মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৮৭
ভীষ্ম বর্ণিত বর্ণাশ্রমধর্ম, চর নিয়োগ ও শুল্ক প্রথা
প্রাককথন
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।
সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।
অশোক ঘোষ
ভীষ্ম বর্ণিত বর্ণাশ্রমধর্ম, চর নিয়োগ ও শুল্ক প্রথা
ভীষ্ম বললেন, ব্রাহ্মণের ধর্ম ইন্দ্রিয়দমন বেদাভ্যাস ও যাজন। ক্ষত্রিয়ের ধর্ম দান যজন বেদাধ্যয়ন প্রজাপালন ও দুষ্টের দমন, তিনি যাজন ও অধ্যাপনা করবেন না। বৈশ্যের ধর্ম দান, বেদাধ্যয়ন, যজ্ঞ, সদুপায়ে ধনসঞ্চয় এবং পশুপালন। প্রজাপতি শূদ্রকে অপর তিন বর্ণের দাসরূপে সৃষ্টি করেছেন, তিন বর্ণের সেবা করাই শূদ্রের ধর্ম। শূদ্র ধনসঞ্চয় করবে না, কারণ নীচ লোকে ধন দিয়ে উচ্চশ্রেণীর লোককে বশীভূত করে। কিন্তু ধার্মিক শূদ্র রাজার অনুমতিতে ধনসঞ্চয় করতে পারে। শূদ্রের বেদে অধিকার নেই, ব্রাহ্মণাদি তিন বর্ণের সেবা এবং তাদের অনুষ্ঠিত যজ্ঞই শূদ্রের যজ্ঞ।
ব্রহ্মচর্য গার্হস্থ্য বানপ্রস্থ ও ভৈক্ষ্য - ব্রাহ্মণের এই চার আশ্রম। মোক্ষকামী ব্রাহ্মণ ব্রহ্মচর্যের পরেই ভৈক্ষ্য গ্রহণ করতে পারেন। ক্ষত্রিয়াদি তিন বর্ণ চতুরাশ্রমের সবগুলি গ্রহণ করেন না। যে ব্রাহ্মণ দুশ্চরিত্র ও স্বধর্মভ্রষ্ট তিনি বেদচর্চা করুন বা না করুন, তাকে শূদ্রের মতো আলাদা ভাবে খেতে দেবে এবং দেবকার্যে বর্জন করবে। যে শূদ্র তার কর্তব্য কর্ম করেছে এবং সন্তানের পিতা হয়েছে, সে যদি তত্ত্বজিজ্ঞাসু ও সদাচারী হয় তবে রাজার অনুমতি নিয়ে ভৈক্ষ্য ভিন্ন অন্য আশ্রমে প্রবেশ করতে পারে।
যুধিষ্ঠির, সমস্ত জন্তুর পদচিহ্ন যেমন হাতির পদচিহ্নে লুপ্ত হয় তেমন অন্য সমস্ত ধর্ম রাজধর্মে লুপ্ত হয়। সকল ধর্মের মধ্যে রাজধৰ্মই প্রধান, তার দ্বারাই চতুর্বর্ণ পালিত হয়। সর্বপ্রকার ত্যাগই রাজধর্মে আছে এবং ত্যাগই শ্রেষ্ঠ ও প্রাচীন ধর্ম। সর্বপ্রকার ভোগ উপদেশ ও বিদ্যা রাজধর্মে আছে, সকলেই রাজধর্মের আশ্রয়ে থাকে। রাজা যদি দণ্ড না দেন, তবে বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে ভক্ষণ করে তেমন প্রবল লোকে দুর্বলের উপর পীড়ন করবে। রাজার ভয়েই প্রজারা পরস্পরকে হত্যা করে না।
রাজা প্রথমেই ইন্দ্রিয় জয় কোরে আত্মজয়ী হবেন, তারপর শত্ৰুজয় করবেন। যারা জড় অন্ধ বা বধিরের মতো দেখতে এবং ক্ষুধা পিপাসা ও পরিশ্রম সহ্য করতে পারে, এমন বিচক্ষণ লোককে পরীক্ষার পর গুপ্তচর করবেন। অমাত্য মিত্র রাজপুত্র ও সামন্তরাজগণের নিকটে এবং নগরে ও জনপদে গুপ্তচর রাখবেন। এই চরেরা যেন পরস্পরকে জানতে না পারে এবং তারা কি করছে তা দেখবার জন্য আরও বিচক্ষণ লোক নিযুক্ত করতে হবে। যাঁরা সর্ব বিষয়ে অভিজ্ঞ এমন লোককে রাজা বিচারক নিযুক্ত করবেন। খনি, লবণ উৎপাদন, পারঘাট, ধৃত বুনো হাতি এবং অন্যান্য বিষয়ের শুল্ক আদায়ের জন্য বিশ্বস্ত লোক রাখবেন। প্রবল শত্রু আক্রমণ করলে রাজা দুর্গের মধ্যে আশ্রয় নেবেন এবং সমস্ত শস্য সংগ্রহ করবেন। দুর্গের মধ্যে আনা অসম্ভব হলে ক্ষেত্রের শস্য পুড়িয়ে ফেলবেন। নদীর সেতু ভেঙে ফেলবেন, পানীয় জল সরিয়ে নেবেন অথবা তাতে বিষ মিশিয়ে দেবেন।
মহর্ষি কশ্যপ পুরূরবাকে বলেছিলেন, পাপী লোকে যখন স্ত্রীহত্যা ও ব্রাহ্মণহত্যা করেও সভায় সাধুবাদ পায়, রাজাকেও উপেক্ষা করে, তখন রাজার ভয় উপস্থিত হয়। লোকে অত্যন্ত পাপ করলে রুদ্রের আবির্ভাব হয়, তিনি সাধু অসাধু সকলকেই সংহার করেন। এই রুদ্র মানবগণের হৃদয়েই থাকেন এবং ইনিই নিজের ও পরের শরীর বিনষ্ট করেন।
তস্কর যদি প্রজার ধন হরণ করে এবং রাজা তা উদ্ধার করতে না পারেন, তবে সেই অক্ষম রাজা নিজের কোষ থেকেই প্রজার ক্ষতি পূরণ করবেন। ধর্মরাজ, তুমি যদি সর্বদাই মৃদুস্বভাব, অতি সৎ, অতি ধার্মিক, কাপুরুষের মতো উদ্যমহীন ও দয়ালু হও তবে লোকে তোমাকে মানবে না।
______________
(ক্রমশ)