Jharapata 95(Complete) in Bengali Love Stories by Srabanti Ghosh books and stories PDF | ঝরাপাতা - 95 (অন্তিম পর্ব)

Featured Books
Categories
Share

ঝরাপাতা - 95 (অন্তিম পর্ব)

ঝরাপাতা 

পর্ব - ৯৫ (অন্তিম পর্ব) 

🌹💞🌹💞🌹💞🌹

সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব ভুলে সমর আর গোপা মন থেকে কাছে টেনে নেয় দুই মেয়ে জামাইকে। তাদের তরফেও কোনো খামতি নেই সেই ব্যবহারের যোগ্য প্রতিদান দিতে। হাসি, মজা, গল্প, আড্ডা, গানের আসর, খাওয়া দাওয়া, সেইসব আনন্দঘন মুহূর্তের ছবি তোলার মধ্যে দিয়ে নিয়মের আড়াই দিন সময় দ্রুত ফুরিয়ে যায়। এর মধ্যে ওদের সব তুতো ভাইবোনদের সিনেমা দেখাতে, ডিনার করাতে বাইরে নিয়ে গেছে দিদি জামাইবাবুরা। 

শুধু মিলি নয়, রনির তুতো ভাইবোনেরাও সবাই এসেছে, পিউ আর বনি তো আছেই। এত বড় দল মিলেমিশে যেন ভারত বিশ্বকাপ জেতার মতো সেলিব্রেশন চলছে। 

সমস্ত খরচ যুগল করেছে। ও বড়, ও প্রথমবার সবাইকে খাওয়াবে, এই একটা কথা বলেই রনিকে এককথায় উড়িয়ে দিয়েছে যুগল। অবশ্য লিলির তাতে ডবল সায় ছিল। 

শুরুতে সব গোলমাল হয়ে গেলেও, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দুই পরিবারের ছেলে মেয়েদের সকলের নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব চোখে দেখে পরিবারের বড়দের সকলের ভালো লাগে, বড্ড নিশ্চিন্ত লাগে। 

শেষে বাড়ি ফেরার দিন এলে সমর একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দেয়। সমর বলে, লিলিরা দুজনেই পড়াশোনা আর চাকরি নিয়ে জেরবার। আর এই অবস্থা কিছুটা হলেও ওদের জন্য। লিলির বিয়েতে প্রাথমিক আপত্তি মেনে নিলে, ওর পাশে থাকলে, হয়ত ও সব খুলে বলত, কিংবা এক্ষুণি না বলুক, এভাবে বিয়ে করত না, সময় নিত। 

তাই সমরের প্রস্তাব, অন্ততঃ যতদিন পড়াশোনা চলছে, লিলি আর যুগল এ বাড়িতে থাক। সংসার সামলানোর চাপ পড়বে না, সেসব ওরা বড়রা সামলে দেবে। উলটে পড়ায় অনেক বেশি সময় আর মনোযোগ দিতে পারবে। 

বলাই বাহুল্য, লিলি আর যুগল, দুজনই আপত্তি করে। ওদের বক্তব্য, লোকে ভাববে ওরা আর চালাতে পারছে না। তাই এ বাড়িতে এসে উঠছে। রনি আর বনি দুই ভাই থেকে শুরু করে, দু তরফের আত্মীয়রা সবাই বোঝায়, লোকে কী বলবে সেটা বাদ দিয়ে, ওরা কী চায়, সেটা নিয়ে ভাবতে। 

যুগলকে নোয়ানো যায় না। সে নাকি বড় চাকরি পেলে এখানে এসে থাকবে, আঙ্কেল আর আন্টিজির দেখভাল করবে। তবে এখন ওর নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। 

এই আলোচনার মধ্যেই যুগলের কাছে কারও ফোন আসে। ঠেট হিন্দিতে কথা বলতে শুনে বোঝা যায়, আত্মীয় বা ওর বেরাদরির ভিতরের বন্ধু। কথা বলার পর যুগল খুবই নার্ভাস হয়ে পড়ে। অন্যরা নতুন করে আতঙ্কিত। ফোন ছাড়ার পর সবার উদ্বেগ কমাতেই ও জানায়, ওর দুই জ্যাঠতুতো দাদা আর নিজের এক জিজাজি আসছেন। ও বলেছিল কাল ওদের সঙ্গে গদিতে দেখা করবে কথা থাকলে। তারা রাজি না। 

সমর আর গোপা স্পষ্টত দিশেহারা। বাকিরা বুঝতে পারছে না, এখানে কী বলা যায়? শত হলেও যুগলের নিজের লোক। বনি আশ্বস্ত করে, এত লোকের মাঝখানে নিশ্চয়ই ওরা কোনো দুর্ব্যবহার করবেন না। হয়ত যুগল যেসব কাগজপত্র স‌ই করে সম্পত্তি, ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে, তাতে আরও কোনো স‌ই বা ডিক্লারেশন দরকার। নাহলে হয়ত ব্যবসার কাজকর্মে অসুবিধা হচ্ছে। এমন কোনো তাড়া আছে বলেই ওরা এ বাড়িতেও আসতে রাজি। 

সবাইকে টেনশনে খাবি খাইয়ে প্রায় একঘন্টার বেশি পার করে এলেন তিনজন। দুজনকে রনি চেনে, যেদিন ও গদিতে গেছিল, কথা হয়েছে। জিজাজিকে নতুন দেখল। প্রাথমিক আলাপ পরিচয় হল সবার। 

নতুন করে মিষ্টি কিনে আনা হয়েছিল ইতিমধ্যে। যাতে সম্পূর্ণ আমিষের সম্পর্কহীন খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা যায়। সেগুলো সাজিয়ে দিল গোপা আর দীপা। মুখে না না করলেও সামান্য একটা দুটো মিষ্টি সবাই খেলেন। বোঝাই গেল ভদ্রতা রক্ষা করছেন। 

এই পর্ব মিটতেই যুগলের জ্যাঠতুতো দাদা মোহিত বলল, ওদের বাবুজি পাঠিয়েছেন। ওরা বাড়ির বহুকে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছে। 

প্রথম লাফিয়ে উঠল যুগল, "ঝুঠ, বিলকুল ঝুঠ। বড়ে পাপা এ্যায়সা কভি নেহি হোনে দেঙ্গে। তুম লোগ কোই গ্যাহরি চাল লেকে আয়া।"

তিনজন ততক্ষণে লিলি আর ওর বাবা মায়ের কাছে দরবার শুরু করেছে। যুগলকে চেপে বসালো মনোজ। ধীরে সুস্থে কথা বলে জানা গেল, যুগল এত বড় প্রপার্টি ছেড়ে দেওয়ায় বাড়ির সবার সঙ্গে সঙ্গে বড়ে পাপা, অর্থাৎ যুগলের জ্যাঠামশাই যথেষ্ট অবাক হয়েছিলেন। লিলির বাড়ি কি তবে কোটিপতি? তারা ছেলেকে কিনে নিয়েছে? উনি রীতিমতো টাকা খরচ করে লোক লাগিয়ে এদের ব্যাপারে খবর নিয়েছেন। 

আর তাতেই বড়ে পাপা বুঝেছেন, টাকা পয়সার চেয়েও লেখাপড়া আর সামাজিক সম্মানকে বেশি জায়গা দেয় এই পরিবার। একবার ভাবতে শুরু করেছিলেন, জাতপাত, ভাষা, খাবার অভ্যেসের জন্য এই বিয়ে না মেনে কি ভুল হল? ঠিক সেই সময়েই পরশু যুগলের ধার নেওয়া আর ফিরিয়ে দেওয়ার গল্প ওর সেই বন্ধুর থেকে মোটামুটি ওদের বেরাদরির প্রায় সব ফ্যামিলি জেনে গেছে। 

আজকাল কয়েক ঘরে বাঙালি বৌমা বা জামাই হয়েছে। তারা তো বটেই, সমস্ত কমিউনিটি লিলির প্রশংসা করছে। ওরাও লিলির মর্ম বুঝেছে। তাই বড়ে পাপাই পাঠিয়েছেন, যুগলকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। যুগলের প্রপার্টিতে ভাগ‌ও থাকবে। কারণ কলকাতার আত্মীয় বন্ধু মহল লিলিকে পছন্দ করেছে। তাই দেশের বাড়ি রাজস্থানে লিলির সম্পর্কে বলার মুখ আছে ওদের ফ্যামিলির। 

সবাই যুগলকে বোঝায়, বড়রা তাদের ছেলে মেয়ের লেখাপড়া, পেশাদার জীবন এমনকি বিয়ে নিয়েও স্বপ্ন দেখে। তাদের ব্যক্তিগত মতামত অতটা গুরুত্ব দেয় না প্রথমদিকে। তার ফলে এমন পরিস্থিতি হয়। এখন যখন সব মিটে গেছে, এবার ওরা বাড়িতে থেকেই স্বপ্নপূরণ করুক। 

যুগল লিলিকে প্রশ্ন করে, ওর কী ইচ্ছে? লিলি সবার কথা শুনে বুঝেছিল, এখন পিছিয়ে গেলে খারাপ দেখাবে। ও রাজি আছে বলে। 

অযাচিত এই বাড়তি আনন্দ পেয়ে সবাই প্ল্যান করে, সামনে দল বেঁধে ওরা দার্জিলিং ঘুরতে যাবে। যুগল আগে বাড়ি ফিরে যাক, তারপর বেড়াতে যাওয়ার দিন ঠিক হবে। 

সেইমতো পুরোহিত মশাইয়ের বলে দেওয়া সময়েই দু জোড়া দম্পতি আলাদা আলাদা ঠিকানায়, যে যার সংসারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। 

🌹💞🌹💞🌹💞🌹

সেদিনের চারবছর পর, লিলি ওর একবছর বয়সী ছেলেকে রেখে শাশুড়ি মাকে বলে বেরোচ্ছে, উনি বললেন, যুগল কখন যাবে? 

লিলি জানায়, যুগল হাফ ছুটি নিয়ে বিকেলে চলে আসবে। প্রায় ছুটতে ছুটতেই নার্সিং হোমটায় এসে পৌঁছয়। যাক বাবা, এখনও সময় হয়নি। মিলিকে সবে নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়েছে। আজ ওর ডেলিভারি ডেট। 

মায়ের পাশে চুপটি করে দাঁড়ায়। মা ফিসফিস করে ওর ছেলের কথা জিজ্ঞেস করে। ও মাথা নাড়ে, ঠিক আছে। মণিকা কাকিমা আর পিউবৌদিও দাঁড়িয়ে আছে। হালকা হাসে সবাই এ ওকে দেখে। বনি আর অঙ্কুর বাইরে রনির সঙ্গে রাস্তায়। 

পিউ ফোন করে ডাকতেই তিনজন হুড়মুড় করে ভিতরে আসে। দুজন ডিউটিরত নার্স কোলে করে তোয়ালে মোড়া গোলাপি রঙের পুতুল দেখিয়ে নিয়ে যায়, "মিঃ সরকার দেখে নিন, এই আপনার বাচ্চা, মেয়ে হয়েছে। এবার আমরা আপনার ওয়াইফকে বেডে দিচ্ছি। আধঘণ্টা পর একবার দেখা করতে পারবেন।"

না বাচ্চাটাকে আবার দেখলে চিনতে পারবে, না ওর দিকে মন দিতে গিয়ে নার্সের বলা কথা ভালো করে শুনেছে। অসহায়ের মতো রনি দাদার দিকে তাকায়। 

ততক্ষণে সবাই এ ওকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, মিষ্টি খাওয়ার আবদার জানাচ্ছে। বনি ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখে, "সব ঠিক আছে, মা আর বাচ্চা সুস্থ আছে, আর কী চাই? একবার মিলির সঙ্গে দেখা করে আয়, তোর নার্ভাসনেস কেটে যাবে।"

তবে মিলিকে দেখতে গিয়ে রনি আরও নার্ভাস হয়ে যায়। এতদিন মুখটা আরও ভরা ভরা লাগত, চকচকে ফর্সা ত্বকে আরও বেশি আলোঝরা জেল্লা ফুটে উঠেছিল। 

সেখানে এখন নার্সিং হোমের একটা ফ্যাকাশে পিঙ্ক ড্রেস গায়ে, চুলগুলো টাইট করে বিনুনি বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও এলোমেলো হয়ে পড়েছে। এই কয়েক ঘন্টায় চোখের নিচে কালি, মুখের চামড়া খসখসে জ্যোতিহীন। প্রায় ষোলো সতেরো ঘন্টা না খেয়ে আছে। 

কিন্তু রনিকে দেখেই মিলির মুখে হাসি ফুটল, ঠিক মিলির মতোই প্রাণখোলা হাসি, "জানো, বেবি কী ছোট, নরম গাল আর চোখ পিটপিট করে আমাকে দেখছে।"

মিলির কপালে চুমু খেয়ে রনি বলে, "ও এখনও কিছু দেখতে পায় না। তুমি এবার ঘুমিয়ে পড়ো। তোমাকে বিকেলে সবার সঙ্গে দেখা করতে দেবে। আমি অপেক্ষা করছি।"

- "কে বলেছে দেখতে পায় না? আর কাউকে না দেখুক, আমাকে দেখতে পায়, আমার গন্ধ পায়। এতগুলো মাস আমার কাছে ছিল যে।" মিলি কনফিডেন্ট। 

- "আচ্ছা বেশ," রনি হেসে ফেলে এতক্ষণে, "তাহলে ওর নাম কী ঠিক হল? এই যে সবাই বলল, জন্মের পরই কেবল নাম ঠিক করা যাবে?"

- "নাম তো এখনও ঠিক হয়নি। যে কদিন এখানে আছি, আমিও নাম ভেবে রাখি, তুমিও ভেবে রাখ।"

- "তাই হবে, আমাদের দুজনের মেয়ের নাম, দুজনে মিলে ভেবে ঠিক করব।" রনি মুঠো করে ধরে রাখে মিলির হাত। 

🌹 সমাপ্ত 🌹


🌹🌹কিছু কথা : -

এটা এই প্ল্যাটফর্মে আমার তৃতীয় গল্প। তবুও এখনও আমি পাঠকদের কমেন্ট কিভাবে পড়ব, জানতে পারিনি। তাই যারা কষ্ট করে আমাকে কমেন্ট করেন, তাদের উত্তর দিতে পারিনি। তারা আমার কাছে কেমন গল্প চান, জানতে পারিনি।

আগেও একবার বলেছিলাম, আবার বলছি, প্লিজ একটু আমার মেসেঞ্জারে কেউ বলবেন, কিভাবে আমি গল্পের কমেন্ট সেকশন ওপেন করব? প্লিজ, বলবেন কিন্তু।

এরপর আমরা পরবর্তী গল্প নিশ্চয়ই আসবে। তখন‌ও আপনাদের পাশে পাব আশা করছি।

সঙ্গে থাকবেন বন্ধুরা। 
🌹🌹🌹🌹🌹