Private Eye Society - 3 in Bengali Adventure Stories by Aro Chatterjee books and stories PDF | প্রাইভেট আই সোসাইটি - 3

Featured Books
Categories
Share

প্রাইভেট আই সোসাইটি - 3

আমার থিওরিটা শেষ পর্যন্ত খাটেনি। সত্যি বলতে, খাটেনি বললে ভুল হবে, থিওরিটার এমন শোচনীয় মৃত্যু হয়েছে যে কোনো গোয়েন্দা মহলে আর মুখ দেখানোর উপায় নেই।

লোনার লেকের ওপর ওগুলো ভিনগ্রহীদের যান ছিল না। জানা গেল, স্থানীয় কয়েকটা ছেলে মজার ছলে কয়েকটা বড় গ্যাস বেলুনের গায়ে বেগুনি রঙের টুনি লাইট বেঁধে উড়িয়ে দিয়েছিল। দূর থেকে সেগুলোকেই মনে হচ্ছিল ইন্টার-গ্যালাকটিক কোনো আকাশযান। 

কি কান্ড!

যাই হোক, খুব দুঃখজনক ব্যাপার! আমার গোয়েন্দাগিরি করার স্কিল কোনোদিনই তেমন আহামরি ছিল না, কিন্তু দাঁত তোলার সময় মানুষের চিৎকার শুনে যতটা আনন্দ পাই, এই হারানো থিওরির জন্য তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেলাম।

সুবীর অবশ্য দমবার পাত্র নয়। ও গম্ভীর মুখে কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, “শিবু, তোর প্রচুর এখন ওয়ার্ক দরকার, দাঁত তুলে তুলে তোর মস্তিস্ক অসার হয়ে গেছে। আবার সেই পুরোনো ফর্ম এ ফিরতে হবে! কাম অন কমরেড!”

এরপর শুরু হলো আমাদের এক অদ্ভুত রুটিন। পেশায় আমি ডাক্তার আর ও অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কিন্তু নেশায় আমরা যেন সেই স্কুলের হাফ-প্যান্ট পরা সেই দুই বন্ধু—যারা সারা দুনিয়াকে সন্দেহের চোখে দেখত। রাত বাড়লে শুরু হতো আমাদের অনলাইন গোয়েন্দাগিরি। ইন্টারনেটের রহস্যময় ফোরাম ঘাঁটাঘাঁটি আর অদ্ভুত সব খবর নিয়ে আলোচনা করাটা আমাদের নেশা হয়ে দাঁড়াল। 

আর সুবীরের সেই ম্যাপ আর নোটের জঙ্গল দিন দিন বাড়তে লাগল। 

তবে আমাদের অধিকাংশ থিওরিই হতো চরম হাস্যকর। 

যেমন বড়বাজারের সেই বিখ্যাত শেঠজির মৃত্যু। আমি বেশ কয়েকদিন ধরে সিসিটিভি ফুটেজ আর খবরের কাগজ ঘেঁটে একটা অকাট্য থিওরি বানালাম—খুনি হলো শেঠজির খাস পরিচারক। 

মোটিভ? শেঠজি নাকি তার বেতন থেকে কয়েকশো-টাকা কেটে রেখেছিলেন। আমি যখন সুবীরকে প্রায় প্রমাণ করে দিয়েছি যে পরিচারকই ভিলেন, তখনই খবরের কাগজে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে জানা গেল—শেঠজি আসলে সিঁড়িতে পড়ে থাকা একটা কলার খোসায় পা পিছলে গড়গড়িয়ে নিচে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন। কোনো ষড়যন্ত্র নেই, কোনো ইনসুলিন ইনজেকশন নেই, নিছকই এক ‘কমেডিক ’ ট্র্যাজেডি!

ছি ছি। একটা দোষহীন লোককে প্রায় মোরিয়ার্টি বানিয়ে দিয়েছিলাম। আর করবোনা।

তবে সবটাই যে ব্যর্থতা ছিল, তা নয়।

মিউজিয়ামের সেই বিখ্যাত নীল হিরে নিয়ে যখন সারা শহর মেতে আছে, সুবীর তখন রাত জেগে হিরের রিফ্লেকশন ইনডেক্স আর মিউজিয়ামের গত দশ বছরের বাজেট স্টেটমেন্ট মেলাচ্ছিল। ও হঠাৎ ঘোষণা করল, “শিবু, আমার কথা মেলাস, হিরেটা নকল। আসলটা অনেক আগেই পাচার হয়ে গেছে।” 

আমি বিশ্বাস করিনি। 

কিন্তু তার ঠিক এক সপ্তাহ পরেই ব্রেকিং নিউজে দেখা গেল, মিউজিয়ামের হিরেটা আসলে কাঁচের টুকরো ছাড়া আর কিছুই নয়।

সেই রাতে আমরা রাস্তার ধারের ধাবা থেকে স্পেশাল তড়কা আর রুটি খেয়ে সেলিব্রেট করেছিলাম। আমাদের মতো দুই সাধারণ লোকের কাছে এই জয়টুকু ছিল অনেক বড়। কেউ আমাদের কোনো বাহবা দেয়নি, আমরা নিজেই নিজেদের পিঠ চাপড়ে দিয়েছি। 

দিন কয়েক পরের কথা। রাত তখন প্রায় আড়াইটে। চেম্বারের কাজ সেরে ক্লান্ত হয়ে ল্যাপটপে একটা অনলাইন রহস্য-ব্লগের ভিডিও দেখছিলাম। ভিডিওটা ছিল কলকাতার এক পুরনো পোড়ো বাড়ির রহস্য নিয়ে। ড্রোন দিয়ে তোলা শট, ঝাপসা সব দৃশ্য।

হঠাৎ একটা ফ্রেমের কোণায় আমার নজর আটকে গেল।

ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে, ভিড়ের মধ্যে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাধারণ পোশাক, কিন্তু চোখে একটা বড় কালো সানগ্লাস। মাঝরাতের ভিডিওতে সানগ্লাস পরা লোকটা একটু বেমানান তো বটেই, কিন্তু আমার অস্বস্তিটা অন্য কারণে। লোকটাকে আমি কোথাও দেখেছি।

মাথা চুলকালাম। কোথায়? চেম্বারে? নাকি রাস্তার কোনো ভিড়ে? সেই চিবুক, সেই দাঁড়ানোর ভঙ্গি—সবটাই কেমন যেন চেনা। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না। লোকটা কি সেই একপায়ে দৌড়বাজের কনস্পিরেসি থিওরির সাথে যুক্ত কোনো কেউ? নাকি সুবীরের ঘরের কোনো কাটিংয়ে ওর ছবি ছিল?

নিজের কপালে একটা হালকা থাপ্পড় মেরে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিলাম। ভাবলাম, ভাই শিবনাথ, তুই ইদানীং সুবীরের সাথে থেকে বেশি বেশি গোয়েন্দাগিরি করার ভূত মাথায় চাপাচ্ছিস। বেশি জেগে থাকলে চোখের মণির সামনে এরকম অনেক ছায়া ঘোরে, এরপরে ওবামা কে দেখে মনে হবে কোনদিন ওর সঙ্গে বসে চা খেয়েছি চায়ের দোকানে। ঘুম দরকার। স্রেফ ক্লান্তির জন্যই একে চেনা মনে হচ্ছে।

কিন্তু বিছানায় শুয়েও সেই কালো চশমার লোকটা যেন আমার বন্ধ চোখের পাতায় ভাসতে লাগল। লোকটা কে? আর আমি ওকে কোথায় দেখেছি?