Jharapata 90 in Bengali Love Stories by Srabanti Ghosh books and stories PDF | ঝরাপাতা - 90

Featured Books
Categories
Share

ঝরাপাতা - 90

ঝরাপাতা 

পর্ব - ৯০

🌹💞🌹💞🌹💞🌹

মিলির প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ওকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দেয় পিউ আর মণিকা। ওর ফুলশয্যার তত্ত্বের শাড়ি, বিয়ের গয়না, খোঁপা বেঁধে তাতে পাকে পাকে জুঁইয়ের মোটা মালা, লিপস্টিক, কাজল, সিঁদুর, যেখানে যা দরকার। তার সঙ্গে পিউ কানে কানে যা বলেছিল, আপনিই ওর গাল লাল হয়ে গেছে। 

বৃষ্টি নামায় একটা এ্যাপক্যাব বুক করে লিলির বাড়ি থেকে ফিরেছে সমর আর গোপা। বাড়িতে ঢোকার আগে এ বাড়িতে সুখবর দিতে আসে, লিলিরাও আসছে আগামী পরশু। এসে মিলির সাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে দুজনেই। যাক, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে মেয়েটা সুখী হতে যাচ্ছে।

রনি এসে দুজনকে প্রণাম করে দেখে মিলিও বাবা মা আর তারপর একধার থেকে সবাইকে প্রণাম করা শুরু করে। প্রথমে রনি খেয়াল করেনি, ওকেও যখন মিলি প্রণাম করে, সবার সামনে বেচারা কী যে বলবে ভেবে পায় না। 

সমর‌ই বরং ওকে বাঁচায়। তাড়াতাড়ি রনির মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বলে, "খুব ভালো থাকো দুজন। আমরা সবাই খুব খুশি হয়েছি। আর ও বাড়িতে এসো, আরও ভালো লাগবে আমাদের। লিলিরাও আসছে, বুঝলে, তোমার চেষ্টাতেই সব হল। আজ বলতেই হবে, আমার ছেলে থাকলেও এমন করে আমার মেয়ের সঙ্গে মিল করিয়ে দিত না।"

রনির মুখে সত্যিকারের খুশির হাসি ফুটে ওঠে। সমরের হাত ধরে বলে, "কাকু বসুন না আপনারা।"

গোপা হাঁ হাঁ করে ওঠে, "আজ না, আজ না। আজ সারাদিন ছোটাছুটিতে কেটেছে। এখনও অনেক কাজ, কেনাকাটা বাকি পরশুর জন্য। সব ঠিক হোক, সেদিন বসে গল্প করব। আজ আমরা আসি। তোমরা কিন্তু সবাই আসবে, বনি, পিউ, তোমাদের দায়িত্ব, সবাই যেন আসেন সেটা দেখবে।"

বনি আশ্বাস দেয়, "সবাই আসবে কাকিমা। মামারা কাল এসে যাবে বলেছে।"

ওরা চলে যেতে মণিকা, পিউ আর টুকাই মিছিল করে মিলিকে নিয়ে যায় দোতলায় রনির ঘরে। এতক্ষণ দরজা বন্ধ করে রেখেছিল পিউ। খুলতে দেখা যায়, গোটা খাট ফুলের মালায় সাজানো, বিছানায় গোলাপের পাপড়ি, ঘরে ফুলদানি ভরে ফুল রাখা হয়েছে। 

টুকাইয়ের উল্লাস দেখে কে? সে একলাফে ফুলের মালা নিতে যায়। পিউ বকুনি দিয়ে থামায়। টুকাই খাটের মাঝখানে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে, "বাবাই, মাম, আজ এখানেই ঘুমোবো আমরা। কি ছুন্দল ফুল দিয়ে সাজানো।"

সবাই মুখ টিপে হাসতে থাকে, আর মিলির লজ্জায় কান লাল হয়ে যায়। বনি এসেছিল পিউর সব রেডি কিনা দেখতে। হো হো করে হেসে ফেলে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে বলে, "আজ তো টুকাই এখানে ঘুমোলে হবে না। আজ টুকাইয়ের মিলি পিসি এখানে ঘুমোবে। তখন আমার সুপারম্যান টুকাই ঠামের ঘরে শোবে, ঠামকে পাহারা দেবে তো?" 

সুপার স্মার্ট টুকাই লাফিয়ে ওঠে, "মিলি পিসি এই ঘরে থাকবে? এত সেজেছে তাই? তাহলে আমিও মিলি পিসির সঙ্গে থাকব, পক্ষীরাজের গল্প শুনব আজ।"

বনি বলে, "না বাবা, কাকাইও থাকবে তো এখানে। এটা তো কাকাইয়ের ঘর। তুমিও থাকলে সবার জায়গা হবে না।"

টুকাই সহজ সমাধান করে দেয়, "কাকাই ঠামের সঙ্গে থাক আজ।" পিউ আর হাসি চাপতে পারে না। 

বনি আর পিউ গড়াগড়ি দিয়ে হাসির মধ্যে মণিকা নাতিকে বলে, "টুকাই বাবা, আমার সঙ্গে চল। তোর মা নাহলে দুম দুম দেবে এরপর।" শেষে পিউ আর ছেলেতে রফা হয়, ফুলদানি থেকে একগোছা ফুল নিয়ে ঠামের সঙ্গে টুকাই নিচে আসে রাজপুত্র আর পক্ষীরাজের গল্পের লোভে। 

রনিকেও অনেক চোখ পাকিয়ে, তোতাই পাতাই করে তত্ত্বের ধুতি পাঞ্জাবী পরিয়ে ছেড়েছে বনি। তবে ইউ টিউব দেখে ভাইকে ধুতি পরাতে গিয়ে বেদম গলদঘর্মও হয়েছে বনি। রনি তাতে আরও হেসেছে। এখন মা নিচে চলে যেতে টানতে টানতে ভাইকে এনে হাজির করল বনি। 

পিউ কোমরে আঁচল জড়িয়ে বরণডালা নিয়ে রেডি ছিল, দেখেই বলল, "লজ্জা টজ্জা পরে পাবে, এখন চটপট পাশাপাশি দাঁড়াও। আমার একগাদা কাজ আছে। মিলি তুই এলি এখানে?"

ভাইয়ের হাত ছেড়ে বনি মিলিকে ধরে এনে ভাইয়ের পাশে দাঁড় করিয়ে দিল, "নাও, ঠিক আছে? আরে ধমকালে কি সব হয়? হাতে ধরে......."

বনিকে এক ধমক দিয়ে পিউ বলল, "বক্তৃতা বন্ধ করে ওকে ভাইয়ের বাঁ দিকে দাঁড় করাও। যেটা বলে দেব না........"

রনি নিজেই পট করে ব‌উয়ের অন্য পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। 

- "ভেরি গুড।" বলে ওদের বরণ করে খাটের একপাশে রাখা দুটো রজনীগন্ধা গোলাপের মালা তুলে নিল পিউ। রনির হাতে একটা মালা ধরিয়ে দিয়ে পরো পরো বলতে বলতে মিলিকে নিজেই অন্য মালাটা পরিয়ে টেনেটুনে দেখে খুশি হয়ে পিছিয়ে এল, "নাও এবার মালাবদলটা করে ফেল। এ্যাই তুমি সব ছবি তুলছ?" বনিকে গুঁতো দিয়ে জিজ্ঞেস করল। 

বনি খিঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল, "দেখছ‌ই তো ছবি তুলছি। তাও আবার কেন বলছ?" 

তার আগেই রনি মালাটা হাত থেকে রাখতে রাখতে বলল, "এবার র‍্যাগিং হয়ে যাচ্ছে। এখন মালাবদল?"

- "আহ রাখছিস কেন?" বনি ফোন নামিয়ে ওর গলায় মালাটা পরায়, "এটা ফুলশয্যার নিয়ম, করতে হয়। এবার ওর সামনে দাঁড়া।" নিজেই ভাইকে ঠেলে মিলির মুখোমুখি দাঁড় করায়, "মালা খোল দুজনেই, তারপর পরা, নে শুরু কর, আমি ছবি তুলি।"

পিউ ততক্ষণে মিলির হাতে হাতে মালাটা খুলতে হেল্প করে দিয়েছে। রনি একবার দাদার দিকে তাকাতেই বনি উৎসাহ দেয়, "খোল খোল, মালাটা খুলে ফেল। পরা ওকে, তুই আগে পরা, হ্যাঁ। এবার মিলি পরা। আবার, আবার একবার। এই আরেকবার, তিনবার হয়েছে, ব্যস।"

রনি মজা করে বলে, "এবার সাতপাকে ঘুরতেও হবে?"

- "না থাক ভাই, অনেক ঘুরপাক খেয়েছ, আমাদের খাইয়েছ, এবার মিষ্টি খাও। এ্যাই মিলি, এই নে, ওকে মিষ্টি খাওয়া।" মিষ্টির প্লেটটা সামনে ধরে পিউ। 

মিলি চামচে একটা আস্ত রসগোল্লা তুলতেই রনি মাথা নাড়ে, "অতটা খেতে পারব না আমি।"

মিলি ইতস্ততঃ করছে দেখে পিউ বলে, "খুব পারবে। ব‌উ মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, পুরোটা খাও। তাহলে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবে, আর ঝগড়া হবে না। মিলি তুই দে না, আমি বললাম তো।" মিলির হাত ধরে এগিয়ে দেয় ও। 

মিলি ওর মুখের সামনে চামচটা ধরে আছে, মিষ্টিটা না খেয়ে রনি বলে, "ওওওও, সেইজন্য দাদা তোমাকে আস্ত রসগোল্লা খাইয়েছিল? ঝগড়া থামাতে?"

- "হ্যাঁ তাই, হয়েছে? এখন নিজের ফুলশয্যাটা হতে দাও। আমার পিছনে লাগতে হবে না।" পিউ জলের গ্লাস হাতে নিয়ে তাড়া দেয়। রনি মিষ্টিটা মুখে নিতে ইশারায় এবার মিলিকে খাইয়ে দিতে বলে পিউ। মিলি ওর ভয়ে আর কথা বাড়ায় না, পুরো মিষ্টিটা মুখে নিয়ে নেয়। 

পিউ জলের গ্লাসটা মিলির হাতে ধরিয়ে দেয়, "ওর খাওয়া হলে জল খাইয়ে দে। তারপর ভাই তোকে খাইয়ে দেবে।"

বনি বলে, "ব্যস, তাহলে শেষ তো? তুমি সব গোছাও। সোজা ঘরে যাবে। কোনো লুকোনো প্ল্যান থাকলে ক্যানসেল করো।"

রনি আড়চোখে পিউকে দেখে, সত্যিই ওকে বিশ্বাস নেই, এই ঘরে আড়ি পাতার কী প্ল্যান করেছে কে জানে? 

পিউ কিন্তু সিরিয়াস মুখে বনিকে বলে, "এমনিতে সব হয়েছে। তবে ঐ মিলির তো ওর পা ধোওয়ানোর কথা....."

রনি আঁতকে ওঠে, "এ্যাই, একদম না। ও বেচারা পা ধোওয়াবে কেন? এসব করলে আমি থাকব না......."

- "না রে বাবা, পাগল নাকি আমরা? ঐসব নিয়ম কেউ করে? পিউকে দিয়েও ঐসব করাতে মা কড়া করে বারণ করে দিয়েছিল সবাইকে, আমার মনে আছে।" বনি তাড়াতাড়ি থামায়, "ও সেটাই বলতে যাচ্ছিল, নিয়ম আছে, কিন্তু আমাদের বাড়িতে সেটা হবে না।"

- "ভেরি গুড। জলটা দাও।" রনি মিলির দিকে হাত বাড়ায়। 

- "এ্যাই না না, তুমি না তুমি না। মিলি খাইয়ে দেবে।" পিউ বাধা দেয়। রনি মিলির হাত থেকেই জল খায়। তারপর আর পিউর ইন্সট্রাকশনের অপেক্ষা না করে জলের গ্লাসটা নিয়ে মিলিকে খাইয়ে দেয়। 

- "বা বা বা, বেশ ভালোই এগোচ্ছিস। তাহলে পিউ, তোমার আর থাকার দরকার নেই। ঐ বরণডালাটা নাও, চলো চলো। চলোওওওও।" বনি ঠেলে বের করে ওকে। রনির কাঁধে হাত রেখে বলে, "আসছি তাহলে। খুব ভালো থাক এবার থেকে। নে, দরজাটা বন্ধ করে দে। কাল আমি না ডাকলে খুলবি না।"

চলবে