Where It's Just You in Bengali Love Stories by MOU DUTTA books and stories PDF | যেখানে শুধু তুমি - পর্ব 9

Featured Books
Categories
Share

যেখানে শুধু তুমি - পর্ব 9

পর্ব ৯: যে রাত সব বদলে দিয়েছিল
রায় ভিলার ড্রইংরুমে এমন নীরবতা নেমে এলো, যেন ঘড়ির কাঁটার শব্দও স্পষ্ট শোনা যায়।
বাইরে আবার হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
জানালার কাঁচ বেয়ে ফোঁটাগুলো ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
আরোহী এখনও বাবার দিকে তাকিয়ে।
তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে।
"সেই রাতে কী হয়েছিল?"
সে ধীরে ধীরে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
— "বাবা... তুমি সত্যিটা জানো?"
লোকটি গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন।
ভেজা শালটা খুলে চেয়ারে রাখলেন।
তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— "জানি... কিন্তু পুরোটা নয়।"
অর্ণব বিস্মিত।
— "মানে?"
— "আমি যা দেখেছিলাম, তা অসম্পূর্ণ। আর যা শুনেছিলাম, তার অর্ধেক ছিল মিথ্যে।"
মেঘলা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে ভয় নেই।
বরং এক ধরনের ক্লান্তি।
সৌমেন কাকু চুপচাপ চা এনে টেবিলে রাখলেন।
কেউ কাপ ছুঁল না।
আরোহীর বাবা পকেট থেকে একটা পুরোনো মানিব্যাগ বের করলেন।
মানিব্যাগের ভেতর থেকে সাবধানে একটা ভাঁজ করা ছবি বের করলেন।
— "এটা দেখো।"
আরোহী ছবিটা হাতে নিল।
ছবিতে—
রায় ভিলার বাগান।
ছোট্ট আরোহী।
ছোট্ট মেঘলা।
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক।
সাদা পাঞ্জাবি।
চোখে চশমা।
মুখে উজ্জ্বল হাসি।
ছবির পেছনে লেখা—
"বন্ধুত্বের কোনো ধর্ম নেই, কোনো পরিচয় নেই। শুধু বিশ্বাস আছে।"
নিচে একটি সই।
রুদ্র সেন।
আরোহী বিস্ময়ে বাবার দিকে তাকাল।
— "এ-ই কি রুদ্র সেন?"
বাবা ধীরে মাথা নাড়লেন।
— "হ্যাঁ।"
— "কিন্তু সবাই তো ওঁকে ভয় পায়!"
বাবা তিক্ত হেসে বললেন,
— "কারণ মানুষ গল্পের শেষটা শুনেছে... শুরুটা নয়।"
ঘরের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল।
মেঘলা আস্তে বলল,
— "তাহলে... রুদ্র আঙ্কেল খারাপ মানুষ ছিলেন না?"
আরোহীর বাবা জানালার বাইরে তাকালেন।
বৃষ্টির দিকে।
— "আমি যতদিন চিনেছি... উনি কাউকে কষ্ট দিতে চাননি।"
— "তাহলে গুলি?"
— "সেই প্রশ্নের উত্তরই আমি এত বছর ধরে খুঁজছি।"
ঠিক তখনই...
টিক...
টিক...
টিক...
ড্রইংরুমের পুরোনো ঘড়িটা আবার নিজে থেকেই চলতে শুরু করল।
অর্ণব বিরক্ত হয়ে বলল,
— "এই ঘড়িটা আবার!"
কিন্তু আরোহীর বাবা আচমকা উঠে দাঁড়ালেন।
তার মুখের রং ফ্যাকাশে।
— "না..."
— "কী হলো?"
তিনি ধীরে ধীরে ঘড়িটার দিকে এগিয়ে গেলেন।
ঘড়ির পেছনের কাঠের বাক্সে হাত বুলিয়ে খুব আস্তে চাপ দিলেন।
ক্লিক।
একটা ছোট্ট গোপন খোপ খুলে গেল।
ভেতরে একটি অডিও ক্যাসেট।
কালো রঙের।
তার ওপরে সাদা কালি দিয়ে লেখা—
"২৭ জুলাই, ২০০৯ – শেষ সাক্ষাৎ"
ঘরের সবাই স্তব্ধ।
আরোহীর বাবা ক্যাসেটটা হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন—
"আমি ভেবেছিলাম এটা বহু বছর আগেই নষ্ট হয়ে গেছে..."
ঠিক তখনই...
বাইরে প্রধান দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ।
ঠক... ঠক... ঠক...
কিন্তু এবার কেউ কলিং বেল বাজাল না।
শুধু একটি ভারী পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল—
"ক্যাসেটটা চালাবেন না। ওটা চালালে সত্যিটা শুধু আপনাদের নয়... আরও অনেকের জীবন বদলে দেবে।"
চারজন একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।
আরোহীর বাবা খুব ধীরে বললেন—
"এই কণ্ঠস্বর... আমি ভুলতে পারিনি।"
ঠক... ঠক... ঠক...
দরজায় আবার কড়া নাড়া হলো।
কেউ নড়ল না।
ড্রইংরুমের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছে।
আরোহীর বাবা ক্যাসেটটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
অর্ণব ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
— "কে?"
বাইর থেকে শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল।
— "আমার নাম জানার দরকার নেই। দরজাটা খুলুন।"
— "কেন?"
— "কারণ ক্যাসেটটা যদি এখন চালানো হয়, তাহলে যাদের বাঁচানোর জন্য এত বছর সত্যিটা লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে।"
মেঘলা এবার আর চুপ থাকতে পারল না।
সে এগিয়ে এসে বলল,
— "কিসের সত্যি?"
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর লোকটা বলল,
— "যে রাতে গুলির শব্দ শুনেছিলে... সেদিন কেউ খুন হয়নি।"
ঘরের সবাই একসঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গেল।
আরোহী অবিশ্বাসের স্বরে বলল,
— "কিন্তু... সবাই তো বলে একজন মারা গিয়েছিল!"
লোকটা উত্তর দিল,
— "মানুষ যা দেখে, সবসময় তা-ই সত্যি হয় না।"
অর্ণব দরজা খুলে দিল।
বাইরে প্রায় পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন বছরের একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
ভেজা রেইনকোট।
চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা।
হাতে একটি পুরোনো ফাইল।
লোকটি ভেতরে ঢুকে সবার দিকে তাকাল।
তার চোখ কয়েক সেকেন্ড মেঘলার ওপর স্থির রইল।
তারপর সে আস্তে বলল,
— "তুমি বড় হয়ে গেছ, মেঘলা।"
মেঘলা বিস্মিত।
— "আপনি আমাকে চেনেন?"
লোকটি মৃদু হাসল।
— "তুমি হয়তো আমাকে মনে রাখোনি। কিন্তু আমি তোমাকে শেষ দেখেছিলাম... যখন তোমার বয়স নয় বছর।"
আরোহী প্রশ্ন করল,
— "আপনি কে?"
লোকটি নিজের পরিচয় দিল।
— "আমার নাম অমিতাভ চক্রবর্তী। আমি তখন এই কেসের তদন্তকারী অফিসার ছিলাম।"
অর্ণব চমকে উঠল।
— "পুলিশ?"
— "হ্যাঁ। অবসর নেওয়ার আগে এই একটা মামলাই আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি।"
অমিতাভ টেবিলের ওপর ফাইলটা রাখলেন।
ধীরে ধীরে খুললেন।
ভেতরে পুরোনো কাগজ, ছবি আর নোট।
তিনি একটি ছবি বের করে আরোহীর দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
— "এটা দেখো।"
ছবিটা দেখে আরোহী থমকে গেল।
এটা সেই বাগান।
কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দুটি ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু এবার ছবির এক কোণে আরও একজন আছে।
একটি ছেলে।
বয়স বারো-তেরো।
তার মুখটা আধাআধি দেখা যাচ্ছে।
মেঘলা ছবিটা হাতে নিয়েই ফিসফিস করে বলল,
— "ঋত্বিক..."
অর্ণব হতবাক।
— "তুই ওর নাম মনে করতে পারলি?"
মেঘলা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
— "আজ হঠাৎ মনে পড়ল..."
আরোহী বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল,
— "ঋত্বিক কে?"
অমিতাভ গভীর গলায় বললেন,
— "ঋত্বিক ছিল সেই রাতের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী।"
— "এখন সে কোথায়?"
অমিতাভ চোখ নামিয়ে বললেন,
— "আমরা জানি না।"
ঘরে আবার নীরবতা।
তিনি আবার বললেন,
— "ঘটনার পরদিন থেকেই সে নিখোঁজ।"
আরোহীর শরীর শিউরে উঠল।
একজন শিশু...
এত বছর ধরে নিখোঁজ?
ঠিক তখনই...
মেঘলার হাতে ধরা ছবিটার পেছন থেকে একটা ছোট্ট কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
অর্ণব সেটা তুলে নিল।
তাতে কাঁপা হাতে লেখা—
"যদি আমি ফিরে না আসি... তাহলে কৃষ্ণচূড়া গাছের শিকড়ের নিচে খুঁজো।"
নিচে শুধু একটি নাম—
ঋত্বিক।
চারজন একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকাল।
বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
আর রায় ভিলার বাগানের ঠিক মাঝখানে...
কৃষ্ণচূড়া গাছটা বাতাসে ধীরে ধীরে দুলছে।
বাইরে বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে।
জানালার কাঁচে টুপটাপ শব্দ পড়ছে।
ড্রইংরুমে বসে থাকা সবাই যেন একই প্রশ্নে আটকে গেছে—
ঋত্বিক কে?
আর কেন সে লিখেছিল, "কৃষ্ণচূড়া গাছের শিকড়ের নিচে খুঁজো"?
অমিতাভ চক্রবর্তী চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।
অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— "আমি এত বছর এই মামলার পেছনে ছুটেছি। অনেক সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি, অনেক নথি পড়েছি। কিন্তু একটা বিষয় কখনও মেলাতে পারিনি।"
আরোহী এগিয়ে এল।
— "কী বিষয়?"
— "সেদিন রাতের পর দু'জন মানুষের স্মৃতি বদলে গিয়েছিল।"
ঘরে নিস্তব্ধতা।
অর্ণব ধীরে বলল,
— "দু'জন?"
— "হ্যাঁ।"
তিনি আরোহীর দিকে তাকালেন।
— "একজন তুমি।"
তারপর মেঘলার দিকে।
— "আর একজন... মেঘলা।"
মেঘলা অবাক হয়ে বসে পড়ল।
— "আমারও?"
অমিতাভ মাথা নাড়লেন।
— "ডাক্তারদের ভাষায় এটা ছিল ট্রমার ফল। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, তোমরা দু'জন ইচ্ছে করেই নিজের ভেতর কিছু স্মৃতি আটকে রেখেছিলে।"
আরোহীর মনে পড়ল সেই অস্পষ্ট দৃশ্যগুলো—
বৃষ্টি...
দৌড়...
একটা চিৎকার...
তারপর অন্ধকার।
সে ফিসফিস করে বলল,
— "আমার শুধু মনে হয়... আমি কাউকে হারিয়েছিলাম।"
মেঘলা তাকাল তার দিকে।
তার চোখে জল।
— "আমারও তাই মনে হয়..."
ঠিক তখনই আরোহীর বাবা উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি ধীরে ধীরে জানালার পাশে গিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে তাকালেন।
অনেকক্ষণ পরে বললেন,
— "আর লুকিয়ে লাভ নেই।"
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
তিনি ফিরে দাঁড়ালেন।
গলাটা ভারী।
— "ঋত্বিক শুধু একজন সাক্ষী ছিল না।"
আরোহী কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
— "তাহলে?"
তিনি ধীরে ধীরে বললেন—
"ঋত্বিক ছিল আমার ছোট ভাই।"
ঘরে যেন সময় থেমে গেল।
অর্ণব বিস্ময়ে বলল,
— "মানে... উনি আরোহীর কাকা?"
— "হ্যাঁ।"
আরোহী হতবাক।
সে কোনোদিন এই নাম শোনেনি।
— "কিন্তু... বাবা, তুমি তো কখনও ওঁর কথা বলোনি!"
তিনি চোখ নামিয়ে বললেন,
— "কারণ ঘটনার পরদিন থেকেই ঋত্বিক নিখোঁজ হয়ে যায়।"
মেঘলা আস্তে বলল,
— "আর সবাই ধরে নেয়..."
— "সে আর বেঁচে নেই।"
ঠিক তখনই বাইরে বজ্রপাত হলো।
কড়ররাম!
আলো একবার নিভে আবার জ্বলে উঠল।
সেই আলোয় জানালার বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে যেন একটা ছায়া নড়ে উঠল।
আরোহী প্রথম দেখতে পেল।
সে জানালার দিকে আঙুল তুলে বলল—
— "ওখানে... কেউ দাঁড়িয়ে আছে!"
সবাই ছুটে জানালার কাছে গেল।
কিন্তু পরের ঝলকানিতে...
সেখানে কেউ নেই।
শুধু ভেজা মাটি।
আর কৃষ্ণচূড়ার গোড়ায় অর্ধেকটা বেরিয়ে থাকা একটা লোহার বাক্সের কোণা।
অর্ণব বিস্ময়ে বলল,
— "এটা তো আগে ছিল না!"
অমিতাভ আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না।
— "চলো।"
চারজন টর্চ নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাগানে।
বৃষ্টি ততক্ষণে ঝুমিয়ে নেমেছে।
কাদা মাড়িয়ে তারা কৃষ্ণচূড়া গাছের কাছে পৌঁছাল।
সৌমেন কাকু একটা কোদাল এনে দিলেন।
অর্ণব আর আরোহীর বাবা মাটি খুঁড়তে শুরু করলেন।
পাঁচ মিনিট...
দশ মিনিট...
তারপর—
ঠং!
কোদাল শক্ত কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেল।
মাটি সরাতেই বেরিয়ে এল একটা পুরোনো লোহার ট্রাঙ্ক।
তালাটা মরচে পড়ে গেছে।
অর্ণব হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতেই তালা ভেঙে গেল।
সবাই নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে।
ধীরে ধীরে ঢাকনাটা উঠল।
ভেতরে...
একটা নীল স্কুলব্যাগ।
কয়েকটা পুরোনো খাতা।
একটা ক্যাসেট।
আর ওপরে ভাঁজ করা একটা চিঠি।
চিঠির ওপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
"যদি এই বাক্স কেউ খুঁজে পায়... বুঝবে আমি আর ফিরতে পারিনি।
— ঋত্বিক"
ঠিক সেই মুহূর্তে দূরে কোথাও পুলিশের সাইরেনের শব্দ ভেসে এল।
আর রায় ভিলার প্রধান গেটের সামনে একের পর এক তিনটি কালো গাড়ি এসে থামল।
চলবে...