। সে ফাইল খুলছে, আবার বন্ধ করছে। কাজের মাঝে মাঝেই তার দৃষ্টি অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাইরে চলে যাচ্ছে—ঠিক সেই জায়গাটায়, যেখানে মেহের বসে।
সে নিজেকে থামানোর চেষ্টা করছিল।
“Focus,” সে নিজের মনেই বলল।
কিন্তু মন কি এত সহজে শোনে?
কিছুক্ষণ পর HR থেকে একটা মেইল এলো—টিম রিভিউ মিটিং।
সবাই কনফারেন্স রুমে জড়ো হলো। মেহেরও নোটপ্যাড হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে পড়ল। সে এখনও এই বড় বড় মিটিংয়ে কথা বলতে স্বচ্ছন্দ নয়, তাই সে শুধু শোনার দিকেই মন দেয়।
অর্ণব ঢুকতেই রুমটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।
সে একে একে সবার কাজ নিয়ে কথা বলতে লাগল—কোথায় ভুল, কোথায় ঠিক, কোথায় উন্নতি দরকার। তার গলায় সেই একই কড়া ভাব, যা সবাইকে একটু সোজা হয়ে বসতে বাধ্য করে।
হঠাৎই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল মেহেরের ওপর।
“Meher.”
মেহের চমকে উঠে তাকাল।
“Your last report… improved.”
একটা ছোট বাক্য।
কিন্তু পুরো রুম অবাক হয়ে গেল।
কারণ অর্ণব কাউকে এভাবে সরাসরি প্রশংসা খুব কমই করে।
মেহের নিজেও কিছুক্ষণ বুঝতে পারল না কী বলবে। তারপর আস্তে বলল, “Thank you, sir…”
তার গলায় নার্ভাসনেস থাকলেও চোখে একটা আলাদা উজ্জ্বলতা ছিল।
অর্ণব দৃষ্টি সরিয়ে নিল, যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত একটা শান্তি কাজ করছিল।
মিটিং শেষ হওয়ার পর সবাই একে একে বেরিয়ে গেল। মেহেরও বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছতেই অর্ণব বলল, “You. Stay.”
সে থেমে গেল।
রুমে এখন শুধু দুজন।
মেহেরের বুক আবার ধড়ফড় করতে লাগল।
“Did you understand everything from the meeting?” অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
“জি… mostly,” সে আস্তে বলল।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, “If you have doubts, ask. Don’t struggle alone.”
কথাটা সাধারণ, কিন্তু তার ভেতরে অন্যরকম একটা ভাব ছিল।
মেহের একটু অবাক হয়ে গেল।
সে ধীরে বলল, “জি… আমি জিজ্ঞেস করব।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর অর্ণব হঠাৎই বলল, “And… don’t stay late unnecessarily.”
মেহেরের চোখে হালকা বিস্ময় ফুটে উঠল।
সে বুঝতে পারল—এই কথাটা শুধু একজন বসের দায়িত্ব না… এর পেছনে আরও কিছু আছে।
সে আস্তে মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
অর্ণব একা দাঁড়িয়ে রইল।
সে নিজের মনে স্বীকার করল না, কিন্তু সত্যিটা পরিষ্কার—সে এখন মেহেরের ব্যাপারে ভাবছে… আগের থেকে অনেক বেশি।
দিনগুলো আবার কেটে যেতে লাগল, কিন্তু এখন ছোট ছোট মুহূর্তগুলো বদলে গেছে। কখনো হালকা চোখাচোখি, কখনো অকারণে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া, কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেও কথা না বলা—সবকিছুতেই একটা অদ্ভুত টান তৈরি হচ্ছে।
একদিন বিকেলে, হঠাৎ করে বাইরে বৃষ্টি শুরু হলো।
জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ পড়ছে, আর পুরো শহরটা ধোঁয়াটে হয়ে গেছে।
অফিস শেষ হওয়ার সময়, সবাই একে একে বেরিয়ে যাচ্ছে। মেহেরও নিচে এসে দাঁড়াল, কিন্তু তার কাছে ছাতা নেই।
সে একটু চিন্তায় পড়ে গেল।
ঠিক তখনই তার পাশে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
“Wait.”
সে ঘুরে তাকাল।
অর্ণব।
তার হাতে একটা কালো ছাতা।
সে কিছু না বলে ছাতাটা খুলে তার দিকে এগিয়ে দিল।
“Take it.”
মেহের অবাক হয়ে বলল, “না… আপনি—”
“Just take it,” অর্ণব কথাটা কেটে দিল।
মেহের ধীরে ছাতাটা নিল।
“আপনি…?” সে আবার বলতে গেল।
অর্ণব হালকা ভ্রু তুলে বলল, “I have another way.”
কথাটা বলে সে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল।
মেহের দাঁড়িয়ে রইল, ছাতাটা হাতে নিয়ে।
তার মুখে ধীরে ধীরে একটা নরম হাসি ফুটে উঠল।
বৃষ্টির শব্দের মাঝেই, সে বুঝতে পারল—
এই সম্পর্কটা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে যাচ্ছে…
আর অর্ণব… ভিজতে ভিজতেই হাঁটছিল, কিন্তু আজ বৃষ্টিটা তার কাছে অস্বস্তিকর লাগছিল না।
বরং, অনেকদিন পর তার ভেতরে কিছু একটা নরম হয়ে আসছিল....