হলুদ কোকাবুরা–2
নিধি বেরোনোর সময় একবার পিছন ঘুরে ভালো করে দেখে নেয়—কেউ ওকে দেখছে না, তারপর সে দরজা টেনে দ্রুত বেরিয়ে যায়।
বেরোনোর সময় সে সাথে করে স্কুটির চাবিটা এবং গ্যারেজের চাবিটা নিয়ে এসেছিল। তাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে সোজা গ্যারেজের দিকে ছুট লাগায়। তারপর দ্রুত হাতে গ্যারেজের দরজা খুলে স্কুটিটা বের করে নিয়ে আসে তবে এখানেই স্টার্ট করে না। পাছে স্কুটির আওয়াজে কেউ জেগে যায়।
কারণ এই সময়ে কেউ জেগে গেলে আর ওকে এইভাবে এতো রাতে দেখে নিলে অনেক মুকশিল হবে, অবান্তর অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এর ফলে ওরই দেরি হবে, তার ওপর আত্মীয় স্বজনতো আছেই আগুনে ঘি ঢালার জন্য।
তাই নিধি গ্যারেজের চাবি আটকে সেটা পকেটে চালান করে স্কুটিটা নিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। যেহেতু ওদের বাড়িটা একদম রাস্তার ধারেই তাই ওকে বেশিক্ষণ হাঁটতেও হয় না।
কি মনে হতে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে সে নিজের ফোনে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় আর সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে যায়। ফোনটা সাইলেন্ট থাকার কারণে দশটা মিসড কলের আওয়াজ কানেই যায়নি তার।
নিধির সামান্য ভ্রু কুঁচকে ওঠে। সে তো বললো আসছে, তাহলে এতবার ফোন করা কিসের জন্য? নিজের ভাবনার মাঝেই নিধি খেয়াল করে ইতিমধ্যেই মিসড কলের সংখ্যা দলের কাঁটা ছাড়িয়ে কুড়ির কাঁটা ধরে ফেলেছে। নিধির বড্ড বিরক্ত লাগে। সে কল না ধরেই ফোনটা পকেটে রাখতে গিয়েও আটকে যায়। যে নিদির্ষ্ট নাম্বার থেকে এতোবার ওর কাছে কল আসছিল সেই নাম্বারে কয়েকটা শব্দ লিখে দেয় "আই এম অন দ্যা ওয়ে।" তারপর নিধি ফোনটাকে আর পার্সটাকে জিন্সের পকেটে ঢুকিয়ে, গাড়ি স্টার্ট করে দেয়।
নিধির স্কুটি বেরিয়ে যায় তবে সে খেয়ালও করে না দোতলার জানলা দিয়ে একজোড়া চোখ ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই চোখের মালিকের মুখ, নিধি বেরিয়ে যেতে, আরও শক্ত হয়ে যায়। নিধির যাওয়া দেখতে দেখতে উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তারপর নিজের ইজি চেয়ারে ফিরে আসেন।
আজ রাতে যে নিধি এইরকম একটা কিছু করতে চলেছে সেটা উনি অনেক আগেই বুঝেছিলন। তাই সারা বাড়ি এমনকি ওনার স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়লেও উনি দুই চোখের পাতা এক মিনিটের জন্যও বন্ধ করতে পারেননি।
তবে সব জানা সত্ত্বেও, কিছুক্ষণের জন্য হলেও ওনার মনে হয়েছিল হয়তো... নিধি এইরকম কিছু করবে না, হয়তো ও...। তবে ওনার ধারনা যে ভুল ছিল সেটা তো নিধি নিজেই প্রমাণ করে দিলো আর কি বলবেন উনি?
এখন ওনার সত্যি হাত কামড়াতে করছে। কি করবেন উনি এখন? লোকজনকে কি উত্তর দেবেন? কি করে মুখ দেখাবেন সবাইকে? আত্মীয় স্বজন– তাদের অপমান, কটাক্ষ...।
চোখ বন্ধ করে শরীরের সমস্ত ভার ইজি চেয়ারে ছেড়ে দেন তিনি। বেশি কিছু আর ভাবতে ইচ্ছা করে না তার। এখন শুধুমাত্র ইশ্বরই ভরসা।
এখন বেশ রাত। এইসময়ে কলকাতার রাস্তাঘাট পুরো ফাঁকা, মাঝে মাঝে রাতের নির্জনতাকে ভঙ্গ করে হুস করে একটা দুটো মালবাহি গাড়ি যাচ্ছে শুধু। সেই সময় চারিদিক কাঁপানো আওয়াজ তারপর আবার যেই কি সেই।
এই সময় একটা বছর চব্বিশের ছেলে একা অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগেই ও একটা ম্যাসেজ পেয়েছে তাই এখন একবার ফোনে টাইমটা দেখে নিয়ে আবার ওটাকে যথাস্থানে রেখে দেয়।
সত্যি এখন অনেক রাত হয়েছে। তবে এই এতো রাতে ওর এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকতে মন্দ লাগছে না। আর তাছাড়াও ওর রাত বিরেতে বাড়ি ফেরার কিংবা বাড়ি থেকে বেরোনোর অভ্যেস আছে আর বাড়ির লোকেরাও সবাই জানে ওর এই অভ্যেসের কথা। তাই এই এতো রাতে বাড়ি থেকে বেরোতে ওর কোনো অসুবিধা হয়নি।
তবে যার জন্য সে এখানে অপেক্ষা করেছে তার অসুবিধা আছে বইকি এবং আজকের তো আছেই। তবে সেই মানুষটার এখনও কোনো পাত্তা নেই। কখন আসবে কে জানে? সেই কখন একটা ম্যাসেজ করেছে।
"আচ্ছা রাস্তায় কোনো বিপদ আপদ হলো না তো।"
এই কথাটা একবার মাথায় আসতেই একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দেখা গেল ছেলেটির মুখে। সে আপনা আপনিই বিড়বিড় করে বললো "বরঞ্চ ও এবার যা করবে তাতে ওর বিপদ থাকলেও থাকতে পারে। কে জানে ভবিষ্যতে ঠিকঠাক ভাবে নিজের খরচটুকুও চালাতে পারবে কি না। আজকের তোর সিদ্ধান্তের ওপরেই নির্ভর করছে নিধি ভবিষ্যতটা তোর কেমন কাটাবে, ভালো নাকি খারাপ। দেখিস নিজের সিদ্ধান্তের জন্য তোকে আবার পস্তাতেই না হয়। তবে হ্যাঁ তুই যদি আমার কথা শুনিস তাহলে তোকে আর...।"
হঠাৎ চুপ করে যায় সে। ওর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা ক্রুর হাসিটা আস্তে আস্তে চওড়া হয়ে পুরো মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
চলবে..............