ঝরাপাতা
পর্ব - ৫৮
🌹🌿🌹🌿🌹🌿🌹
- "কি হয়েছে মিলি? কি চাই বলো না। এরকম হেজিটেট করো কেন আমাকে কিছু বলতে?"
- "হেজিটেট করছি না, বলছি। আমার রিকোয়েস্ট বলতে পার। তুমি আর এই কথাটা বলবে না। যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। সেটা নিয়ে আমরা দুজনেই ভুগেছি, বাড়ির লোকেরা ভুগেছে। এখন কার দোষ, কে ভুল, এসব নিয়ে আর আমরা কথা বলব না। সবই নতুন করে শুরু হচ্ছে আমাদের, আমরা সেভাবেই শুরু করি চলো।"
রনির মুখে কথা যোগায় না। এই সেই বাচ্চা মেয়েটা? সেজেগুজে, নাচ গান, হইচই করে বেড়াত? এতটাই ধাক্কা খেয়েছে এই কয়েকমাসে, এত পরিণত হয়ে গেছে?
- "কি হল? চুপ করে আছ কেন? আমি সত্যিই চাই না তুমি বারবার দুঃখ পাও...."
- "মিলি, থ্যাঙ্ক ইউ।" কথার মাঝখানে বলে ওঠে রনি, "থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। যেটা আমার বলা উচিত ছিল, আমি বলতে পারিনি, তুমি আমাকে সেটা দিলে আজ। এবার দেখো, আমি আমার সব ভয়, সব ভুলভাল ইনসিকিউরিটি ভুলে নতুন করে সব শুরু করব। খুব ভালো রাখব তোমাকে। তুমি শুধু আমার সঙ্গে থেকো। থাকবে তো?"
- "থাকব রনিদা। তুমি একটু রাগ করাটা কমাও। কিছু মনে হলে আমাকে একবার জিজ্ঞেস কোরো।"
- "জিজ্ঞেসও করতে হবে না মিলি। তোমার মনের সব কথা জানতাম না বলে ভুল করেছি। আর ভুল ভাবব না। শুধু তুমি আরেকটা ধাপ এগোও।"
- "সে তো দিন টিন দেখুক বড়রা।"
- "না সোনা, দিনক্ষণ না দেখেই এবার রনিদা ডাকটার ওজন কমিয়ে ফেলো তো। এখন তো খুব ভালো করে জানো, আমি মোটেই দাদা নই। ....... কি হল চুপ কেন?"
- "আচ্ছা আচ্ছা, সে হবে।"
- "আচ্ছা নয়, আজকেই হবে, এক্ষুণি হবে।"
- "ইস, আমার বেলায় এক্ষুণি। আর নিজে কিছু বদলাচ্ছ?"
- "বদলেছি তো। আমি তো পুঁচকে একটা মেয়েকে তুই বলতাম। সেই মেয়েটা যখন নতুন করে তাকে চেনাতে হল নিজেকে, তুমি বললাম যে।"
- "তার মানে আমি ঠিক শুনেছিলাম, সেদিন বেড়াতে গিয়ে তুমি ভুল করে তুই বলেছিলে। আর....."
- "হুম, তুমি ধরে ফেলতেই অন্য কথায় চলে গেছিলাম। কিন্তু ঐ একবার ছাড়া কক্ষণো ভুল করিনি, সেটা বলো। তার প্রাইজ দিতেও তো আমার নাম ধরে ডাকো একবার।"
- "বললাম তো, ডাকব।"
- "ডাকব বলতে বলিনি, আমার নামটা বলতে বলেছি।"
- "তোমার নাম বলতে কি আছে? তোমার নাম তো শ্রেয়ান সরকার। সব্বাই জানে।"
- "তবে রে, চালাকি হচ্ছে? ঠিক আছে, যতদিন আমাকে নাম ধরে না ডাকবে, আমি ফোন করব না।"
- "ওকে ডান।" মিলি খুক করে হাসে।
রনি ভেবেছিল এই হুমকিতে কাজ হবে, ডান শুনে ওর হয়ে গেছে। কাতরে ওঠে, "এ্যাই, ডান মানে কি?"
- "ডান মানে আমি রাজি। তুমি ফোন করবে না। তবে আমি ফোন করলে ধরবে। তাই তো?" মিটিমিটি হাসছে মিলি। আচ্ছা জব্দ করেছে রনিকে।
- "না, তাও ধরব না।" রনিও বুঝেছে ফাঁদটাতে নিজেই পা দিয়েছে।
- "না তো, ঠিক তো?"
- "ঠিক।"
- "রনি।"
- "এ্যাই কি বললে, আবার বলো।" রনি লাফিয়ে ওঠে।
- "রাখছি, রাত হয়ে গেছে।"
- "খবরদার ফোন রাখবে না মিলি।" ধমকে ওঠে রনি। তারপরই সুর নরম করে, "প্লিজ, আরেকবার বলো।"
- "ফোন রাখছি, গুড নাইট রনি।" মিলি ফোন কেটে নিজের মোবাইলটা বুকে জড়িয়ে ধরে, মুখে ধরা পড়া দুষ্টু হাসি। ওর বুকের মধ্যে ফোনটা আবার বেজে ওঠে। জানে রনিই করেছে। না দেখেই রিসিভ করে কানে দেয়, "হুঁ, বলো।"
- "গুড নাইট মিসেস সরকার। কাল দেখা হবে। তোমাকে কবে আনা হবে মা দিন দেখেছে, কাল কথা বলতে যাব। আমার ভাবতেই কেমন লাগছে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে কত সি *গা *রে *ট খেয়েছি তোমাকে একবার দেখার জন্য। সেই তুমি এবার থেকে........"
- "তুমি ভীষণ সি *গা *রে *ট খাও। তাছাড়া খুব ড্রিঙ্ক করো। রিঙ্কুবৌদি বলছিল, তুমি, দেবারুণদা, তোমরা সবাই দশমীর দিন কি কাণ্ড করেছ।" মিলি মাঝখানে বলে ওঠে।
- "রিঙ্কুবৌদির ফালতু কথা শোনো কেন?"
- "কেন? মিথ্যে বলেছে?" মিলির গলায় রাগ জমেছে বোঝে রনি।
- "মিথ্যে না। তবে রিঙ্কুবৌদির বর দেবারুণদাটা পাঁড় মা *তা *ল। আমি তো তোমার জন্য.........." বলতে গিয়ে ঢোঁক গেলে রনি।
- "আমার জন্য মানে?" মিলি অবাক।
- "রাগ করবে না? প্রমিস?"
- "হুঁ বাবা প্রমিস। তুমি বলোতো ব্যাপারটা কি? সত্যি কথা বলবে বলে দিলাম।"
- "তোমাকে আমি মিথ্যে বলি না মিলি। অনেক কথা বলতে পারিনি সময়ে....."
- "দ্যুৎ, তুমি দশমীর গল্পটা বলবে?" মিলি চূড়ান্ত অধৈর্য্য হয়ে পড়েছে।
- "গল্প আবার কি? তোমার তখন কোনো কথা মনে নেই, অসুস্থ। তোমার কথা ভাবলেই আমার যে নিজের উপর কি রাগ হত ! তার মধ্যে দশমীর দিন আমার সামনে ঠাকুর বরণ করতে এলে, বৌদি তোমাকে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছিল। তুমি ভাবতেই পারবে না, আমার কি হচ্ছিল। আমার বৌ তুমি, অথচ সবার মাঝখানে তাকিয়ে দেখতেও পারছি না। আজও আমার ঘর খালি, আমার সবকিছু......." চুপ করে যাওয়ার আগে রনির গলাটা কেন ভারী হয়ে যায় মিলির বুঝতে বাকি থাকে না।
- "রনি।" নিজের চোখ মুছে ওকে ডাকে মিলি।
- "উঁ বলো।" রনিও হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছছে।
- "তুমি না বললে, আর মনখারাপ করবে না?"
- "করিনি তো। তোমার সঙ্গে কথা বললে আর আমার মনখারাপ থাকে?"
- "মিথ্যেও বলছ?" মিলি চোখে জল নিয়েই হাসার চেষ্টা করে।
- "মিলি, আমি সত্যিই সরি। যা কিছু করেছি, সব ভুলে আমাকে মাপ করে দিও।"
- "ঠিক আছে, মাপ করে দেব। তুমি এই নে *শাটা কমাও। এগুলো তোমাকে মানায়?"
- "আর করব না। তুমি যখন একবার বলেছ, আমি সব ছেড়ে দিলাম।" রনি সত্যিই সি *গা *রে *টের প্যাকেটটা দুমড়ে ঘরের বাজে কাগজের ঝুড়িতে ছুঁড়ে দেয়, "নাও ফেলে দিলাম। এবার রিঙ্কুবৌদিকে বলে দিও।"
- "সত্যি ফেলে দিলে? থ্যাঙ্ক ইউ।"
- "কে তোমার থ্যাঙ্ক ইউ শুনতে চায়? আমি অন্য কমপেনসেশন চাই।"
- "মানে?"
- "এ বাড়িতে এসো, মানেটা বোঝাচ্ছি।" রনি মুখ টিপে হাসে।
মিলি ততক্ষণে খুব ভালো বুঝেছে সেদিন লিলির বাড়িতে রনির সঙ্গে একলা থাকার অভিজ্ঞতা মনে পড়ে। তড়বড় করে, "এখন রাখছি, গুড নাইট" বলে ফোন কেটে দেয়।
রনি হাসতে হাসতে ফোনটা বালিশের পাশে রেখে কখন ঘুমিয়েও পড়ে।
চলবে