ঝরাপাতা
পর্ব - ৭২
🌹💞🌹💞🌹💞🌹
বাবা গো শুনেই রনি বুঝেছে, এটা চোর না, মিলি। কিন্তু তখন আর সময় নেই। বুকের উপর হঠাৎ মিলি আছড়ে পড়ায় ও ছিটকে পড়েছে পিছনে। হুড়মুড় করে মিলি পড়েছে ওর উপর। পড়বি তো পড়, মিলির ঠোঁট ওর ঠোঁট ছুঁয়ে গেছে। কেঁপে উঠেছে দুজনেই। সব অভিমানের পাঁচিল গলে গলে পড়ছে।
মিলি চুপিচুপি নামছিল চোরটাকে ধরবে বলে। দুটো ধাপ বাকি থাকতে হঠাৎ একলাফে রনি সামনে এসে পড়তে মারাত্মক চমকে গিয়ে পড়েছে ওর উপর। পড়ে গিয়ে রনির মনে হল, ওর কোমরটাই ভেঙে গেছে। ব্যথা পেয়ে রনি ওমাগো বলে উঠতেই মিলিও বুঝেছে, কার সামনে পড়েছে। ততক্ষণে সোজা রনির বুকে।
জল ভরার জন্য নিচের আলো জ্বেলেছিল রনি। সেই আলোতে দুজন দুজনকে ভালো করে দেখতে পাচ্ছে। দুজনেই হতবাক, কথা বলার ক্ষমতাই নেই।
কতক্ষণ পরে রনি চোখ বুজে নিজেকে সামলে নেয়। মিলি কি ঝামেলা করবে, কি না কি বলবে আবার, কে জানে?
তার আগেই চোখ খুলে ও ফিসফিস করে বলে, "তুমি কোথায় যাচ্ছিলে?"
চোরের পিছু নিলেও মিলির একটু একটু ভয় ভয়ও করছিল। তার মধ্যে এভাবে চমকে গেছে। এখন রনির গলা শুনে কিছুটা সাহস পায়। আরও ফিসফিস করে বলে, "চোর, একটা চোর ঢুকেছে বাড়িতে।"
মিলি তো চোর দেখেনি, শুধু আওয়াজ পেয়েছিল। তাই এখনও ভাবছে, চোর ঘরে লুকিয়ে আছে। রনি স্টোল মুড়ি দেওয়া মিলিকে দেখেছে। তাই এখন বুঝেছে, ও আসলে মিলির পিছু নিয়েছিল।
দুহাত তুলে মিলির বাহু মুঠোয় ধরে রনি ব্যঙ্গ করে, "চোর ! চোর তো তুমি নিজে !"
- "কি বললে? আমি চোর? তোমাদের বাড়িতে এসেছি বলে ! ছি ছি ছি !" ধড়মড় করে মিলি রনির উপর থেকে ওঠে। ওঠার সময় আবার ওর বুকের উপর হাত চেপে ভর দিয়ে উঠেছে। রনির এবার মনে হয় কোমরের সঙ্গে সঙ্গে বুক আর পিঠও ভেঙে গেল।
ককিয়ে ওঠার আগেই মিলির ফায়ারিং শোনে, "কিছু শখে পড়ে তোমাদের বাড়িতে আসিনি বুঝলে? কাকিমা অসুস্থ তাই। এইজন্যই বলে, পরের উপকার করতে নেই। ওদের বাড়িতে চোর ঢুকেছে দেখে ভয়ে ভয়ে তখন থেকে চোরটাকে খুঁজছি, আর আমাকে বলে কিনা চোর !"
রনির টনক নড়েছে, মিলি আবার ভুল ভেবেছে ওর কথায়। তাড়াতাড়ি থামানোর জন্য উঠে বসতে যায়, সারা শরীরে ব্যথা। বাবাগো বলে আবার শুয়ে পড়ে।
মিলিও একটু ঘাবড়ে যায় ওর মুখ দেখে। মনে মনে ভাবে, আবার মেঝেতে শুয়ে পড়ল কেন ঝগড়ুটেটা? ভয়ে ভয়ে বলে, "কি হল?"
- "কি হল মানে? আমাকে মেরে ফেলেছ। ওরকম সিঁড়ির উপর থেকে কেউ পড়ে? কোমরটা গেছে। এ জীবনে আর উঠতে পারব কিনা কে জানে ! তার উপর চেঁচাচ্ছেন মহারাণী ! উনি পরের উপকার করছেন ! আমি ওর পর ! মায়ের ঘুম ভেঙে যাবে খেয়াল আছে?" রনি খিঁচিয়ে উঠতে গিয়ে কোঁকাতে থাকে।
মিলি ঘাবড়ে গিয়ে ওর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে, "ব্যথা লেগেছে? আমি সত্যিই চোর দেখে..... ওঠো, এভাবে শুয়ে থাকলে ঠান্ডা লাগবে। আমি হাত ধরছি।"
কোনোমতে মিলির হাত আঁকড়ে ধরে রনি উঠে বসে। ব্যথায় মুখ ব্যাঁকাচ্ছে সমানে, পিঠ সোজা করতে পারছে না।
- "কিন্তু সত্যি চোর ঢুকেছে।" মিলি ওর হাত ধরে রেখেই কানে কানে ফিসফিস করে বলে।
- "চোরকে দেখেছ?" রনি কটমট করে তাকায়।
- "না দেখিনি। আমি টুকাইয়ের সাইকেলটা সিঁড়ির পাশে রেখেছিলাম। ওটা এখন উলটোদিকে পড়ে আছে। আর ঠ্যাং ঠ্যাং করে আওয়াজ হয়েছিল। চোরটা বোধহয় সাইকেলে ধাক্কা খেয়েছে। ঐ আওয়াজেই আমি চোর খুঁজতে এসেছি।" যথাসম্ভব চাপা গলায় বলে মিলি।
- "তবে রে ! সাইকেলটাও তুমিই ওখানে রেখেছ?" রনি দাঁত কিড়মিড় করে।
- "হ্যাঁ, আমি সরিয়ে রেখেছিলাম। এখন দেখছি....... "
- "কচু দেখছ। আমাকে মেরে ফেলার হাল করেছে ! সাইকেল নাকি সরিয়ে রেখেছে ! আমি ধাক্কা খেয়েছি ওতে। বুঝেছ? চোর না, ওটা আমি ছিলাম। উফ, নখটা বোধহয় উড়ে গেছে।"
- "তুমি !!" মিলির চোখ গোল গোল হয়ে গেছে।
- "হ্যাঁ, আমি। টুকাইয়ের সাইকেলটা এমন বেজায়গায় রেখেছ, বুড়ো আঙ্গুলটায় কি জোর লাগলো। তাতেও শান্তি হয়নি। আমাকেই চোর ভেবে ফেলে দিয়ে কোমরটা ভেঙে দিলে।" রনি গজগজ করে।
মিলির আপশোষের শেষ নেই, "ইসস, খুব ভুল হয়ে গেছে। তুমিও এমন হঠাৎ সামনে চলে এলে ! আমি ভাবলাম চোরটা আমাকে দেখে নিয়েছে। তুমিই বা এত তড়বড় করে কোথায় যাচ্ছিলে?"
মিলির মিষ্টি কথায় রনির আর খেয়াল থাকে না যে সাক্ষাৎ শত্রুপক্ষের সামনে রয়েছে ও। তাই ওরও মুখ খুলে যায়, মিলির গা থেকে অর্ধেক খুলে মেঝেতে লোটানো স্টোলটা তুলে ধরে বলে, "এই সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে ঝাঁসীর রাণী হতে যাচ্ছিলে, আমি দেখে ভাবলাম, তুমি চোর।"
- "বাহ আমি এখন চোর হয়ে গেলাম !" মিলির গলায় অভিমান।
রনি খিঁচুনি দেয়, "চোর তাও ভালো। ভূত ভাবিনি তোমাকে, সেটাই যথেষ্ট। মাঝরাতে এরকম সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে কেউ ঘোরে? কি লেগেছে, বাপ রে বাপ।"
মিলি নিজের মনে দৃশ্যটা ভেবে প্রথমে মজা পায়। মুখ টিপে হাসছিল, আবার রনির ব্যথার কথা শুনে মুখটা ছোট্ট হয়ে যায়। রনির একটা হাত ধরে বলে, "চলো, ওঠো, উঠে দাঁড়াও। ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নেবে।"
অনেক কষ্টে রনি উঠে দাঁড়ায়। ব্যথাটা ক্রমশঃ বাড়ছে বুঝতে পারে। এখন ঘরে গিয়ে শুতে পারলে সত্যিই ভালো লাগবে। একহাত মিলি ধরে আছে, অন্য হাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে পা তোলে প্রথম ধাপে। ব্যথায় ককিয়ে উঠে মিলির হাতটা আরও জোরে চেপে ধরে।
- "কি হল পারবে না? আচ্ছা চলো, আমি ধরছি, দেখি।" মিলি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
রনিও আস্তে আস্তে ওর হাতটা ধরে সামলে নিয়েছে। মিলি ততক্ষণে ওর হাত থেকে ডানহাত ছাড়িয়ে নিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরেছে। বাঁ হাতে চেপে ধরেছে ওর বাহুমূল। খুব ধীরে ধীরে পা ফেলে দুজন উপরে উঠে আসে। খেয়াল করে না, সাঁ করে একজন লুকিয়ে পড়ে ওদের দোতলায় উঠতে দেখে।
রনিকে এনে দু কাঁধ ধরে ওর ঘরে খাটে বসায় মিলি। ওকে বলে, "একেবারে শুয়ে পড়ো।"
- "দাঁড়াও, একটু জল খাব।" এদিক ওদিক তাকিয়েই রনির মনে পড়ে, জলের বোতলটা নিচে টেবিলে রয়ে গেছে।
হতাশ মুখে তাকাতেই মিলি বলে, "কোথায় জল?"
- "আরে জল নিতেই তো গেছিলাম। তারপর তোমাকে ধরার জন্য.....নিচের টেবিলে রয়ে গেছে।" কাচুমাচু মুখে রনি বলে।
- "ঠিক আছে, আমি নিয়ে আসছি। তুমি এখানে হেলান দিয়ে বোসো।" একটা বালিশ টেনে দেয় ওর পিঠের দিকে।
প্রজাপতির মতো উড়ে নিচে গিয়ে জল নিয়ে আসে। রনির হাতে দিয়ে বলে, "নাও, খেয়ে নাও। তারপর শুয়ে পোড়ো, আমি আসছি।"
- "দাঁড়াও দাঁড়াও, ওপাশে ড্রয়ারে একটা ব্যথা কমার স্প্রে আছে, একটু দাও না।" ব্যথাও করছে, তার সঙ্গে সঙ্গে রনির আসল উদ্দেশ্য যতক্ষণ পারে মিলিকে আটকে রাখা।
তবে মিলিও ওর চোট লেগেছে দেখে সেবা শুশ্রূষা করতে তৎপর। চটপট স্প্রে খুঁজে এনে রনির সামনে দাঁড়ায়, "জামা খোলো।"
- "মানে?" রনি আকাশ থেকে পড়ে।
- "এটা লাগাব, জামা খুলতে হবে না?"
রনি চেষ্টা করে টি শার্টটা তোলার। হাত পিছনদিকে ঘোরাতেই পারছে না। অসহায় মুখ দেখে মিলি একটু ঘুরে ওর পিছনে যায়, টি শার্ট, গেঞ্জি তুলে, স্প্রে করে দেয়। পিছন থেকে ওর ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে গা শিরশির করে মিলির। রনির কাঁধের উপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নেয়। মনে মনে ভাবে, এই ঘরে আর থাকা যাবে না।
আর সময় নেই, এবার মিলি চলে যাবে, রনি খপ করে হাতটা ধরে ফেলে, নিজের বুকের কাছে দুহাতে চেপে ধরে বলে, "আই এ্যাম সরি। আই লাভ ইউ মিলি।"
মিলি মাথা নিচু করে বলে, "লাভ ইউ টু। আর ভুলটা আমার হয়েছে। আমি সরি।"
চলবে