মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৮৮
রাজার মিত্র, দণ্ডবিধি, রাজকর, যুদ্ধনীতি বিষয়ে ভীষ্মের উপদেশ
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
রাজার মিত্র, দণ্ডবিধি, রাজকর, যুদ্ধনীতি বিষয়ে ভীষ্মের উপদেশ
যুধিষ্টির বললেন, পিতামহ, অন্যের সাহায্য না নিয়ে রাজকার্য সম্পাদন করা অসম্ভব। রাজার সচিব কেমন হবেন? কেমন লোককে রাজা বিশ্বাস করবেন?
ভীষ্ম বললেন, রাজার মিত্র চতুর্বিধ স্বভাবসম্পন্ন - সমার্থ (যাঁর স্বার্থ রাজার স্বার্থের সমান), ভজমান (অনুগত), সহজ (আত্মীয়) এবং কৃত্রিম (অর্থ দ্বারা বশীভূত)। এ ছাড়াও রাজার পঞ্চম মিত্র ধর্মাত্মা, তিনি যে পক্ষে ধর্ম দেখেন সেই পক্ষেরই সহায় হন, সংশয়স্থলে নিরপেক্ষ থাকেন। বিজয়লাভের জন্য রাজা ধর্ম ও অধর্ম দুইই অবলম্বন করেন। তাঁর যে সংকল্প ধর্মবিরুদ্ধ তা ধর্মাত্মা মিত্রের নিকট প্রকাশ করবেন না। পূর্বোক্ত চতুর্বিধ মিত্রের মধ্যে ভজমান ও সহজই শ্রেষ্ঠ, অপর দুজন আশঙ্কার পাত্র। একই কাজের জন্য দু-তিন জনকে মন্ত্রী করা উচিত নয়, তারা একে অপরকে সহ্য করতে পারবেন না।
কোনও রাজকর্মচারী যদি রাজধন চুরি করে, তবে যে লোক তা জানাবে তাকে রাজা রক্ষা করবেন, নতুবা চোর-কর্মচারী তাকে বিনাশ করবে। যিনি লজ্জাশীল ইন্দ্রিয়জয়ী সত্যবাদী সরল ও উচিতবক্তা, এমন লোকই সভাসদ হবার যোগ্য। সৎকুলজাত বুদ্ধিমান রূপবান চতুর ও অনুরক্ত লোককে তোমার পরিজন নিযুক্ত করবে। অপরাধীকে তার অপরাধ অনুসারে দণ্ড দেবে, ধনীর অর্থদণ্ড করবে এবং নির্ধনকে কারাদণ্ড দেবে। দুবৃত্তগণকে প্রহার কোরে দমন করবে এবং সজ্জনকে মিষ্ট বাক্যে এবং উপহার দিয়ে পালন করবে। রাজা সকলের মনে তার প্রতি বিশ্বাস জন্মাবেন, কিন্তু নিজে কাউকে বিশ্বাস করবেন না, পুত্রকেও নয়।
রাজা ছয় প্রকার দুর্গের মধ্যভাগে নগর স্থাপন করবেন - মরুদুর্গ, মহীদুর্গ, গিরিদুর্গ, মনুষ্যদুর্গ, মৃদুর্গ ও বনদুর্গ। প্রত্যেক গ্রামের একজন অধিপতি থাকবেন, তার উপরে দশ গ্রামের এক অধিপতি, তার উপরে বিশ গ্রামের, একশত গ্রামের এবং এক হাজার গ্রামের জন্য এক এক জন অধিপতি থাকবেন। এঁরা সকলেই নিজ নিজ এলাকায় উৎপন্ন খাদ্যের উপযুক্ত অংশ পাবেন। রাজা নানাবিধ কর আদায় করবেন, কিন্তু অধিক কর নিয়ে প্রজাদের বিপদাপন্ন করবেন না। যদি শত্রুর আক্রমণের ভয় উপস্থিত হয় তবে রাজা সেই ভয়ের বিষয় প্রজাদের জানিয়ে বলবেন, “তোমাদের রক্ষার জন্য আমি ধন চাইছি, ভয় দূর হলে এই ধন ফিরিয়ে দেবো। শত্রু যদি তোমাদের ধন কেড়ে নেয় তবে তা আর ফিরে পাবে না। তোমরা স্ত্রীপুত্রের জন্যই ধনসঞ্চয় কোরে থাকো, কিন্তু সেই স্ত্রীপুত্ৰই এখন বিনষ্ট হতে বসেছে। আপৎকালে ধনের মায়া করা উচিত নয়।
ক্ষত্রিয় রাজা বর্মহীন বিপক্ষকে আক্রমণ করবেন না। তিনি শঠ যোদ্ধার সঙ্গে শঠতার দ্বারা এবং ধার্মিক যোদ্ধার সঙ্গে ধর্ম অনুসারে যুদ্ধ করবেন। ভীত বা পরাজিত লোককে প্রহার করা উচিত নয়। বিষাক্ত বাণ বর্জনীয়, অসৎ লোকেই এরূপ অস্ত্র প্রয়োগ করে। যার অস্ত্র নষ্ট হয়েছে বা বাহন হত হয়েছে, অথবা যে শরণাগত হয়েছে, তাকে বধ করবে না। আহত শত্রুর চিকিৎসা করবে অথবা তাকে নিজের গৃহে পাঠাবে। চিকিৎসার পর ক্ষত সেরে গেলে শত্রুকে মুক্তি দেবে।
চৈত্র বা অগ্রহায়ণ মাসে সৈন্যসজ্জা করার উপযুক্ত সময়, তখন শস্য উৎপন্ন হয়, অধিক শীত বা গ্রীষ্ম থাকে না। বিপক্ষ দ্বারা বিপদগ্রস্ত হলে অন্য সময়েও সৈন্যসজ্জা করা যেতে পারে। যখন বৃষ্টি থাকে না তখন রথ ও ঘোড়সওয়ার সৈন্য এবং বর্ষাকালে পদাতিক ও গজারোহী সৈন্য উপয়ুক্ত। যদি শান্তিস্থাপন সম্ভব হয় তবে যুদ্ধ করা অনুচিত। সাম দান ও ভেদ নীতি বিফল হলে তবেই যুদ্ধ করা উচিৎ। যুদ্ধের সময় রাজা বলবেন, “আমার লোকেরা বিপক্ষের সৈন্য বধ করছে তা আমার কাম্য নয়, আহা, সকলেই তো বাঁচতে চায়।’ শত্রুর সামনে এইকথা বলে রাজা গোপনে নিজের যোদ্ধাদের প্রশংসা করবেন।
যুধিষ্ঠির, আত্মকলহের ফলে বিভেদ সৃষ্টি ও বংশনাশ হয়, রাজ্যের সমূহ ক্ষতি হয়, সেজন্য তার প্রতিবিধান করা আবশ্যক। এই আভ্যন্তরিন ভয়ের তুলনায় বাইরের শত্রুর ভয় তুচ্ছ। স্বপক্ষের সংঘবদ্ধতা রাজ্যরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়।
______________
(ক্রমশ)