ঝরাপাতা
পর্ব - ০২
🌹🌿🌹🌿🌹🌿🌹
লিলি সেই সময়ে ফিরে গেছে তিরিশে ডিসেম্বরের সন্ধ্যায়। রনি আর মিলিকে নিজেদের ঘরে রেখে দিয়ে হাউজিং এর সবার সঙ্গে হঠাৎ পিকনিক। সন্ধ্যায় বেরিয়ে, রাত এগারোটায় দীঘা। হাউজিং এর পুরনো বাসিন্দা নীহাররঞ্জন চৌধুরীর হোটেল আছে ওল্ড দীঘায়। ছোট হোটেল, সেটা পুরোটাই বুক করা হয়েছে। সমুদ্র থেকে একটু দূরে, মিনিট পাঁচেকের হাঁটাপথ। বরং বড় রস্তার ধারে। তাই বাসটা সরাসরি হোটেলের সামনে অবধি আনা যায়।
বাসে অন্যদের চোখ এড়িয়ে যুগলের কাঁধে মাথা দিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে গল্প করছিল লিলি। গল্পের বিষয়, তখন রনি আর মিলি কি করছে, ওদের ভাব হল কিনা।
যুগল জোর দিয়ে বলেছিল, "রনি ভাইয়া ঠিক মিলিকে পটিয়ে ফেলেছে। আরে মিলির রাগ থাকলে আসতই না।"
- "মিলি না, রনিদা রেগে আছে কিনা কে জানে। সেদিন তো দেখোনি। ওকে দেখেই মিলি বেরিয়ে গেল। কদিন ধরে ও চেষ্টা করে গেছে, মিলি কথা বলেনি।"
- "আরে রনিও ওর সঙ্গে ভাব করতেই চায়। তাই না তোমাকে ডেকে নিয়ে গেছিল। আমার বাড়ির কাউকে চেনে না, জানে না, সেখানে হাজির হয়েছিল। আজও আমি একবার ফোন করতেই ছুটি করে চলে এল।"
- "সেই। ওদের ভাব হলেই ভালো।"
- "আরে ওদের কখন ভাব হয়ে গেছে। তুমি খালি ওদের নিয়ে..... এবার একটু আমার দিকে নজর দাও তো।"
- "তোমার দিকে কি নজর দেব?"
- "বুঝতে পারছ না, আমি কি বলছি?" যুগল আরও কাছে ঘেঁষে আসে।
- "খুব বুঝেছি, তুমি সরো। বাসভর্তি লোক আর তুমি ! সরো না।" লিলি জানালার কাঁচে সেঁটে গিয়েও ওর থেকে একচুল সরতে পারে না।
যুগল ফিক করে হেসে ফেলে, "ওকে ওকে, রাতে হোটেলে পৌঁছে......." ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই দলের এক ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, "ওকে ফ্রেন্ডস, সবাই গুছিয়ে বসে পড়েছেন? আর আধঘণ্টা পর কফি আর পকোড়া দেওয়া হবে সবাইকে। সেটা পেতে গেলে এখন আমাদের সঙ্গে অন্তাক্ষরী জয়েন করতে হবে। আমরা টীম তৈরি করে নি চলুন।"
লিলির চিমটিতে যুগল সোজা হয়ে বসে। যতক্ষণ অন্তাক্ষরীর হট্টগোল চলে, যারা উৎসাহ নিয়ে খেলছিল, সবাইকে ও মনে মনে গাল পাড়ে, "হতভাগা, তোরা এসব বেসুরো গান না গেয়ে ঘুমোতে পারতিস তো। আমি একটু রোমান্স করে নিতাম।"
হোটেলে ঢুকেই দশ মিনিটের মধ্যে নাম ডেকে সবাইকে ঘরের চাবি দিয়ে দিলেন নীহাররঞ্জন বাবু। দশ মিনিটের নোটিশে ফ্রেশ হয়ে সবাই ডাইনিং এ। হোটেলের নিজস্ব রুম সার্ভিস থাকলেও, পিকনিকের খাওয়া দাওয়া ডাইনিংএই হবে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঘরে ঢুকে অবশ্য যুগল আর কোনো বাধা না মেনে লিলিকে পাগলের মতো আদর করতে শুরু করেছিল। ততক্ষণে রনির ফোন পেয়ে গেছে ওরা, ডবল খুশি দুজনেই। লিলির মোটেই ইচ্ছে করছিল না তখন ডাইনিং এ যেতে। তাও, যেতে তো হবেই। যুগলকে কোনোমতে থামিয়ে একটু ঠিকঠাক হয়ে দুজন ডাইনিং এ আসে।
প্রায় চল্লিশ জনের দল। হাউজিং সেক্রেটারি বিলাস রক্ষিত আর নীহাররঞ্জন বাবুর ব্যবস্থাপনায় সবাই খাওয়া দাওয়া গল্প মজায় মেতে থাকে। আগামীকাল ভোরে উঠে সোজা যাওয়া হবে শঙ্করপুর মোহনায়। সেখান থেকেই পছন্দ করে মাছ কেনা হবে, আর ফিরে আসার পর লাঞ্চ, ডিনার, টুকটাক স্ন্যাক্স, মাছের নানান পদ থাকবে ঠিক হয়েছে।
এবার ঘরে এসে যুগল আর কোনো বাধা মানে না, দরজা লক করেই লিলিকে কোলে তুলে নেয়। পড়ে যাওয়ার ভয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরেও লিলি হইহই করে ওঠে, "কি করছ তুমি?"
- "কেন জানো না?" ওকে বিছানায় এনে ফেলে পাশে শুয়ে হাসে যুগল, "আমাদের হানিমুনের কথা ভুলে গেলে?"
সত্যিই, হানিমুনে অর্থাৎ বাড়ি ছেড়ে দুজনে সোজা এসেছিল মন্দারমণিতে। রিসর্টের রিসেপশনে সব ফর্মালিটি সেরে নিজেদের জন্য বরাদ্দ ঘরে ঢুকে প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে গেছিল। এর আগে অনেক আবেগঘন কথা হয়েছে দুজনের, এ ওর হাত ধরে নানান প্রতিজ্ঞা করেছে। তার বেশি এগোয়নি খোলামেলা জায়গায় দেখা করতে গিয়ে। বিয়ে করেও, চুপচাপ রেজিস্ট্রেশনটা মিটিয়ে যে যার বাড়ি ফিরে গেছে।
এখন এমন বন্ধ ঘরে এসে পড়ে অদ্ভুত পরিস্থিতির সামনে পড়েছে দুজনেই। একটু পরে লিলিই বলে, "চলো, সমুদ্র থেকে ঘুরে আসি।"
প্রথমে জলের ধারে ধারে অল্প পা ভিজিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অন্য কয়েকটি কাপলকে হাত ধরাধরি করে বা জড়িয়ে ধরেই সমুদ্রস্নান করতে দেখে অস্বস্তি আরও বাড়ছিল। তারপর নিজেরাও সমুদ্রের টানে ধীরে ধীরে আরেকটু এগিয়ে গেছে জলের গভীরে। ঢেউয়ের দোলায় আপনা থেকেই হুটোপাটি শুরু হয়েছে। ঢেউয়ে নাকানি চোবানি খেয়ে এ ওর হাত ধরে রেখেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। মাঝে মাঝে বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় সোজা থাকতে লিলি আঁকড়ে ধরেছে যুগলের জামা। কয়েকবারের পর যুগল একহাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে রেখেছে ঢেউ থেকে আড়াল করতে।
চলবে