ঝরাপাতা
পর্ব - ৮৮
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
মাথা গরম করে, লিলিকে পাঁচটা কথা শুনিয়ে চলে আসাটা সমর আর গোপার উদ্দেশ্য ছিল না। তবে ক্রমশঃই অশান্তি পেকে উঠছিল। এবার তাই বাবা মা আর মেয়ের মাঝখানে ঢুকতে বাধ্য হল যুগল। ওর রিকোয়েস্টে অবশ্য কাজও হল। ঘর থেকে বেরিয়ে না গেলেও সমর থেমে গেল।
যুগল শান্ত কিন্তু প্রায় অর্ডার দেওয়ার গলায় লিলিকে বলল, "ওয়াশরুম যাও। ফ্রেশ হয়ে এসে চা বসাও। আমি ভালো বানাতে পারি না। আঙ্কেলজি আন্টিজি ফার্স্ট টাইম এসেছেন। নাহলে আমিই করতাম।"
- "ওরা তোমাকে অপমান করবে যুগল।" লিলি আকুল হয়ে বলে।
- "তুমি ওদের এনাফ ইনসাল্ট করেছ। এবার যাও।" যুগল সমরের দিকে ফেরে, "প্লিজ আঙ্কেলজি, বসুন। আমি আপনার কথা শুনতে চাই।"
সমর এসে চেয়ারে বসে, গোপাও বসে অন্যটায়। সমরই বলে, "তোমার তো বেশ বুদ্ধিসুদ্ধি আছে মনে হচ্ছে। আচার ব্যবহারও ভালো। তা আমার ঐ বদরাগী মেয়েকে বিয়ে করলে কেন?"
এত বছর পশ্চিম বাংলায় থাকার সুবাদে যুগল জানে, আচার মানে কী। ও সমরের কথায় মৃদু হাসে। মুখে বলতে পারে না, পাগলীটাকে বহুত প্যায়ার করি যে।
সমর আবার বলে, "দেখো ভাই, তোমার কথাই আমরা জানতাম না। তাই দাঁড়িয়ে বিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই নেই। তাও তোমরা বিয়ে টিয়ে করেও যদি দেখা করতে, শুধু আমাদের জানাতে, তোমার বাড়িতে নাহয় দেখা করতাম। একটা রিসেপশন করা যায় কিনা সবাই মিলে, আলোচনা করতাম।"
কথা কেটে যুগল বলে, "ও হবে না আঙ্কেলজি। আমার বাড়িতে বঙ্গালিন মেয়ে এ্যাক্সেপ্টই করবে না। বহুত ঝঞ্ঝাট হয়ে গেছে।"
- "হুম, শুনেছি আমরা। আমি লিলি পালিয়ে আসার আগের কথা বলছিলাম। তা লিলি না জানিয়ে এমন দিনে পালালো, যখন রেজিস্ট্রি করেছ, তখনই বলতে পারতে। সময় ছিল, বিয়ে ক্যানসেল করতাম।"
অপরাধী অপরাধী মুখ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে যুগল। মনে মনে বলে, "শ্বশুরজি তো খারাপ না। লিলি এমন ভয় দেখায়, ইসস, আগে বললে এতদিনে রনির চেয়ে আমার সঙ্গে বেশি পটে যেত। আমিই তো বড়। রনি পরে আসত কাহানীতে।"
গোপা বলে, "দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোসো না। দেখো বাবা, তোমরা যেদিন গেলে, তখন আমার ছোট মেয়েটা এত অসুস্থ, ও আর কথা বলবে ভাবিনি আমরা। তাই তোমার সঙ্গে একটু, একটু কেন, খুব খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি। তুমি রাগ রেখো না।"
যুগল তাড়াতাড়ি ওদের সামনে খাটের ধারে বসে পড়ে বলে, "না না আন্টিজি, আমি রনি ভাইয়ার কাছে সব শুনেছি। মিলির সঙ্গে বহুত খারাপ হয়েছে। আই এ্যাম সরি ফর দ্যাট। বিশোয়াস করুন, আমি আপনাদের চিনতাম না, এত কুছু হবে বুঝিনি।"
- "আমরা জানি। তোমাকে আগেও দোষ দিইনি। আর আজ তো খুব ভালো লাগলো তোমাকে। তা বাবা, একটা কথা বলি। এই দুটোই মেয়ে আমাদের। তুমি আর রনিই আমাদের দুজনের সব। আমরা রনিকে নিমন্ত্রণ করছি। ওর সঙ্গেও অশান্তি কম হয়নি। ওকে যদি ছেলে মেনে মাপ করতে পারি, তুমি তো কখনো খারাপ কিছু করনি। তুমিও বাড়িতে এসো।" গোপা সুন্দর করে গুছিয়ে বলে।
যুগলের মনটা ভারী হয়ে যায়। ওর মা, বাবুজি যদি লিলিকে একবার ডাকত ! ও ঠিক লিলিকে ম্যানেজ করত, ওরা বড়, দরকার হয় পায়ে ধরে মাফি চেয়ে নিতে বলত। সব যদি ঠিক হয়ে যেত তাতে।
- "কী ভাবছ বাবা? যাবে না?"
সমরের প্রশ্নে না বলতে পারে না যুগল। ঢক করে মাথা নাড়ে, "জরুর যাব আঙ্কেলজি। আপনি নিজে আমার গরিবখানায় এসেছেন, আমি যাব না?"
- "আমি যাব না। রনিদা জেদ করছে বলে তোমরা ওকে ডাকছ। কেন ওর কোনো প্রেস্টিজ নেই?" ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে লিলি।
- "ঠিক আছে ঠিক আছে, তুমি যাবে না, আমি একা যাব।" সমর রেগে ওঠার আগেই একগাল হাসে যুগল, "এখন চা বানাও। বাবা মার সঙ্গে ভাব করো। আমি একটু আসছি।"
ও উঠে দাঁড়াতেই সমর খপ করে হাত ধরে ফেলে, "দোকানে যাচ্ছ, আমাদের জন্য কিছু কিনতে?"
ধরা পড়ে মাথা চুলকোয় যুগল। গোপার দিব্যি লাগে ছেলেটিকে, বেশ ছেলেমানুষ, হাসিখুশি, রনির মতো কথার আগেই চিড়বিড়িয়ে ওঠে না। একটা গভীর শ্বাস পড়ে, লিলি আর রনি, দুই মাথা গরমের বিয়ে হলে কী হত কে জানে? হয়ত ঠাকুরের এটাই ইচ্ছে ছিল।
যুগলকে বলে, "চুপটি করে বোসো। আজ বাড়ি ফিরব এবার। তুমি হলে জামাই, তুমি আগে আমাদের বাড়িতে নেমন্তন্ন খাবে। পরে আমরা। বোসো বলছি। লিলি চা দিবি আমাদের?"
যুগলের সঙ্গে বাবা মাকে সহজ সুরে কথা বলতে দেখে লিলির চোখে জল ভরে আসে। নাক টেনে বলে, "একটু বোসো, চা করছি। পাঁপড় ভাজি? বাবা পাঁপড় ভাজা ভালোবাসে।"
গোপা মেয়ের কাছে উঠে আসে, "মায়ের উপর রাগ করেই থাকবি?"
আর বলতে হয় না। মাকে জড়িয়ে হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকে লিলি। গোপাও কম যায় না। সমর আর যুগল নিজেদের বেটার হাফের কান্না দেখে বসে বসে। শেষে যুগল উঠে সসপ্যানে জল ভরে গ্যাসে বসায়। তারপর লিলিকে উদ্দেশ্য করে বলে, "আচ্ছা আচ্ছা হো গ্যায়া না। ইতনা রোওগি তো আন্টিজিকো কওন রোকেগা? প্লিজ আন্টিজি, হামলোগ সরি। আপ প্লিজ রোইয়ে মত।" আবেগের চোটে বেচারা বাংলায় বলতে পারে না।
সমরেরও চোখ শুকনো ছিল না। গলা খাঁকড়ে বলে, "লিলি, বোস এখানে। কথা শোন। দু তারিখ তোরা আসবি। তোর মা, কাকিমনি সব তোদের বরণ টরণ করবে। সকাল দশটার মধ্যে আসতে হবে, ঠাকুরমশাই সময় দিয়েছে। ইয়ে হয়েছে, বিয়ের জোড় টোড় কিছু আছে তোদের? নাকি শুধু সইয়ের বিয়ে? থাকলে নিয়ে আসিস। সব নিয়ম হবে। তুই বড়, তোর নিয়ম আগে হবে। পরে মিলির। তাই দেরি করবি না। আর এই যে তুমি,"
বলামাত্র যুগল সামনে এসে টপ করে শ্বশুর মশাইকে প্রণাম করে বলে, "আমি চলে যাব। এখন চা টা করে ফেলি? জল গরম হয়ে গেছে?"
লিলি চোখ মুছে বলে, "আমি করছি।" মা মেয়ে গিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে।
সমর বলে, "তুমি তো যাবেই, বলেই দিয়েছ, আমি জানতে চাই, তুমি কী খাও টাও? মানে নিরামিষ খাও তো বোধহয়, তা সব সবজি খাও?"
যুগল লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলে, "নন ভেজ ভি খাই। সবরকম মছলি খেতে ভালো লাগে না। আন্ডা খাই। আপনি ভাববেন না, আন্টিজি যা পাকাবেন, তাই খাব।"
- "আরে আন্টি রান্না করবে নাকি? শ তিনেক লোক হচ্ছে। ক্যাটারার বলা হয়েছে দু বাড়িতে। ভালো কথা, তোমরা তোমাদের বন্ধুদের নেমন্তন্ন করে দিও। আমাকে শুধু বলে দিও কতজন হচ্ছে। কেমন? আর ছুটি নেবে, চার তারিখে ফিরবে। সব নিয়ম আছে। বুঝেছ?"
যুগল মুখ তুলে কারও দিকে তাকাতে পারে না। এতদিনে ও বুঝেছে, লিলি কেন কিছুতেই বাড়িতে ওর কথা জানায়নি। রনির বাড়ি থেকে বিয়ের সময় অনুষ্ঠান হয়েছিল। গণ্ডগোল যা হয়েছে, তার জন্য আবার এখন খরচাপাতি করে অনুষ্ঠান হচ্ছে। ও তো রনির মতো লোকজন ডেকে খাওয়াতে পারবে না। অথচ এই অনুষ্ঠানে গিয়ে দু বাড়িরই নিমন্ত্রণে খেতে হবে ওকে।
চলবে