ঝরাপাতা
পর্ব - ৮৯
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
- "মানে? আমার ঘরে কী হয়েছে?" রনি ভুরু কুঁচকে তাকায়।
- "ঐ আরকি, তোর ঘরটা একটু গোছাতে হবে বুঝিস তো। দিন এগিয়ে আসছে। সে আমরা সামলে নেব। তুই এখন জামা ছাড়তে চল।" বনি ভাইয়ের হাত ধরে হাঁটা দেয়।
দু চারটে হাঁচিও পড়েছে ইতিমধ্যে। তাই রনি আর কথা বাড়ায় না। বনির ঘরে টি শার্ট আর লোয়ার, তোয়ালে সব গুছিয়ে রেখেছিল বনি। দুই ভাইয়ের চেহারায় খুবই মিল। মাঝে মাঝে শখ করেও এ ওর শার্ট, পাঞ্জাবী পরে। তাই আজও অসুবিধা হয় না রনির।
নিচে এসে দেখে মিলিকে নিয়ে দক্ষযজ্ঞ চলছে। মা ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছে, বৌদি ড্রায়ার দিয়ে ওর লম্বা চুল শুকোচ্ছে, ম্যাডাম আদা দেওয়া চা খেতে খেতে মাঝে মাঝেই হাঁচি দিচ্ছেন, তখন দাদা চটপট ওর চায়ের কাপটা ধরছে। টুকাই একটু দূরে সোফায় বসে পুরোটা দেখছে। মিলিকে রনির কিনে দেওয়া চকলেট বক্সটা ওর কোলে।
রনি একটু থমকে যায়, এই হই হট্টগোল, আনন্দ, মজার পারিবারিক ছবিটার মধ্যমণি হয়ে মিলিকে দেখতে পাওয়ার আশা চলেই গেছিল সেদিন মিলি ওকে তাড়িয়ে দেওয়ায়। আজ জানে যে, সেটা সাময়িক অভিমান ছিল মিলির। নাহলে এভাবে ভবিষ্যতে কী হবে না হবে, তা না জেনেই কোনো মেয়ে এতগুলো দিন ওর বাড়িতে এসে থাকত না।
কিন্তু মনে মনে হয়ত বেচারি দুশ্চিন্তায় আছে। তাই সবসময় খোলামনে আনন্দ করতে পারছে না। এখন যেমন খুব হাসছে সবার সঙ্গে দলে পড়ে, কিন্তু এতক্ষণ রনির সঙ্গে রাস্তায় কেমন চুপচাপ, ভয়ে ভয়ে ছিল।
এদিকে ওকে চোখে পড়েছে পিউর। ড্রায়ারের গরম হাওয়া যাতে সমস্ত চুলে লাগে, সেভাবে মিলির চুলগুলো নেড়েচেড়ে, উলটে পালটে দিতে দিতে বলে, "এই যে তোমার চা, এখানে ঢাকা দিয়ে রেখেছি। জলদি খেয়ে নাও। আর দশ মিনিট পর খেতে দেব। তারপর একটা জরুরি কাজ আছে।"
রনি চায়ে চুমুক দিতে দিতে আড়চোখে মিলিকেই দেখছে। পিউ কাজের কথা বললেও ও মাথা ঘামায়নি। ভেবেছে বৌদির নিজের কোনো কাজ হবে। টুকাই বলে বসল, "আজ খুব মজা হবে কাকাই। এখন চকলেট পেয়েছি, তাপ্পর ফুল নেব।"
রনির চা খাওয়া হয়ে গেছিল, টুকাইকে কোলে নিতে যাচ্ছে সবে, দাদা, বৌদি, মা, সবাই হেসে ফেলে। ও অবাক হয়ে তাকাতেই টুকাই বলে, "কত্ত ফুল এনেছিল জানো? আমাকে একটাও দেয়নি। মাম সব তোমার ঘরে রেখে দিয়েছে। আমাকে একটা ফুল দাও না কাকাই।"
পিউ বলে, "ধ্যাত, সব সারপ্রাইজ মাটি!"
বনি বলে, "আচ্ছা আচ্ছা, খানিকক্ষণ পরে তো সারপ্রাইজটা বলেই দেওয়া হত খাওয়া দাওয়া হলে, টুকাই নাহয় একটু আগেই ফাঁস করে দিয়েছে।"
পিউ রনির কোলে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে, "সব কথায় ঢুকবে আর একটা কথাও চাপতে দেবে না।'' তবে মুখে হাসি, রাগ নেই।
মণিকা উঠে পড়ে বলে, "টুকাই আয় আমার সঙ্গে চল। তোকে ফুল দেব।" তাড়াতাড়ি নাতিকে নিয়ে ছেলে মেয়েদের সামনে থেকে পালায় মণিকা।
পিউ রনির সামনে এসে বলে, "একটা কথা বলি শোনো, একদম মাথা গরম করবে না। তখন তো ফোনে বললাম, দ্বিরাগমনের ডেট হয়ে গেছে। তার আগে বাকি থেকে যাওয়া কাজটা করতে হবে তো?"
- "মানে?" ভুরুটা অনেকখানি তুলে রনি তাকিয়ে থাকে। কী বলছে বৌদি? সমরকাকুর কাছে মাপ চাইতে হবে? আর চাইতে হলে চাইব, ভেবে চুপ করে সোফায় এসে বসে পড়ে।
বনি ফিক করে হেসে ভাইয়ের পাশে বসে পড়ে, "মানে হচ্ছে, তোদের ফুলশয্যাটা যে হয়নি? সেটা করতে হবে না?"
রনি আর মিলি দুজনেই চমকে উঠে বনির মুখের দিকে তাকায়, তারপর পিউর দিকে। বনি এদিকে ভাইয়ের কাঁধে হাত দিয়ে বলে যাচ্ছে, "দ্যাখ, আমাদেরও তো কিছু শখ, ইচ্ছে আছে। পরশু তোরা ঐ বাড়িতে যাবি বলে পিউ আজ ফুলের দোকানে অর্ডার দিয়ে তোদের ঘর সাজিয়েছে। বিয়ের সময়ের ফুলশয্যার তত্ত্বের সব জিনিসপত্র, জামাকাপড় তো এই দিনটার জন্য যত্ন করে রাখাই আছে ওর। মিষ্টি টিষ্টি যা লাগবে মায়ের থেকে শুনে নিয়ে কিনে এনেছে। তুই আর কথা বাড়াস না। আজ থেকে মিলি তোর ঘরে থাকবে। এটাই আমাদের ইচ্ছে।"
রনি চকিতে একবার মিলির দিকে তাকায়, ওর দিকেই তাকিয়ে আছে মিলিও। চোখাচোখি হতে দুজনেই মাথা নিচু করে ফেলে।
পিউ আবার ড্রায়ারটা চালিয়ে মিলির চুল শুকোতে শুকোতে বলে, "আমি সব ঠিক করে ফেলেছিলাম, আর তুমি বৌটাকে পুকুরে চুবিয়ে ভিজিয়ে এনেছ এই রাতে। এখন ঠান্ডা লেগে শরীর খারাপ না হলে বাঁচি। এত বড় একটা অনুষ্ঠান সামনে। এ্যাই, এবার একটা গাড়ি কিনবে। আর ওকে বাইকে করে নিয়ে গিয়ে ভিজিয়ে আনবে না।" মিলি আড়ষ্ট হয়ে গেছে, ও বুঝেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই এসব বলছিল।
রনি সোজাসুজি পিউয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, "এটা কি তোমাদের তিনজনের সিদ্ধান্ত? তুমি, দাদা আর মা?"
- "মানে? আবার কী হল?" বনি ঘুরে তাকায়।
- "ওকে জিজ্ঞেস করেছ?" আঙ্গুল তুলে মিলিকে দেখায় রনি, "ওর বাবা মাকে জানিয়েছ? আমরা কিন্তু ওদের বলেছি, মায়ের শরীর ভালো না, ওকে কাছে এনে রাখতে চায়, ও মায়ের কাছে থাকবে।"
বনি ঠাঁই করে ভাইয়ের পিঠে এক চাপড় মেরে বলে, "নিজে যখন ওর সঙ্গে ঘুরছিস, তখন এগুলো মনে থাকে? এখন খুব সাধু সাজছিস যে?"
- "আমি ওর সঙ্গে ঘুরছি না দাদা। ও বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে গেছিল। বৌদির কাছে শুনে, ওয়েদার খারাপ দেখে আমি আনতে গেছিলাম।''
- "ভাগ্যিস গেছিলে !" রনিকে হাসিমুখে বলে পিউ ঝটপট বনির দিকে ফিরে বলে ওঠে, "তুমি থামো তো, যা বৃষ্টি হল, ভাগ্যিস ভাই ওকে আনতে গেছিল। আর জিজ্ঞেস করার কথা? গোপা কাকিমাই ঠাকুর মশাইকে দিয়ে দিনক্ষণ সব ঠিক করেছে। আমার সঙ্গে সব কথা হয়েছে। জানো, আজ লিলির বাড়িতে কথা বলতে গেছে ওরা। এতক্ষণে হয়ত লিলির সঙ্গেও ভাব হয়ে গেছে। তারপর না সব ব্যবস্থার ভার দিয়েছে আমাকে। আর তোমার বউকে আমরা কেন জিজ্ঞেস করব? আমার দায়িত্ব তোমার বউকে সাজিয়ে গুছিয়ে ঘরে দিয়ে আসা। আমি সেটুকু করে দেব। ওকে যা জিজ্ঞেস করার তুমি জিজ্ঞেস করে নিও তখন।"
এরপর আর থাকা চলে না। রনিও আর দাঁড়ায় না, একদৌড়ে দাদার ঘরে গিয়ে ঢোকে। পিছনে বনি আর পিউ ডাকাডাকি করে হাসতে থাকে।
চলবে