I found you on the wrong path. in Bengali Love Stories by MOU DUTTA books and stories PDF | ভুল পথে পেলাম তোমাকে - Part 19

Featured Books
Categories
Share

ভুল পথে পেলাম তোমাকে - Part 19

ভাঙা আলো, শক্ত হাত
রাতটা অস্বাভাবিক নীরব ছিল।
যেন শহরের প্রতিটা শব্দ ইচ্ছা করে চুপ করে গেছে।
ইরা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। বাইরে আলো জ্বলছে, মানুষ চলছে—
তবু তার ভেতরে অদ্ভুত একটা শূন্যতা।
আজ প্রথমবার সে বুঝতে পারছিল, একা থাকা মানে শুধু পাশে কেউ না থাকা নয়—
একাই নিজের ভেতরের সঙ্গে আটকে পড়া।
পিছন থেকে মায়া এসে দাঁড়াল।
কোনো শব্দ না করে।
কোনো প্রশ্ন না করে।
এই নীরবতাটুকু তারা দু’জনেই চেনে।
“তুমি ভেঙে যাচ্ছ,” মায়া ধীরে বলল।
কণ্ঠে অভিযোগ নেই—আছে শুধু সত্য।
ইরা হেসে ফেলল।
কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না।
“আমি ভাঙিনি,” সে বলল,
“আমি বুঝে গেছি… আমি একা।”
মায়া এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।
দু’হাত দিয়ে ইরার মুখটা ধরল, জোর করে নয়—
ভরসা দিয়ে।
“একটা কথা মনে রাখো,” মায়া বলল,
“একা থাকা আর একা ফেলে দেওয়া—এই দুটো এক না।”
ইরার চোখ ভিজে উঠল।
সে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু মায়া ছাড়ল না।
“আমাকে দেখো,” মায়া বলল।
ইরা তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে ভয় ছিল, রাগ ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল—
ভরসা।
“আমি ভুল পথে তোমাকে পাইনি,” মায়া বলল,
“আমি ঠিক সময়েই তোমার কাছে এসেছি।”
এই কথাটা ইরার বুকের ভেতর কিছু ভেঙে দিল।
সে ধীরে ধীরে মাথা নত করল, কপালটা মায়ার কাঁধে ঠেকাল।
আর প্রথমবার, অনেকদিন পর—
সে কাঁদল।
নিঃশব্দে।
কিন্তু ভেঙে পড়ার মতো করে।
মায়া তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
কোনো সান্ত্বনা নেই, কোনো আশ্বাস নেই—
শুধু উপস্থিতি।
কিছুক্ষণ পর ইরা ফিসফিস করে বলল,
“যদি একদিন আমি তোমাকেও হারাই?”
মায়া চোখ বন্ধ করল।
এই প্রশ্নটা সে অনেকদিন ধরেই ভয় পাচ্ছিল।
“তুমি হারাবে না,” সে বলল,
“কারণ আমি যাওয়ার মানুষ নই।”
ইরা তাকাল।
“কীভাবে এতটা নিশ্চিত হও?”
মায়া হালকা হাসল।
“কারণ আমি জানি—ভালোবাসা মানে পালানো নয়।”
এই মুহূর্তে ইরা বুঝল—
ভালোবাসা সব সময় নরম হয় না।
কখনো কখনো সেটা শক্ত হাতের মতো—
পড়ে যেতে দেয় না।
রাত গভীর হল।
দু’জন পাশাপাশি বসে রইল—কথা না বলে।
কিন্তু এই নীরবতায় এবার ভয় ছিল না।
ছিল একটা চুক্তি।
ভোরের আলো ঢুকতে ঢুকতে মায়া বলল,
“এখান থেকে আর পিছনে তাকাবে না।”
ইরা মাথা নাড়ল।
“আমি ভয় পাই।”
“আমি জানি,”
ভোরের আলোটা আজ অদ্ভুত ছিল।
না পুরো আলো, না পুরো অন্ধকার—
মাঝামাঝি একটা অবস্থান।
যেমন ইরা আর মায়ার সম্পর্কটা এখন।
ইরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা হাতে নিয়েছিল।
ধোঁয়া উঠছিল, কিন্তু মনটা ঠান্ডা।
গতরাতের কান্না তার চোখে রয়ে গেছে,
কিন্তু আজ সে নিজেকে দুর্বল মনে করছে না।
সে জানে—
ভেঙে পড়া আর হার মানা এক জিনিস নয়।
পেছনে দরজার শব্দ।
মায়া বেরিয়ে এল, চুল এলোমেলো, চোখে ঘুম নেই।
“ঘুমাওনি?” ইরা জিজ্ঞেস করল।
মায়া মাথা নাড়ল।
“কিছু ভাবনা ঘুমাতে দেয়নি।”
ইরা তাকাল।
“আমাকে নিয়ে?”
মায়া একটু থামল।
তারপর বলল,
“আমাদের নিয়ে।”
এই কথাটা হাওয়ার মধ্যে ভারী হয়ে থাকল।
দু’জন পাশাপাশি দাঁড়াল।
কোনো স্পর্শ নেই, তবু দূরত্বও নেই।
“তুমি জানো,” মায়া বলল ধীরে,
“ভালোবাসা শুধু আশ্রয় না—কখনো সেটা যুদ্ধ।”
ইরা চুপ করে রইল।
“আর যুদ্ধ মানে,” মায়া চলতে থাকল,
“কেউ না কেউ আঘাত পাবে।
কেউ না কেউ বদলে যাবে।”
ইরা চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল।
“তুমি ভয় পাচ্ছ?”
মায়া হাসল—কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।
“আমি ভয় পাচ্ছি না,” সে বলল,
“আমি প্রস্তুত হচ্ছি।”
এই কথায় ইরার বুক কেঁপে উঠল।
সে জানে, মায়া যখন এমন কথা বলে—
তখন কিছু একটা আসছে।
“কিসের জন্য?” ইরা জিজ্ঞেস করল।
মায়া তাকাল তার চোখে।
এই দৃষ্টিতে আর কোমলতা নেই—
আছে সতর্কতা।
“কারণ সব ভুল পথ শুধু আমাদের ভেতর দিয়ে যায় না,”
মায়া বলল,
“কিছু ভুল পথ বাইরের মানুষও বানায়।”
ইরা বুঝে গেল।
সে চুপ করে গেল।
সেদিন বিকেলে ইরা একা বেরোল।
মায়া কিছু বলল না, শুধু বলল—
“সাবধানে থেকো।”
শহরটা আজ আলাদা লাগছিল।
পরিচিত রাস্তা, পরিচিত মুখ—
কিন্তু কোথাও একটা চাপা অস্বস্তি।
ইরা অনুভব করছিল,
কেউ তাকে লক্ষ্য করছে।
সে হেঁটে যাচ্ছিল, হঠাৎ পিছন থেকে ডাক—
“ইরা?”
সে ঘুরে দাঁড়াল।
একটা মুখ।
পুরনো, কিন্তু ভুলে যাওয়া নয়।
“তুমি এখানে?” ইরার গলা শক্ত হয়ে গেল।
মেয়েটা হাসল।
“তোমাকে খুঁজতেই এসেছিলাম।”
এই মানুষটা অতীতের অংশ—
যে অধ্যায় ইরা বন্ধ করতে চেয়েছিল।
“তুমি কেন এসেছ?” ইরা প্রশ্ন করল।
মেয়েটা ধীরে এগোল।
“কারণ তুমি ভুল পথে হাঁটছ।”
ইরার ভেতর আগুন জ্বলে উঠল।
“ভুল পথ কে ঠিক করে?”
মেয়েটা চোখ সরু করল।
“যারা শেষ পর্যন্ত থাকে।”
এই কথাটা আঘাত করল।
ইরা বুঝল—
এই যুদ্ধ বাইরে থেকেই শুরু হবে।
রাতে বাড়ি ফিরে ইরা সব বলল মায়াকে।
একটুও লুকোল না।
মায়া শান্তভাবে শুনল।
কিন্তু তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“আমি ভেবেছিলাম ও আর ফিরবে না,” মায়া বলল।
“আমি ভয় পেয়েছিলাম,” ইরা স্বীকার করল।
“কিন্তু পালাইনি।”
এই কথায় মায়া তার দিকে তাকাল।
চোখে গর্ব।
“এইটাই ভালোবাসার যুদ্ধ,” মায়া বলল,
“পালানো নয়—মুখোমুখি হওয়া।”
সে ইরার হাত ধরল।
এইবার শক্ত করে।
“একটা কথা মনে রেখো,” মায়া বলল,
“যদি কেউ তোমাকে আমার থেকে দূরে নিতে চায়—
তাহলে সে জানে না,
আমি কতটা দূর যেতে পারি।”
ইরা কেঁপে উঠল।
এই ভালোবাসা আর নরম নেই।
রাত গভীর হল।
ঝড় আসার আগে যেমন বাতাস থমকে যায়—
তেমনই।
দূরে কোথাও বাজ পড়ল।
এই শব্দটা শুধু আকাশে না—
তাদের জীবনের মাঝখানে।