Rater sesh train in Bengali Horror Stories by Mohan Manna books and stories PDF | রাতের শেষ ট্রেন

Featured Books
Categories
Share

রাতের শেষ ট্রেন

তখন রাত্রি ১১টা ৪৫। গোপাল যখন বালিচক স্টেশনে পৌঁছাল, প্ল্যাটফর্ম প্রায় সম্পূর্ণ ফাঁকা। চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা যেন বহুক্ষণ কোনো মানুষের পায়ের শব্দ শোনা যায়নি। শুধু স্টেশনের বাইরে কোথাও কয়েকটা কুকুর একটানা ডেকে চলেছিল। গোপাল উদ্বিগ্ন হয়ে চারদিকে তাকাল।এই সময়ে আর কোনো ট্রেন থাকার কথা নয়। কিন্তু ওকে আজ রাতেই কলকাতা পৌঁছাতেই হবে। বাবা হাসপাতালে ভর্তি। ভোরের আগেই অপারেশন।সে না পৌঁছাতে পারলে অপারেশনটা হয়তো আর হবে না। এইসব ভাবতে ভাবতেই প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে পড়ল সে। হঠাৎ দূরে রেললাইনের ওপাশ থেকে একটা আলো দেখা গেল।গোপাল উঠে দাঁড়াল।ধীরে ধীরে একটা ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে।কাছে আসতেই সে দেখতে পেল- “মেদিনীপুর-হাওড়া লোকাল”গোপাল ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আজকের শেষ ট্রেন তো অনেক আগেই চলে যাওয়ার কথা। তবে কি কোনো কারণে দেরি করেছে? অবশ্য এই লাইনে ট্রেন লেট করা নতুন কিছু নয়। ট্রেনটা ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে এসে থামল। দরজাগুলো খোলা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে কোনো শব্দ নেই। না যাত্রীদের কথা, না হকারদের চিৎকার।গোপাল দ্রুত উঠে পড়ল ট্রেনে। আর তারপরই তার বুকের ভিতরটা হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।পুরো কামরা প্রায় ফাঁকা। শুধু এক কোণে বসে আছে একটি মেয়ে।সাদা কাপড় পরা।লম্বা চুল মুখের উপর ঝুলে আছে।মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে না।আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—ট্রেনে ওঠার পর থেকে মেয়েটি একবারও নড়েনি। গোপালের বুকের ভিতরটা ধকধক করতে লাগল। ও ঠিক করল পরের কামরায় চলে যাবে। তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগোতেই বুঝতে পারল অনেক দেরি হয়ে গেছে। ট্রেন তখন ভয়ংকর গতিতে ছুটছে। এখন নামার চেষ্টা মানে নিশ্চিত মৃত্যু। অগত্যা ওকে এই কামরাতেই থাকতে হবে… অন্তত পরের স্টেশন পর্যন্ত। গোপাল ভয়ে ভয়ে জানলার পাশের একটা সিটে গিয়ে বসল। ওর কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। কামরার ভিতরটা অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। দেয়ালগুলো স্যাঁতস্যাঁতে। আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে একটা পচা, কাঁচা গন্ধ। গোপাল নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। পকেট থেকে ফোন বের করে ফেসবুক খুলতে গেল। ভাবল, ফোনে মন দিলেই হয়তো ভয়টা একটু কমবে। কিন্তু স্ক্রিন অন করতেই ওর বুকটা আবার কেঁপে উঠল। No Network একটাও সিগন্যাল নেই। গোপাল বিরক্ত হয়ে ফোনটা নামিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই— খচমচ… খচমচ… কিছু একটা চিবিয়ে খাওয়ার শব্দ। শব্দটা খুব কাছে থেকে আসছে। গোপালের গলা শুকিয়ে গেল। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে সে কোণের সিটটার দিকে তাকাল। আর তারপর… ওর শরীরের রক্ত যেন মুহূর্তে বরফ হয়ে গেল। সাদা কাপড় পরা মেয়েটা মাথা নিচু করে কিছু একটা খাচ্ছে। না… “কিছু একটা” নয়। ওটা একটা মানুষের হাত। কনুই থেকে কাটা। যেভাবে মানুষ মুরগির লেগপিস খায়, ঠিক সেভাবেই মেয়েটা হাতটার মাংস দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। টুপ… টুপ… কালচে লাল রক্ত মেয়েটার ঠোঁট বেয়ে সিটের উপর পড়ছে। আর সেই মুহূর্তে প্রথমবারের মতো মেয়েটা ধীরে ধীরে মুখ তুলল। গোপালের নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে গেল। মেয়েটার মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। দুটো চোখ সম্পূর্ণ কালো… যেন চোখের জায়গায় গভীর অন্ধকার। ঠোঁটের চারপাশে জমে আছে তাজা রক্ত। মেয়েটা কিছুক্ষণ স্থিরভাবে গোপালের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কর্কশ গলায় বলল— “অনেকদিন পর কেউ এই ট্রেনে উঠল…”গোপালের গলা শুকিয়ে কাঠ। ও সিট থেকে উঠতে গিয়েও উঠতে পারল না। মনে হচ্ছিল শরীরটা যেন অবশ হয়ে গেছে। ট্রেনটা তখনও অস্বাভাবিক গতিতে ছুটে চলেছে। কিন্তু বাইরের দৃশ্য দেখে গোপালের বুক কেঁপে উঠল। জানলার বাইরে কোনো স্টেশন নেই। কোনো আলো নেই।শুধু ঘন কালো অন্ধকার। হঠাৎ পুরো কামরার লাইট কয়েকবার টিমটিম করে নিভে গেল। দুই সেকেন্ড পর লাইট আবার জ্বলে উঠতেই গোপাল দেখল— মেয়েটা আর আগের জায়গায় নেই। সিটটা ফাঁকা। গোপালের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। ঠিক তখনই ওর কানের কাছে ঠাণ্ডা একটা নিঃশ্বাস অনুভব করল। আর পেছন থেকে ভেসে এল ফিসফিসে গলা— “তুমি কি জানো… এই ট্রেন কখনো হাওড়ায় পৌঁছায় না?” গোপালের পুরো শরীর কাঁপতে লাগল। ও ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকাল। মেয়েটা ঠিক ওর পেছনে দাঁড়িয়ে। তার কালো চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যে অদ্ভুতভাবে জ্বলছে। গোপাল চিৎকার করে পিছিয়ে গেল। “কে… কে তুমি?” মেয়েটা ঠাণ্ডা গলায় বলল— “এই ট্রেনের সব যাত্রী মৃত।” গোপালের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। “মিথ্যে! এটা সম্ভব না!” মেয়েটা ধীরে ধীরে নিজের রক্তমাখা হাতটা তুলল তারপর জানলার দিকে ইশারা করল। গোপাল কাঁপতে কাঁপতে বাইরে তাকাল। আর যা দেখল, তা দেখে ওর নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। রেললাইনের পাশে একটা ভাঙা ট্রেন পড়ে আছে পুরো ট্রেনটা পুড়ে কালো হয়ে গেছে। চারদিকে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স আর আগুনের পোড়া দাগ। একটা উল্টে যাওয়া বগির গায়ে লেখা— “মেদিনীপুর-হাওড়া লোকাল” গোপালের মাথা ঘুরে উঠল। এটা তো সেই ট্রেন… যেটায় সে এখন বসে আছে। মেয়েটা ধীরে ধীরে বলল—“পাঁচ বছর আগে এই ট্রেনটা দুর্ঘটনায় পড়ে। কেউ বাঁচেনি।” গোপালের গলা কাঁপতে লাগল। “তা… তাহলে আমি এখানে কীভাবে?” মেয়েটার ঠোঁটে ধীরে ধীরে একটা ভয়ংকর হাসি ফুটে উঠল। তারপর সে বলল— “কারণ তুমিও আর জীবিত নও।” ঠিক সেই মুহূর্তে গোপালের মাথায় বিদ্যুতের মতো একটা স্মৃতি ফিরে এল। বালিচক স্টেশনে আসার আগে রাস্তা পার হওয়ার সময় একটা দ্রুতগামী ট্রাকের তীব্র আলো চোখে পড়েছিল তারপর আর কিছু মনে নেই। গোপালের চোখ ধীরে ধীরে বিস্ফারিত হয়ে গেল। ও কাঁপতে কাঁপতে নিজের হাতের দিকে তাকাল। হাতটা ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। আর অন্ধকারের মধ্যে শুধু শোনা গেল অসংখ্য মৃত মানুষের ফিসফিসে হাসি। পরের দিন খবরের কাগজে শুধু একটা খবর বেরিয়েছিল— বালিচক স্টেশনের কাছে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার।