The Reverse Current - ​​1 in Bengali Fiction Stories by Surajit Sarkar books and stories PDF | উল্টো ধারা - 1

Featured Books
Categories
Share

উল্টো ধারা - 1

****সাল-2019 জায়গা-লাটাগুড়ি 

“এই জায়গাটা কি রকম অদ্ভুত টাইপের না?”

রিজুর দিকে তাকিয়ে বললো মীরা।

রিজু হেসে বললো, “অদ্ভুত আবার কী আছে? নদীর ধারে আর কিরকমই বা লাগতে পারে!”

মীরা আর রিজুর বিয়ে হয়েছে এক মাস। নয় বছরের সম্পর্ক—বিয়ের পর তেমন কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। তাই দুজনেই ঠিক করেছিল, কলকাতার গরম ছেড়ে কয়েকটা দিন উত্তরবঙ্গের কোনো এক অফবিট জায়গায় কাটিয়ে আসবে।

জায়গাটা খুঁজে পেয়েছিল মীরাই—ফেসবুকে। লাটাগুড়ি থেকে প্রায় বারো কিলোমিটার ভেতরে, ছোট্ট একটা গ্রাম—ধুমঘর।

গ্রামের পাশ দিয়ে তিস্তা নদীর একটা শাখা বয়ে গেছে। জায়গাটা ছবির মতো সুন্দর—মীরার তো প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গিয়েছিল। রিজুরও খারাপ লাগেনি। কলকাতার গরমের থেকে অনেকটাই স্বস্তি এখানে।

“এই নদীটার ব্যাপারেই বলছিলো না?”

মীরা আবার প্রশ্ন করলো।

রিজু মাথা নাড়িয়ে বললো, “হ্যাঁ, এইটাই। ভাবতে অবাক লাগে—এখনো এমন লোক আছে যারা এসব কুসংস্কার বিশ্বাস করে।”

তারা যে হোমস্টেতে উঠেছে, সেটা নদীর পাড় থেকে অনেকটাই দূরে। ডুয়ার্সে সাধারণত নদীর ধারে হোমস্টে থাকে, কিন্তু এখানে তার উল্টো—নদীর পাশে তো দূরের কথা, আশেপাশে কোনো জনবসতিও নেই। অথচ জায়গাটা এত সুন্দর।

পুরো গ্রামে এই একটাই হোমস্টে। হয়তো লোকজন খুব একটা আসে না। হোমস্টেটা চালায় দুজন লোক—বিজয় তামাং আর তার মেয়ে মিলি।

বিকেলের দিকে তারা যখন একটু হাঁটতে বেরোচ্ছিল, তখন বিজয় তাদের বলেছিল—

“সন্ধের আগে ফিরে আসবেন… আর নদীর ধারে সন্ধের পর যাবেন না।”

রিজু জিজ্ঞেস করেছিল কেন।

বিজয় ঠিক করে কিছু বলেনি, শুধু বলেছিল—

“নদীর পাড়টা সন্ধের পর ভালো জায়গা না…”

রিজু অবশ্য এসবকে তেমন পাত্তা দেয়নি।

এখন বাজে সাতটা পনেরো। অনেকক্ষণ হলো সূর্য ডুবে গেছে। আকাশে ধীরে ধীরে চাঁদ উঠছে। তার জ্যোৎস্নার আলোয় নদীটাকে আরও মায়াবী লাগছে।

রিজু তাকিয়ে আছে নদীর দিকে… তারপর মীরার দিকে।

এই আলোয় মীরাকেও অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।

“মিলি… এই মিলি! সাহেবদের বিকেলের টিফিন দিয়েছিস?”

ডাকতে ডাকতে হোমস্টেতে ঢুকলো বিজয় তামাং।

মিলি বললো, “দিদি-দাদারা এখনো ফেরেনি।”

কথাটা শুনে বিজয়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“ফেরেনি মানে?”

সে তাড়াতাড়ি মিলির হাত চেপে ধরে বললো,

“তুই ওদের বলিসনি সন্ধের মধ্যে ফিরতে?"

মিলি বললো, “আমি কেন? তুমিও তো বলেছিলে সন্ধের আগে ফিরে আসতে… হয়তো একটু পরেই চলে আসবে।”

কথাটা বিজয়ের একদম মনোপুত হলো না। তার ভেতরে একটা অজানা অস্বস্তি কাজ করছিল।

আবার যদি কিছু হয়ে যায়…

সে আর দেরি না করে গ্রাম্যের মোড়লের সাথে দেখা করতে বেরিয়ে পড়লো।

নদীর ধারে বসে আছে দুজন মানুষ—রিজু আর মীরা।

অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। হঠাৎ মীরার মাথায় এলো—

“কটা বাজে? আমাদের এবার ফেরা উচিত না?”

রিজু ফোন বের করে সময়টা দেখলো।

“মাত্র সোয়া সাতটা।”

মীরার ভ্রু কুঁচকে গেল।

সোয়া সাতটা? একটু আগেই তো দেখেছিলাম… তখনও সোয়া সাতটাই ছিল…

চারপাশটা কেমন যেন বদলে গেছে।

নদীর শব্দটা আগের থেকে অনেক বেশি জোরে শোনা যাচ্ছে।

আর অদ্ভুতভাবে… ভয়ংকর।

“রিজু… আমাদের এবার ওঠা উচিত,” মীরা আস্তে করে বললো।

“আর একটু থাকি না… এমন জায়গা আর কবে পাবো,” রিজু হেসে বললো।

মীরা আর কিছু বললো না।

এদিকে বিজয় সব কথা খুলে বলার পর মোড়লের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো।

সে দেরি না করে গ্রামের কয়েকজন যুবককে ডাকলো।

“চল, এখনই নদীর ধারে যেতে হবে!”

তাদের যে করেই হোক আটটার আগে পৌঁছাতে হবে—

না হলে কী হতে পারে, সেটা কেউই স্পষ্ট করে বলতে চায় না…

এখন বাজে ৭:৪৫।

“রিজু, এবার উঠি… অনেকক্ষণ তো হয়ে গেল,” মীরা আবার বললো।

রিজু এবার ফোনটা বের করে সময় দেখলো।

আর মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

সোয়া সাতটা…

একই সময়।

কয়েক মিনিট আগেও যা ছিল—একটুও বদলায়নি।

রিজুর ভ্রু কুঁচকে গেল।

মোবাইলটা নষ্ট হলো নাকি…? দেখে এবার একটু নিজে অবাক হলো আগের যা টাইম ছিলো একই টাইম। মোবাইল টা খারাপ হলো নাকি .

হঠাৎ করে রিজুর মনে হলো—নদীর জলের আওয়াজ একদম থেমে গেছে।

যেন কোনো শব্দই নেই… চারপাশ নিস্তব্ধ।

সে ধীরে ধীরে মীরার দিকে তাকালো।

মীরা একদম চুপ করে বসে আছে।

“এই মীরা… মীরা?”

কোনো সাড়া নেই।

মীরার চোখ নদীর দিকে স্থির হয়ে আছে—

যেন নদীটা তাকে সম্মোহিত করে ফেলেছে।

রিজুর বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠলো।

হচ্ছেটা কী…?

একটু আগেও চারপাশে রাতচরা পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছিল—

এখন সব চুপ।

অস্বাভাবিকভাবে চুপ।

রিজু ধীরে বললো,

“মীরা… ওই নদীটা দেখ…”

মীরা খুব আস্তে মাথা নড়ালো।

তারপর নিচু, বিস্মিত গলায় বললো—

“ওটা… ওটা কি উল্টো দিকে বইছে?”

এই রাতের বেলায়, চাঁদের আলোয় নদীর দিকে তাকিয়ে তারা যা দেখলো—

তা এক মুহূর্তের জন্য তাদের দুজনকেই স্তব্ধ করে দিল।

নদীর জল…

সত্যিই উল্টো দিকে বয়ে যাচ্ছে।

“এটা… এটা সম্ভব না…” রিজু ফিসফিস করে বললো।

হঠাৎ—

চারদিক ভরে গেল এক তীক্ষ্ণ, অসহ্য শব্দে।

যেন খুব কাছে থেকেও আসছে না… আবার খুব দূর থেকেও না।

মীরা দুই কান চেপে ধরলো।

“রিজু…!”

রিজু কিছু বলতে যাচ্ছিল—

কিন্তু শব্দটা আরও তীব্র হয়ে উঠলো।

চারপাশ যেন কেঁপে উঠলো একবার।

তারপর—

সবকিছু হঠাৎ থেমে গেল।

নিস্তব্ধতা।

মীরা হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ খুলে তাকালো।

তার মাথা ঘুরছে… সব ঝাপসা।

“রিজু…?”

কোনো উত্তর নেই।

তার পাশে যেখানে রিজু ছিল—

সেখানে এখন শুধু ফাঁকা জায়গা।

কিছুক্ষণ পর, যখন গ্রামের মোড়ল আর তার লোকজন নদীর ধারে পৌঁছালো—

তারা দেখলো,

মীরা মাটিতে পড়ে আছে, অচেতন অবস্থায়।

চারপাশে কেউ নেই।

রিজুর কোনো চিহ্নও পাওয়া গেল না।

 কিন্তু নদীটা বয়ে যাচ্ছে একই ভাবে কিন্তু উল্টো দিকে না সোজা দিকে