মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৯০
ভীষ্ম বর্ণিত আপদগ্রস্ত রাজা ও তিন মৎস্যের কাহিনি
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
ভীষ্ম বর্ণিত আপদগ্রস্ত রাজা ও তিন মৎস্যের কাহিনি
যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলেন, যে রাজা অলস ও দুর্বল, যাঁর কোষাগার ধনশূন্য, গোপন মন্ত্রণা সবাই জেনে গেছে এবং অমাত্যরা বিপক্ষের বশীভূত হয়েছে, তিনি অন্য রাজা কর্তৃক আক্রান্ত হলে কি করবেন?
ভীষ্ম বললেন, বিপক্ষ রাজা যদি ধার্মিক ও শুদ্ধস্বভাব হন তবে শীঘ্ৰ সন্ধি করা উচিত। সন্ধি অসম্ভব হলে যুদ্ধই কর্তব্য। সৈন্য যদি অনুরক্ত ও সন্তুষ্ট থাকে তবে অল্প সৈন্যেও পৃথিবী জয় করা যায়। যদি যুদ্ধ করা নিতান্ত অসম্ভব হয় তবে রাজা দুর্গ ত্যাগ কোরে কিছুকাল অন্য দেশে থাকবেন এবং পরে উপযুক্ত মন্ত্রণা কোরে পুনর্বার নিজ রাজ্য অধিকার করবেন।
শাস্ত্রে আছে, আপদগ্রস্ত রাজা স্বরাজ্য ও পররাজ্য থেকে ধন সংগ্রহ করবেন এবং বিশেষত ধনী লোকের থেকেই ধন নেবেন। গ্রামবাসীরা যদি পরস্পরের নামে অভিযোগ করে তবে রাজা কাকেও পুরস্কার দেবেন না, তিরস্কারও করবেন না। কেবল সদুপায়ে বা কেবল নিষ্ঠুর উপায়ে ধনসংগ্রহ হয় না, মধ্যবর্তী উপায়ই প্রশস্ত। লোকে ধনহীন রাজাকে অবজ্ঞা করে। বস্ত্র যেমন লজ্জা আবরণ করে ধনও তেমন রাজার সকল দোষ আবরণ করে। রাজা সর্বতোভাবে নিজের উন্নতির চেষ্টা করবেন এবং বিনষ্ট হলেও কখনও নত হবেন না। দস্যুরা যদি ভদ্র স্বভাবের হয় তবে তাদের বিনষ্ট না করে বশীভূত করাই উচিত। ক্ষত্রিয় রাজা দস্যু ও অলস লোকের ধন হরণ করতে পারেন। যিনি অসাধু লোকের অর্থ নিয়ে সাধুদের পালন করেন তিনিই পূর্ণ ধর্মজ্ঞ।
যুধিষ্ঠির, কাজ ও অকাজ নির্ধারণ সম্বন্ধে আমি একটি কাহিনি বলছি শোনো —এক জলাশয়ে তিনটি শোল মাছ বাস করতো, তাদের নাম অনাগতবিধাতা, প্রত্যুৎপন্নমতি ও দীর্ঘসূত্র। একদিন জেলেরা মাছ ধরবার জন্য সেই জলাশয় থেকে জল বার কোরে ফেলতে লাগল। ক্রমশ জল কমছে দেখে দীর্ঘদর্শী অনাগতবিধাতা তার দুই বন্ধুকে বলল, জলচরদের বিপদ উপস্থিত হয়েছে, পালাবার পথ বন্ধ হবার আগেই অন্য জলাশয়ে চলো। যে উপযুক্ত উপায়ে অনাগত অনিষ্টের প্রতিবিধান করে সে বিপন্ন হয় না। দীর্ঘসূত্র বলল, তোমার কথা ঠিক, কিন্তু কোনও বিষয়ে তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। প্রত্যুৎপন্নমতি বলল, কাজের সময় উপস্থিত হলে আমি কর্তব্যে অবহেলা করি না। তখন অনাগতবিধাতা জলস্রোতে নির্গত হয়ে অন্য এক জলাশয়ে গেল। জল বেরিয়ে গেলে জেলেরা নানা উপায়ে সমস্ত মাছ ধরতে লাগল, অন্য মাছের সঙ্গে দীর্ঘসূত্র এবং প্রত্যুৎপন্নমতিও ধরা পড়ল। জেলেরা যখন সমস্ত মাছ দড়ি দিয়ে গাঁথছিল তখন প্রত্যুৎপন্নমতি দড়ি কামড়ে রইল, জেলেরা ভাবলে তাকেও গাঁথা হয়েছে। তার পর জেলেরা দড়িতে গাঁথা সমস্ত মাছ অন্য এক বৃহৎ . জলাশয়ে ডুবিয়ে ধুতে লাগল, সেই সুযোগে প্রত্যুৎপন্নমতি পালিয়ে গেল। মন্দবুদ্ধি দীর্ঘসূত্র বিনষ্ট হোলো।
যুধিষ্ঠির, যে লোক মোহের বশে আসন্ন বিপদ বুঝতে পারে না সে দীর্ঘসূত্রের মতোই বিনষ্ট হয়। যে লোক নিজেকে চতুর মনে কোরে পূর্বেই প্রস্তুত হয় না সে প্রত্যুৎপন্নমতির ন্যায় সংশয়াপন্ন থেকেও মুক্তিলাভ কোরে থাকে। অনাগতবিধাতা ও প্রত্যুৎপন্নমতি উভয়েই সুখী হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘসূত্র বিনষ্ট হয়। যাঁরা বিচার করে যুক্তি অনুসারে কার্য সম্পাদন করেন তারাই সুফল লাভ করেন।
______________
(ক্রমশ)