হলুদ কোকাবুরা:পর্ব 1
রাস্তার ধারের তিনতলা, সাদা রঙের বাড়িটায় আজ সকাল থেকে হইচই হচ্ছে। সকাল থেকেই আত্মীয় স্বজন এসে চলেছে অনবরত। তাঁদের কথাবার্তায়, হাসি ঠাট্টার আওয়াজে সারা বাড়ি গমগম করছে। আর করবেনাই বা কেন— পরের দিন যে এই বাড়ির একমাত্র মেয়ে নিবেদিতার বিয়ে। আর তাই বিয়ের আগের দিন থেকেই লোকজন আসতে শুরু করে দিয়েছে আর এটাই তো স্বাভাবিক।
আজ সবার মনে আনন্দ। নিজের মধ্যে কথা বলার, হাসি-ঠাট্টার মাঝে সবাই ব্যস্ত বিয়ের তোড়জোড়ে। তবে এই এত কিছুর মাঝে কারোর খেয়ালই নেই যে একজনের মনে কোনোরকম খুশির ঝলক নেই। সে সকাল থেকে মনমরা হয়ে বসে আসে।
সে না পারছে কাউকে নিজের মনের কথা বলতে আর না পারছে সব কিছু ছেড়ে, এইসবের থেকে অনেক দূরে কোথাও চলে যেতে। সবার আনন্দের আড়ালে একমাত্র সেই আছে যার কষ্টে, দুঃখে মনটা আজ হাজারও খন্ডে ভাগ হয়ে যাচ্ছে।
এখন রাত দেড়টা। সারা বাড়ির লোকজন এখন ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে সেই কোন কালে। শুধু একজনের চোখে ঘুম নেই এখনও। বরং সে অপেক্ষা করছে কখন বাড়ির সমস্ত লোক ঘুমিয়ে পড়বে এবং সে নিজের কাজ করতে পারবে।
বেশ অনেকক্ষণ ধরে নিজের রুমে ছটফট করার পর নিধি আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দরজা ফাঁক করে দেখে নেয় বাইরে কেউ আছে কি না। বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে যখন সে নিশ্চিত হয় বাইরে কেউ নেই, তখন নিধি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে দেয়।
নিজের ঘরের বিছানার ওপর গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে সে। এখনোও ওর মন দোলাচলে আছে। কি করবে, না করবে— সব কিছু যেন মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে ওর। আর ওইদিকে একজন, নির্দিষ্ট জায়গায় ওর জন্য অপেক্ষা করছে। এই মুহূর্তে নিধির করনীয় কি সেটাই বুঝতে পারছে না সে।
যদিও ও আগে থেকেই নিজের মনকে মানিয়ে নিয়েছিলে, কিন্তু তাও এখন ওর খুব কষ্ট হচ্ছে, চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে বড্ড। আজ যে ও সবকিছু শেষ করে দিতে যাচ্ছে, আর এর ফল যে কি হবে তা ওর জানা নেই।
চোখ থেকে গড়িয়ে আসা নোনা জলের রেখাটাকে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মোছে নিধি। তারপর পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা নিয়ে টাইমটা দেখে নেও। তবে আরও একটা জিনিস ওর চোখে পড়েছে, আর সেটা হল দশটা মিসড্ কল আর গোটা কয়েক ম্যাসেজ।
"না এখানে এইভাবে বসে থাকলে আর হবে না, আমার ভীষণ দেরি হয়ে যাচ্ছে। এবার আমাকে বেরোতেই হবে। সে যে করেই হোক না কেন।" আপন মনে বিড়বিড় করে বলে ওঠে নিধি। তারপর চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ায়।
একটা নেভি কালারের চুড়িদার পড়ে নেয় সে। চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটজোড়া নুড কালারের লিপস্টিকে রাঙিয়ে তোলে। কপালের মাঝ বরাবর একটা কালো টিপ পড়ে নেয় ও। তারপর হাত দিয়ে চুলগুলো আঁচড়ে নেয়।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে টেবিল থেকে পার্স আর ফোনটাকে নিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বাইরে চোখ রাখে। কাউকে দেখতে না পেয়ে এবার সে খুব সন্তর্পনে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে বাইরে।
ভাগ্যিস আজ ওর সাথে কেউ ঘুমায়নি নাহলে এইভাবে বেরোতে খুব মুশকিল হয়ে যেত। তবে নিধির ছোটো মামার মেয়েটা জেদ করছিলো খুব নিধির সাথে শোয়ার জন্য তবে সে ভীষণ ছোটো হওয়ায় কারণে, ছোটো মামি ওকে কোলে কোলে করে নিয়ে চলে গেছে নিজের কাছে শোয়াবে বলে।
তখন অবশ্য নিধি ওর ছোটো মামিকে মনে মনে থ্যাঙ্কাস বলেছিল এই কারণে। এইসব কথা ভাবতে ভাবতে নিধি খুব আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে।
নিধির ঘর দোতলায়, একদম সিঁড়ির পাশেই। নিচে নেমেই এদিক ওদিক আবার ভালো করে দেখে নেয় সে। চারিদিকে চোখ বোলাতে বোলাতে ওর একটা ঘরের সামনে এসে থেমে যায়। কারণ ঘরের লাইট জ্বলছে এবং দরজাটা সামান্য খোলা। তবে ঘরের ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। তবে এই সময় ঘরের মানুষজন জেগে আছে দেখে নিধির ভয়ের থেকে বেশি আশ্চর্য হয়। কারণ এটা ওর দাদু আর ঠাম্মির ঘর। এই সময়ের মধ্যে ওদের ঘুমিয়ে পড়া উচিত কিন্তু ওরা জেগে আছে, কিন্তু কেন?
নিধি কি করবে ভাবতে থাকে। ও কি এখন ওই ঘরে গিয়ে দেখবে নাকি লুকিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে থাকবে। এরপর নিধির হঠাৎ কি মনে হতে আস্তে আস্তে সেই ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। তারপর খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভেতরটা একটু উঁকি মেরে দেখে ওর দাদু আর ঠাম্মি শুয়ে আছে, না একটু ভুল হল ঘুমিয়ে আছেন। মাঝে মাঝে নিধির দাদু আর ঠাম্মি কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েন লাইট অফ্ না করেই এবং এইরকম এর আগে অনেকবার হয়েছে। আজও বোধহয় গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
নিধি ঘরে ঢুকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যায় ওদের দিকে। তারপর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হালকা হেসে লাইট অফ্ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় এবং দরজাটা বন্ধ করে দেয়। তারপর পায়ে ঝটপট জুতো গলিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় শুধু বেরোনোর আগে একবার পিছন ঘুরে বাড়িটাকে ভালো করে দেখে নেয়।
চলবে.......................
(আজ থেকে নতুন গল্প শুরু হল, আশা করি আপনারা আগের গল্পটার মতো এই গল্পটাও সাপোর্ট করবেন।)