ঝরাপাতা
পর্ব - ৮৩
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
দুই ভাই বাড়ি থেকে খুশি খুশি বেরিয়ে যেতেই মিলিকে ফোন করে পলাশ।
পলাশ অঙ্কুরের কাছে রনির সঙ্গে সবার রাগারাগি হওয়া পর্যন্তই খবর পেয়েছে। আর তাতেই আবার নিজের দিকটা শক্তিশালী ভেবে মিলিকে নিয়ে অনেক লম্বা পরিকল্পনা করে ফেলেছে। যার প্রথম ধাপ, রনির সঙ্গে মিলির সম্পর্ক ভাঙায় এখন নিশ্চয়ই মিলির মনখারাপ। এইসময়টা থাকতে থাকতেই মিলির মনে নিজের একটা জায়গা করে নেওয়া।
গতকাল ও বাকি বন্ধুদের সবাইকে রাজি করিয়েছে, আজ ও সিনেমা দেখাবে, বাইরে ডিনার করাবে। পরীক্ষা হয়ে গেছে, সামনের সপ্তাহে নতুন সেমিস্টার শুরু। তার আগে শুধু এইটুকু ঘোরাফেরা। তাই সবাই বাড়ি থেকে পারমিশন পেয়েছে।
ইচ্ছে করেই পলাশ সবার শেষে মিলিকে ফোন করেছে। রনির সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙায় যদি মিলি মনখারাপ করে যাবে না বলেও, একা ও যেতে রাজি না হয়ে সবার আনন্দ মাটি করছে বলে ওকে চাপ দিতে পারবে।
মিলিকে যেই পলাশ বলে, আজ সিনেমায় যাবে সবাই, মিলিকেও যেতে হবে, শোনামাত্র মিলি না করে দেয়, "আমার হবে না রে।"
পলাশ নাছোড়, "তার মানে? পরীক্ষার পর আমাদের সঙ্গে সিনেমায় যাবি বলে রেখেছিলি, তোর জন্যই প্ল্যান করলাম বলা যায়, এখন আবার পিছিয়ে যাচ্ছিস? কেন বলত? ও এখনও আমার উপর রাগ করে আছিস?"
- "না না, রাগারাগির ব্যাপার নয়। আসলে কাকিমার শরীরটা ভালো না। আমি এখন কোথাও যাব না।" মিলি আমতা আমতা করে বলে।
লিভিং রুমে মণিকা আর পিউর সঙ্গেই গল্প করছিল ও। একটু আগেই গোপা ফোন করে বলেছে, পুরোহিত মশাইয়ের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। দেরি যখন হয়েছেই, এবার দ্বিরাগমনের সব নিয়ম মানবে গোপা। দু তারিখ রনি মিলিকে নিয়ে দ্বিরাগমনে ও বাড়িতে যাবে। নিয়ম মেনে বিয়ের গাঁটছড়া খোলা হবে। আর আড়াই দিন থেকে নিয়মের শেষে চার তারিখে দুজন এ বাড়িতে ফিরবে। দু তারিখ ওবাড়ির তরফে আর চার তারিখ এবাড়ির তরফে অনুষ্ঠান করে লোকজনকে ডেকে আনন্দ করা হবে।
এই খবরে তিনজনেরই মন আনন্দে ভরে উঠেছে। মণিকা আর পিউ আলোচনা করছে, মিলিকে কেমন করে সাজানো হবে, ওরা কে কেমন সাজবে। তখনই পলাশ ফোন করেছে।
তাই ফোনের এপারে মিলির সব কথাই শুনেছে মণিকা। বাকিটা আন্দাজ করে বলে, "কি বন্ধুদের সঙ্গে আউটিং প্ল্যান হচ্ছে?"
ফোন কানে রেখেই মাথা নাড়ে মিলি, "হ্যাঁ, সিনেমায় যাবে বলছে ওরা। আমি যাব না।" আবার পলাশকে বলে, "তোরা আজ ঘুরে আয়, পরে একবার......."
মিলির কথা শেষ হওয়ার আগেই মণিকা বলে, "তুই কেন যাবি না? আমার শরীর খারাপ বলে? এখন আমি পুরো সুস্থ। যা ঘুরে আয়। আজ না গেলে আমি খুব রাগ করব। আমার মনে হবে, আমি তোকে আটকে রেখেছি।"
- "তা কেন বলছ?" মিলি মিনমিন করে।
- "তাহলে এক্ষুণি বন্ধুদের বলে দে, তুই যাচ্ছিস। তারপর তোর সঙ্গে বাকি কথা।" মণিকা হাসিমুখে বলে।
- "যা, ঘুরে আয় মিলি। আমি আছি তো। তুই কেন এত চিন্তা করছিস?" পিউ ওকে উৎসাহ দেয়।
পলাশ সবার কথাই শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু মিলি যে এই মুহূর্তে রনির বাড়িতে, ও জানতও না, আন্দাজও করতে পারেনি। ওদিকে পিউ বা মণিকার সঙ্গে কখনো কথা বলেনি। মিলির বিয়ের দিন হয়ত এক দুবার দেখেছে। তখন লিলির বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে এসে কনে বদল হয়ে ওরই পছন্দের মেয়েটি ওর সামনে অন্যের বৌ হয়ে যাচ্ছে, এটাই সবচেয়ে তাড়া করছিল পলাশকে। ফলে না এখন বুঝতে পারে কারা কথা বলছে, মিলি আজ আসছে আনন্দে সেকথা জানতেও চায় না।
যদি পলাশ জানতে পারত, এই মুহূর্তের সমস্ত সত্যি, তাহলে হয়ত ভবিষ্যৎ অন্যরকম হত। তার বদলে ও শুধু এই ভেবেই খুশি হয়ে গেল, মিলি আসছে। সবকিছু ওর প্ল্যানমাফিক হচ্ছে। তার মানে বাকিটাও ঠিক থাকবে।
ওদিকে মিলিরও ভালো লাগছিল, বন্ধুদের সঙ্গে মজায় কাটবে দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা। যেহেতু কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়িতে অনুষ্ঠান, দুবাড়িতেই ওর বন্ধুদের নেমন্তন্ন থাকছে, বন্ধুদের সামনে আজ বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে, কাকিমা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিরিশ তারিখের অনুষ্ঠান পিছিয়ে গেছে কেবল, বাতিল হয়নি। বরং আরও বড় করে হচ্ছে কাকিমা ঠিক হয়ে যাওয়ার খুশিতে।
মণিকা ওকে বলে দেয়, গোপাকে জানিয়ে যেতে আর বন্ধুদের নেমন্তন্ন করে আসতে, দ্বিরাগমনের অনুষ্ঠানে যেন হাজির থাকে।
সরাসরি মিলি সিনেমা হলের সামনে গিয়ে দেখে, বন্ধুদের কয়েকজন তখনও আসতে বাকি। অঙ্কুরও আসেনি। যারা এসেছে তারা বাকিদের ফোন করে খবর নিচ্ছে, কোথায়, কতদূরে আছে।
পলাশ একগাল হেসে মিলির সামনে এসে দাঁড়ায়, "থ্যাঙ্ক ইউ অদ্রিজা। তুই এলি বলে এত আনন্দ হচ্ছে।"
- "আরে কি থ্যাঙ্ক ইউ বলছিস, তুই ফোন করেছিস আমি আসব না? ঐ কাকিমার জন্য একটু খারাপ লাগছিল।" মিলিও হাসিমুখে বলে। পলাশ যে ওর কথার অন্য অর্থ করে অকারণ খুশি হয়ে যাচ্ছে, খেয়াল করে না।
বাকি বন্ধুরাও একে একে এসে যায়। হই হট্টগোল বন্ধ করে সবাই হলে ঢুকে পড়ে। মিলির নেমন্তন্নের কথা বলাই হয় না।
পিউ এদিকে প্রথমে বনিকে, তারপর রনিকেও ফোন করে তারিখগুলো জানিয়ে দেয়। ছুটির এ্যাপ্লাই করতে পই পই করে মনে করিয়ে দেয়। তখনই রনি জানতে পারে, মিলি বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গেছে।
মিলি যখন সিনেমা দেখে বেরোচ্ছে, লিলি আর যুগল ফ্ল্যাটের সামনে এসে দেখে, সমর আর গোপা দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে একটু হতবাক হলেও লিলি মন শক্ত করে, যুগলকে কেউ বিন্দুমাত্র অপমান করলে ও সহ্য করবে না।
গোপাই প্রথম এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে দাঁড়ায়, "একটু কথা ছিল তোর সঙ্গে। এভাবে বাইরে না বলে ঘরে যেতে পারলে....."
যুগলের মাথা কাজ করতে শুরু করেছে ততক্ষণে। লিলির আগেই ও ঢিপ ঢিপ করে দুজনকে প্রণাম করে আসুন আসুন বলে দরজা খোলে।
চলবে