Story of Mahabharat Part 171 in Bengali Spiritual Stories by Ashoke Ghosh books and stories PDF | মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 171

Featured Books
Categories
Share

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব 171

মহাভারতের কাহিনি – পর্ব-১৭১

কৃষ্ণকে দুর্যোধনের ভর্ৎসনা

 

প্রাককথন

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মহাভারত নামক মহাগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি এই গ্রন্থে কুরুবংশের বিস্তার, গান্ধারীর ধর্মশীলতা, বিদুরের প্রজ্ঞা, কুন্তীর ধৈর্য, বাসুদেবের মাহাত্ম্য, পাণ্ডবগণের সত্যপরায়ণতা এবং ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণের দুর্বৃত্ততা বিবৃত করেছেন। নানা কাহিনি সংবলিত এই মহাভারতে সর্বমোট ষাট লক্ষ শ্লোক আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস পূর্বে নিজের পুত্র শুকদেবকে এই গ্রন্থ পড়িয়ে তার পর অন্যান্য শিষ্যদের শিখিয়েছিলেন। তিনি ষাট লক্ষ শ্লোকে আর একটি মহাভারতসংহিতা রচনা করেছিলেন, তার ত্রিশ লক্ষ শ্লোক দেবলোকে, পনের লক্ষ পিতৃলোকে, চোদ্দ লক্ষ গন্ধর্বলোকে এবং এক লক্ষ মনুষ্যলোকে প্রচলিত আছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন শেষোক্ত এক লক্ষ শ্লোক পাঠ করেছিলেন। অর্জুনের প্রপৌত্র রাজা জনমেজয় এবং ব্রাহ্মণগণের বহু অনুরোধের পর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত শোনাবার জন্য আজ্ঞা দিয়েছিলেন।

সেইসব মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যাঁরা বিশালাকার মহাগ্রন্থ মহাভারত সম্পূর্ণ পাঠ করেছেন। অধিকাংশ মানুষই মহাভারতের কিছু কিছু গল্প পড়েছেন, শুনেছেন বা দূরদর্শনে সম্প্রসারিত ধারাবাহিক চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছেন, যা মহাভারতের খণ্ডাংশ মাত্র এবং মূলত কৌরব ও পাণ্ডবদের বিষয়ীভূত ও শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

মহাগ্রন্থ মহাভারত রচিত হয়েছে অসংখ্য কাহিনির সমাহারে, যে কাহিনিসমূহের অধিকাংশই কৌরব ও পাণ্ডবদের কাহিনির সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।

সেই সমস্ত কাহিনিসমূহের কিছু কিছু কাহিনি সহজবোধ্য ভাষায় সুহৃদ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরাবাহিকভাবে উপস্থাপনা করার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আশা করি ভালো লাগবে।

অশোক ঘোষ

 

কৃষ্ণকে দুর্যোধনের ভর্ৎসনা

দুর্যোধনের পতনে পাণ্ডব পাঞ্চাল ও সৃঞ্জয় যোদ্ধারা হৃষ্ট হয়ে গর্জন কোরে হাত নাড়তে লাগলেন। তাদের অনেকে ভীমকে বললেন, বীর, ভাগ্যবশে আপনি মত্ত হাতির মতো পা দিয়ে দুর্যোধনের মাথা পিষে দিয়েছেন, সিংহ যেমন মহিষের রক্ত পান করে তেমন আপনি দুঃশাসনের রক্ত পান করেছেন।

এইরকম কটুক্তি শুনে কৃষ্ণ সবার উদ্দ্যেশ্যে বললেন, বিনষ্ট শত্রুকে কটুকথায় আঘাত করা উচিত নয়। এই নির্লজ্জ লোভী পাপী দুর্যোধন যখন শুভাকাঙ্খীদের উপদেশ লঙ্ঘন করেছিল তখনই এর মৃত্যু হয়েছে। এই নরাধম এখন অক্ষম হয়ে শুকনো কাঠের মতো পড়ে আছে, একে কটুকথায় পীড়িত কোরে কি হবে?

দুর্যোধন দুই হাতে ভর দিয়ে উঠে বসলেন এবং প্রাণান্তকর যন্ত্রণা অগ্রাহ্য কোরে কৃষ্ণকে বললেন, কংসদাসের পুত্র, অন্যায় যুদ্ধে আমাকে নিপাতিত কোরে তোমার লজ্জা হচ্ছে না? তুমিই ভীমকে ঊরুভঙ্গের প্রতিজ্ঞা মনে করিয়ে দিয়েছিলে, তুমি অর্জুনকে যা বলেছিলে তা কি আমি জানি না? তোমারই কূটনীতিতে আমাদের সমস্ত যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তুমিই শিখণ্ডীকে সম্মুখে রাখিয়ে অর্জুনের বাণে ভীষ্মকে নিপাতিত করেছ, অশ্বত্থামার মরণের মিথ্যা সংবাদ দিয়ে দ্রোণাচার্যকে বধ করিয়েছ, কর্ণ যখন ভূমি থেকে রথের চাকা তুলছিলেন তখন তুমিই অর্জুনকে দিয়ে তাঁকে হত্যা করেছ। আমাদের সঙ্গে ন্যায়যুদ্ধ করলে তোমরা কখনও জয়ী হতে না।

কৃষ্ণ উত্তর দিলেন, গান্ধারীর পুত্র, তুমি পাপের পথে গিয়েই আত্মীয়বান্ধবসহ নিহত হয়েছ। ভীষ্ম তোমার মতো পাপীর পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করছিলেন সেজন্যই শিখণ্ডী কর্তৃক নিহত হয়েছেন। দ্রোণ স্বধর্ম ত্যাগ কোরে তোমার প্রীতির জন্য যুদ্ধ করছিলেন, তাই ধৃষ্টদ্যুম্ন তাকে বধ করেছেন। বহু সুযোগ পেয়েও অর্জুন কর্ণকে মারেন নি, বীরোচিত উপায়েই তাকে মেরেছেন। অর্জুন নিন্দাজনক কাজ করেন না, তাঁর দয়াতেই তুমি এবং ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ অশ্বত্থামা প্রভৃতি বিরাটনগরে নিহত হও নি। তুমি আমাদের যেসব অকার্যের কথা বলেছ তা তোমার অপরাধের জন্যই আমরা করেছি। লোভের বশে এবং অতিরিক্ত শক্তিলাভের বাসনায় তুমি যেসব দুষ্কর্ম করেছ এখন তারই ফল ভোগ করো।

দুর্যোধন বললেন, আমি যথাবিধি অধ্যয়ন দান ও সসাগরা পৃথিবী শাসন করেছি, শত্রুদের মাথায় অধিষ্ঠান করেছি, ক্ষত্রিয়ের অভীষ্ট মরণ লাভ করেছি, দেবগণের যোগ্য এবং রাজাগণের দুর্লভ রাজ্য ভোগ করেছি, শ্রেষ্ঠ ঐশ্বর্য লাভ করেছি। আমার তুল্য আর কে আছে? কৃষ্ণ, আমার শুভাকাঙ্খী ও ভাইদের সঙ্গে আমি স্বর্গে যাবো। তোমাদের সংকল্প পূর্ণ হোলো না, তোমরা শোকসন্তপ্ত হয়ে জীবনধারণ করো।

দুর্যোধনের উপর আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হোলো, অপ্সরা ও গন্ধর্বগণ গীতবাদ্য করতে লাগল, সিদ্ধগণ সাধু সাধু বললেন। দুর্যোধনের প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন দেখে কৃষ্ণ ও পাণ্ডব প্রভৃতি লজ্জিত হলেন। বিষণ্ণ পাণ্ডবগণকে কৃষ্ণ বললেন, দুর্যোধন ও ভীষ্মাদি বীরগণকে আপনারা ন্যায়যুদ্ধে বধ করতে পারতেন না। আপনাদের হিতসাধনের জন্যই আমি কূট উপায়ে এঁদের নিধন ঘটিয়েছি। শত্ৰু বহু বা প্রবল হলে বিবিধ কূট উপায়ে তাদের বধ করতে হয়, দেবতারা এবং অনেক সৎপুরুষ এমন করেছেন। আমরা কৃতকার্য হয়েছি, এখন আমি বিশ্রাম করতে চাই, আপনারাও সকলে বিশ্রাম করুন। তখন পাঞ্চালগণ হৃষ্ট হয়ে শঙ্খ বাজালেন, কৃষ্ণও পাঞ্চজন্য বাজালেন।

______________

(ক্রমশ)