ঝরাপাতা
পর্ব - ৯৩
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
পিউর গলা পেতেই ইশারায় মিলিকে ওয়াশরুমে ঢুকতে বলে রনি। খুলছি বলে পিউকে সাড়া দিয়ে নিজের গালটা আবার ঘষে আয়নায় দেখে নেয়। সন্তুষ্ট হয়ে দরজা খুলতে এগোতেই চোখে পড়ে, মিলির শাড়িটা খাট থেকে নিচে মেঝেতে লুটোচ্ছে। ওটাকেও খাটে তুলে সারা ঘরে চোখ বোলায়, গভীর শ্বাস নিয়ে আবার ছেড়ে বৌদির মিসাইল আক্রমণের মুখোমুখি হতে এগিয়ে যায়।
দরজা খুলতেই একগাল হাসি নিয়ে ঢোকে পিউ। একটু আধটু অসতর্ক অবস্থায় দুই মক্কেলকে পাকড়ানোই ওর আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু ঘরে ঢুকে মিলি নেই দেখে থতিয়ে যায়। আপনা থেকেই চোখ যায় ওয়াশরুমের দরজায়, বন্ধ। ভিতরে জলের কলও খোলা মনে হয়। আপশোষে ভরে ওঠে বুক, একজন হাত থেকে ফসকে গেছে। তবে অপরাধীরা যখন জোটে ছিল, একটাকে ধরতে পারলেও............ একবুক আশা নিয়ে রনির দিকে ফেরে। দিব্যি ঘরের টিশার্ট লোয়ার পরা, হাতে তোয়ালে। সক্কালবেলা খুঁত ধরার কোনো রাস্তাই নেই। মনে মনে ধুত বলে খাটে বসতে গিয়ে দেখে, মিলির গতকাল রাতের শাড়িটা গোল্লা পাকানো। সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞ চোখ খুঁজতে শুরু করেছে, মিলির কী কী পোষাক ওখানে আশেপাশে রয়েছে।
- "কী দরকার আছে বলছিলে? কী হয়েছে বৌদি?" দেবশিশুর মতো নিষ্পাপ মুখে রনি বলে। এতক্ষণ বৌদির মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ও বুঝেছে, প্রথম চালে ওরা এগিয়ে আছে।
ধুরন্ধর পিউ ইতিমধ্যে ছিদ্র পেয়ে গেছে। তাই মধুর হেসে বলে, "বলছি, তোমরা উঠলে কখন? মিলি কি ওয়াশরুমে?"
- "হ্যাঁ। এই তো উঠলাম। ও ভিতরে গেল তক্ষুনি তুমি এলে।" ততক্ষণে রনিও বৌদির মুখের ভাবের বদল আর তার কারণ যে মিলির শাড়ি, সেটা ধরে ফেলেছে। তাই ও আরও মধুর হেসে বলে, "আসলে মুশকিল হয়েছে। মিলির জামাকাপড় সব মায়ের কাছে। কাল চেঞ্জ করে ঘুমোনোর জন্য আমার টিশার্ট দিয়েছিলাম। এখন ওর জামা এনে দিলে, তবে নাকি ঘর থেকে বেরোবে। তাই আমি ওকে আগে যেতে বললাম, এইফাঁকে নিচে থেকে এনে দিচ্ছি।"
পিউ সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে ধপাশ করে বিছানায় বসে পড়ে মনে মনে বলে "হতচ্ছাড়া ছেলে, কিছুতেই বাগে পাচ্ছি না। হবে না? এত বছর আমাদের দুজনকে এতবার পাকড়াও করেছে যে ভাইটার ভালো দরের ট্রেনিং হয়ে গেছে। তার উপর আগের দিন অত বড় কাণ্ড করে ভালোই সাবধান হয়ে গেছে।"
- "বৌদি, এ্যাই বৌদি, কী বিড়বিড় করছ? ঐ আমাকে যেটা বলবে বলে এসেছ?" মধুরতর গলায় জানতে চায় রনি।
- "হ্যাঁ, আসলে ভাবছিলাম, তোমরা তো কাল ও বাড়িতে যাবে। এবার সব নতুন করে একটা শুরু হচ্ছে। সবাইকে এমনিতেই গিফট দিতে হয়, নিয়ম আছে। তার জন্য কেনাকাটা করতে যেতে হবে। তুমি কি ছুটি করে যাবে?"
- "না না, আমি কাল থেকে ছুটি নেব মেইল করে দিয়েছি। আর এখন ছুটি নেব না। তোমরা যাও সবাই। আমি ক্যাব বুক করে দিচ্ছি মাকেও নিয়ে যাও। অনেকদিন বেরোয়নি, ভালো লাগবে।" রনির কথার মাঝখানে মিলি বেরিয়ে এসেছিল। ওকে দেখেই রনি বলল, "মিলিকে বরং সঙ্গে নিয়ে যাও। কার কী পছন্দ, ও বেটার আইডিয়া দিতে পারবে।"
পিউর ওসব কথায় মন নেই, ও ততক্ষণে মুখ টিপে হাসছে মিলিকে দেখে। মিলি অভিমানভরে বলল, "হাসছ কেন? তোমার জন্য তো ! এত হুড়োহুড়ি করলে, আমার জামা আনাই হল না।"
- "ভাগ্যিস আনতে দিইনি, তাই না তোর বর এত যত্ন করল।" পিউ হেসে গড়িয়ে পড়ে।
- "যত্ত বাজে কথা ! এ্যাই তুমি ওর জামাটামা কী লাগবে এনে দাও তো। ওসব নিয়ে এসে বোসো, কথা আছে।" রনি খ্যাক খ্যাক করে ওঠে।
- "কী কথা?" পিউ হাসি থামিয়ে গোল গোল চোখে তাকায়।
রনি উত্তর দেওয়ার আগেই মণিকা ডাকে, "এ্যাই মিলি, তোর একসেট কুর্তা এনেছি, শাড়ি পালটে নে। পরে সব জিনিস এ ঘরে নিয়ে আসিস। আর কিছু লাগলে আমাকে বলবি, কিনে নিলেই হবে।"
মণিকাকে দেখে মিলি আবার ওয়াশরুমে লুকোনোর তাল খুঁজছিল। তার আগেই মণিকা ওর জামাকাপড় হাতে ধরিয়ে দিল।
রনি মাকে বলল, "তুমি আবার এসব আনতে গেলে কেন? যাকগে এসেছ যখন, বোসো, কথা আছে। বৌদি বলছে মিলিদের বাড়ির জন্য গিফট কিনতে হবে। আমার সময় হবে না, তোমরা তিনজন যাও। দাদা পারলে ভালো। আর আমার এই কার্ডটা রাখো। বৌদি পিনটা জানে। যা ঠিক মনে হয় কিনে নাও। দুপুরে বাইরে খেয়ে নিও তোমরা।"
মণিকা কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ছোঁ মেরে কার্ডটা নিয়ে পিউ হাসতে হাসতে বলে, "যাক বাবা, শেষ একবার আমরা কার্ডটা পেয়েছি। কাল থেকে ওর শালা শালীরাই পাবে খালি।"
- "পিউ, এসব কথা একদম বলবি না। এগুলো থেকেই ভুল বোঝাবুঝি হয়। ওদের আবদার থাকতেই পারে। আর সবাই ছোট। ওরা রনির কাছে আবদার করবে না?" মণিকা অপছন্দ জানায়।
- "না মামনি, আমি ঠাট্টা করছি না। কাল থেকে ভাইয়ের উচিত, ওদের সবাইকে একটা ভালো ট্রীট দেওয়া। বিয়ের সময় ও বেচারারা একটুও আনন্দ করতে পারেনি। আর মিলি শোন, এই কার্ডটা রাখ। আজকের সব কেনাকাটা মামনি করবে বলেছে। তুই শুধু বলবি কে কোন রঙ ডিজাইন পছন্দ করে। কিছুটা আমিও জানি। তবে প্রথমবার বাড়ির সবার জন্য গিফট কিনছিস, সব তোর পছন্দে হবে। আর কেনাকাটার পর তুই আমাদের খাওয়াবি, ভাইয়ের কার্ড দিয়ে।"
মিলির হাতে কার্ডটা দিতে গেলে ও হাত সরিয়ে বলল, "এটা আমাকে দিচ্ছ কেন? তুমি রাখো।"
- "না, পিউ ঠিক করেছে। রনি, এখন থেকে কেনাকাটা করতে দিলে, ওর হাতেই কার্ড দিবি।" মণিকা মিলির পিঠে হাত রাখে, "এটা নে, পিনটা পিউর থেকে মুখস্থ করে নে। তবে আজ তোদের দুজনকে খাওয়াবোও আমি। আর মিলি, তোর নিজস্ব কিছু কিনতে হলেও আমাকে বলবি, এটা থেকে কিনবি না আজ।"
প্রায় সারাদিন ঘুরে, কেনাকাটা খাওয়া দাওয়া করে, মাঝে মাঝে ফোনে, ভিডিও কলে দুই ছেলেকে জামাকাপড় দেখিয়ে পছন্দ করে, সবার জন্য বাজার করে সন্ধেবেলায় ফিরে আসে মণিকারা।
সে সময় যুগলের ফোনে একটা মেসেজ ঢোকে। সেটা দেখে নিয়ে যুগল বলে, "লিলি, ছুটির পর চলো, তোমার বাড়ির সবার জন্য কী কী পছন্দ, কিনে নেবে। আর তোমারও কোনো ভালো শাড়ি নেই দুটো দামী শাড়ি, ড্রেস কিনে নেবে।"
- "মানে?" লিলি আকাশ থেকে পড়ে, "এখন আমি শাড়ি কিনব, তাও দামী?"
- "হ্যাঁ, মিলিও আসবে। তুমি কি এইসব অফিসের কুর্তা টি শার্ট পরে যাবে কাল? পঁচাশ হাজার বাজেট আছে, সবার জন্য কিনবে।"
লিলি ভির্মি যাওয়া আটকায়, "পঞ্চাশ হাজার টাকা ! কোথায় পেলে? চুপ করে থাকলে হবে না। বলো বলো, স্পীক আউট যুগল, এত টাকা কোথায় পেলে?"
চলবে