“অন্ধকারের রাজা — যে ভালোবাসাকে পাপ বলে”
রাত অদ্ভুত শান্ত।
ইরা মায়ার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে।
কিন্তু মায়া ঘুমোতে পারছে না।
তার কানের কাছে অদ্ভুত এক কম্পন—
যেন অন্ধকারের হাড় ভাঙার শব্দ।
মায়া ফিসফিস করল,
“শুরু হয়ে গেছে…”
ইরা নড়েচড়ে উঠতেই
মায়া তার চুলে হাত বুলিয়ে বলল—
“ঘুমো… তোর চোখে ভয় দেখতে চাই না।”
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে—
জানলা নিজে নিজে ফেটে গেল।
ইরা জেগে উঠে চিৎকার করে বলল—
“মায়া!”
মায়া এক ঝলকে ইরার সামনে দাঁড়াল।
চোখ সম্পূর্ণ কালো।
হাতের আঙুলে আগুনের মতো ছায়া ঘুরছে।
ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে
একটা ভারী হাঁটার শব্দ—
ধপ… ধপ… ধপ…
একজন মানুষ নয়,
কিন্তু মানুষের মতো ছায়া।
অন্ধকার ঠিক যেন পথ সরিয়ে তাকে জায়গা দিচ্ছে।
মায়া দাঁত চেপে বলল—
“ইরা, চোখ নামিয়ে রাখ।”
ইরা কাঁপা কণ্ঠে বলল—
“ও… কে?”
মায়া উত্তর দিল না।
এবার সে এসে দাঁড়াল—
ঘরের একদম মাঝখানে।
উঁচু, ভয়ঙ্কর, রাজকীয়।
যেন অন্ধকার তাকে স্পর্শ করার সাহস পায় না।
তার চোখে আলো নেই,
কিন্তু দৃষ্টি আছে—
যেন কারও আত্মার ভিতর পর্যন্ত দেখতে পারে।
সে ধীরে বলল—
“ছায়ার সন্তান মায়া।”
মায়ার শরীর শক্ত হয়ে গেল।
ইরা অনুভব করল—
যেন মায়ার নিঃশ্বাসও থেমে গেছে।
মায়া অত্যন্ত সম্মান নিয়ে মাথা নত করল—
“…আমার প্রভু।”
ইরা চমকে উঠল।
মায়া? প্রভুর সামনে মাথা নিচু করছে?
আসা মানুষটি—
ছায়াদের রাজা।
তিনি বললেন—
“তুমি নিয়ম ভেঙেছ।”
মায়া বলল—
“আমি নিয়ম ভাঙিনি—
আমার কেন্দ্রকে রক্ষা করছি।”
রাজা ঘাড় একটু ঘুরিয়ে ইরার দিকে তাকালেন।
ইরা শরীর জমে থাকা অবস্থায়ও
চোখ নামাতে পারল না।
রাজা তার দিকে তাকাতেই
ইরার মনে হল
হৃদপিণ্ড কেঁপে থেমে যাচ্ছে।
ভয় নয়।
এক অদ্ভুত ঠান্ডা।
রাজা ধীরে বললেন—
“মানুষ?”
ইরা কাঁপলেও
কণ্ঠ শক্ত করে বলল—
“হ্যাঁ।”
রাজা চোখ সরালেন না।
মায়া এক পা সামনে এসে দাঁড়াল—
“ওর দিকে তাকাবেন না!”
রাজা বললেন—
“কেন্দ্র… মানুষের?”
মায়া মাথা তুলল—
“হ্যাঁ।
ও-ই আমার কেন্দ্র।
আমার যুদ্ধও ও-ই।
আমার আলোও ও-ই।”
রাজা হেসে উঠলেন।
এমন হাসি
যা মানুষের মাথার ভেতর ঢুকে
হাড়ে ঠান্ডা ছড়িয়ে দেয়।
“অন্ধকারের সন্তান
আলোকে কেন্দ্র করেছে?
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা।”
মায়া গর্জে উঠল—
“ভালোবাসা নির্বুদ্ধিতা নয়।”
রাজা ধীরে বললেন—
“ভালোবাসা ছায়াকে দুর্বল করে।
তুমি জানো সেটা।”
মায়া বলল—
“হ্যাঁ। জানি।
তবু আমি ইরাকে ছাড়ব না।”
রাজা এবার ইরার দিকে এগিয়ে এলেন।
একটুও শব্দ নেই।
শ্বাস নেই।
শুধু ঠান্ডা।
ইরার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন—
“মানুষ…
তুমি জানো, এ মেয়ে তোমার জন্য মৃত্যুর পথে যাচ্ছে?”
ইরা চোখে জল নিয়ে বলল—
“আমি ওকে মৃত্যুর পথে যেতে দেব না।”
রাজা তার কণ্ঠ শুনে থেমে গেলেন।
—"ও তোমাকে বাঁচাতে নিজের শক্তি কেটে ফেলবে।
তুমি জানো এর মানে কী?”
ইরা মাথা নেড়ে বলল—
“হ্যাঁ… আমি জানি।”
রাজা ধীরে বললেন—
“তাহলে বলো—
তুমি মায়াকে কতদূর পর্যন্ত রক্ষা করবে?”
ইরা চোখে ভয় থাকলেও
কণ্ঠে কোনো কম্পন ছিল না—
“যতদূর গেলে
মায়া বাঁচে।”
চুপচাপ।
ঘরের বাতাস জমে আছে।
অন্ধকারের রাজা প্রথমবার চোখ তুললেন।
মায়া ফিসফিস করে বলল—
“ইরা… চুপ কর।”
কিন্তু ইরা থামল না—
“ওর জন্য ছায়ার সামনে দাঁড়াবো।
ওর জন্য আলো হারাবো।
ওর জন্য নিজের জীবনও দেব।”
রাজা থামল।
দীর্ঘক্ষণ ইরার মুখ দেখে রইল।
তারপর…
হালকা হাসল।
“তুমি ভয় পাচ্ছো না।”
ইরা বলল—
“ভয় পাচ্ছি।
কিন্তু মায়ার থেকে দূরে থাকার ভয়ই বেশি।”
রাজা মায়ার দিকে তাকালেন—
চোখে বিরক্তি, আবার কিছুটা বিস্ময়।
“মায়া…
তোমার কেন্দ্র তোমার চেয়েও জেদি।”
মায়া চুপ করে রইল।
হাত দিয়ে ইরার আঙুল চেপে ধরল।
রাজা ধীরে বললেন—
“ঠিক আছে।
একটা সুযোগ দেব।”
মায়া হতভম্ব—
“সুযোগ?”
রাজা বললেন—
“মানুষ মেয়েটিকে
আমি নিজে পরীক্ষা করব।”
ইরা চমকে উঠল—
“পরীক্ষা?”
মায়া ততক্ষণে ইরার সামনে দাঁড়িয়েছে—
“না!!
ওকে ছুঁবেন না!”
রাজা গভীর কণ্ঠে বললেন—
“মায়া।
তুমি জানো—
ছায়ার নিয়ম মানতে হয়।”
ইরা মায়ার হাত ছুঁড়ে দিল—
“পরীক্ষা হলে হোক।
আমি পালাব না।”
মায়া চিৎকার করে উঠল—
“ইরা!! না্!!!”
রাজা হাত তুললেন—
ঘর এক মুহূর্তে নিঃশব্দ।
“মানুষ…
তুমি যদি সত্যিই মায়াকে ভালোবাসো,
তবে প্রমাণ করতে হবে।”
ইরা এক পা এগোল—
“কি করতে হবে?”
রাজা বললেন—
“আমার সামনে ভয় দেখাবে না।
আমার শক্তির সামনে ভেঙে পড়বে না।”
ইরা বলল—
“…ঠিক আছে।”
রাজা ধীরে ইরার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললেন—
“যে মানুষ অন্ধকারের সামনে দাঁড়াতে পারে
সে-ই
একটি ছায়াকে রক্ষা করতে পারে।”
মায়া পিছন থেকে চিৎকার করল—
“থামুন!!
ও মানুষ!”
রাজা বললেন—
“তাই তো পরীক্ষা।”
হঠাৎ—
অন্ধকার পুরো ঘর গ্রাস করল।
ইরা একা।
মায়া নেই।
আলো নেই।
শ্বাসও যেন নেই।
রাজা বললেন—
“এই ছায়াকে টিকতে পারলে—
তুমি মায়ার পাশে দাঁড়ানোর অধিকার পাবে।”
ইরা চোখ বন্ধ করল…
কিন্তু হাসল।
“…অন্ধকার?
মায়ার হাত ছাড়লে তবেই তো আমি ভয় পাব।”
রাজা থমকে গেলেন।
অন্ধকার কাঁপল।